Tag: ইডি তদন্ত

  • ED Investigation: ইন্দ্রনীলের সংস্থা থেকে মমতার অ্যাকাউন্টে ‘ট্রান্সফার’ ৩০ লক্ষ টাকা! বড় দাবি ইডির, ইউনেস্কো-কাণ্ডের তদন্তে চাঞ্চল্যকর মোড়

    ED Investigation: ইন্দ্রনীলের সংস্থা থেকে মমতার অ্যাকাউন্টে ‘ট্রান্সফার’ ৩০ লক্ষ টাকা! বড় দাবি ইডির, ইউনেস্কো-কাণ্ডের তদন্তে চাঞ্চল্যকর মোড়

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কলকাতার দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’ ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে একের পর এক তথ্য সামনে আনছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী তথা গায়ক-নেতা ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি সংস্থা ও ব্যক্তির আর্থিক লেনদেন। ১ অক্টোবর প্রকাশিত ইডির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, মাসআর্ট সোসাইটির মাধ্যমে টিকিট বিক্রি, সরকারি টেন্ডার এবং ইন্দ্রনীলের সঙ্গে যুক্ত ‘অক্টেভ রেকর্ডস’-এর ব্যাঙ্ক লেনদেন—এই তিনটি সূত্রে আর্থিক অনিয়মের একাধিক দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

    এই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতেই প্রথমবার প্রকাশ্যে আসে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর তথ্য। ইডির দাবি, অক্টেভ রেকর্ডসের অ্যাকাউন্ট থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা পাঠানো হয়েছিল। তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদে ইন্দ্রনীল ওই অর্থকে গানের রয়্যালটি বাবদ দেওয়া টাকা বলে দাবি করেছেন বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। তবে ওই অর্থের প্রকৃতি নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ইডির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়নি।

    কলকাতার ১৫টি জায়গায় তল্লাশি

    ইডি জানিয়েছে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর কলকাতার ১৫টি জায়গায় তল্লাশি ও বাজেয়াপ্তের অভিযান চালানো হয়। প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্টের (PMLA) ১৭ নম্বর ধারায় এই অভিযান চালানো হয়েছিল। তল্লাশির আওতায় ছিল মাসআর্ট সোসাইটির অফিস ও আবাসিক ঠিকানা, সংস্থার পদাধিকারীদের জায়গা এবং ইন্দ্রনীল সেন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে যুক্ত একাধিক স্থান।

    বৌবাজার থানায় কলকাতা পুলিশের দায়ের করা একটি এফআইআরের ভিত্তিতে এই তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ইডি। ওই এফআইআরে ইন্দ্রনীল সেন ছাড়াও মাসআর্টের সভাপতি মধুছন্দা সেন, সম্পাদক ধ্রুবজ্যোতি বসু, সহ-সভাপতি সায়ন্তন মৈত্র এবং কোষাধ্যক্ষ রঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে। আরও কয়েক জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযোগের কথা জানানো হয়েছে।

    ইউনেস্কোর নাম-লোগো ব্যবহার করে টিকিট বিক্রির অভিযোগ

    ইডির তদন্তের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু মাসআর্ট সোসাইটির দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’। তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কলকাতার ২৪টি নির্বাচিত পুজোমণ্ডপে এই অনুষ্ঠানের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে টিকিট বিক্রি করা হয়েছিল।

    টিকিটের দাম ছিল ১,৭৪৯ টাকা থেকে ৫,৪৯৯ টাকা পর্যন্ত। ইডির দাবি, ২০২৩ ও ২০২৪ সালেই এক লক্ষের বেশি টিকিট ইস্যু করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের অভিযোগ, মাসআর্ট নিজেদের ইউনেস্কোর পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরে এবং ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহার করে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছিল। এই ধরনের বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ।

    এখানে কলকাতার দুর্গাপুজোর ইউনেস্কো স্বীকৃতি এবং কোনও নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক অনুষ্ঠানের জন্য ইউনেস্কোর অনুমোদন—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখছে তদন্ত। ইডির অভিযোগ মূলত ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের বিষয়কে ঘিরে।

    টিকিটের টাকা কোথায় গেল?

    ইডির বক্তব্য অনুযায়ী, মাসআর্টের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে নগদে তোলা হয়েছিল। অন্য অংশ বিভিন্ন খরচের নামে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে তদন্তকারীদের দাবি। এর মধ্যে ‘বিবিধ খরচ’-এর উল্লেখও রয়েছে।

    তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, সংগৃহীত অর্থের একাংশ ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত মোট কত টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছিল, তার মধ্যে কত টাকা নগদে তোলা হয়েছিল এবং নির্দিষ্ট ভাবে কার কাছে কত টাকা পৌঁছেছিল—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করেনি ইডি। ফলে এই আর্থিক লেনদেনের চূড়ান্ত চরিত্র তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে।

    ইন্দ্রনীলের মন্ত্রিত্বকালে ৮৫ কোটির বেশি টেন্ডার

    মাসআর্টের আর্থিক লেনদেনের তদন্ত করতে গিয়ে ইন্দ্রনীল সেনের মন্ত্রিত্বকালের সরকারি টেন্ডারের বিষয়টিও সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে ইডি।

    তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ইন্দ্রনীল সেন মন্ত্রী থাকাকালীন পর্যটন ও সংস্কৃতি দফতরের একাধিক টেন্ডার ধ্রুবজ্যোতি বসু এবং দীপেশ রায়ের মালিকানাধীন সংস্থাগুলি পেয়েছিল। ইডির হিসাব অনুযায়ী, ওই টেন্ডারগুলির সম্মিলিত মূল্য ৮৫ কোটি টাকারও বেশি। তদন্তকারীরা দু’জনকেই ইন্দ্রনীলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

    ইডির আরও দাবি, টেন্ডার পাওয়া সংস্থাগুলি থেকে পরবর্তী সময়ে ইন্দ্রনীলের আত্মীয়দের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে বড় অঙ্কের নগদ টাকা তোলার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি করেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা।

    তবে সরকারি টেন্ডারের মোট মূল্য ৮৫ কোটির বেশি হওয়া এবং সেই পুরো অর্থ বেআইনি ভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে—এই দুই বিষয় এক নয়। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোনও অনিয়ম হয়েছিল কি না এবং পরবর্তী অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে তার কোনও বেআইনি যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

    অক্টেভ রেকর্ডসের অ্যাকাউন্টে ৩.৮ কোটি টাকার বেশি নগদ জমা

    ইডির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ইন্দ্রনীল সেনের সঙ্গে যুক্ত ‘অক্টেভ রেকর্ডস’-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, ইন্দ্রনীলের মন্ত্রিত্বকালে ওই সংস্থার অ্যাকাউন্টে ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টাকারও বেশি নগদ অর্থ জমা পড়েছিল।

    এই অর্থের উৎস কী ছিল, কারা ওই টাকা জমা করেছিলেন এবং কোন ধরনের ব্যবসায়িক কার্যকলাপ থেকে তা এসেছিল—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে ইডির তদন্তের সূত্রে জানা যাচ্ছে। তবে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ওই নগদ জমার প্রতিটি লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।

    মমতার অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা

    তদন্তের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলির একটি হল অক্টেভ রেকর্ডস থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর দাবি।

    ইডির প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অক্টেভ রেকর্ডসের অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার মাধ্যমে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা পাঠানো হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদে ইন্দ্রনীল সেন ওই অর্থকে গানের রয়্যালটি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন বলে জানিয়েছে ইডি।

    তবে কোন গান বা কোন কাজের জন্য এই রয়্যালটি দেওয়া হয়েছিল, কোন সময়কালের হিসাবের ভিত্তিতে অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছিল কিংবা সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও হিসাবপত্রে কী রয়েছে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

    একই সঙ্গে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর তথ্য উল্লেখ করলেও ওই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ইডি এই লেনদেনকে বেআইনি বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। লেনদেনটির প্রকৃতি এবং এর সঙ্গে তদন্তাধীন অন্য আর্থিক সূত্রগুলির কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তেই নির্ধারিত হবে।

    প্রায় ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ ইন্দ্রনীলকে

    ২৯ সেপ্টেম্বরের তল্লাশির পরের দিন ইডির সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে হাজির হন ইন্দ্রনীল সেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে প্রায় ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

    মাসআর্টের টিকিট বিক্রি, সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংস্থাগুলির ভূমিকা এবং বিভিন্ন ব্যাঙ্ক লেনদেন নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয় বলে তদন্ত সূত্রের খবর। এর আগে ইন্দ্রনীল সেন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

    তল্লাশি অভিযানে একাধিক ডিজিটাল ডিভাইস ও গুরুত্বপূর্ণ নথি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে ইডি। তদন্তকারীদের মতে, ওই নথি ও ডিজিটাল তথ্য আর্থিক লেনদেনের গতিপথ খতিয়ে দেখতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

    এখন তদন্তের নজরে তিন আর্থিক সূত্র

    ইডির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই তদন্তে আপাতত তিনটি বড় আর্থিক সূত্র সামনে এসেছে—মাসআর্টের ‘প্রিভিউ শো’-এর টিকিট বিক্রি, ইন্দ্রনীলের মন্ত্রিত্বকালে ৮৫ কোটির বেশি মূল্যের সরকারি টেন্ডার এবং অক্টেভ রেকর্ডসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নগদ জমা ও সেখান থেকে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর।

    এই তিনটি সূত্রের মধ্যে কোনও বেআইনি যোগসূত্র রয়েছে কি না, অর্থের প্রকৃত ব্যবহার কী ছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কতটা—তা তদন্তের পরবর্তী ধাপে স্পষ্ট হওয়ার কথা। ইডি জানিয়েছে, তদন্ত এখনও চলছে। ফলে আরও নথি, ব্যাঙ্ক লেনদেন এবং জিজ্ঞাসাবাদ থেকে নতুন তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

LinkedIn
Share