Tag: ইসরো

  • ISRO privatisation: ইসরো কি বেসরকারি হাতে যাচ্ছে? সব জল্পনায় জল ঢেলে বড় বার্তা মহাকাশ গবেষণা সংস্থার

    ISRO privatisation: ইসরো কি বেসরকারি হাতে যাচ্ছে? সব জল্পনায় জল ঢেলে বড় বার্তা মহাকাশ গবেষণা সংস্থার

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ISRO) কি ধীরে ধীরে বেসরকারি সংস্থার হাতে চলে যাচ্ছে? মহাকাশ ক্ষেত্রে চলতে থাকা সংস্কারের জেরে কি ইসরোর গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে? এই ধরনের জল্পনা এবং রিপোর্টকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভুল বলে সরাসরি খারিজ করল ইসরো। রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর এক সরকারি বিবৃতিতে দেশের শীর্ষ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইসরোকে বেসরকারিকরণ করা হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতেও তার গুরুত্ব কমানো হবে না।

    ইসরোকে ঘিরে জল্পনা কেন?

    ভারতের মহাকাশ ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে বেসরকারি সংস্থার প্রবেশ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। স্যাটেলাইট তৈরি, উৎক্ষেপণযান, প্রোপালশন সিস্টেম, গ্রাউন্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার থেকে শুরু করে মহাকাশ-ভিত্তিক পরিষেবা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখন বেসরকারি সংস্থা এবং স্টার্ট-আপগুলি কাজ করছে।

    এই পরিবর্তনের জেরে ইসরোর কর্মী এবং বিজ্ঞানীদের একাংশের মধ্যে সংস্থাটির ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল। বিশেষ করে ইসরোর পরিণত প্রযুক্তি শিল্পের হাতে তুলে দেওয়া, উৎপাদন ও কিছু পরিচালনমূলক দায়িত্ব বেসরকারি বা অন্যান্য সংস্থার হাতে দেওয়ার মতো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই ইসরোর এই স্পষ্টীকরণ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

    ‘ইসরোর ভূমিকা কমছে না’

    ইসরো জানিয়েছে, মহাকাশ ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণ বাড়ানোর অর্থ কোনওভাবেই ইসরোর ভূমিকা কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং সরকারের মহাকাশ সংস্কারের মূল লক্ষ্য হল একটি বৃহত্তর, শক্তিশালী এবং বহুমুখী ভারতীয় মহাকাশ-ইকোসিস্টেম তৈরি করা। এই ব্যবস্থায় ইসরো, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা, স্টার্ট-আপ এবং শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিজেদের দক্ষতা অনুযায়ী একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।

    ইসরোর বক্তব্য অনুযায়ী, উন্নত মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি বিকাশ, জাতীয় ও কৌশলগত মিশন, মহাকাশবিজ্ঞান ও অনুসন্ধান এবং গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাধুনিক মহাকাশ সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে ইসরোর মূল ভূমিকা অক্ষুণ্ণ থাকবে। অর্থাৎ, বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণকে ইসরোর বিকল্প হিসেবে নয়, বরং ভারতের সামগ্রিক মহাকাশ ক্ষমতা বাড়ানোর একটি মাধ্যম হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

    কেন বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়া হচ্ছে পরিণত প্রযুক্তি?

    এই সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ম্যাচিওর বা পরিণত প্রযুক্তি শিল্পের হাতে তুলে দেওয়া। কোনও প্রযুক্তি যখন গবেষণা ও পরীক্ষার পর্যায় পেরিয়ে নির্ভরযোগ্য এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের উপযোগী হয়ে ওঠে, তখন সেটি বেসরকারি শিল্পের মাধ্যমে আরও বেশি পরিমাণে তৈরি ও বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। ইসরোর যুক্তি, এর অর্থ সেই প্রযুক্তির ক্ষেত্র থেকে সংস্থা সরে যাচ্ছে না।

    বরং বেসরকারি সংস্থা উৎপাদন, বিনিয়োগ, বাণিজ্যিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছনোর কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। অন্যদিকে ইসরোর বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা নিজেদের আরও বেশি সময় দিতে পারবেন নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি এবং এখনও গবেষণার সীমান্তে থাকা জটিল মহাকাশ প্রকল্পে। সহজ কথায়, পুরনো ও পরিণত প্রযুক্তির বৃহৎ উৎপাদনের দায়িত্ব শিল্পের হাতে দিয়ে ইসরো আরও উন্নত প্রযুক্তির গবেষণায় মনোনিবেশ করতে চাইছে।

    ২০২০ থেকেই শুরু মহাকাশ ক্ষেত্রে বড় সংস্কার

    ভারতের মহাকাশ ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের সূচনা হয় ২০২০ সালে। এরপর Indian Space Policy 2023-এর মাধ্যমে সংস্কারের কাঠামো আরও স্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক করা হয়। পাশাপাশি বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা FDI-এর নিয়মও শিথিল করা হয়েছে। এই নীতির মাধ্যমে মহাকাশ ক্ষেত্রের প্রায় গোটা ভ্যালু চেনেই বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

    এর মধ্যে রয়েছে—

    • ● স্যাটেলাইট তৈরি
    • ● উৎক্ষেপণযান নির্মাণ
    • ● প্রোপালশন প্রযুক্তি
    • ● গ্রাউন্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার
    • ● মহাকাশ-ভিত্তিক পরিষেবা
    • ● পৃথিবী পর্যবেক্ষণ
    • ● যোগাযোগ ব্যবস্থা
    • ● মহাকাশ প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার

    ইসরোর ভাষায়, এই পরিবর্তনকে ‘বেসরকারিকরণ’ নয়, বরং ‘ইকোসিস্টেম সম্প্রসারণ এবং সক্ষমতার বহুগুণ বৃদ্ধি’ হিসেবে দেখা উচিত।

    ২০২০-তে হাতে গোনা স্টার্ট-আপ, এখন ৪৫০-এর বেশি

    সংস্কারের ফলে ভারতের মহাকাশ ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ইসরোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে মহাকাশ ক্ষেত্রে স্টার্ট-আপের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। বর্তমানে সেই সংখ্যা ৪৫০-এর বেশি। এই সংস্থাগুলি উৎক্ষেপণযান, স্যাটেলাইট, প্রোপালশন, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, যোগাযোগ এবং বিভিন্ন মহাকাশ-ভিত্তিক পরিষেবা নিয়ে কাজ করছে। এর ফলে ভারতীয় মহাকাশ ক্ষেত্র এখন শুধুমাত্র সরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি বড় শিল্প ও প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমে পরিণত হচ্ছে।

    কৌশলগত পরিকাঠামো থাকবে সরকারের নিয়ন্ত্রণেই

    তবে বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণ বাড়লেও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ও কৌশলগত সক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনও আপস করা হচ্ছে না বলে ইসরো স্পষ্ট করেছে। সংস্থার বক্তব্য, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাকাশ পরিকাঠামো এবং কৌশলগত সক্ষমতার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতেই থাকবে।

    কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাকে পরিষেবা বা পরিচালনমূলক কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও তা জাতীয় নিরাপত্তা, নিরাপত্তা বিধি এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অধীনেই হবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একদিকে যেমন বেসরকারি বিনিয়োগ ও দক্ষতাকে কাজে লাগানো হবে, অন্যদিকে দেশের কৌশলগত মহাকাশ সক্ষমতার উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে।

    ইসরোর কর্মীদেরও বার্তা

    ইসরোর এই বিবৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সংস্থার কর্মী ও বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তা। সংস্কারের ফলে ইসরোর দায়িত্ব ধীরে ধীরে কমে যাবে এবং বেসরকারি সংস্থাগুলি সেই জায়গা দখল করবে—এমন আশঙ্কা যে তৈরি হয়েছিল, তা দূর করার চেষ্টা করেছে ইসরো। বরং সংস্থার বক্তব্যের সারমর্ম হল—বেসরকারি শিল্প যত বেশি পরিণত প্রযুক্তির উৎপাদন ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা সামলাবে, ইসরো তত বেশি মনোযোগ দিতে পারবে কঠিন, কৌশলগত এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির গবেষণায়।

    আসলে ‘ইসরোর জায়গা নেওয়া’ নয়, ‘ইসরোর কাজের পরিধি বাড়ানো’

    বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের মহাকাশ সংস্কারের লক্ষ্য মূলত সরকারি সংস্থাকে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং ইসরোর গবেষণা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে দেশের শিল্পশক্তি, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং স্টার্ট-আপ ইকোসিস্টেমকে যুক্ত করা। এর ফলে ইসরোর সামনে আরও জটিল মহাকাশ অভিযান, উন্নত উৎক্ষেপণ প্রযুক্তি, মহাকাশ অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রযুক্তি তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে।

    একই সঙ্গে শিল্পের মাধ্যমে পরিণত প্রযুক্তির উৎপাদন বাড়লে ভারতের বাণিজ্যিক মহাকাশ বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে। তাই ইসরোর সাম্প্রতিক বার্তাটি মূলত একটি বিষয় পরিষ্কার করছে—ভারতের মহাকাশ ক্ষেত্রে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার অর্থ ইসরোর অবসান বা বেসরকারিকরণ নয়। বরং লক্ষ্য হল ইসরোকে তার মূল গবেষণা ও কৌশলগত দায়িত্বে আরও বেশি মনোনিবেশ করার সুযোগ দিয়ে গোটা ভারতীয় মহাকাশ ব্যবস্থাকে আরও বড় করে তোলা।

  • EOS-05: জিস্যাট-১ ব্যর্থতার ৫ বছর পর বড় কামব্যাক! ইসরোর ইওএস-০৫ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

    EOS-05: জিস্যাট-১ ব্যর্থতার ৫ বছর পর বড় কামব্যাক! ইসরোর ইওএস-০৫ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মহাকাশ থেকে পৃথিবীর উপর নজরদারির ক্ষেত্রে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এগিয়ে গেল ভারত। শুক্রবার ভোরে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হল ভারতের নতুন প্রজন্মের আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট বা ইওএস-০৫। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো-র জিএসএলভি-এফ১৭ রকেটে চেপে শ্রীহরিকোটা থেকে মহাকাশে পাড়ি দিল প্রায় ২,৩৬৭ কেজি ওজনের এই উপগ্রহ। সবচেয়ে বড় বিষয়, ইওএস-০৫-কে সাধারণ নিম্ন কক্ষপথে নয়, সাব-জিটিও বা সাব-জিওসিনক্রোনাস ট্রান্সফার অরবিটে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী ধাপে নিজস্ব প্রপালশন সিস্টেম ব্যবহার করে নির্দিষ্ট জিওসিনক্রোনাস কক্ষপথে পৌঁছবে উপগ্রহটি।

    ভোররাতে শ্রীহরিকোটা থেকে সফল উৎক্ষেপণ

    শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ভোর ২টা ৫৫ মিনিটে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টারের সেকেন্ড লঞ্চ প্যাড থেকে জিএসএলভি-এফ১৭-এর সফল উৎক্ষেপণ হয়। প্রায় ৫১.৭ মিটার লম্বা রকেটটি নির্ধারিত সময়েই আকাশে উড়ে যায়। উৎক্ষেপণের প্রায় ১৮-১৯ মিনিট পর রকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয় ইওএস-০৫। এরপর উপগ্রহটিকে নির্ধারিত সাব-জিটিও-তে স্থাপন করা হয়। অর্থাৎ, এই মুহূর্তে ইওএস-০৫ এখনও তার চূড়ান্ত ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতার অপারেশনাল জিওসিনক্রোনাস অবস্থানে পৌঁছয়নি। সেটি হবে পরবর্তী অরবিট-রেইজিং ম্যানুভারের মাধ্যমে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উপগ্রহটি সফলভাবে মহাকাশে পৌঁছে গেলেও তার পূর্ণাঙ্গ অপারেশনাল মিশন শুরু হতে এখনও কয়েকটি ধাপ বাকি।

    ইওএস-০৫ কেন অন্য আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইটের থেকে আলাদা?

    ইওএস-০৫-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল জিওসিনক্রোনাস অরবিট থেকে ইমেজিং করার ক্ষমতা। সাধারণ আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইটের বড় অংশই লো আর্থ অরবিট (এলইও) বা সান-সিনক্রোনাস অরবিটে (এসএসও) কাজ করে। এই উপগ্রহগুলি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সময় বিভিন্ন অঞ্চলের ছবি তোলে। ফলে কোনও নির্দিষ্ট এলাকার ছবি পাওয়ার জন্য পরবর্তী অরবিটাল পাসের অপেক্ষা করতে হয়।

    ইওএস-০৫-এর ধারণাটি সম্পূর্ণ আলাদা। প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় জিওসিনক্রোনাস অরবিটে অবস্থান করলে উপগ্রহটি পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রদক্ষিণ করবে। ফলে ভারতের মতো একটি বড় ভৌগোলিক অঞ্চলের দিকে প্রায় একই অবস্থান থেকে ক্রমাগত নজর রাখা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, ইওএস-০৫-এর মূল শক্তি শুধু অত্যন্ত উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি তোলা নয়। এর আসল সুবিধা হল একই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ঘন ঘন আপডেটেড ছবি পাওয়া।

    ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে গিয়েও কেন সুবিধা?

    সাধারণভাবে মনে হতে পারে, পৃথিবীর যত কাছাকাছি থাকা যায়, তত বেশি স্পষ্ট ছবি তোলা সম্ভব। সেই যুক্তিতে লো আর্থ অরবিটের উপগ্রহ অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি তুলতে সুবিধাজনক। কিন্তু ইওএস-০৫-এর লক্ষ্য আলাদা। ধরা যাক, বঙ্গোপসাগরে দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে একটি ঘূর্ণিঝড়। লো আর্থ অরবিটের কোনও স্যাটেলাইট সেই সময় অন্য জায়গার উপর দিয়ে উড়ে গেলে, নির্দিষ্ট অঞ্চলের পরবর্তী ছবি পেতে পরবর্তী পাসের অপেক্ষা করতে হতে পারে।

    ইওএস-০৫ অপারেশনাল হলে একই বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে অনেক বেশি ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।ফলে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ, মেঘের গঠন, বন্যার বিস্তার কিংবা আগুনের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির উপর নজরদারিতে এই ব্যবস্থা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আগের জিস্যাট কর্মসূচি সংক্রান্ত সরকারি তথ্যেও নির্দিষ্ট সেক্টরের ছবি ঘন ঘন সংগ্রহ এবং উপযুক্ত পরিস্থিতিতে প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে সমগ্র ভারতীয় ভূখণ্ডের ছবি পাওয়ার লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

    দুর্যোগ মোকাবিলায় বড় হাতিয়ার হতে পারে ইওএস-০৫

    ইওএস-০৫-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারগুলির মধ্যে অন্যতম হতে পারে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। ভারতের মতো দেশে প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিধস, দাবানল-সহ একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যায়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে কয়েক ঘণ্টা আগের তথ্য অনেক সময় যথেষ্ট হয় না। কোথায় জল ঢুকছে, কোন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি বেশি, ঘূর্ণিঝড়ের মেঘ কোথায় তৈরি হচ্ছে—এসব তথ্য যত দ্রুত পাওয়া যায়, প্রশাসনের পক্ষে তত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। জিওসিনক্রোনাস ইমেজিং স্যাটেলাইট সেই জায়গাতেই বড় সুবিধা দিতে পারে।

    উপগ্রহের ছবি ব্যবহার করে—

    • ● ঘূর্ণিঝড়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ,
    • ● মেঘের বিকাশ ও আবহাওয়ার পরিবর্তন শনাক্ত,
    • ● বন্যাকবলিত এলাকা চিহ্নিত,
    • ● বনাঞ্চলে আগুনের বিস্তার পর্যবেক্ষণ,
    • ● দুর্যোগের পর ভূমি ও উদ্ভিদের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতে পারে।

    তবে ইওএস-০৫ ভারতের অন্যান্য আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইটকে প্রতিস্থাপন করবে না। বরং এটি দেশের বর্তমান উপগ্রহ ব্যবস্থার সঙ্গে একটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অবজারভেশন সক্ষমতা যোগ করবে।

    কৃষি থেকে পরিবেশ—বহু ক্ষেত্রে ব্যবহার

    ইওএস-০৫-এর গুরুত্ব শুধু দুর্যোগ মোকাবিলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। আর্থ অবজারভেশন ডেটা কৃষি, বন, পরিবেশ এবং ভূমি ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন স্পেকট্রাল ব্যান্ডে ইমেজিংয়ের মাধ্যমে শুধুমাত্র কোনও এলাকার ছবি নয়, সেই এলাকার উদ্ভিদ, ফসল, মাটি এবং পরিবেশের পরিবর্তন সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায়। ভিজিবল ও নিয়ার-ইনফ্রারেডের মতো বিভিন্ন স্পেকট্রাল ব্যান্ড ব্যবহার করে কোনও অঞ্চলের উদ্ভিদের স্বাস্থ্য বা পরিবেশগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা সম্ভব।

    অর্থাৎ প্রশ্নটা শুধু নয় যে—“এই জায়গাটা দেখতে কেমন?” বরং স্যাটেলাইট ডেটা থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়—“এই জায়গায় কী পরিবর্তন হচ্ছে?” কৃষিক্ষেত্রে ফসলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, পরিবেশগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ল্যান্ড-ইউজ মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

    কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ইওএস-০৫

    ইওএস-০৫-কে সরাসরি কোনও ডেডিকেটেড মিলিটারি স্পাই স্যাটেলাইট হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। এটি মূলত একটি আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট, যার অসামরিক এবং কৌশলগত—দুই ধরনের ব্যবহারই থাকতে পারে।  তবে জিওসিনক্রোনাস অরবিট থেকে ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ও আশপাশের জলভাগকে ঘন ঘন পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

    বিশেষ করে দেশের সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং সামুদ্রিক অঞ্চলের উপর নিয়মিত নজরদারির ক্ষেত্রে এই ধরনের হাই-ফ্রিকোয়েন্সি স্যাটেলাইট ইমেজারি সহায়ক হতে পারে। এখানেই ইওএস-০৫-এর কৌশলগত গুরুত্ব। এটি কোনও একটি সামরিক লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে তৈরি নয়, বরং একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের উপর নিয়মিত ও দ্রুত আপডেটেড নজরদারি সক্ষমতা তৈরি করছে।

    জিস্যাট-১ ব্যর্থতার পাঁচ বছর পর নতুন সাফল্য

    ইওএস-০৫-এর এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অতীত। উপগ্রহটির সঙ্গে জিস্যাট কর্মসূচির সরাসরি যোগ রয়েছে। মূল পরিকল্পনায় জিওস্টেশনারি অরবিটে ইমেজিং স্যাটেলাইট পাঠিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের উপর প্রায় রিয়েল-টাইম অবজারভেশন সক্ষমতা তৈরি করার লক্ষ্য ছিল।

    কিন্তু ২০২১ সালের অগাস্টে জিএসএলভি-এফ১০ মিশন ব্যর্থ হয়। সেই মিশনে জিস্যাট-১-কে কক্ষপথে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ক্রায়োজেনিক আপার স্টেজের অপারেশনের সময় সমস্যার কারণে উপগ্রহটি নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছতে পারেনি। প্রায় পাঁচ বছর পর ইওএস-০৫-এর সফল উৎক্ষেপণ সেই বৃহত্তর পরিকল্পনাকেই নতুন করে এগিয়ে দিল।

    জিএসএলভি-এফ১৭-এর সফল মিশন শুধু একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নয়; এটি জিওসিনক্রোনাস ইমেজিং সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে ইসরো-র জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তনও।

    জিএসএলভি-এফ১৭-ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়

    এই মিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল জিএসএলভি-এফ১৭। এটি ভারতের জিওসিনক্রোনাস স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকলের ১৯তম উড়ান। রকেটটিতে রয়েছে সলিড কোর, চারটি লিকুইড স্ট্র্যাপ-অন মোটর, লিকুইড সেকেন্ড স্টেজ এবং ভারতের নিজস্ব ক্রায়োজেনিক আপার স্টেজ। তুলনামূলকভাবে ভারী স্পেসক্রাফ্টকে জিওসিনক্রোনাস অরবিটের দিকে পাঠানোর ক্ষেত্রে জিএসএলভি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লঞ্চ ভেহিকল। ইওএস-০৫-কে সাব-জিটিও-তে সফলভাবে স্থাপন করে জিএসএলভি-এফ১৭ সেই সক্ষমতারই আরও একটি প্রমাণ দিল।

    এখন কী হবে ইওএস-০৫-এর?

    এখনও ইওএস-০৫-এর কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। সাব-জিটিও-তে পৌঁছনোর পর উপগ্রহটি নিজস্ব অনবোর্ড প্রপালশন সিস্টেম ব্যবহার করে ধাপে ধাপে কক্ষপথের উচ্চতা বাড়াবে। একাধিক অরবিট-রেইজিং ম্যানুভার-এর পর সেটি তার নির্দিষ্ট জিওসিনক্রোনাস অবস্থানে পৌঁছবে। এরপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ক্যালিব্রেশন এবং কমিশনিং সম্পন্ন হলে শুরু হবে অপারেশনাল ইমেজিং। তাই ইওএস-০৫ ইতিমধ্যেই ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতার ফাইনাল জিওসিনক্রোনাস অরবিটে পৌঁছে গিয়েছে—এমন দাবি করা প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক হবে না। লঞ্চ এবং অরবিটাল ইনজেকশন সফল হয়েছে; ফাইনাল অপারেশনাল অরবিটে পৌঁছনোর যাত্রা এখনও বাকি।

    ভারতের স্পেস অবজারভেশনে নতুন যুগের সূচনা?

    ভারতের আর্থ অবজারভেশন কর্মসূচি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট শক্তিশালী। বিভিন্ন রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের উচ্চমানের ছবি এবং তথ্য সংগ্রহ করছে। কিন্তু ইওএস-০৫ সেই ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। লো আর্থ অরবিট স্যাটেলাইটের বড় সুবিধা হল ডিটেল বা স্পেশিয়াল রেজোলিউশন। অন্যদিকে জিওসিনক্রোনাস ইমেজিং প্ল্যাটফর্মের বড় শক্তি হল ফ্রিকোয়েন্সি এবং পারসিস্টেন্স—একই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পরিবর্তনকে আরও ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ করা।

    দুর্যোগের সময় এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একটি ঘূর্ণিঝড়, বন্যা কিংবা দাবানলের ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা আগের ছবি এবং সদ্য পাওয়া ছবির মধ্যে ব্যবধানই কখনও কখনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য তৈরি করে। সেই জায়গায় ইওএস-০৫ ভারতের জন্য শুধুমাত্র আরও একটি স্যাটেলাইট নয়। এটি বড় অঞ্চলের উপর দ্রুত, ঘন ঘন এবং ধারাবাহিক আর্থ অবজারভেশনের নতুন সক্ষমতা তৈরি করতে পারে।

    মহাকাশে ভারতের নতুন চোখ

    জিএসএলভি-এফ১৭-এর সফল উৎক্ষেপণ এবং ইওএস-০৫-এর সাব-জিটিও-তে সঠিকভাবে পৌঁছে যাওয়া ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। এখন নজর থাকবে উপগ্রহটির অরবিট-রেইজিং, কমিশনিং এবং অপারেশনাল ইমেজিংয়ের দিকে। চূড়ান্তভাবে কাজ শুরু করলে ইওএস-০৫-এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যেতে পারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, কৃষি, পরিবেশ এবং কৌশলগত নজরদারি—এই একাধিক ক্ষেত্রে। অর্থাৎ, মহাকাশ থেকে ভারতকে দেখার ক্ষমতা শুধু আরও শক্তিশালী হচ্ছে তাই নয়—কত দ্রুত সেই ছবি পাওয়া যাচ্ছে, সেই ক্ষমতাতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে ইওএস-০৫।

  • ISRO Transformation: বড় রদবদল ইসরোর কাজে, রকেট-স্যাটেলাইট তৈরির দায়িত্ব যাচ্ছে বেসরকারি সংস্থার হাতে!

    ISRO Transformation: বড় রদবদল ইসরোর কাজে, রকেট-স্যাটেলাইট তৈরির দায়িত্ব যাচ্ছে বেসরকারি সংস্থার হাতে!

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে কেন্দ্র। ভবিষ্যতে রকেট ও নিয়মিত ব্যবহারের উপগ্রহ তৈরির মতো রুটিন উৎপাদনমূলক কাজ থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে গবেষণা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক অভিযান এবং বিশেষ পরিকাঠামো তৈরিতে আরও বেশি মন দিতে চলেছে ইসরো (ISRO)। সেই সঙ্গে রকেট ও উপগ্রহের উৎপাদন এবং বাণিজ্যিক পরিচালনার বড় অংশ তুলে দেওয়া হবে বেসরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট শিল্পক্ষেত্রের হাতে। একটি সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইন-স্পেস-এর চেয়ারম্যান ড. পবন গোয়েঙ্কা এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই রূপান্তর ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে এবং আগামী দিনে ভারতের মহাকাশ শিল্পে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

    রকেট তৈরির দায়িত্ব আর নেবে না ইসরো

    পবন গোয়েঙ্কার কথায়, ভবিষ্যতে ইসরো নিজে আর কোনও লঞ্চ ভেহিকল তৈরি করবে না। তাঁর বক্তব্য, রকেট নির্মাণের কাজ বেসরকারি সংস্থা অথবা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার হাতে চলে যাবে। এর ফলে কয়েক দশক ধরে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে যে মডেল কার্যকর ছিল, তাতে বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। এতদিন গবেষণা থেকে শুরু করে রকেটের নকশা, উৎপাদন এবং উৎক্ষেপণ—প্রায় প্রতিটি স্তরেই ইসরোর কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল। নতুন ব্যবস্থায় ইসরো মূলত প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।

    এসএসএলভি দিয়ে শুরু হয়েছে পরিবর্তন

    এই প্রক্রিয়ার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে উঠে এসেছে স্মল স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিক্যল বা এসএসএলভি (SSLV)। ইতিমধ্যেই এসএসএলভি-র প্রযুক্তি ও উৎপাদনের অধিকার নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (HAL)-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এটি ভারতের মহাকাশ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির। ভবিষ্যতে আরও বড় রকেটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মডেল কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

    এবার পিএসএলভি ও এলভিএম ৩-র পালা?

    পরবর্তী ধাপে ভারতের দুই গুরুত্বপূর্ণ লঞ্চ ভেহিকল—পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিক্যল বা পিএসএলভি (PSLV) এবং লঞ্চ ভেহিক্যল মার্ক-৩ বা সংক্ষেপে এলভিএম-৩ (LVM3) —বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া এগোতে পারে। এলভিএম-৩ বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী কার্যকরী রকেট। ভারী উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পাশাপাশি ভারতের ভবিষ্যৎ মানব মহাকাশ অভিযানেও এই পরিবারের রকেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে এসএসএলভি-এর মতো এবার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন গোয়েঙ্কা। অর্থাৎ, এই পর্বে বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলিই মূলত উৎপাদনের দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পাবে।

    গবেষণায় আরও বেশি মন দেবে ইসরো

    এই পরিবর্তনের ফলে ইসরোর চরিত্রও ধীরে ধীরে বদলাবে। শুধু রকেট ও উপগ্রহ তৈরির দায়িত্ব পালনকারী সংস্থা হিসেবে নয়, বরং একটি গবেষণা ও উন্নয়ন বা গবেষণা-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসরোকে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন প্রযুক্তি তৈরি, বৈজ্ঞানিক মহাকাশ অভিযান, বিশেষায়িত উপগ্রহ এবং এমন উন্নত পরিকাঠামো নির্মাণে ইসরো গুরুত্ব দেবে, যেগুলি বেসরকারি সংস্থার পক্ষে একা তৈরি করা কঠিন। কোনও প্রযুক্তি পরীক্ষিত ও পরিণত হয়ে গেলে তা বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হবে। সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেসরকারি শিল্প বাণিজ্যিক পরিষেবা চালাতে পারবে। গোয়েঙ্কা জানান, ইতিমধ্যেই ইসরো ১২০টি প্রযুক্তি বেসরকারি ক্ষেত্রের হাতে হস্তান্তর করেছে।

    নতুন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রও বেসরকারি হাতে যেতে পারে

    শুধু রকেট উৎপাদন নয়, ভারতের একটি নতুন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বও বেসরকারি শিল্পের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গোয়েঙ্কার বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী চার-পাঁচ মাসের মধ্যে এই উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের অপারেটর চূড়ান্ত হতে পারে। এর ফলে ভারতের মহাকাশ পরিকাঠামোতেও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের পরিমাণ বাড়বে।

    ২০৩৩ সালের মধ্যে ৪৪ বিলিয়ন ডলারের মহাকাশ অর্থনীতি

    ভারতের এই নীতির পিছনে রয়েছে আরও বড় অর্থনৈতিক লক্ষ্য। বর্তমানে ভারতের মহাকাশ অর্থনীতির আকার প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩৩ সালের মধ্যে সেটিকে ৪৪ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া। এই লক্ষ্য পূরণে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন গোয়েঙ্কা। প্রথমত, মহাকাশ পরিষেবায় সরকারের চাহিদা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রচলিত মহাকাশ শিল্পের বাইরের ক্ষেত্রগুলিতে মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় মহাকাশ পরিষেবা ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে একজন ‘অ্যাঙ্কর কাস্টমার’ বা প্রধান ক্রেতা হিসেবে কাজ করতে হবে বলেও মত দিয়েছেন তিনি।

    প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও বাড়ছে বেসরকারি মহাকাশ সংস্থার ভূমিকা

    প্রতিরক্ষা ক্ষেত্র ইতিমধ্যেই এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক বেসরকারি সংস্থাগুলির কাছ থেকে ৩১টি উপগ্রহের অর্ডার দিয়েছে। একই বৃহত্তর কর্মসূচির আওতায় আরও ২১টি উপগ্রহ তৈরি করার কথা ইসরোর। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে নিরাপত্তা, নজরদারি, যোগাযোগ এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা প্রয়োজনেও বেসরকারি মহাকাশ সংস্থার তৈরি উপগ্রহের ব্যবহার বাড়তে পারে।

    বদলাচ্ছে মহাকাশ ব্যবসার মডেল

    ভারত শুধু বেসরকারি সংস্থাকে রকেট বা উপগ্রহ তৈরির সুযোগ দিতে চাইছে না, বরং মহাকাশ সম্পদের মালিকানা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুন মডেলের দিকে এগোচ্ছে। এই মডেলে বেসরকারি সংস্থাগুলি নিজেরাই উপগ্রহের মালিক হবে। সেই উপগ্রহ থেকে সংগৃহীত তথ্য, ডেটা ও পরিষেবা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে তারা আয় করতে পারবে। ফলে আগামী দিনে ভারতের মহাকাশ অর্থনীতিতে শুধু উৎক্ষেপণ পরিষেবা নয়, স্যাটেলাইট ডেটা, স্পেস-ভিত্তিক পরিষেবা, যোগাযোগ, নজরদারি এবং বিভিন্ন শিল্পে মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

    ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে নতুন যুগের সূচনা?

    স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির বিকাশে ইসরোর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। সীমিত সম্পদ ও পরিকাঠামোর মধ্যে নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি করে ভারত আজ বিশ্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এবার সেই মডেলেই বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। রুটিন উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কাজের বড় অংশ শিল্পক্ষেত্রের হাতে তুলে দিয়ে ইসরো যদি গবেষণা ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির দিকে আরও বেশি মন দিতে পারে, তাহলে চাঁদ, মঙ্গল, মানব মহাকাশ অভিযান, গভীর মহাকাশ গবেষণা এবং নতুন প্রজন্মের উৎক্ষেপণ প্রযুক্তিতে ভারতের সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। অর্থাৎ, রকেট তৈরি থেকে প্রযুক্তি তৈরি—ইসরোর ভূমিকার এই পরিবর্তনই ভারতের পরবর্তী মহাকাশ অভিযানের অন্যতম বড় ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

LinkedIn
Share