Tag: কলকাতার GRSE

  • Indian Navy: ৪০ হাজার কোটির স্টেলথ করভেট প্রকল্পে সিলমোহর কেন্দ্রের! নৌবাহিনীর জন্য তৈরি হবে ৮টি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ

    Indian Navy: ৪০ হাজার কোটির স্টেলথ করভেট প্রকল্পে সিলমোহর কেন্দ্রের! নৌবাহিনীর জন্য তৈরি হবে ৮টি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতীয় নৌবাহিনীর শক্তি আরও বাড়াতে বড় পদক্ষেপ কেন্দ্রের। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি (CCS) ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য ৮টি নেক্সট জেনারেশন করভেট (Next Generation Corvettes) তৈরির প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কলকাতার গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (GRSE) এবং গোয়া শিপইয়ার্ড লিমিটেড (GSL) এই যুদ্ধজাহাজগুলি তৈরি করবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দুই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।

    এই প্রকল্প শুধু ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নয়, দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন, অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (IOR) ভারতের কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

    কী বিশেষত্ব এই নেক্সট জেনারেশন করভেটগুলির?

    প্রস্তাবিত আটটি করভেট হবে প্রায় ২,০০০ টন ওজনের উচ্চগতিসম্পন্ন যুদ্ধজাহাজ। ঘণ্টায় নয়, নৌবাহিনীর প্রচলিত গতির একক নট অনুযায়ী, এগুলির সর্বোচ্চ গতি হতে পারে প্রায় ৩০ নট। ভারতীয় নৌবাহিনীর নিজস্ব নকশায় তৈরি এই যুদ্ধজাহাজগুলিতে ব্যবহার করা হবে অত্যাধুনিক জাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তি এবং স্টেলথ প্রযুক্তি। ফলে শত্রুপক্ষের নজরদারি ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযানে এগুলিকে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

    নকশার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল বহুমুখী অভিযানে অংশ নেওয়ার ক্ষমতা। সমুদ্রপৃষ্ঠে শত্রুর যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে অভিযান, সাবমেরিন শনাক্ত ও মোকাবিলা এবং আকাশপথ থেকে আসা হুমকি প্রতিহত করার মতো কাজে ব্যবহার করা যাবে এই করভেটগুলি। পাশাপাশি নজরদারি, যুদ্ধজাহাজকে এসকর্ট করা, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা বজায় রাখার মতো দায়িত্বও পালন করতে পারবে এগুলি।

    উন্নত সেন্সর, অস্ত্রব্যবস্থা, স্টেলথ নকশা এবং উচ্চ চালনক্ষমতার সমন্বয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীর অভিযানের পরিধি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষত উপকূলবর্তী জলসীমা থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগরের বিস্তৃত এলাকায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো এবং একাধিক ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে এই যুদ্ধজাহাজগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

    ৫টি যুদ্ধজাহাজ তৈরি করবে জিআরএসই, বাকি ৩টি জিএসএল

    প্রকল্পটির দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে দুই রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ নির্মাণ সংস্থার মধ্যে। বাণিজ্যিক দরপত্র খোলার পর ২০২৫ সালের মে মাসে জিআরএসই সর্বনিম্ন দরদাতা বা L1 হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কলকাতার জিআরএসই তৈরি করবে পাঁচটি করভেট। বাকি তিনটি তৈরি করবে গোয়া শিপইয়ার্ড লিমিটেড। দুই সংস্থার ক্ষেত্রেই প্রতি যুদ্ধজাহাজের নির্মাণমূল্য একই রাখার কথা।

    কলকাতার জিআরএসই-র জন্য এই প্রকল্প বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বড় অঙ্কের এই বরাত সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি কাজের নিশ্চয়তা বাড়াবে। পাশাপাশি গোয়া শিপইয়ার্ডের উৎপাদন ও নির্মাণ পরিকাঠামোও উপকৃত হবে। যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME), যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী এবং অন্যান্য সহযোগী সংস্থার কাছেও নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরির আশা করা হচ্ছে।

    ৭০ শতাংশের বেশি দেশীয় প্রযুক্তি ও উপকরণ

    প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দেশীয় উপাদানের ব্যবহার। আটটি যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে ৭০ শতাংশের বেশি দেশীয় সামগ্রী ও প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্প, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সরবরাহ শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী হতে পারে।

    কেন্দ্রের আত্মনির্ভর ভারত (Atmanirbhar Bharat) উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। বিদেশি প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় নকশা, উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোই এর অন্যতম লক্ষ্য।

    একই সঙ্গে প্রকল্পটি ভারতের SAGAR—Security and Growth for All in the Region—ভাবনার সঙ্গেও সম্পর্কিত। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং ভারতের উপস্থিতি জোরদার করার ক্ষেত্রে আধুনিক যুদ্ধজাহাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

    ২০৩০ সালের মধ্যে প্রথম যুদ্ধজাহাজ হাতে পাওয়ার লক্ষ্য

    প্রকল্পের অনুমোদন মিললেও এবার মূল নজর নির্মাণের সময়সীমার দিকে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগামী এক বছরের মধ্যে প্রথম করভেটের নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রথম যুদ্ধজাহাজটি নৌবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নির্মাণের সময় আরও কমিয়ে আনা যায় কি না, তা নিয়েও দুই শিপইয়ার্ডের তরফে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

    পরবর্তী যুদ্ধজাহাজগুলির সরবরাহ ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন কত দ্রুত এগোয়, তার উপর নির্ভর করবে নৌবাহিনী কত তাড়াতাড়ি নতুন করভেটগুলিকে সক্রিয় পরিষেবায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।

    ২০২২ সালে শুরু, এবার চূড়ান্ত অনুমোদন

    নেক্সট জেনারেশন করভেট তৈরির পরিকল্পনা বেশ কয়েক বছর ধরেই বিবেচনাধীন ছিল। ২০২২ সালের জুন মাসে প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ (Defence Acquisition Council) আটটি করভেট নির্মাণের জন্য Acceptance of Necessity বা প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তার অনুমোদন দেয়। সেই সময় প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ছিল প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

    এরপর দরপত্র প্রক্রিয়া, ২০২৫ সালের মে মাসে জিআরএসই-র সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়া এবং ২০২৬ সালে মূল্য নিয়ে আলোচনা-সহ একাধিক ধাপ অতিক্রম করে প্রকল্পটি। এদিকে নৌবাহিনীর ওয়ারশিপ ডিজাইন ব্যুরোর সহযোগিতায় নেভাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল ল্যাবরেটরি (NSTL) সফলভাবে হাইড্রোডাইনামিক মডেল পরীক্ষাও সম্পন্ন করেছে। এবার CCS-এর অনুমোদনের ফলে চুক্তি স্বাক্ষর এবং নির্মাণকাজ শুরুর পথ আরও প্রশস্ত হল।

    চিনের উপস্থিতির মধ্যে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প?

    ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে ভারতীয় নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু বড় যুদ্ধজাহাজ নয়, দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং বিভিন্ন ধরনের অভিযানে সক্ষম করভেটও নৌবাহিনীর কৌশলগত পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ।

    প্রস্তাবিত করভেটগুলি ভারতীয় নৌবাহিনীর পুরনো খুখরি-শ্রেণি ও কোরা-শ্রেণির করভেটগুলির জায়গা নিতে পারে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নতুন যুদ্ধজাহাজগুলির কার্যকরী সক্ষমতা শুধু পুরনো জাহাজের বিকল্প হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নজরদারি, এসকর্ট, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা এবং সমুদ্রপথে দ্রুত সামরিক প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রেও এগুলি নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

    বর্তমানে নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণ কর্মসূচিতে নীলগিরি-শ্রেণির ফ্রিগেট, পরবর্তী প্রজন্মের ডেস্ট্রয়ার এবং ফ্লিট সাপোর্ট শিপের মতো বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাটফর্ম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে আটটি নেক্সট জেনারেশন করভেট যুক্ত হলে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে আরও আধুনিক ও বহুমুখী যুদ্ধজাহাজের সমন্বয় তৈরি হবে।

    সব মিলিয়ে, ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই প্রকল্প প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভারতীয় নৌবাহিনীর সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি বড় পদক্ষেপ। এখন চুক্তি স্বাক্ষর, নির্মাণের অগ্রগতি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ—এই তিনটি বিষয়ই প্রকল্পের সাফল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

LinkedIn
Share