Tag: ভারতীয় প্রতিরক্ষা

  • 800 Km BrahMos: ৪৫০ থেকে বেড়ে ৮০০ কিমি পাল্লা! আরও বিধ্বংসী হচ্ছে ব্রহ্মস, ২০২৭ সালেই পরীক্ষা?

    800 Km BrahMos: ৪৫০ থেকে বেড়ে ৮০০ কিমি পাল্লা! আরও বিধ্বংসী হচ্ছে ব্রহ্মস, ২০২৭ সালেই পরীক্ষা?

    সুশান্ত দাস

    ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তিতে আরও বড়সড় সংযোজন হতে চলেছে ব্রহ্মস (BrahMos) সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল। ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়িয়ে ৪৫০ কিলোমিটার থেকে ৮০০ কিলোমিটার করার লক্ষ্যে দ্রুত কাজ করছে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO)। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সমুদ্র ও স্থলপথে শত্রুপক্ষের কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আরও অনেক দূর থেকে নিখুঁত আঘাত হানতে পারবে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী। শুধু পাল্লা বৃদ্ধি নয়, নতুন সংস্করণে র‌্যামজেট ইঞ্জিনের উন্নয়ন এবং একাধিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও আনা হচ্ছে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে শুরু হতে পারে নতুন সংস্করণের ডেভেলপমেন্ট টেস্টিং। ২০২৭ সালের শেষ অথবা ২০২৮ সালের গোড়ায় পরীক্ষার পর্ব সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

    কীভাবে বাড়বে ব্রহ্মসের পাল্লা?

    ব্রহ্মস একটি সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল, যা র‌্যামজেট ইঞ্জিন প্রযুক্তির সাহায্যে পরিচালিত হয়। নতুন সংস্করণে ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা ৮০০ কিলোমিটারে নিয়ে যেতে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা ও জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

    র‌্যামজেট ইঞ্জিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এটি বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করে জ্বালানি দহনের কাজে ব্যবহার করে। ফলে ক্ষেপণাস্ত্রকে জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর করে তোলা সম্ভব। এই প্রযুক্তির উন্নত সংস্করণ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্রহ্মসের উড়ানপথ ও পাল্লা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

    নতুন সংস্করণে ওজন নিয়ন্ত্রণ, উন্নত নেভিগেশন ব্যবস্থা এবং ওয়ারহেডের সক্ষমতা নিয়েও কাজ হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘ দূরত্বে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পাশাপাশি নির্ভুলতা ও সামগ্রিক যুদ্ধক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

    পুরনো লঞ্চারেই ব্যবহার করা যাবে নতুন ব্রহ্মস!

    এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, পাল্লা বাড়লেও ক্ষেপণাস্ত্রটির লঞ্চার এবং সংশ্লিষ্ট সহায়ক ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না বলে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, ভারতীয় নৌসেনার যে যুদ্ধজাহাজগুলিতে বর্তমানে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন রয়েছে, সেগুলিতে নতুন সংস্করণ যুক্ত করার জন্য বড় ধরনের পরিকাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে না।

    এর ফলে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ক্ষেত্রে সময় ও খরচ, দু’দিক থেকেই সুবিধা পাওয়া যাবে। বিদ্যমান যুদ্ধজাহাজের পরিকাঠামো ব্যবহার করেই উন্নত সংস্করণকে কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে।

    প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নতুন কোনও অস্ত্রব্যবস্থা তৈরি করলেই শুধু হয় না, সেটিকে বিদ্যমান সামরিক পরিকাঠামোর সঙ্গে দ্রুত সংযুক্ত করাও সমান জরুরি। সেই জায়গায় ব্রহ্মসের নতুন সংস্করণ ভারতীয় নৌসেনার জন্য বিশেষ সুবিধা এনে দিতে পারে।

    ২০২৭ সালেই শুরু হতে পারে পরীক্ষামূলক উড়ান

    নতুন ব্রহ্মস তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে উন্নত র‌্যামজেট ইঞ্জিন এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের দেশীয় স্তরে পরীক্ষা চালানো হবে। সেই পরীক্ষায় সাফল্য মিললে পরবর্তী পর্যায়ে ক্ষেপণাস্ত্রটির ডেভেলপমেন্ট টেস্টিং শুরু হবে।

    প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে এই পরীক্ষা শুরু হতে পারে। ২০২৭ সালের শেষ অথবা ২০২৮ সালের গোড়ার মধ্যে পরীক্ষার পর্ব শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

    পরীক্ষার সময় ক্ষেপণাস্ত্রটির গতি, পাল্লা, নেভিগেশন এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতা খতিয়ে দেখা হবে। সমস্ত পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফল মিললে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবহারের জন্য উৎপাদন শুরু করার উপর জোর দেওয়া হবে। সম্ভাব্য সময়সীমা ২০২৮ সাল।

    রফতানির জন্য ২৯০ কিমি, ভারতের হাতে ৮০০ কিমির সংস্করণ

    ব্রহ্মসের নতুন সংস্করণের কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের বিষয়টিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। রফতানির ক্ষেত্রে ভারত ২৯০ কিলোমিটার পাল্লার ব্রহ্মস সংস্করণের উৎপাদন অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে, ৮০০ কিলোমিটার পাল্লার উন্নত সংস্করণ মূলত ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর প্রয়োজন মেটানোর জন্য তৈরি করা হবে।

    এর পিছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (MTCR)-এর বিধিনিষেধ। এই ব্যবস্থার আওতায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম রফতানির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে দেশীয় সামরিক প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা—দুই ক্ষেত্রেই আলাদা কৌশল বজায় রাখার সুযোগ পাবে ভারত।

    চিন ও পাকিস্তানের মোকাবিলায় বাড়বে কৌশলগত সুবিধা

    ব্রহ্মসের পাল্লা ৮০০ কিলোমিটারে পৌঁছলে ভারতের সামরিক সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। সমুদ্রপথে শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজকে অনেক বেশি দূর থেকে নিশানা করার সুযোগ তৈরি হবে। একইভাবে স্থলভাগে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পরিকাঠামো ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রেও বাড়বে সক্ষমতা।

    বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নৌসেনার উপস্থিতি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করার ক্ষেত্রে এই ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। পাশাপাশি চিন ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলির সামরিক সক্ষমতার মোকাবিলায় ভারতের প্রতিরোধমূলক শক্তি (Deterrence Capability) আরও মজবুত হবে।

    স্থল, জল এবং আকাশ—তিন ক্ষেত্রেই ব্রহ্মসের ব্যবহারযোগ্যতা ভারতের সামরিক পরিকল্পনায় বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে। তবে নতুন সংস্করণের প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে পরীক্ষার ফলাফল এবং বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির পর তার বাস্তব প্রয়োগের উপর।

    আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পথে আরও এক ধাপ

    ভারত ও রাশিয়ার যৌথ সহযোগিতায় ব্রহ্মস প্রকল্পের সূচনা হলেও এর উন্নত সংস্করণ তৈরির ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তি ও গবেষণার ভূমিকা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। উন্নত ইঞ্জিন, নেভিগেশন এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার পরীক্ষায় সাফল্য এলে ভারতের নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থাও উপকৃত হবে।

    তবে এই প্রকল্পের সামনে প্রযুক্তিগত জটিলতা, দীর্ঘ পাল্লায় নির্ভুলতা বজায় রাখা এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমস্ত পরীক্ষা শেষ করে উৎপাদন শুরু করাও বড় বিষয়।

    সব মিলিয়ে, ৪৫০ কিলোমিটার থেকে ৮০০ কিলোমিটার পাল্লার ব্রহ্মস তৈরির উদ্যোগ ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে চলেছে। পরিকল্পনা সফল হলে ভারতীয় নৌসেনা, স্থলসেনা ও বায়ুসেনার আক্রমণাত্মক সক্ষমতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে এই উন্নত সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র।

LinkedIn
Share