মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, কোটি কোটি ভক্তের কাছে এটি আস্থা, ভক্তি ও পুণ্যলাভের এক মহামুহূর্ত। ওড়িশার পুরীতে অনুষ্ঠিত শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে শুরু হওয়া এই উৎসব ঘিরে দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত পুরীতে ভিড় জমান। সংস্কৃত ভাষায় ‘রথ’ শব্দের অর্থ গাড়ি এবং ‘যাত্রা’ অর্থ শোভাযাত্রা বা মিছিল। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রথে আরোহী জগন্নাথদেবের এক ঝলক দর্শন করাও বহু জন্মের পুণ্যের ফল। একইসঙ্গে রথের রশি স্পর্শ করা বা রথ টানার সুযোগকে অত্যন্ত সৌভাগ্যের বলে মনে করা হয়।
পুরীর রথযাত্রার বিশেষ ঐতিহ্য
পুরীর রথযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ হল শতাব্দীপ্রাচীন রাজপরম্পরা। আজ রাজতন্ত্র না থাকলেও পুরীর রাজপরিবারের উত্তরাধিকারীই প্রতি বছর এই উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। রথযাত্রা শুরুর আগে তিনি তিনটি রথের সামনে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেন এবং সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথের চারপাশ পরিষ্কার করার বিশেষ আচার, ‘ছেরা পহরা’, সম্পন্ন করেন। এই আচার শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় রথ টানার পর্ব।
কেন তিনটি আলাদা রথ?
পুরীর রথযাত্রা মূলত শ্রীজগন্নাথ, তাঁর বড় ভাই বলভদ্র (বলরাম) এবং বোন সুভদ্রার গুণ্ডিচা মন্দির যাত্রার স্মৃতিকে কেন্দ্র করে পালিত হয়। এই কারণে তিন দেবতার জন্য থাকে তিনটি পৃথক রথ। যাত্রার ক্রমও নির্দিষ্ট—
- প্রথমে বলভদ্রের রথ
- এরপর সুভদ্রার রথ
- সব শেষে জগন্নাথদেবের রথ
উল্টো রথ বা বাহুদা যাত্রা শেষে প্রতিবছর নতুন করে রথ নির্মাণ করা হয়। তবে রথের পার্শ্বদেব-দেবী, সারথি ও ঘোড়ার কাঠের মূর্তিগুলি সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
নন্দীঘোষ: জগন্নাথদেবের মহারথ
জগন্নাথদেবের রথের নাম নন্দীঘোষ। প্রচলিত বিশ্বাস, দেবরাজ ইন্দ্র এই রথ জগন্নাথদেবকে প্রদান করেছিলেন। এই রথ নির্মাণে প্রায় ৮৩২টি কাঠের অংশ ব্যবহৃত হয়। উচ্চতা প্রায় ১৩.৫ মিটার (৪৪ ফুট ২ ইঞ্চি)। বর্তমানে এতে ১৬টি চাকা থাকে। রথটি লাল ও হলুদ কাপড়ে আবৃত। চারটি কালো ঘোড়ার নাম— শঙ্খ, বলাহক, শ্বেত ও হরিদাক্ষ। রথের ধ্বজার নাম ত্রৈলোক্যমোহিনী, রশির নাম শঙ্খচূড়, আর রক্ষক হিসেবে থাকেন গরুড়। রথের সারথি দারুক। নন্দীঘোষে বরাহ, নৃসিংহ, রাম, নারায়ণ, হনুমান, রুদ্র-সহ একাধিক পার্শ্বদেবতার পাশাপাশি নারদ, ব্যাসদেব, বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ প্রমুখ ঋষিদের প্রতীকী উপস্থিতিও থাকে।
তালধ্বজ: বলভদ্রের শক্তির প্রতীক
বলভদ্রের রথের নাম তালধ্বজ। এটি তৈরি করতে প্রায় ৭৬৩টি কাঠের অংশ লাগে। উচ্চতা প্রায় ১৩.২ মিটার (৪৪ ফুট) এবং বর্তমানে এতে ১৪টি চাকা থাকে। সবুজ ও লাল কাপড়ে মোড়া এই রথের ধ্বজার নাম উন্মনী, আর রশির নাম বাসুকী নাগ। চারটি সাদা ঘোড়ার নাম— তীব্র, ঘোর, শ্রম (স্বর্ণনাভ) ও দীর্ঘ (দীর্ঘশর্মা)। রথের সারথি মাতলি এবং রক্ষক বাসুদেব। এই রথে গণেশ, কার্তিক, সর্বমঙ্গলা, মহেশ্বর, মৃত্যুঞ্জয়, শেষদেব-সহ ন’জন পার্শ্বদেবতার অবস্থান রয়েছে।
দর্পদলন: সুভদ্রার রথের বিশেষত্ব
দেবী সুভদ্রার রথের নাম দর্পদলন। এটি তিনটি রথের মধ্যে তুলনামূলকভাবে ছোট। নির্মাণে লাগে ৫৯৩টি কাঠের অংশ। উচ্চতা প্রায় ১২.৯ মিটার (৪২ ফুট ৩ ইঞ্চি) এবং এতে থাকে ১২টি চাকা। লাল ও কালো কাপড়ে ঢাকা এই রথের ধ্বজার নাম নাদম্বিক, আর রশির নাম স্বর্ণচূড় নাগ। চারটি লাল ঘোড়ার নাম— রচিকা, মোচিকা, জিতা ও অপরাজিতা। রথের সারথি অর্জুন এবং রক্ষক জয়দুর্গা। দর্পদলনে চণ্ডী, চামুণ্ডা, মঙ্গলা, উগ্রতারা, বনদুর্গা, শ্যামাকালী, বিমলা ও বরাহী-সহ ন’জন পার্শ্বদেবীর প্রতীকী উপস্থিতি দেখা যায়। দ্বারপালিকার দায়িত্বে থাকেন ভূদেবী ও শ্রীদেবী।
কেন আজও কোটি মানুষের আবেগের কেন্দ্র পুরীর রথযাত্রা?
পুরীর রথযাত্রা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি ভারতীয় ঐতিহ্য, কারুশিল্প, আচার-অনুষ্ঠান এবং ভক্তির এক অনন্য সমন্বয়। প্রতি বছর নতুন করে রথ নির্মাণ, শতাব্দীপ্রাচীন রাজপরম্পরা, তিন দেবতার পৃথক রথ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের একসঙ্গে রথ টানার দৃশ্য এই উৎসবকে বিশ্বের অন্যতম অনন্য ধর্মীয় আয়োজনে পরিণত করেছে। ভক্তদের বিশ্বাস, রথযাত্রার দিনে জগন্নাথদেবের দর্শন এবং রথের রশি স্পর্শ করার সৌভাগ্য অর্জন করলে জীবনে শুভফল ও পুণ্য লাভ হয়। সেই বিশ্বাসই প্রতিবছর পুরীর পথে লাখো মানুষের পদচারণাকে আরও অর্থবহ করে তোলে।


