মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ১৪ বছরের বনবাস শেষে অযোধ্যায় রামচন্দ্রের প্রত্যাবর্তনের স্মরণে দীপাবলির (Deepotsav In Ayodhya) আবহে সেজে উঠছে রামনগরী। দশম বর্ষের দীপোৎসব উপলক্ষে শনিবার, ৭ নভেম্বর, অযোধ্যায় জ্বালানো হবে ৩০ লক্ষেরও বেশি মাটির প্রদীপ। সরযূ নদীর তীর থেকে রাম কি পৈড়ি-সহ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে চলেছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। আলোর উৎসবকে বর্ণময় করে তুলতে থাকছে ২১০০টি ড্রোনের বিশেষ প্রদর্শনী, রামায়ণের বিভিন্ন দৃশ্যের উপস্থাপনা এবং পাঁচটি দেশের শিল্পীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গত ৫ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী এই দীপোৎসব। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে এবারের আয়োজনকে বিশেষ রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে উত্তরপ্রদেশ সরকার।
দশম বর্ষে দীপোৎসব
২০১৭ সালে প্রথম দীপোৎসবে প্রায় ১ লক্ষ ৭১ হাজার প্রদীপ জ্বালানো হয়েছিল। সেখান থেকে সংখ্যাটা বেড়ে এ বছর পৌঁছেছে ৩০ লক্ষেরও বেশি। অযোধ্যার ৫৬টি ঘাট জুড়ে জ্বলবে এই প্রদীপ। উল্লেখ্য, গত বছর ২০২৫ সালে ২৬ লক্ষ ১৭ হাজার প্রদীপ জ্বালিয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েছিল অযোধ্যা। এ বছর সেই রেকর্ডকেও ছাপিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রদীপ জ্বালানোর কাজে যুক্ত হয়েছেন অযোধ্যার বিভিন্ন কলেজের প্রায় ৩৫ হাজার পড়ুয়া। রাম কি পৈড়ির ৫৬টি ঘাটে প্রদীপ সাজানো এবং উৎসবের অন্যান্য প্রস্তুতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তাঁরা।
সরযূ নদীর তীরে মহাআরতি
এবারের দীপোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ সরযূ নদীর তীরে মহাআরতি। এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন ২১৪৭ জন। জনপ্রতিনিধি, কাউন্সিলর এবং সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে আরতির অনুষ্ঠান। আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনও থাকছে এবারের উৎসবে। দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, লাওস এবং থাইল্যান্ডের রামলীলা দল অংশ নেবে অনুষ্ঠানে। পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ২১০০টি ড্রোনের সাহায্যে রাতের আকাশে ফুটিয়ে তোলা হবে রামায়ণের বিভিন্ন পর্ব। ড্রোনের সমন্বিত আলোকসজ্জা ও বিশেষ বিন্যাসে তুলে ধরা হবে মহাকাব্যের নানা দৃশ্য। এ ছাড়াও থাকবে ভাসমান মঞ্চে রামচন্দ্রের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের কাহিনি। নৃত্য, সঙ্গীত এবং হিন্দি ভাষায় বর্ণনার মাধ্যমে পরিবেশিত হবে সেই বিশেষ অনুষ্ঠান। থাকছে আট মিনিটের লেজার শো, ২০ মিনিটের প্রজেকশন ম্যাপিং এবং সঙ্গীতের তালে আতশবাজির প্রদর্শনী।
১৩টি থিমভিত্তিক প্রবেশদ্বার
শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় তৈরি করা হয়েছে ১৩টি থিমভিত্তিক প্রবেশদ্বার এবং ২০টি সেলফি পয়েন্ট। লতা মঙ্গেশকর চক থেকে রাম কি পৈড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় রামায়ণের নানা ঘটনার আদলে তৈরি হয়েছে বিশেষ ইনস্টলেশন। সাতটি কাণ্ডের ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে ২২টি ট্যাবলো। সেখানে থাকবে রামরথ, রাম দরবার এবং পুষ্পক বিমানের প্রতিরূপ। রামকথা পার্কে থাকছে বালির ভাস্কর্য এবং অন্যান্য আকর্ষণীয় শিল্পকর্ম।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ২৫০০ শিল্পী
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রায় ২৫০০ শিল্পী। শহরের ১২টি মঞ্চে চলবে অনুষ্ঠান। এর মধ্যে ছ’টি ছোট, চারটি মাঝারি এবং দু’টি বড় মঞ্চ। উত্তরপ্রদেশের ১৬টি জেলার শিল্পীদের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য রাজ্যের শিল্পীরাও অংশ নেবেন। কর্নাটকের ডোল্লু কুনিথা, রাজস্থানের ঘুমর, বিহারের ঝিঝিয়া, পিলিভীতের থারু লোকসংস্কৃতি এবং গোরক্ষপুরের বনটাঙ্গিয়া সম্প্রদায়ের পরিবেশনা বিশেষ আকর্ষণ হতে চলেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ১০০০টি শিল্পীদলও এই উৎসবে অংশ নেবে বলে জানা গিয়েছে।
বিশেষ ড্রোন শোয়ের আয়োজন
শনিবার মূল অনুষ্ঠান হলেও ৯ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে দীপোৎসব। ৮ নভেম্বরও থাকছে একাধিক সাংস্কৃতিক কর্মসূচি। অন্যদিকে, ৯ নভেম্বর শুধুমাত্র অযোধ্যার বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ ড্রোন শোয়ের আয়োজন করা হয়েছে। দীপোৎসবে অংশগ্রহণের জন্য বিদেশে নিযুক্ত ৩৪ জন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দীপোৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। অযোধ্যার গিয়াসপুর এবং বারাবাঁকির কাজিয়াপুর ও ভাগড় ঝিল এলাকার ২৫ জন মহিলা মৃৎশিল্পীর কাছ থেকে ১ লক্ষ ৬০ হাজার প্রদীপের বরাত দেওয়া হয়েছে। যার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। প্রদীপ উৎপাদন বাড়াতে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৯৭ জন মৃৎশিল্পীকে বৈদ্যুতিক কুমোরের চাকা দেওয়া হয়েছে।
৩০ লক্ষেরও বেশি প্রদীপে আলোকিত অযোধ্যা
উত্তরপ্রদেশের পর্যটন, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিষয়ক দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব অমৃত অভিজাত জানিয়েছেন, পর্যটকদের জন্য অযোধ্যার পরিকাঠামো আরও উন্নত করাই সরকারের লক্ষ্য। তাঁর বক্তব্য, পর্যটন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ যাতায়াত, নির্ভরযোগ্য পরিষেবা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয়তার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।সব মিলিয়ে, ধর্মীয় আবেগ, লোকসংস্কৃতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে দশম দীপোৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করতে প্রস্তুত অযোধ্যা। ৩০ লক্ষেরও বেশি প্রদীপের আলোয় সরযূর তীর হয়ে উঠবে আলোকময়।
