মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মহাকাশ ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ এগোল ভারত-ফ্রান্স সহযোগিতা। উপগ্রহ উৎক্ষেপণ, মহাকাশ নজরদারি এবং মাইক্রোস্যাটেলাইট প্রযুক্তি—এই তিন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নতুন বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করল দুই দেশের সংস্থাগুলি। প্যারিসে আয়োজিত প্রথম ইন্টারন্যাশনাল স্পেস সামিট-এ এই চুক্তিগুলি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল ফ্রান্সের সাফরান স্পেস এবং ভারতের ধ্রুব স্পেস-এর মধ্যে ৫ মিলিয়ন ইউরোর (প্রায় ৫০ কোটি টাকা) বেশি মূল্যের চুক্তি। ভারতের পরিকল্পিত ৫২টি উপগ্রহের স্পেস-সার্ভেইলেন্স কনস্টিলেশন তৈরিতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর প্যারিসে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক মহাকাশ সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের সরকার, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, শিল্পক্ষেত্র এবং বিজ্ঞানীরা অংশ নেন। সম্মেলনে মোট ৫১টি ঘোষণা করা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২০ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা)। সেই মঞ্চেই ভারতীয় মহাকাশ সংস্থাগুলির সঙ্গে ফরাসি সংস্থাগুলির একাধিক নতুন অংশীদারিত্ব সামনে এসেছে।
৫২ উপগ্রহের নজরদারি ব্যবস্থা
সাফরান স্পেস এবং ধ্রুব স্পেস-এর চুক্তিটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভারতের এসবিএস-৩ স্পেস-সার্ভেইলেন্স কনস্টিলেশন-এর জন্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ৫২টি উপগ্রহের এই কনস্টিলেশন গড়ে তোলা হবে।
চুক্তির আওতায় ভারতীয় সংস্থাকে যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইনারশিয়াল ন্যাভিগেশন ইউনিট, অপটিক্যাল পেলোড এবং গ্রাউন্ড স্টেশন-সংক্রান্ত প্রযুক্তি সরবরাহ করবে সাফরান স্পেস। এর ফলে কক্ষপথে থাকা বিভিন্ন মহাকাশযান ও অন্যান্য বস্তুর উপর নজরদারি এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়বে ভারতের।
বিশ্লেষকদের মতে, মহাকাশে উপগ্রহের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পেস সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেস বা মহাকাশ পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা এখন জাতীয় নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। পৃথিবীর কক্ষপথে কোন উপগ্রহ কোথায় রয়েছে, কোনও মহাকাশযানের গতিপথে পরিবর্তন হচ্ছে কি না, কিংবা কোনও বস্তু সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করছে কি না—এসব বিষয়ে নির্ভুল তথ্য পাওয়ার জন্য শক্তিশালী স্পেস-সার্ভেইলেন্স পরিকাঠামো প্রয়োজন। ৫২টি উপগ্রহের পরিকল্পিত কনস্টিলেশন সেই সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সরকারি কর্মসূচির বাইরে বেসরকারি মহাকাশ শিল্প
এই চুক্তির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ভারত-ফ্রান্স মহাকাশ সহযোগিতা ক্রমশ সরকারি মহাকাশ সংস্থার গণ্ডি ছাড়িয়ে নিউ স্পেস বা বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও ফ্রান্সের মহাকাশ সহযোগিতার মূল স্তম্ভ ছিল ভারতের ইসরো এবং ফ্রান্সের সিএনইএস। কিন্তু সাম্প্রতিক চুক্তিগুলি দেখাচ্ছে, এখন ভারতীয় বেসরকারি সংস্থাগুলিও আন্তর্জাতিক মহাকাশ সরবরাহ-শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
ধ্রুব স্পেস-এর সঙ্গে সাফরানের চুক্তি সেই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ। পাশাপাশি ভারতের মেক ইন ইন্ডিয়া নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদেশি প্রযুক্তি এবং ভারতীয় শিল্প-উৎপাদন সক্ষমতার সমন্বয় ঘটানোর সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
ভারতীয় সংস্থার সঙ্গে আরও দুই চুক্তি
প্যারিস সম্মেলনে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হয়েছে। ফরাসি লঞ্চ-সার্ভিস সংস্থা রাইড এবং ভারতীয় সংস্থা টেকমিটুস্পেস-এর সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। এর আওতায় টেকমিটুস্পেস-এর দুটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হবে। টেকমিটুস্পেস-কে ভারতের প্রথম অরবিটাল ডেটা সেন্টার-এর নকশাকারী সংস্থা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই অংশীদারিত্ব ভারতীয় বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলির জন্য আন্তর্জাতিক উৎক্ষেপণ পরিষেবার বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। এর আগে রাইড এবং ভারতীয় মহাকাশ সংস্থাগুলির মধ্যে সহযোগিতার নজির রয়েছে। সম্প্রতি একটি ইউরোপীয় অ্যাটমস্ফেরিক রি-এন্ট্রি ক্যাপসুল ভারতের পিএসএলভি-র মাধ্যমে উৎক্ষেপণ, কক্ষপথে সংযুক্তি এবং পরে পৃথিবীতে ফেরানোর কাজে দুই পক্ষের সহযোগিতা হয়েছে।
অন্যদিকে ফরাসি মহাকাশ সংস্থা ইউ-স্পেস এবং ভারতীয় প্রযুক্তি সংস্থা অ্যাক্সিসকেডস একটি বাণিজ্যিক সহযোগিতা চুক্তি করেছে। লক্ষ্য ভারতের দ্রুত বাড়তে থাকা মাইক্রোস্যাটেলাইট মার্কেট-এ একসঙ্গে কাজ করা। পরিকল্পনাটি ধাপে ধাপে এগোনোর কথা, যার অন্যতম ভিত্তি ভারতের মেক ইন ইন্ডিয়া নীতি। ফরাসি মহাকাশ প্রযুক্তির সঙ্গে ভারতীয় শিল্প ও ইঞ্জিনিয়ারিং সক্ষমতাকে যুক্ত করাই এই অংশীদারিত্বের মূল লক্ষ্য।
পাঁচ দশকেরও বেশি পুরনো সম্পর্ক
ভারত ও ফ্রান্সের মহাকাশ সহযোগিতা অবশ্য নতুন নয়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশ মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করছে। ইসরো এবং সিএনইএস-এর দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্ব সেই সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি। পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, স্পেস জিওডেসি, মানব মহাকাশ অভিযান, পরবর্তী প্রজন্মের লঞ্চ-ভেহিকল প্রযুক্তি এবং গ্রহ অনুসন্ধান—একাধিক ক্ষেত্রে দুই দেশ সহযোগিতা করেছে।
দুই দেশের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক স্পেস ডায়ালগ বা কৌশলগত মহাকাশ সংলাপও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে অসামরিক এবং প্রতিরক্ষা—দুই ধরনের মহাকাশ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রথম বৈঠক হয় ২০২৩ সালের জুনে প্যারিসে। দ্বিতীয় বৈঠক হয় ২০২৪ সালের মার্চে নয়াদিল্লিতে।
ইসরো-সিএনইএস সহযোগিতায় ত্রিশনা-সহ একাধিক প্রকল্প
ইসরো এবং সিএনইএস ইতিমধ্যেই ভবিষ্যৎ লঞ্চ-ভেহিকল প্রযুক্তি, যৌথ ত্রিশনা আর্থ অবজারভেশন মিশন, সামুদ্রিক ক্ষেত্র সম্পর্কে নজরদারি এবং স্পেস সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেস-এর মতো বিষয়ে চুক্তি করেছে।
দুই দেশের লঞ্চ-সার্ভিস সংস্থাগুলির মধ্যেও বহু বছরের সহযোগিতা রয়েছে। ভারতীয় পিএসএলভি বাণিজ্যিকভাবে ফরাসি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে। আবার ফ্রান্সের এরিয়ানস্পেস ভারতীয় জিওস্টেশনারি উপগ্রহ উৎক্ষেপণে পরিষেবা দিয়েছে।
ফলে মহাকাশ ক্ষেত্রে ভারত-ফ্রান্স সম্পর্ক শুধু গবেষণা বা সরকারি প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উৎক্ষেপণ, উপগ্রহ নির্মাণ, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, মহাকাশ নজরদারি এবং বেসরকারি মহাকাশ ব্যবসা—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই সহযোগিতার পরিধি বাড়ছে।
চন্দ্রযান-৩ থেকে নতুন প্রজন্মের মহাকাশ সহযোগিতা
ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে ফরাসি শিল্পের অংশগ্রহণও দীর্ঘদিনের। সাফরানের ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে যুক্ত থাকার পাশাপাশি চন্দ্রযান-৩ চন্দ্র অভিযানে তাদের অবদান ছিল। একই সঙ্গে ভারতে তাদের শিল্প পরিকাঠামোও সম্প্রসারিত হয়েছে।
ফলে সাফরান-ধ্রুব স্পেস-এর নতুন চুক্তিকে বিচ্ছিন্ন কোনও বাণিজ্যিক চুক্তি হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না। বরং এটি ভারতীয় মহাকাশ পরিকাঠামো এবং ফরাসি মহাকাশ প্রযুক্তির মধ্যে ক্রমশ গভীরতর শিল্প-সহযোগিতার পরবর্তী ধাপ।
প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত ক্ষেত্রেও কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মহাকাশ এখন আর শুধুমাত্র বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্র নয়। যোগাযোগ, ন্যাভিগেশন, আবহাওয়া, গোয়েন্দা তথ্য, সীমান্ত নজরদারি, ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ এবং সামরিক যোগাযোগ—আধুনিক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে মহাকাশ পরিকাঠামো সরাসরি যুক্ত।
এই কারণেই ভারতের জন্য স্পেস সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেস এবং মহাকাশে নিজস্ব নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি প্রযুক্তির সঙ্গে ভারতীয় সংস্থার দক্ষতার সমন্বয়ে ৫২টি উপগ্রহের পরিকল্পিত কনস্টিলেশন সেই সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
একই সঙ্গে বেসরকারি সংস্থাগুলিকে এই ধরনের প্রকল্পে যুক্ত করার ফলে ভারতের মহাকাশ শিল্পে প্রযুক্তি, উৎপাদন এবং গবেষণার পরিসরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভারতীয় নিউ স্পেস সংস্থাগুলি বিশ্ববাজারে প্রবেশের আরও সুযোগ পাবে।
মাক্রঁর ভারত সফরের পর আরও গতি
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রঁর ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত সফরের সময়ও দুই দেশ অসামরিক উপগ্রহ নির্মাণ এবং মানব মহাকাশ অভিযান-সহ একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার পক্ষে সওয়াল করেছিল। তার পরেই প্যারিসের আন্তর্জাতিক মহাকাশ সম্মেলনে একসঙ্গে তিনটি নতুন বাণিজ্যিক চুক্তি সামনে আসা দুই দেশের মহাকাশ অংশীদারিত্বে নতুন গতি নির্দেশ করছে।
সব মিলিয়ে, ভারত-ফ্রান্সের মহাকাশ সম্পর্ক এখন ইসরো-সিএনইএস-এর ঐতিহ্যবাহী সহযোগিতা থেকে বেরিয়ে সরকারি কর্মসূচি + প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত মহাকাশ সক্ষমতা + বেসরকারি শিল্প + আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ—এই চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়াচ্ছে। ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫২টি উপগ্রহের পরিকল্পিত নজরদারি কনস্টিলেশন এবং নতুন বেসরকারি অংশীদারিত্বগুলি সেই পরিবর্তনেরই গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
