মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মহারাষ্ট্রের নাসিকে গোদাবরী নদীর তীরে ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিশাল ধর্মীয় সমাবেশ। ৬৫০টি গ্রামের প্রায় ৬৫০০ আদিবাসী পুরুষ ও মহিলা একসঙ্গে গোদাবরী আরতিতে অংশ নেন। সমবেত আরতির মাধ্যমে গিনেস বিশ্বরেকর্ডে জায়গা করে নেওয়াই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। নাসিক-ত্র্যম্বকেশ্বর সিংহস্থ কুম্ভমেলার (Simhastha Kumbh Mela) আনুষ্ঠানিক সূচনাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গিনেস বিশ্বরেকর্ড কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা। তাঁদের উপস্থিতিতেই রেকর্ড গড়ার প্রচেষ্টা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হয় (Guinness World Record)।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশের পরনেই ছিল সাদা পোশাক। স্থানীয় কমিটিগুলির তত্ত্বাবধানে কয়েক মাস ধরে তাঁরা এই বিশেষ আরতির প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। নাসিকের পঞ্চবটি এলাকার রামকুণ্ড সংলগ্ন নদীর ঘাটে একই ছন্দে প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি ও মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করেন তাঁরা।
আরও এক রেকর্ড (Simhastha Kumbh Mela)
এই সমবেত আরতির মাত্র ছ’দিন আগেই গোদাবরীর তীরে আরও একটি উল্লেখযোগ্য নজির তৈরি হয়েছিল। ২৫ অক্টোবর যশবন্ত মহারাজ পটাঙ্গণে একসঙ্গে শঙ্খধ্বনি করেছিলেন ৫১৭ জন ভক্ত। টানা সাড়ে পাঁচ মিনিট ধরে চলেছিল সেই শঙ্খধ্বনি। গিনেস বিশ্বরেকর্ড কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই এই কৃতিত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
গিনেস বিশ্বরেকর্ডের নথি অনুযায়ী, একসঙ্গে সর্বাধিক মানুষের শঙ্খধ্বনির নতুন নজির গড়েছেন নাসিক ত্র্যম্বকেশ্বর কুম্ভমেলা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে অংশ নেওয়া ৫১৭ জন। এর আগে ২০১৯ সালে আমেরিকার নিউ জার্সিতে ৩০৩ জনের একযোগে শঙ্খধ্বনির রেকর্ড ছিল। নতুন নজির গড়ার জন্য বিশেষভাবে শংসাপত্রপ্রাপ্ত শঙ্খ সংগ্রহ করা হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের নথিভুক্তকরণ, উপস্থিতি এবং নির্ধারিত নিয়ম মেনে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখেন বিচারকরা।
নাসিক-ত্র্যম্বকেশ্বর সিংহস্থ কুম্ভমেলা কর্তৃপক্ষ, অনন্ত বিজয় শঙ্খনাদ পাঠক এবং নাসিক পুরনিগমের যৌথ উদ্যোগে এই শঙ্খধ্বনির আয়োজন করা হয়েছিল। কুম্ভমেলার পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানের আগে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
পরবর্তী সময়ে জানা যায়, এই আরতির ক্ষেত্রেও নাসিক নয়া বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। প্রায় ৬৫০০ জনের উপস্থিতিতে ৬২৩৩ জন ভক্ত একযোগে গোদাবরী আরতিতে অংশ নেন। ফলে এক সপ্তাহের ব্যবধানে শঙ্খধ্বনি ও সমবেত আরতি—দুই ক্ষেত্রেই বিশ্বরেকর্ড গড়ার নজির গড়ল নাসিক।
সিংহস্থ কুম্ভমেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা
৩১ অক্টোবর দুপুর ১২টা ২ মিনিটে নাসিকের রামকুণ্ড এবং ত্র্যম্বকেশ্বরের কুশাবর্ত তীর্থে একই সময়ে ধর্মীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্যে দিয়ে সিংহস্থ কুম্ভমেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। নাসিকে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু পতাকা উত্তোলন করেন। অন্যদিকে ত্র্যম্বকেশ্বরে পতাকা উত্তোলন করেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, পূজার্চনা ও শঙ্খধ্বনির মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
রাষ্ট্রপতি নাসিকের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে গোদাবরীর পুজো দেন এবং ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন করেন। অনুষ্ঠানজুড়ে উপস্থিত ছিলেন সাধু-সন্ত, ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বহু ভক্ত।
সিংহস্থ কুম্ভমেলা ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ২০২৮ সালের ২৪ জুলাই পর্যন্ত চলার কথা। অর্থাৎ ২০ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলবে এই ধর্মীয় সমাবেশ। এই দীর্ঘ সময়ে পুণ্যস্নান, সাধুদের শোভাযাত্রা, ধর্মীয় আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন আধ্যাত্মিক কর্মসূচির আয়োজন করা হবে।
গোদাবরী নদী ও রামকুণ্ডের ধর্মীয় গুরুত্ব
হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে গোদাবরী নদীর বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। দক্ষিণ ভারতের গঙ্গা বা দক্ষিণ গঙ্গা হিসেবেও পরিচিত এই নদীর উৎপত্তি মহারাষ্ট্রের ত্র্যম্বকেশ্বরের কাছে ব্রহ্মগিরি পর্বতের পাদদেশে। সেখান থেকে ১৪০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ অতিক্রম করে নদীটি প্রবাহিত হয়েছে (Simhastha Kumbh Mela)।
ধর্মীয় শাস্ত্র ও পুরাণে কুম্ভমেলার উৎপত্তি নিয়ে একাধিক কাহিনি রয়েছে। সমুদ্র মন্থনের সময় অমৃতের কলস থেকে অমৃতের কয়েক ফোঁটা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় পড়েছিল বলে পুরাণে উল্লেখ রয়েছে। নাসিকও সেই পবিত্র স্থানগুলির অন্যতম বলে বিশ্বাস। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে, বৃহস্পতি ও সূর্য যখন সিংহ রাশিতে প্রবেশ করে, তখন সিংহস্থ যোগ তৈরি হয়। এই বিশেষ মহাজাগতিক অবস্থানে গোদাবরীর জল বিশেষ পবিত্র হয়ে ওঠে বলে ভক্তদের বিশ্বাস। সেই সময়ে নদীতে স্নান করলে পাপমুক্তি ঘটে এবং মোক্ষলাভের পথ প্রশস্ত হয় বলে ধর্মীয় বিশ্বাস।
নাসিকের রামকুণ্ডকে গোদাবরীর তীরবর্তী সবচেয়ে পবিত্র স্নানঘাটগুলির মধ্যে অন্যতম বলে মনে করা হয়। রামায়ণের কাহিনি অনুসারে, বনবাসের ১৪ বছরের একটি সময়ে সীতা ও লক্ষ্মণের সঙ্গে পঞ্চবটী অঞ্চলে অবস্থানকালে ভগবান রাম এই কুণ্ডে স্নান করেছিলেন। সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই জায়গাটির ধর্মীয় গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
রামকুণ্ডের আর একটি পরিচয় হল অস্থিবিলয় তীর্থ। হিন্দু রীতি অনুযায়ী, প্রয়াত ব্যক্তিদের অস্থি এখানে বিসর্জন দেওয়া হয়, যাতে তাঁদের আত্মার শান্তি পায়। সারা বছর ধরে এখানে সকাল ও সন্ধ্যায় আরতি, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে পিণ্ডদান এবং পবিত্র স্নানের মতো নানা ধর্মীয় আচার পালিত হয়।
কুম্ভমেলার সময়ে রামকুণ্ড হয়ে ওঠে বৈষ্ণব আখড়াগুলির প্রধান স্নানস্থল। অন্যদিকে, শৈব আখড়াগুলির সাধু-সন্তরা ত্র্যম্বকেশ্বরের কুশাবর্ত তীর্থে পুণ্যস্নান করেন। দীর্ঘদিনের এই ধর্মীয় রীতিই নাসিক ও ত্র্যম্বকেশ্বরকে কেন্দ্র করে কুম্ভমেলার দু’টি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশগুলির অন্যতম কুম্ভমেলা
বিশ্বের বৃহত্তম শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সমাবেশগুলির মধ্যে কুম্ভমেলা অন্যতম। প্রতি ১২ বছর অন্তর নির্দিষ্ট জ্যোতিষশাস্ত্রীয় অবস্থানের ভিত্তিতে প্রয়াগরাজ, হরিদ্বার, উজ্জয়িনী এবং নাসিক-ত্র্যম্বকেশ্বরে পর্যায়ক্রমে এই মেলার আয়োজন করা হয়। লাখ লাখ পুণ্যার্থী, সাধু, নাগা সন্ন্যাসী এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানী মানুষ এই সমাবেশে যোগ দেন।
নাসিকের সিংহস্থ কুম্ভমেলা বিশেষত বৃহস্পতি ও সূর্যের সিংহ রাশিতে অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে পবিত্র স্নান, যা শাহী স্নান বা অমৃতস্নান নামে পরিচিত, মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। পাশাপাশি বিভিন্ন আখড়ার শোভাযাত্রা, ধর্মীয় প্রবচন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সমাজসেবামূলক কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়।
এ বারের কুম্ভমেলার প্রস্তুতিতে আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি পরিকাঠামো উন্নয়ন, বিপুল জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ এবং নদী সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গোদাবরীর পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আদিবাসী সংস্কৃতি, প্রকৃতিপূজা ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা
৩১ অক্টোবরের সমবেত গোদাবরী আরতির বিশেষ তাৎপর্য ছিল আদিবাসী সমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণ। নাসিক জেলার পেঠ, সুরগানা, ত্র্যম্বকেশ্বর, দিণ্ডোরি ও নিফাড়-সহ বিভিন্ন এলাকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ এই কর্মসূচিতে যোগ দেন। আয়োজকদের উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতি, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং সামাজিক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে বৃহত্তর মঞ্চে তুলে ধরা।
এই আরতির প্রস্তুতির জন্য অংশগ্রহণকারীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। যাতে প্রত্যেকে একই সময়ে প্রদীপ হাতে আরতি করতে পারেন এবং সমবেত মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে নদীর দুই তীরজুড়ে এক অভিন্ন দৃশ্য ও শব্দের আবহ তৈরি হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হয়েছিল। সাদা পোশাকে সজ্জিত হাজার হাজার ভক্তের হাতে জ্বলন্ত প্রদীপের আলোয় গোদাবরীর ঘাট কার্যত এক আধ্যাত্মিক মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়।
একই সপ্তাহে শঙ্খধ্বনির বিশ্বরেকর্ড এবং বিপুল সংখ্যক আদিবাসীর অংশগ্রহণে সমবেত আরতি—এই দুই আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে নাসিক। হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে শঙ্খকে শুভ সূচনা, জাগরণ এবং অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই শঙ্খধ্বনিকে একযোগে বিশ্বরেকর্ডের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং তার সঙ্গে আদিবাসী সমাজের সমবেত আরতির সংযোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে (Guinness World Record)।
আগামী কয়েক মাস ধরে সিংহস্থ কুম্ভমেলাকে কেন্দ্র করে গোদাবরীর তীরে আরও বহু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও বহু পুণ্যার্থী ও পর্যটকের সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। রামকুণ্ড ও আশপাশের পবিত্র ঘাটগুলিকে কেন্দ্র করে এই বিশাল আয়োজনের সূচনা পর্বেই ভক্তি, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের (Simhastha Kumbh Mela) এক সম্মিলিত ছবি উঠে এল।
