মাধ্যম নিউজ ডেস্ক : সামাজিক মাধ্যমে ফের জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ’৮০-এর দশকের নস্টালজিক লুকে (80s Style AI Photo) এআই-নির্মিত ছবি। নিজের বর্তমান ছবি আপলোড করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিজেকে পুরনো সময়ের পোশাক, চুলের স্টাইল বা ভিনটেজ গাড়ির সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। এর আগে ‘ঘিবলিফাই’-এর মতো এআই-নির্ভর ছবির ট্রেন্ডও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু এই ধরনের ছবি তৈরির সময় ব্যবহারকারীরা যে ব্যক্তিগত তথ্য এআই প্ল্যাটফর্মের হাতে তুলে দিচ্ছেন, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এনিয়ে চিন্তাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ছবি শুধু একটি ছবি নয়—এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে একাধিক তথ্য।
ছবির সঙ্গে যায় আরও অনেক তথ্য
স্মার্টফোনে থাকা ছবিতে কখন সেটি তোলা হয়েছে, কোন ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোনও ক্ষেত্রে কোথায় ছবি তোলা হয়েছে—এ ধরনের মেটাডেটা থাকতে পারে। আর কোনও ছবিতে ব্যক্তির মুখ স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা গেলে সেটি ব্যক্তিগত তথ্য হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবু ধাবির সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা পপার-বলেছেন, এআই সিস্টেমে ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি একাধিক স্তরে ঘটতে পারে। ব্যবহারকারী কী লিখছেন এবং কী ছবি বা ফাইল আপলোড করছেন, তার পাশাপাশি সেশন-সংক্রান্ত তথ্য, যেমন আইপি ঠিকানা ও ডিভাইসের ধরনও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংরক্ষিত হতে পারে। সেই সঙ্গে ব্যবহারকারীর কার্যকলাপ থেকে কিছু তথ্য অনুমান করাও সম্ভব। ফলে কোনও জনপ্রিয় ট্রেন্ডে অংশ নিতে একটি ছবি আপলোড করলেও ব্যবহারকারী অজান্তেই ছবির বাইরের আরও কিছু তথ্য এআই পরিষেবার কাছে তুলে দিতে পারেন।
মূল ছবি থেকে যেতে পারে
এআই দিয়ে তৈরি ’৮০-এর দশকের ছবিটি হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমের ফিড থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু সেই ছবি তৈরির জন্য আপলোড করা মূল ছবিটি কতদিন এআই সংস্থার সার্ভারে থাকবে, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য সংরক্ষণ নীতির ওপর। বিভিন্ন এআই পরিষেবার তথ্য সংরক্ষণের সময়সীমার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি-তে চ্যাট ব্যবহারকারী নিজে মুছে না দেওয়া পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে ওপেন এআই-এর সার্ভারে তা ৩০ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। অ্যাকাউন্ট থেকে আলাদা করে দেওয়া তথ্য আরও দীর্ঘ সময় থাকতে পারে। জেমিনাই-এর ক্ষেত্রে চ্যাট ডেটা ডিফল্টভাবে ১৮ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণের কথা রয়েছে। ক্লড-এ মুছে দেওয়া চ্যাট সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে অ্যানথ্রোপিক-এর ব্যাক-এন্ড থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। তবে ব্যবহারকারী যদি নিজের চ্যাটকে মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে থাকেন, তাহলে পরিচয়বিহীন কপি দীর্ঘ সময়—সর্বোচ্চ পাঁচ বছর—সংরক্ষিত থাকতে পারে।
এর অর্থ ছবি ফাঁস হবেই, এমন নয়
তবে কোনও এআই প্ল্যাটফর্মে ছবি আপলোড করার অর্থ এই নয় যে সেই ছবি অবশ্যই ফাঁস হবে বা অপব্যবহার করা হবে। মূল বিষয়টি হল, ব্যবহারকারীর মুখের আরেকটি ডিজিটাল কপি তখন সংশ্লিষ্ট এআই সংস্থার সার্ভারে রয়েছে এবং সেটি সংস্থার তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারের নীতির আওতায় চলে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ব্যবহারকারী কী ধরনের ছবি আপলোড করছেন এবং কী বিষয়ে এআই-কে প্রশ্ন করছেন—এই তথ্যের ধারাবাহিকতা থেকে তার অভ্যাস, আগ্রহ বা পেশা সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হতে পারে। নাম বা সরাসরি পরিচয় না থাকলেও এই ধরনের তথ্যের সমন্বয়ে একজন ব্যবহারকারীর একটি বিস্তারিত প্রোফাইল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এআই পরিষেবাগুলো এখন ই-মেল, কেনাকাটা, ছবি ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্যের সঙ্গে ক্রমশ বেশি যুক্ত হচ্ছে। ফলে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে থাকা ব্যক্তিগত তথ্যের গুরুত্বও বাড়ছে।
কীভাবে সতর্ক থাকবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, এআই ট্রেন্ডে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে—
পরিচয়পত্র বা অত্যন্ত ব্যক্তিগত নথির ছবি এআই চ্যাটবটে আপলোড না করা।
শিশু বা অন্য ব্যক্তির ছবি তাদের অনুমতি ছাড়া আপলোড না করা।
যেখানে সুযোগ রয়েছে, সেখানে এআই মডেল প্রশিক্ষণে নিজের ডেটা ব্যবহারের অনুমতি বন্ধ রাখা।
সংবেদনশীল তথ্যের ক্ষেত্রে সাময়িক বা প্রাইভেট চ্যাটের সুবিধা ব্যবহার করা।
প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে পুরনো চ্যাট ও আপলোড করা ফাইল মুছে ফেলা।
কোনও এআই অ্যাপে ছবি আপলোড করার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থার ডেটা ব্যবহারের নীতি ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত নিয়ম দেখে নেওয়া।
এআই চ্যাটবটকে অন্যান্য বহুল ব্যবহৃত অ্যাপের তুলনায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি বিপজ্জনক বলা যায় না। তবে ব্যবহারকারীদের মনে রাখা জরুরি—এআই পরিষেবায় আপলোড করা তথ্য ব্যক্তিগত হলেও তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পরিবেশে থাকে না। তাই শুধুমাত্র কয়েক সেকেন্ডের মজার ছবি তৈরির জন্য ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো বিবেচনা করাই নিরাপদ।
