মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বুধবার সকালে বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের (Ajit Pawar)। তার পরেই উঠছে সেই মোক্ষম প্রশ্নটি, ‘আসল’ এনসিপির (NCP) নেতৃত্বে এবার কে? ভারতের রাজনৈতিক দলগুলি সাধারণত কমিটি নয়, ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্বে চলে। সংগঠনিক কর্তৃত্বের চেয়ে এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ক্যারিশমার গুরুত্ব বেশি, এনসিপিও এর ব্যতিক্রম নয়।
‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান’ (Ajit Pawar)
মহারাষ্ট্র রাজনীতির ‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান’ শরদ পাওয়ারের হাতে গড়া ও লালিত এই দলটিতে বরাবরই নেতৃত্বে ছিলেন কোনও না কোনও ‘পাওয়ার’। ২০২৩ সালের মে মাসে এর এক আবেগঘন উদাহরণ দেখা গিয়েছিল। সেদিন ভাইপো অজিত পাওয়ারের বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়া ঠেকাতে শরদ পাওয়ার দল ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তৎক্ষণাৎ দলীয় কর্মীরা তাঁকে স্লোগানে স্লোগানে ভরিয়ে দেন। এমনকি যখন এনসিপি ভেঙে দু’টি শিবির তৈরি হয়েছিল, তখনও দলের রাশ ছিল পাওয়ার পরিবারেরই হাতে। কিন্তু অজিত পাওয়ারের অকাল মৃত্যুর পর সেই সমীকরণ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। অজিত-উত্তর ‘আসল’ এনসিপির মালিকানা নিয়ে শীঘ্রই টানাপোড়েন শুরু হতে পারে। কারণ, এই মর্মান্তিক ঘটনার পরেও সরকার চালাতে হবে, মন্ত্রিসভায় শূন্য পদ, এমনকি উপ-মুখ্যমন্ত্রীর পদও পূরণ করতে হবে। এরই মধ্যে দু’টি স্পষ্ট ক্ষমতার ভরকেন্দ্র প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
প্রথম শিবির
প্রথম শিবির পাওয়ার পরিবার। এই শিবিরের কেন্দ্রে রয়েছেন অজিত পাওয়ারের স্ত্রী সুনেত্রা পাওয়ার। অন্তত আপাতত তিনি বিপুল সহানুভূতির হাওয়া পাবেন, এমনকি তাঁদের কাছ থেকেও, যাঁরা সাধারণত এনসিপি বা অজিত পাওয়ারের রাজনীতির সমর্থক নন। রাজনীতিতে বংশানুক্রমের দৃষ্টিভঙ্গি ধরলে, স্বামীর উত্তরসূরি হিসেবে সুনেত্রাই দলীয় নেতৃত্বের সবচেয়ে স্বাভাবিক পছন্দ। তবে সুনেত্রা রাজনৈতিকভাবে নবাগত। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গিয়েছিলেন। বর্তমানে সুনেত্রা রাজ্যসভার সাংসদ। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা প্রবীণ ও কৌশলী নেতা, যেমন ছগন ভুজবল বা সুনীল তটকরের পূর্ণ আনুগত্য আদায় করার পক্ষে যথেষ্ট নাও হতে পারে (Ajit Pawar)। এই শিবিরে (NCP) রয়েছেন অজিতের দুই ছেলে—পার্থ ও জয় পাওয়ার। তবে দু’জনকেই সুনেত্রার থেকেও কম বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পার্থকে ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। পুনে জেলার মাভাল কেন্দ্র থেকে তিনি প্রার্থী হন। কিন্তু শিবসেনার শ্রীরং বার্নের কাছে বিরাট ব্যবধানে হেরে যান তিনি। পার্থ পাঁচ লাখের কিছু বেশি ভোট পেলেও, বার্নে পেয়েছিলেন ৭.২ লাখেরও বেশি ভোট। এর পর থেকে পার্থকে আর সেভাবে সক্রিয় রাজনীতিতে দেখা যায়নি। ভোটারদের মধ্যে আবেগ তৈরি করতে তাঁর প্রত্যাবর্তন কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারলেও, তাঁর বিরুদ্ধে চলা একাধিক আইনি মামলার কারণে সেই সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ। অজিতের ছোট ছেলে জয় এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল বিকল্প বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। গত কয়েক বছর ধরে জয় মূলত পারিবারিক ব্যবসার দিকেই মনোযোগ দিয়েছেন। বোর্ডরুমের কাজেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ বলে মনে করা হয়। যদিও বারামতিতে, পরিবারের শক্ত ঘাঁটিতে, গ্রামস্তরে কিছু সক্রিয়তার খবর পাওয়া গিয়েছে। এবং সেটাও সম্ভবত তাঁকে রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক রাখার চেষ্টা হিসেবে করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, জয় কখনও কোনও নির্বাচনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি, যা তাঁর বিরুদ্ধে যেতে পারে।
দ্বিতীয় শিবিরে কারা?
এতো গেল প্রথম শিবিরের কথা। দ্বিতীয় শিবিরে রয়েছেন এনসিপির শক্তিমান নেতারা। এই শিবিরে রয়েছেন অজিত -ঘনিষ্ঠ প্রবীণ তিন নেতাও, ছগন ভুজবল, সুনীল তটকরে এবং প্রফুল্ল প্যাটেল (NCP)। এঁদের মধ্যে প্রফুল্ল প্যাটেলই বর্তমানে অজিতের এনসিপির সবচেয়ে সিনিয়র নেতা। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক কৌশলবিদ প্যাটেল একসময় দিল্লিতে শরদ পাওয়ারের দরকষাকষির প্রধান মুখ ছিলেন (Ajit Pawar)। সংসদীয় রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় রাজধানীতে যোগাযোগের জোরে তিনি অজিতের এনসিপির স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। তবে অনেকের মতে, দলের কর্মী ও ভোটারদের মধ্যে অজিতের যে দাপট ছিল, তা প্যাটেলের নেই। তাই দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব তাঁর পক্ষে কঠিন হতে পারে। তবুও, দল পুনর্গঠনের সময় তিনি একজন আদর্শ তত্ত্বাবধায়ক নেতা হতে পারেন। সুনীল তটকরে আবার একেবারে তৃণমূলস্তর থেকে উঠে আসা নেতা। রায়গড় জেলায় অজিতের এনসিপি গড়ে তুলতে তাঁর বিরাট ভূমিকা ছিল। তিনি মহারাষ্ট্রের জলসম্পদ মন্ত্রী হিসেবেও কাজ করেছেন।
অজিতের এনসিপি কি আবার শরদ পাওয়ারের দলে?
তবে প্যাটেলের মতো তাঁরও রাজ্যজুড়ে পূর্ণ কর্তৃত্ব নেই, যা ভবিষ্যতে দলের ভেতরে বিদ্রোহ হলে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটা বড় অংশের মতে, সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পরিণতি হতে পারে এটিই – যে এনসিপি বিধায়কদের শরদ পাওয়ার ছেড়ে অজিত পাওয়ারের দিকে টানা হয়েছিল, তাঁরা ‘পাইড পাইপারে’র মৃত্যুর পর পুরানো শিবিরে ফিরে যেতে পারেন। এমনটা কি হতে পারে? অজিতের এনসিপি কি আবার শরদ পাওয়ারের দলে, বা কার্যত তাঁর কন্যা সুপ্রিয়া সুলের নেতৃত্বাধীন এনসিপির সঙ্গে মিশে যেতে পারে (NCP)? সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। চলতি মাসের শুরুতেই পুনে ও পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড় পুরসভা নির্বাচনে শরদ ও অজিত সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন। ফল আশানুরূপ না হলেও, এবং বিজেপি-নেতৃত্বাধীন মহাযুতি জোটে অজিতের কোণঠাসা হওয়ার ফলেই এই জোট গড়ে উঠলেও, পুনর্মিলনের সম্ভাবনা কিন্তু রয়েই গিয়েছে (Ajit Pawar)।



