মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মিরোস্লাভ ক্লোজেকে টপকে বিশ্বকাপের (Fifa World Cup 2026) সর্বোচ্চ গোলদাতা লিওনেল মেসি। তবুও নিরুত্তাপ-শান্ত। নিজের রেকর্ড নিয়ে খুব একটা হেলদোল নেই মেসির। তিনি বেশি খুশি হয়েছেন আর্জেন্টিনাকে নকআউটে তুলতে পেরে। তাঁর জোড়া গোলে জিতেছে আর্জেন্টিনা-এটা উপরি পাওনা। অস্ট্রিয়া ম্যাচের পর এমনই অভিমত লিও-র। আর্জেন্টিনা ছাড়া সোমবার নকআউটে গেল ফ্রান্সও। মেসির মতোই জোড়া গোল এমবাপের। ২৬-এর বিশ্বকাপে লিয়োনেল মেসিকে তাড়া করছেন কিলিয়ান এমবাপে। মঙ্গলবার ভারতীয় সময় রাতে ক্লোজেকে টপকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক গোলের মালিক হয়েছেন মেসি। কয়েক ঘণ্টা পর ক্লোজেকে ছুঁয়ে ফেললেন এমবাপে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনিও করে ফেললেন ১৬ গোল। ছাপিয়ে গেলেন ব্রাজিলের রোনাল্ডোকে।
আর্জেন্টিনার কাছে ২২ জুন ইতিহাস
জোড়া গোলে আবার নায়ক লিয়োনেল মেসি। ঠিক ৪০ বছর আগে এই ২২ জুন দিনটিকে দিয়েগো মারাদোনা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় তুলে দিয়েছিলেন ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল করে। একই দিনে মেসি রচনা করলেন অন্য এক কীর্তি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার জন্য এদিন একটি গোল দরকার ছিল লিয়োর। সহজতম সুযোগ এসে গিয়েছিল ৯ মিনিটে। বক্সের মধ্যে লাউতারো মার্তিনেজকে একসঙ্গে ট্যাকল করেন অস্ট্রিয়ার দুই ফুটবলার। ভার-এর সাহায্য নিয়ে পেনাল্টি দেন রেফারি। পিছন থেকে ট্যাকল করাতেই সম্ভবত পেনাল্টি দেন তিনি। যদিও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল বিশেষজ্ঞদের একাংশ সন্তুষ্ট নন। তবে নজর ছিল মেসির দিকে। আর্জেন্টিনার অধিনায়কই পেনাল্টি মারতে এগিয়ে যান। গোটা স্টেডিয়াম তখন বিষ্ফোরণের অপেক্ষায়। কিন্তু গোল করতে পারলেন না মেসি! ডান পোস্টে শট মারেন। কিন্তু শটে তেমন জোর ছিল না! আটকে দিলেন অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লেগার। মেসি গোলের সুযোগ নষ্ট করলেন ১৯ মিনিটেও। এ বার শ্লেগারকে প্রায় একা পেয়েও তাঁর গায়ে মারেন! মেসি-ভক্তেরা যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মাহেন্দ্রক্ষণ এল ৩৮ মিনিটে। গোল করলেন মেসি। এ বারের বিশ্বকাপে চতুর্থ। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে ১৭তম গোল এলএম টেনের।
দলকে জিতিয়েই খুশি
অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে দলকে জিতিয়ে মেসি বলেন, “দল জেতায় সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছি। খুব দরকার ছিল এই জয়টা। কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছে। দল নকআউটে ওঠায় মানসিক শান্তি পেয়েছি, যা ভবিষ্যতে আমাদের সাহায্যে করবে। এই বিশ্বকাপে সব ম্যাচই টান টান হবে। কঠোর পরিশ্রম করতে হবে ম্যাচ জিততে গেলে। আমি প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করছি। সতীর্থদের সঙ্গে আনন্দ করার জন্য তর সইছে না।” দু’গোলে জিতলেও অস্ট্রিয়া যথেষ্ট লড়াই করেছে বলে মনে করেন মেসি। জয় যে সহজে আসবে না, এটাও তিনি জানতেন। মেসি বলেন, “জিততে পেরে খুশি হয়েছি। কিন্তু কতটা কষ্ট করে জয় পেতে হয়েছে সেটা সকলেই দেখেছেন। ছ’পয়েন্ট পাওয়া খুব দরকার ছিল। আমরা জয়ের লক্ষ্যেই মাঠে নেমেছিলাম। তবে এটা জানতাম জয় সহজে আসবে না। এখনকার ফুটবলে কোনও দলই সহজে হাল ছেড়ে দেয় না। প্রতিটা ম্যাচই মনোযোগ দিয়ে খেলতে হয়।”
সব ম্যাচ জেতাই লক্ষ্য
মেসির সংযোজন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল যোগ্যতা অর্জন করা। সব ম্যাচ জেতার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামতে হবে। দলের প্রত্যেকে খুশি। আসলে আমরা একসঙ্গে হলে খুব মজা করতে ভালবাসি। অনুশীলনেও রোজ হাসিঠাট্টার মধ্যে দিয়েই কেটে যায়। সে কারণেই মাঠে নেমে এত ভাল খেলি। আমরা ইতিমধ্যেই অনেককে আনন্দ দিয়েছি। আরও আনন্দ দিতে চাই। পেনাল্টি নষ্ট করার পর নিজের উপরেই খুব রেগে গিয়েছিলাম। দিনের শেষে সেটা অবশ্য মাথায় নেই।” অস্ট্রিয়া ম্যাচেই বিশ্বকাপের নকআউট নিশ্চিত করে নিতে চেয়েছিলেন লিয়োনেল স্কালোনি। যে কোনও পেশাদার কোচ তাই চাইবেন। আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ী কোচও ব্যতিক্রম নন। সোমবার দলকে শুরু থেকেই আগ্রাসী ফুটবল খেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। সেইমতো খেলে নীল-সাদা। এদিন বিশ্বকাপে মেসির ১৮তম গোলও করেন মেসি। এ বারেই দু’ম্যাচে পাঁচটি।
দেড় ঘণ্টার ম্যাচ চলল ৪ ঘণ্টা
অন্যদিকে, প্রত্যাশা মতোই ইরাককে ৩-০ গোলে হারাল ফ্রান্স। আরও এক বার জোড়া গোল করলেন এমবাপে। কিন্তু এই ম্যাচে সবকিছুকে ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে আমেরিকার আবহাওয়া। দেড় ঘণ্টার ম্যাচ চলল ৪ ঘণ্টা ধরে। ১৫ মিনিটের বিরতি বেড়ে হল ১৩১ মিনিটের। ফলে যে খেলা ভারতীয় সময় ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ শেষ হয়ে যাওয়া উচিত তা শেষ হল প্রায় সাড়ে ৬টায়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি দীর্ঘতম ম্যাচ। ফিলাডেলফিয়াতে যে ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে তা আগেই জানা গিয়েছিল। বিরতির সময়েই জানা যায়, স্টেডিয়ামের কাছাকাছি ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। ধীরে ধীরে স্টেডিয়ামেও তা শুরু হয়। দর্শকেরা গ্যালারির ভিতরের দিকে আশ্রয় নেন। প্রবল বৃষ্টি দেখে এক এক সময় মনে হচ্ছিল, আদৌ খেলা শুরু করা যাবে তো। আমেরিকায় এই দৃশ্য মাঝেমাঝেই দেখা যায়। ফলে সেখানকার ফুটবল স্টেডিয়ামের নিকাশি ব্যবস্থা সে ভাবেই করা। বৃষ্টি থামলে দ্রুত খেলা শুরু করা যায়।
এমবাপের ঝড়
ঝড়বৃষ্টির আগে ও পরে দু’বার ঝড় তুললেন এমবাপেও। ১৪ মিনিটের মাথায় বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের জোরাল শটে গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন এমবাপে। তাঁর শটের কোনও জবাব গোলরক্ষকের কাছে ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধে খেলা শুরু হওয়ার পর আবার গোল করেন এমবাপে। সেই সঙ্গে ব্রাজিলের রোনাল্ডোকে টপকে তিনি ছুঁয়ে ফেলেন ক্লোজ়েকে। পরের ম্যাচে একটি গোল করলে মেসির পর দ্বিতীয় ফুটবলার হিসাবে একই বিশ্বকাপে ক্লোজ়েকে ছাপিয়ে যাবেন তিনি। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে হবেন দ্বিতীয় সর্বাধিক গোলদাতা। ফ্রান্সের হয়ে ৬৬ মিনিটে দলের তৃতীয় গোল করেন উসমান দেম্বেলে। এই জয়ের পর ফ্রান্সের পয়েন্ট দুই ম্যাচ ৬।

