মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আজ, ১ জৈষ্ঠ্য শনিবার, ফলহারিণী কালীপুজো। বাংলায় কালীপুজোর চল সারা বছর ধরেই দেখা যায়। দুর্গাপুজোর পরে যে কালীপুজো হয় তা জনপ্রিয় দীপান্বিতা কালী পুজো নামে পরিচিত। এছাড়াও রয়েছে রক্ষাকালী পুজো। স্থানীয়ভাবেও বাংলার নানা প্রান্তে কালীপুজো হয়। কোনও কোনও গৃহস্থের বাড়িতেও কালী পুজো বছরের বিশেষ সময়ে দেখা যায়। জৈষ্ঠ্য মাসের অমাবস্যা তিথিতে যে কালীপুজো হয় তা ফলহারিণী কালীপুজো (Falharini Kali Puja 2026) নামে প্রসিদ্ধ।
ফলহারিণী অমাবস্যা কতক্ষণ থাকবে?
এবছর, শনিবার এই অমাবস্যা তিথি (Falharini Amavasya) থাকায়, দিনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকামতে, ফলহারিণী অমাবস্যা ১৬ মে ২০২৬ সালে ভোর ৫টা ১৩ মিনিটে পড়েছে। অর্থাৎ তিথি শনিবার পড়েছে। আর তিথি শেষ হচ্ছে, ১৭ মে রবিবার ভোররাত ১টা ১৩ মিনিটে। উল্লেখ্য, এই পঞ্জিকামতে, তিথি ১ জ্যৈষ্ঠ শুরু, তিথি শেষ ২ জ্যৈষ্ঠ। অন্যদিকে, অমাবস্যা ১৫ মে শুক্রবার ভোর ৪টে ১ মিনিটে পড়ছে। অমাবস্যা তিথি শেষ হবে ১৬ মে শনিবার রাত ১টা ৪৯ মিনিটে।
পাপক্ষয়, আত্মশুদ্ধি ও মাতৃশক্তির আরাধনার বিশেষ তিথি
হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মনে করা হয়—মা কালী এই তিথিতে ভক্তদের পাপ, দুঃখ, ক্লেশ ও কর্মফলের বন্ধন থেকে মুক্তি দেন। ‘ফলহারিণী’ শব্দটির অর্থই হল— যিনি কর্মফল হরণ করেন। তাই সাধারণ কালীপুজোর তুলনায় এই পূজার আধ্যাত্মিক গুরুত্ব অনেক গভীর। ফলহারিণী কালীপুজো মূলত তন্ত্রসাধনা, আত্মশুদ্ধি এবং ঈশ্বরচিন্তার একটি বিশেষ দিন হিসেবে বিবেচিত। বাংলার বহু বাড়ি, মন্দির ও আশ্রমে এই দিন মা কালীর বিশেষ পুজো, হোম-যজ্ঞ, চণ্ডীপাঠ ও নামসংকীর্তনের আয়োজন করা হয়। ভক্তরা উপবাস পালন করে মাতৃশক্তির কৃপা প্রার্থনা করেন।
ফলহারিণী কালীপুজোর পৌরাণিক তাৎপর্য
শাস্ত্র মতে, জগজ্জননী মা কালী শুধু সংহারক নন, তিনি মুক্তিদাত্রীও। জীবনের সঞ্চিত কর্মফল, অহংকার, লোভ, ক্রোধ এবং মোহ দূর করে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার শক্তি রয়েছে তাঁর মধ্যে। এই কারণেই ফলহারিণী অমাবস্যায় মা কালীর পূজার বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষ জন্মে জন্মে নিজের কর্মের ফল বহন করে। শুভ কর্মে যেমন ভালো ফল আসে, তেমনই অশুভ কর্ম দুঃখ ও বাধার কারণ হয়। ফলহারিণী কালীপুজো সেই কর্মফলের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির প্রতীক। এই দিনে আন্তরিক ভক্তি ও প্রার্থনার মাধ্যমে মা কালীর কাছে জীবনের নেতিবাচক শক্তি দূর করার আবেদন জানানো হয়।
ফলের মালা পরানোর রীতি দেখা যায়
ভক্তদের বিশ্বাস, মা কালী জীবের কর্মফল অনুসারে তাদের আশীর্বাদ প্রদান করেন। তিনি প্রসন্না হলে জীবের দুঃখ দুর্দশা থেকে মুক্তি মেলে। পাশাপাশি জীবন সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠে। ফলহারিণী অমাবস্যায় দেবীকে বিভিন্ন মরশুমি ফল দিয়ে পুজো দিলে দেবী সন্তুষ্ট হন বলে বিশ্বাস। আম, জাম, কলা, লিচু-সহ বিভিন্ন ফলের মালা তৈরি করে দেবীকে পরানোর রীতি দেখা যায়।
কেন এই পুজো ফলহারিণী কালীপুজো নামে পরিচিত?
শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, জৈষ্ঠ্য মাসে আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল সমেত নানারকম মরসুমী ফল পাওয়া যায়। ভক্তরা তাঁদের ইষ্টদেবীকে এই ফল নিবেদন করে থাকেন। দেবী ভক্তদের কর্মফল হরণ করে তাদেরকে মোক্ষফল প্রদান করেন। ভক্তদের বিশ্বাস, ফলহারিণী কালীপুজো করলে বিদ্যা, কর্ম এবং অর্থ ভাগ্যের উন্নতি ঘটে প্রেম প্রণয়ের বাধা দূর হয়, দাম্পত্য সংসারী জীবনেও সুখ শান্তি বিরাজ করে। এককথায় এই বিশেষ পুজোয় ভক্তরা আধ্যাত্মিক, নৈতিক, মানসিক শক্তি পেয়ে থাকেন বলে তাঁদের বিশ্বাস।
এই দিনেই সারদা দেবীকে পুজো করেছিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ
ফলহারিণী কালীপুজোর আরেকটি ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব রয়েছে। জানা যায়, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ফলহারিণী কালীপুজোর দিনে সারদা দেবীকে পুজো করেছিলেন জগৎ কল্যাণের জন্য। এই ঘটনা হিন্দু আধ্যাত্মিক জগতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১২৮০ বঙ্গাব্দের জৈষ্ঠ্য মাসের অমাবস্যা তিথিতে ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে ষোড়শী রূপে পুজো করেছিলেন সারদা মা’কে। শ্রী রামকৃষ্ণ তাঁর সাধনার পরম পরিণতি হিসেবে স্ত্রী সারদা দেবীর মধ্যে আদ্যাশক্তির প্রকাশ দেখেছিলেন। ফলহারিণী কালীপুজোর রাতেই তিনি সারদা দেবীকে দেবীর আসনে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করেন। এর মাধ্যমে নারীশক্তি, মাতৃত্ব ও দেবীত্বের এক অনন্য ব্যাখ্যা সামনে আসে। পরবর্তীতে এই সময়ের কালী পুজো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে ফলহারিণী কালী (Falharini Kali Puja 2026) পুজো নামেই প্রসিদ্ধি পায়।
