মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দেশের গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও পরিবেশবান্ধব, জ্বালানি-সাশ্রয়ী এবং টেকসই করে তোলার লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল ভারতীয় রেল (Indian Railway)। হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত শাখায় পাইলট প্রজেক্ট বা পরীক্ষামূলকভাবে দেশের প্রথম হাইড্রোজেন ফুয়েল (Hydrogen Powered Train) সেল-ভিত্তিক ১০ কামরার ট্রেনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় রেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১,২০০ কিলোওয়াটের হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রপালশন সিস্টেম দ্বারা চালিত এই অত্যাধুনিক ট্রেনটি দ্রুত যাত্রী পরিষেবা শুরু করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার নির্ধারিত হয়েছে।
শক্তি দক্ষতা এবং পরিবেশবান্ধব (Hydrogen Powered Train)
এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ভারত জার্মানি, জাপান, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলির এলিট ক্লাবে প্রবেশ করল, যারা পরিচ্ছন্ন ও সবুজ রেল পরিবহণের জন্য হাইড্রোজেনের ব্যবহার শুরু করেছে। ভারতীয় রেলের (Indian Railway) এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই প্রকল্পটি উদ্ভাবন, শক্তি দক্ষতা এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহণের প্রতি ভারতীয় রেলের বৃহত্তর প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি ভারতের জাতীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নীতি এবং ‘নেট-জিরো’ বা কার্বন নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যকে জোরালো সমর্থন জোগাবে।”
কীভাবে কাজ করবে এই ট্রেন?
ভারতীয় রেল ইতিমধ্যেই তার নেটওয়ার্কের প্রায় ১০০ শতাংশ অংশই বৈদ্যুতিকীকরণের আওতায় নিয়ে এসেছে, যা কার্বন নির্গমন বহুলাংশে হ্রাস করেছে। তবে হাইড্রোজেন ট্রেনের (Hydrogen Powered Train) ক্ষেত্রে রেল আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে। এই ট্রেনগুলি বাইরে থেকে বিদ্যুৎ না নিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তিতে ট্রেনের ভেতরেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তিতে হাইড্রোজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরি হয় এবং এর ফলে উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে শুধুমাত্র জলীয় বাষ্প নির্গত হয়। ফলে প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় এটি সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত। জিন্দ-সোনিপত রুটের জন্য জিন্দে একটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তির হাইড্রোজেন স্টোরেজ এবং রিফুয়েলিং বা জ্বালানি ভরার কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, যা ‘পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস সেফটি অর্গানাইজেশন’ (PESO)-এর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রও পেয়েছে। প্রথম দিকে ট্রেনটির সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষিত কারিগরি কর্মীরা ট্রেনের (Indian Railway) ভেতরে উপস্থিত থাকবেন।
কঠোর নিরাপত্তা প্রোটোকল
যেহেতু বিশ্বজুড়ে এই প্রযুক্তি এখনও প্রাথমিক স্তরে রয়েছে, তাই এর পরিচালনায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভারতীয় রেলের (Indian Railway) নির্দেশিকা অনুযায়ী যা যা জানা গিয়েছে তা হল–
- ● হাইড্রোজেন রিফুয়েলিং সিস্টেমের (Hydrogen Powered Train) চব্বিশ ঘণ্টা (২৪x৭) সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হবে।
- ● অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির জন্য শুধুমাত্র প্রত্যয়িত এবং বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কর্মীদের মোতায়েন করা হবে।
- ● হাইড্রোজেন উৎপাদন, সঞ্চয়স্থান এবং ফিলিং সেন্টারে উন্নত প্রযুক্তির ‘হাইড্রোজেন লিক ডিটেক্টর’ এবং ‘ফ্লেম ডিটেক্টর’ (আগুন সনাক্তকারী যন্ত্র)-এর মতো সেন্সর বসানো হয়েছে।
- ● ধুলোকণা জমে যাতে কোনও বিপদ না ঘটে, তার জন্য নিয়মিত পরিদর্শন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কড়া নিয়ম অনুসরণ করা হবে।
হাইড্রোজেনের ব্যবহার বাড়ছে সড়ক পরিবহণেও
পরিবহণ ক্ষেত্রে হাইড্রোজেনের (Hydrogen Powered Train) ব্যবহার বাড়াতে ভারত সরকার প্রতিনিয়ত তৎপরতা দেখাচ্ছে। সম্প্রতি সড়ক পরিবহণের ক্ষেত্রেও বড় সাফল্য এসেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকেই দিল্লির সেন্ট্রাল ভিস্তা এলাকায় দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন (DMRC) দেশের প্রথম হাইড্রোজেন-চালিত শাটল বাস পরিষেবা চালু করেছে। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন লিমিটেড (IOCL)-এর দেওয়া এই বাসগুলিতে ৩৫ জন যাত্রীর বসার আসন রয়েছে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের জন্য বাসগুলিতে জিপিএস ও সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, ভারতীয় রেলের (Indian Railway) এই সবুজ উদ্যোগ আগামী দিনে ভারতের সার্বিক পরিবহণ ব্যবস্থার ভোল বদলে দিতে পারে।
