Tag: BrahMos Export

  • BrahMos Missile Indonesia: ভারতের ব্রহ্মসে অস্বস্তিতে চিন! ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি ঘিরে বেজিংয়ের বড় স্বীকারোক্তি

    BrahMos Missile Indonesia: ভারতের ব্রহ্মসে অস্বস্তিতে চিন! ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি ঘিরে বেজিংয়ের বড় স্বীকারোক্তি

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতের কাছ থেকে ‘ব্রহ্মস’ (BrahMos) সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘অ্যাস্ট্রা’ (Astra) বিয়ন্ড-ভিজুয়াল-রেঞ্জ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল (BVRAAM) ইন্দোনেশিয়ার কেনার সিদ্ধান্ত চিনের কপালেও ভাঁজ ফেলেছে। বেজিংয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই চুক্তির প্রভাব পড়তে পারে গোটা ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, বিশষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য ও ভূ-রাজনীতির ওপর। বিশেষ করে মালাক্কা-সহ গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়াদিল্লির প্রতিরক্ষা কূটনীতির বিস্তারকে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছে চিন।

    চিনা সরকারি সংবাদমাধ্যমে ভারত-ইন্দোনেশিয়া সামরিক চুক্তি

    ভারতের তৈরি ‘ব্রহ্মস’ এবং ‘অ্যাস্ট্রা’ কেনার সিদ্ধান্তে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি এবার প্রকাশ্যে স্বীকার করল চিন। আর সেই স্বীকৃতির পরই চিনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে দিল, বেজিং এই চুক্তিকে শুধু অস্ত্র রফতানি হিসেবে দেখছে না, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনা করছে। চিনা বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিপিন্সের পর ইন্দোনেশিয়াও যখন ব্রহ্মসের গ্রাহক হচ্ছে এবং একই সময়ে ভিয়েতনামের সঙ্গেও ভারত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করছে, তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়াদিল্লির একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা-অংশীদারিত্বের নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে। তাদের দাবি, ভারত এখন শুধু অস্ত্র রফতানি করছে না, বরং আসিয়ান (ASEAN) দেশগুলির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কও গড়ে তুলছে।

    ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র রফতানিকে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ বলছে চিন

    চিনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানির বিস্তার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। বিশেষ করে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধে জড়িত দেশগুলির হাতে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছে গেলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে বলেই মনে করছে বেজিং। চিনা বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষমতা এখন শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি নয়াদিল্লির রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবকে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রসারিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

    ব্রহ্মসের মোকাবিলা কীভাবে? ভাবনা শুরু চিনের!

    তবে একই সঙ্গে ব্রহ্মসের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছে চিনা প্রতিরক্ষা মহল। তাদের দাবি, রফতানিযোগ্য ব্রহ্মস সংস্করণের পাল্লা প্রায় ২৯০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা মিসাইল টেকনোলজি কন্ট্রোল রেজিম (MTCR)-এর আগের রফতানি নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এই সংস্করণ মূলত উপকূলীয় প্রতিরক্ষার জন্য বেশি উপযোগী, দীর্ঘ-পাল্লার আক্রমণাত্মক অভিযানের জন্য নয়। এছাড়াও চিনা বিশ্লেষকদের দাবি, পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির ‘টাইপ ০৫৫’ এবং ‘টাইপ ০৫২ডি’ ডেস্ট্রয়ারে থাকা বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উচ্চগতির ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় সক্ষম। যদিও এই মূল্যায়ন সম্পূর্ণরূপে তাত্ত্বিক এবং বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে তার কার্যকারিতা এখনও প্রমাণিত হয়নি।

    মালাক্কা প্রণালি ঘিরে বাড়ছে ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব

    চিনা প্রতিবেদনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানকে। মালাক্কা, সুন্ডা এবং লম্বক প্রণালি—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। বিশ্বের বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহণের বড় অংশ এই রুট দিয়েই সম্পন্ন হয়। চিনের আশঙ্কা, এই ধরনের কৌশলগত সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণে থাকা দেশগুলির হাতে যদি স্থলভিত্তিক অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়, তবে ভবিষ্যতের কোনও আঞ্চলিক সংঘাতে নৌ-অভিযান আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে চিনা বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াকে ঘিরে ভারতের যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গড়ে উঠছে, তা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত।

    ইন্দোনেশিয়াকে সরাসরি আক্রমণ নয়, সতর্ক বার্তা বেজিংয়ের

    উল্লেখযোগ্যভাবে, ইন্দোনেশিয়ার সমালোচনা না করে তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছে চিনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। সম্পাদকীয়গুলিতে ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক শক্তির বাইরের দেশগুলির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ালে নতুন ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে, চিন এখনও ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার—এই বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে।

    ভারতের জন্য বড় মাইলফলক

    ভারতের দৃষ্টিতে এই চুক্তি প্রতিরক্ষা রফতানির ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সাফল্য। ইতিমধ্যেই ব্রহ্মস ভারতের সবচেয়ে সফল প্রতিরক্ষা রফতানি পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে, চুক্তি কার্যকর হলে অ্যাস্ট্রা হবে ভারতের প্রথম স্বদেশে তৈরি বিয়ন্ড-ভিজুয়াল-রেঞ্জ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল, যা বিদেশে রফতানি করা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই ক্ষেপণাস্ত্রের রফতানি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্য নয়, বরং ভারতের দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির পরিণত সক্ষমতারও প্রমাণ। একই সঙ্গে ঐতিহ্যগত অস্ত্র-রফতানিকারি দেশগুলির উপর নির্ভরতা কমাতে আগ্রহী রাষ্ট্রগুলির কাছে ভারতকে একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা অংশিদার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করছে।

    ‘স্ট্রিং অব পার্লস’-এর জবাব দিচ্ছে ভারত, বলছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা আধিকারিকরা

    ভারতীয় সেনার অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিকরা এই চুক্তিকে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল পিকে সেহগল (অবসরপ্রাপ্ত) বলেন, ‘‘ইন্দোনেশিয়ার ব্রহ্মস কেনার সিদ্ধান্ত ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি এটি আত্মনির্ভর ভারত এবং মেক ইন ইন্ডিয়া উদ্যোগেরও বড় সাফল্য।’’ তিনি জানান, ২০১৪ সালের আগে ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২৫,০০০ থেকে ২৬,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে তা ৫০,০০০ কোটির কাছাকাছি পৌঁছতে পারে। মেজর জেনারেল সেহগল আরও জানান, ভারতের সঙ্গে ফিলিপিন্স ও ভিয়েতনামের পর এবার ইন্দোনেশিয়ারও ব্রহ্মস চুক্তি প্রমাণ করছে যে, চিন যেভাবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে, ভারতও তার কৌশলগত জবাব দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘ইন্দোনেশিয়া শুধু ব্রহ্মসই নয়, ভারতের তৈরি অ্যাস্ট্রা ক্ষেপণাস্ত্রও নিচ্ছে, যা দেশটির বিমানবাহিনি ও উপকূলীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি সাবাং বন্দর-সহ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলছে।’’

    ‘নেকলেস অব ডায়মন্ডস’ কৌশলের ইঙ্গিত

    মেজর জেনারেল সঞ্জয় সোই (অবসরপ্রাপ্ত) বলেন, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ব্রহ্মস চুক্তি চিনের সম্প্রসারণবাদি নীতির কার্যকর জবাব। তাঁর মতে, চিন যেখানে ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের মাধ্যমে ভারতকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করেছে, সেখানে ভারত ‘নেকলেস অব ডায়মন্ডস’ নীতির মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিকে কৌশলগত অংশিদারিত্ব আরও শক্তিশালী করছে। অন্যদিকে, মেজর জেনারেল ধ্রুব কাটোচ (অবসরপ্রাপ্ত) বলেন, ‘‘ব্রহ্মসের মতো কৌশলগত অ্যাস্ট্রা কোনও দেশের হাতে থাকলে সেটি শুধুমাত্র যুদ্ধের জন্য নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা (Deterrence) তৈরি করে। এতে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ সামরিক আগ্রাসনের আগে বহুবার ভাবতে বাধ্য হয়।’’

    ইন্দো-প্যাসিফিকে ভারতের প্রতিরক্ষা কূটনীতির নতুন অধ্যায়

    বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ব্রহ্মস ও অ্যাস্ট্রা ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি শুধু একটি প্রতিরক্ষা রফতানি নয়; এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের প্রতিরক্ষা কূটনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ফিলিপিন্স, ভিয়েতনামের পর ইন্দোনেশিয়াও যখন ভারতের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার উপর আস্থা দেখাচ্ছে, তখন স্পষ্ট হচ্ছে যে ভারত ক্রমশ একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা রফতানিকারি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা অংশিদার হিসেবে নিজের অবস্থান আরও মজবুত করছে। একই সঙ্গে চিনের তীব্র প্রতিক্রিয়াও এই চুক্তির কৌশলগত গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

LinkedIn
Share