Tag: BSF Smart Border Project

  • 358 Security Mesh Fencing: শিলিগুড়ি থেকে সুন্দরবন! বাংলাদেশ সীমান্তে বসছে এআই-সমর্থিত স্মার্ট ফেন্সিং! অভেদ্য প্রাচীরের মধ্যমণি ‘৩৫৮ মেশ’, কী এটা?

    358 Security Mesh Fencing: শিলিগুড়ি থেকে সুন্দরবন! বাংলাদেশ সীমান্তে বসছে এআই-সমর্থিত স্মার্ট ফেন্সিং! অভেদ্য প্রাচীরের মধ্যমণি ‘৩৫৮ মেশ’, কী এটা?

    সুশান্ত দাস

    ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে আরও অভেদ্য করে তুলতে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে কেন্দ্রের ‘স্মার্ট বর্ডার’ প্রকল্প। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে ১,০০০ একরেরও বেশি জমি হস্তান্তরের পর সীমান্তে অত্যাধুনিক স্মার্ট ফেন্সিং নির্মাণের কাজ জোরকদমে শুরু করেছে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (BSF)। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৭২.৬ কিলোমিটার সীমান্তে উচ্চ-নিরাপত্তাসম্পন্ন বেড়া তৈরি করা হচ্ছে। ‘শিলিগুড়ি করিডর’ -এর পাশাপাশি, বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং সুন্দরবনের মতো অনুপ্রবেশ-প্রবণ এলাকাগুলিকে। প্রকল্পটি শুধুমাত্র একটি নতুন সীমান্ত বেড়া নির্মাণ নয়। বরং এটি এমন একটি সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সীমান্তের প্রতিটি নড়াচড়ার উপর তাৎক্ষণিক নজর রাখা সম্ভব হবে।

    কেন এত গুরুত্ব পাচ্ছে ‘স্মার্ট ফেন্সিং’?

    ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বড় অংশ নদী, চর এবং দুর্গম ভূখণ্ডে অবস্থিত। বহু জায়গায় প্রচলিত কাঁটাতারের বেড়া কার্যকরভাবে নির্মাণ করা সম্ভব হয় না। আবার সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং অন্যান্য অবৈধ কার্যকলাপ দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্র ‘স্মার্ট বর্ডার’ ধারণা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—শুধু শারীরিক বাধা তৈরি নয়, প্রযুক্তির সাহায্যে সীমান্তকে ২৪ ঘণ্টা নজরদারির আওতায় আনা।

    শুধু বেড়া নয়, থাকবে অত্যাধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা

    নতুন স্মার্ট ফেন্সিংয়ের সঙ্গে একাধিক উন্নত প্রযুক্তিকে যুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—

    • ● উচ্চ রেজোলিউশনের সিসি ক্যামেরা
    • ● থার্মাল ইমেজার
    • ● নাইট ভিশন ডিভাইস
    • ● নজরদারির জন্য ড্রোন
    • ● সেন্সর-ভিত্তিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা
    • ● আধুনিক কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার
    • ● রিয়েল-টাইম মনিটরিং নেটওয়ার্ক

    এই সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্তে কোনও সন্দেহজনক নড়াচড়া ধরা পড়লেই সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে। এরপর দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠানো যাবে কুইক রিঅ্যাকশন টিম (QRT)। একজন বিএসএফ আধিকারিক বলেন, “এই নতুন বেড়া শুধু উঁচু নয়, এটি স্মার্টও। মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি সেক্টরের মতো এলাকায় ১২ ফুট উঁচু নিরাপত্তা প্রাচীরের সঙ্গে থাকবে সিসিটিভি, ড্রোন, থার্মাল সেন্সর এবং রিয়েল-টাইম অ্যালার্ম ব্যবস্থা।”

    কী এই ‘৩৫৮’ সিকিউরিটি মেশ? কেন এত শক্তিশালী?

    এই স্মার্ট ফেন্সিংয়ের অন্যতম আকর্ষণ হল ‘৩৫৮ সিকিউরিটি ওয়েল্ডেড মেশ’ প্রযুক্তি। ভারতে এই ধরনের উচ্চ-নিরাপত্তার স্টিল মেশ তৈরির অন্যতম কেন্দ্র শিলিগুড়ি। এখানকার একাধিক সংস্থা সামরিক ঘাঁটি, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তে ব্যবহারের উপযোগী এই বিশেষ ধরনের বেড়া তৈরি করে।

    ‘৩৫৮’ নামের পিছনেও রয়েছে প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা—

    • ● ৩ ইঞ্চি × ০.৫ ইঞ্চি মেশ ওপেনিং
    • ● ৮-গেজ (প্রায় ৪ মিমি) পুরু স্টিল তার
    • ● ছোট ফাঁক হওয়ায় হাত ঢোকানো বা পা রাখার সুযোগ নেই
    • ● সাধারণ বোল্ট কাটার বা হাতিয়ার দিয়ে কাটা অত্যন্ত কঠিন
    • ● হট-ডিপ গ্যালভানাইজড স্টিল ব্যবহারের ফলে দীর্ঘদিন মরিচা পড়ে না
    • ● অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য পাউডার কোটিং বা পিভিসি আবরণ ব্যবহার করা যায়
    • ● বিশেষ ক্ল্যাম্প ও নাট-বল্টের সাহায্যে দ্রুত স্থাপন সম্ভব, ফলে মাঠ পর্যায়ে ভারী ওয়েল্ডিংয়ের প্রয়োজন পড়ে না

    ফলে এই বেড়া কার্যত একটি অদৃশ্য নিরাপত্তা প্রাচীরের মতো কাজ করে।

    অমিত শাহ কী বলেছিলেন?

    সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ‘শিলিগুড়ি করিডর’ সফরে গিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ‘স্মার্ট বর্ডার’ ধারণার মাধ্যমে দেশের সীমান্তকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করাই কেন্দ্রের লক্ষ্য। তিনি জানান, চতুর্মুখী নিরাপত্তা বলয় (Quadrangular Security Grid) গড়ে তোলার প্রকল্পের সূচনা পশ্চিমবঙ্গ থেকেই হবে।

    সফরের সময় তিনি একাধিক আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি পরিদর্শন করেন। এর মধ্যে ছিল—

    • ● রেডিও-ভিত্তিক ফেন্স ব্রিচ ডিটেকশন সিস্টেম— যা বেড়া কাটার বা নষ্ট করার চেষ্টা হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা সম্প্রচার করে।
    • ● ইনফ্রারেড অ্যালার্ম সিস্টেম— যা নদী, খাল কিংবা দুর্গম এলাকায় ইনফ্রারেড রশ্মি বিচ্ছিন্ন হলেই নিরাপত্তা বাহিনীকে আগাম সতর্ক করে।

    সুন্দরবনের জন্য আলাদা নিরাপত্তা কৌশল

    স্থল সীমান্তের মতো সুন্দরবনের নদীপথে সাধারণ বেড়া নির্মাণ কার্যত অসম্ভব। তাই সেখানে নেওয়া হয়েছে পৃথক কৌশল।

    সুন্দরবনে মোতায়েন করা হচ্ছে—

    • ● ভাসমান বর্ডার আউটপোস্ট
    • ● উচ্চগতির টহল নৌকা
    • ● নদী ও খাঁড়িতে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি
    • ● স্মার্ট নজরদারি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা

    এই ভাসমান সীমান্ত চৌকিগুলি কার্যত চলমান বিএসএফ ক্যাম্প হিসেবে কাজ করবে। জলপথে সন্দেহজনক গতিবিধি নজরে এলেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।

    সীমান্ত নিরাপত্তায় নতুন অধ্যায়

    বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত সুরক্ষার ধারণা এখন আর শুধুমাত্র কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সমর্থিত নজরদারি, সেন্সর, ড্রোন, থার্মাল ইমেজিং এবং রিয়েল-টাইম ডেটা বিশ্লেষণ আগামী দিনের সীমান্ত নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হতে চলেছে।পশ্চিমবঙ্গে শুরু হওয়া এই স্মার্ট ফেন্সিং প্রকল্প সফল হলে ভবিষ্যতে ভারতের অন্যান্য আন্তর্জাতিক সীমান্তেও একই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু হতে পারে। সীমান্ত সুরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি দ্রুত প্রতিক্রিয়া, উন্নত নজরদারি এবং অনুপ্রবেশ রোধে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেই মনে করছে নিরাপত্তা মহল।

LinkedIn
Share