Tag: Burdwan Blast

  • Durga Puja 2026: দুর্গাপুজোকে ঘিরে অশান্তি, পশ্চিমবঙ্গে এক দশকের খতিয়ান

    Durga Puja 2026: দুর্গাপুজোকে ঘিরে অশান্তি, পশ্চিমবঙ্গে এক দশকের খতিয়ান

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে দুর্গাপুজো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। পুজো কমিটি, মণ্ডপ, প্রতিমা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং বিসর্জনের শোভাযাত্রা—সব মিলিয়ে প্রতি বছরই রাজ্যের জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে দুর্গাপুজো। কলকাতার দুর্গাপুজো  (Durga Puja 2026) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। মানবতার বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি তালিকায় কলকাতার দুর্গাপুজোকে অন্তর্ভুক্ত করেছে ইউনেস্কো।

    তবে গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে একাধিক বিতর্ক, অশান্তি এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ সামনে এসেছে। কোথাও পুজো মণ্ডপে ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর অভিযোগ উঠেছে, কোথাও ধর্মীয় আচার পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ, আবার কোথাও বিসর্জনের শোভাযাত্রায় হামলা, প্রতিবাদীদের গ্রেফতার, পুলিশি পদক্ষেপ এবং প্রশাসনিক বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে (Pandal Vandalism Incidents)।

    রাজনৈতিক বিতর্ক (Durga Puja 2026)

    ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও দুর্গাপুজোর মণ্ডপ সংলগ্ন সিপিআই(এম)-এর বইয়ের স্টলকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। “শারদোৎসবে”র বদলে ‘দুর্গোৎসব’ শব্দ ব্যবহার করতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। তা না করলে পুজো কমিটিগুলিকে সিপিআই(এম)-এর বইয়ের স্টল বসানোর অনুমতি না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয় বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পাল্টা সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এই পদক্ষেপকে “ফ্যাসিবাদী আক্রমণ” বলে আখ্যা দেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় আবেগ উসকে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। দীর্ঘদিন ধরেই পুজো মণ্ডপের আশপাশে সিপিআই(এম) ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলির বইয়ের স্টল বসানোর রীতি রয়েছে। সেখানে দলীয় প্রকাশনা, মার্কসবাদী সাহিত্য এবং বিভিন্ন বই বিক্রি করা হয়।

    ২০২৪ সালের দুর্গাপুজোর সময় একাধিক ঘটনাও বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। কলকাতার গার্ডেন রিচ এলাকায় নিউ বেঙ্গল স্পোর্টিং ক্লাবের পুজোয় অষ্টমী ও নবমীর আচার-অনুষ্ঠানের সময় গান ও ভক্তিগীতি বাজানোকে কেন্দ্র করে আপত্তির অভিযোগ ওঠে। পুজো কমিটির অভিযোগ ছিল, একটি দল পুজোর অনুষ্ঠান বন্ধ করার হুমকি দেয় এবং দুর্গাপ্রতিমা ভাঙচুরেরও হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মামলা করে।

    দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে অশান্তি

    হাওড়ার শ্যামপুরে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে অশান্তির অভিযোগ ওঠে। পুজো সংলগ্ন এলাকায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। পরে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয় এবং এলাকায় নিষেধাজ্ঞামূলক নির্দেশ জারি করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

    এদিকে, দুর্গাপুজোর বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিবাদকে কেন্দ্র করেও পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। কলকাতা পুলিশ পুজোর সময় জুনিয়র চিকিৎসকদের “অভয়া পরিক্রমা” কর্মসূচি থামিয়ে দেয় এবং বেশ কয়েকজনকে আটক করে। পুজো মণ্ডপের বাইরে চিকিৎসকদের আন্দোলনের সমর্থনে প্রতিবাদ করার অভিযোগে আলিপুরে নয় যুবককে গ্রেফতার করা হলেও পরে কলকাতা হাই কোর্ট তাঁদের অন্তর্বর্তী জামিন দেয়। আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, তাঁদের উদ্দেশ্য ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো বা ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা ছিল না (Durga Puja 2026)।

    দুর্গাপুজোর সরকারি কার্নিভালেও এক চিকিৎসকের গ্রেফতারি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। আরজি কর-কাণ্ডে আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকদের সমর্থনে ব্যাজ পরে পুজো কার্নিভালে অংশ নেওয়া কর্তব্যরত সরকারি চিকিৎসক তপাব্রত রায়কে কলকাতা পুলিশ গ্রেফতার করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাঁর গ্রেফতারির প্রতিবাদে চিকিৎসক ও অন্যদের বিক্ষোভের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে কলকাতা হাই কোর্ট ওই মামলায় তাঁকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষাও দেয়।

    নদিয়ার রানাঘাটে প্রায় ৫০ বছর ধরে দুর্গাপুজো করে আসা একটি ক্লাবকে ১১২ ফুট উচ্চতার প্রতিমা পুজোর অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। আইনশৃঙ্খলার কারণ দেখিয়ে অনুমতি না দেওয়ায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে ক্লাবটি ওই বছর পুজো না করার সিদ্ধান্ত নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

    অশান্তি বিসর্জনের শোভাযাত্রায়ও

    দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত বিসর্জনের শোভাযাত্রাতেও একাধিকবার অশান্তির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর কলকাতার পার্ক সার্কাস ও নারকেলডাঙা এলাকায় কালী ও লক্ষ্মীপ্রতিমা বিসর্জনের সময় পাথর ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। পুজো কমিটি ও শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া ভক্তদের অভিযোগ, রাজাবাজার এলাকায় হঠাৎ করে পাথর, কাচের বোতল এবং ইট ছোড়া হয়। আশপাশের বাড়ি থেকেও পাথর ছোড়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। আতঙ্কে অনেকে দৌড়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেন এবং কয়েকটি শোভাযাত্রার যাত্রাভঙ্গ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পরে অবশ্য বিসর্জন শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয় (Durga Puja 2026)।

    এই ঘটনার পর জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য অর্চনা মজুমদার রাজ্যপালকে চিঠি দিয়ে নারকেলডাঙার হিংসার অভিযোগ জানান। তাঁর দাবি ছিল, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সময় পুলিশ আধিকারিকদের আচরণও যথাযথ ছিল না। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাঁর সঙ্গে তর্ক হয় এবং পরে বিসর্জনের শোভাযাত্রায় থাকা আক্রান্তদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয় (Pandal Vandalism Incidents)।

    ২০২০ সালের বিজয়া দশমীতে বীরভূমে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে পুলিশি লাঠিচার্জের অভিযোগ উঠেছিল। পুজো কমিটির সদস্য ও ভক্তদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে বলে অভিযোগ। ঘটনার ভিডিয়োয় এক পুলিশকর্মীকে এক যুবকের জামার কলার ধরে রাস্তায় টেনে নিয়ে যেতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

    দুর্গাপুজোর মণ্ডপের থিম এবং ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। ২০২১ সালে কলকাতার বড়িশা ক্লাবের দুর্গাপুজোকে ঘিরে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির বিরোধিতায় বিভ্রান্তিকর বার্তা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মণ্ডপে দুর্গাপ্রতিমার পাশাপাশি ঢাকার ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়েছিল। মণ্ডপসজ্জায় একটি দৃশ্যে দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে এক হিন্দু মহিলা ও তাঁর শিশুকে ভারতের একটি আটককেন্দ্রে বন্দি দেখানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে—এমন ইঙ্গিতও ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া কিছু দুর্গাপুজোয় প্রতিমার সামনে আজান দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। আজান ইসলামে নমাজের আহ্বান। এই ঘটনাকে ঘিরেও ধর্মীয় প্রতীক ও পুজোর পরিবেশ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

    খাগড়াগড় বিস্ফোরণকাণ্ড

    দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনাগুলির একটি হল বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলা। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর বর্ধমানের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে বিস্ফোরণ ঘটে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশি জঙ্গি সংগঠন জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশের একটি মডিউলের সঙ্গে এই ঘটনার যোগ ছিল। বিস্ফোরণে মণ্ডপের বেশ কয়েকটি প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, বিস্ফোরক তৈরির সময় দুর্ঘটনাবশত বিস্ফোরণ ঘটে এবং দু’জনের মৃত্যু হয়। পরে বিশেষ এনআইএ আদালত মামলায় ১৯ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে, যাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন (Durga Puja 2026) চারজন।

    দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ ও গ্রেফতারের ঘটনাও সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে আলিপুরে পুজোর মণ্ডপ থেকে আরজি কর-কাণ্ডে আন্দোলনরত চিকিৎসকদের সমর্থনে প্রতিবাদ করার অভিযোগে নয় যুবককে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং অন্তর্বর্তী জামিন দেওয়া হয়।

    পুজো মণ্ডপে জুনিয়র চিকিৎসক ও প্রতিবাদীদের আটক এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়েও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কলকাতা পুলিশের কাছে জবাব চেয়েছিল। ত্রিধারা সম্মিলনী দুর্গাপুজোর মণ্ডপে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই নোটিশ দেওয়া হয়। সর্বভারতীয় ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কলকাতা পুলিশের কাছে ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপের রিপোর্ট চায়।

    সব মিলিয়ে, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজোকে ঘিরে নানা ধরনের বিতর্ক ও সংঘাতের ঘটনা সামনে এসেছে। কোথাও পুজোর মণ্ডপে ভাঙচুর, কোথাও ধর্মীয় আচার পালনে বাধা, কোথাও বিসর্জনের শোভাযাত্রায় হিংসা, আবার কোথাও প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ—বিভিন্ন ঘটনায় উৎসবের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক পরিসর প্রশ্নের মুখে পড়েছে (Pandal Vandalism Incidents)।

    বিসর্জনের শোভাযাত্রায় পাথর ছোড়ার অভিযোগ

    বিশেষ করে ২০২৪ সালের ঘটনাগুলিতে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ ও তার আশপাশের জনপরিসর একাধিক পৃথক সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। গার্ডেন রিচে পুজোর আচার ঘিরে বিরোধ, শ্যামপুরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, নারকেলডাঙায় বিসর্জনের শোভাযাত্রায় পাথর ছোড়ার অভিযোগ, পুজোর মণ্ডপের কাছে প্রতিবাদকারীদের গ্রেফতার এবং সরকারি পুজো কার্নিভালে কর্তব্যরত চিকিৎসকের আটক—সবক’টি ঘটনায়ই নতুন করে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

    এর পাশাপাশি প্রতিমা বিসর্জন, বিজয়া দশমীতে পুলিশি পদক্ষেপ, পুজোর মণ্ডপের থিম ও ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার এবং বর্ধমান বিস্ফোরণ মামলার মতো পুরনো ঘটনাগুলিও এই বিতর্কের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে।

    ২০২৬ সালের “শারদোৎসব” বিতর্ক সেই চলমান চর্চায় নয়া মাত্রা যোগ করেছে। দুর্গাপুজোর পরিচয়, নামকরণ, সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা এবং পুজোকে ঘিরে (Durga Puja 2026) জনপরিসরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের মধ্যে মতপার্থক্য ফের প্রকাশ্যে এসেছে (Pandal Vandalism Incidents)।

     

LinkedIn
Share