মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দীর্ঘ এক দশক পর ফের কানাডা সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Modi’s Canada Visit)। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ তাঁর কানাডা সফরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ভারত ও কানাডার (India Canada Relation) মধ্যে প্রস্তাবিত কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (CEPA)-এর আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। দুই দেশের লক্ষ্য, এই বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দেওয়া। মোদি-র সম্ভাব্য কানাডা সফর এবং আগামী ৫ অক্টোবর পরবর্তী দফার বাণিজ্য আলোচনা—দুই দেশই কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ২০২৩ সালে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর ভারত-কানাডা সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যেই এই উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জে জয়শঙ্কর-আনন্দ বৈঠক
শনিবার নিউইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কানাডার বিদেশমন্ত্রী অনিতা আনন্দের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বৈঠকের পর জয়শঙ্কর সমাজমাধ্যমে জানান, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। তিনি লেখেন, কানাডার বিদেশমন্ত্রী অনিতা আনন্দের সঙ্গে দেখা করা সবসময়ই আনন্দের। দুই দেশের সম্পর্ককে “আরও উচ্চতায়” নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেই তাঁদের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে কানাডার বিদেশমন্ত্রীও ভারতের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি কানাডা বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও বৈচিত্র্যময় করার দিকে নজর দিচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যও রয়েছে কানাডার। এই লক্ষ্যে ইন্দো-প্যাসিফিক, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলির সঙ্গে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চাইছে অটোয়া। সেই তালিকায় ভারত ও চিনের মতো বড় অর্থনীতির দেশও রয়েছে বলে জানান আনন্দ।
ডিসেম্বরেই কানাডা যেতে পারেন মোদি
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এর আগে জানিয়েছিলেন, ডিসেম্বর নাগাদ প্রধানমন্ত্রী মোদির কানাডা সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে কার্নি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা “ভাল গতিতে” এগোচ্ছে। কার্নির কথায়, ভারত-কানাডা সম্পর্ক মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য ও অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর জি-২০-তে ভারত ও কানাডা চলতি বছর জি২০ সম্মেলনের মধ্যে সেপা-র আলোচনা শেষ করার দিকে এগোনোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন কার্নি। মোদি ডিসেম্বর মাসে কানাডা গেলে, সেটি হবে ২০১৫ সালের পর তাঁর প্রথম দ্বিপাক্ষিক কানাডা সফর।
৫ অক্টোবর থেকে ফের বাণিজ্য আলোচনা
সেপা নিয়ে ভারত ও কানাডার মধ্যে আলোচনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল এবং কানাডার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমন্ত্রী মনিন্দর সিধু একাধিক বৈঠক করেছেন। আগামী ৫ অক্টোবর থেকে পরবর্তী দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। দুই দেশের লক্ষ্য, সেপা (CEPA)-র মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া। তবে এখনও চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ঠিক কোন কোন ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো, পরিষেবা, বিনিয়োগ কিংবা নিয়ন্ত্রক সহযোগিতার ব্যবস্থা থাকবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতাতেও জোর
বাণিজ্যের পাশাপাশি বিনিয়োগও ভারত-কানাডা সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কানাডার পেনশন ফান্ডগুলি ইতিমধ্যেই ভারতের পরিকাঠামো, পরিবহণ ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক আবাসন ক্ষেত্রে বড় আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে। সেপা চূড়ান্ত হলে এই বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ-শৃঙ্খলের উপর নির্ভরতা কমানো এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দুই দেশ একটি নতুন দ্বিপাক্ষিক কৌশলও গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক শক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, পরিচ্ছন্ন শক্তি এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র।
২০২৩-এর কূটনৈতিক সংঘাতের পর ফের সম্পর্ক স্বাভাবিকের পথে
২০২৩ সালে ভারত-কানাডা সম্পর্কের বড় অবনতি হয়। তৎকালীন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো কানাডায় বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিক হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতীয় সরকারি এজেন্টদের সম্ভাব্য যোগসূত্রের অভিযোগের তদন্তের কথা বলেছিলেন। ভারত সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। এরপর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে এবং একে অপরের কূটনীতিকদের বহিষ্কার ও কূটনৈতিক উপস্থিতি কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের মার্চে মার্ক কার্নি কানাডার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। জুন ২০২৫-এ কার্নি ও মোদি দুই দেশের সম্পর্কের স্থিতিশীলতা ফেরাতে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন। এরপর দুই দেশের হাইকমিশনাররা ফের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়।
নজর ৫ অক্টোবরের বৈঠকে
ভারত-কানাডা সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন বড় পরীক্ষা ৫ অক্টোবরের সেপা আলোচনা। বাণিজ্য চুক্তির বাকি মতপার্থক্যগুলি কতটা দ্রুত মেটানো যায়, তার উপরই নির্ভর করবে চুক্তির চূড়ান্ত রূপ। ডিসেম্বরে মোদির সম্ভাব্য কানাডা সফর সেই আলোচনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা দিতে পারে। তবে সফরের আগে সেপা-র বাকি বিষয়গুলিতে ঐকমত্য তৈরি হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
