মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আমেরিকার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য আলোচনা (US Trade Deal) ডকুমেন্টেশনের পর্যায়ে এগোচ্ছে। তবে কৃষি ও দুগ্ধ খাতে নিজেদের দীর্ঘদিনের অনড় অবস্থানই বজায় রাখবে ভারত, এমনটাই (Agriculture Dairy) ইঙ্গিত মিলল সরকারের শীর্ষ কর্তাদের তরফে। তাঁদের স্পষ্ট বার্তা, সংবেদনশীল কৃষি খাতগুলিকে বড় ধরনের বাজার উন্মুক্তকরণ সংক্রান্ত কোনও প্রতিশ্রুতির আওতায় আনা হবে না।
কৃষিপণ্য ও দুগ্ধ খাত (US Trade Deal)
সংবেদনশীল কৃষিপণ্য ও দুগ্ধ খাতকে চুক্তির আওতার বাইরে রাখার বিষয়ে নয়াদিল্লির অবস্থান অপরিবর্তিতই রয়েছে। এক শীর্ষ আধিকারিক বলেন, “যে অবস্থান ছিল, সেটাই রয়েছে।” তিনি বলেন, “কৃষি ও দুগ্ধ খাতে সংবেদনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে আমাদের প্রচলিত অবস্থানই বজায় থাকবে। আমাদের কৃষকদের স্বার্থ কোনওভাবেই ক্ষুণ্ণ করা হবে না।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে ওই খাতগুলির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংবেদনশীলতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
বাণিজ্য চুক্তি
প্রসঙ্গত, এই বক্তব্যটি এমন একটা সময়ে এসেছে, যখন এর একদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ঘোষণা করেন, ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে। এই চুক্তির লক্ষ্য হল, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে কার্যকর হতে চলা পারস্পরিক শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তির ফলে ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক কমে ১৮ শতাংশে নামবে এবং ভারতের বাজারে প্রবেশকারী মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে। তবে নয়াদিল্লির কর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, উভয় পক্ষের আলোচকরা এখনও চুক্তির সূক্ষ্ম শর্তাবলি ও আনুষ্ঠানিক নথি চূড়ান্ত করার কাজেই ব্যস্ত রয়েছেন (Agriculture Dairy)।
দেশীয় উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন
ভারতের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা কৃষি ও দুগ্ধ খাতের সঙ্গে যুক্ত। লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এই খাতগুলির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে দুগ্ধ খাত মূলত ছোট, পারিবারিক স্তরের উৎপাদকদের দখলে—বড় কর্পোরেট খামার নয়। নীতিনির্ধারক ও মুক্ত বাণিজ্যের সমালোচকরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে— যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলির ভর্তুকিপ্রাপ্ত, বৃহৎ আকারের কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার জন্য ভারতীয় বাজার খুলে দিলে দেশীয় উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানে ধস নামতে পারে (US Trade Deal)। কৃষি খাতে অধিকতর প্রবেশাধিকার দিতে ভারতের অনীহা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় বারবার সংঘাতের কারণ হয়েছে। দুগ্ধ ও সয়াবিনের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল খাত খুলে দিতে নয়াদিল্লি ধারাবাহিকভাবে আপত্তি জানিয়েছে, যদিও অন্যান্য আলোচনায় নির্বাচিত কিছু ক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশাধিকার দিয়েছে। সূত্রের খবর, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কাঠামোর আওতায় কৃষি ও দুগ্ধ খাত সুরক্ষিতই থাকবে (Agriculture Dairy)।
চুক্তির অংশ
এই চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সম্ভাব্যভাবে ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করবে—এমন দাবিও করেছেন ট্রাম্প। তবে ভারতীয় সরকারি সূত্র এই দাবি খারিজ করে ‘মানুষ-প্রথম’ এবং বাজারনির্ভর জ্বালানি নিরাপত্তা নীতির কথা আবারও একবার জানিয়ে দিয়েছে মার্কিন কর্তাদের। সরকারি এক শীর্ষ কর্তা বলেন, “যে বাজারে সবচেয়ে ভালো চুক্তি পাওয়া যাবে এবং যেসব সংস্থা নিষেধাজ্ঞার আওতায় নেই, সেখান থেকেই আমরা তেল কিনব। আমাদের কৌশল নির্ধারিত হবে বাজারদরের ভিত্তিতে।” বিশ্বের তৃতীয় (US Trade Deal) বৃহত্তম তেল আমদানিকারী দেশ ভারত বর্তমানে রুশ অপরিশোধিত তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত দৈনিক প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করে, যা মোট আমদানির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। অন্তত এমনটাই জানিয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষক সংস্থা ক্লেপলারের তথ্য।
ভারতের অবস্থান
এই অবস্থান ভারতের পরিশোধন শিল্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপেও প্রতিফলিত হয়েছে। ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নিষেধাজ্ঞামুক্ত সরবরাহকারীদের মাধ্যমে ছাড়ে রুশ অপরিশোধিত তেল কেনা আবার শুরু করেছে এবং সেই তেল গুজরাটের জামনগর শোধনাগারে পাঠানো হচ্ছে। দেশের বৃহত্তম রিফাইনারি সংস্থাটি আফ্রাম্যাক্স ট্যাঙ্কার ভাড়া করেছে এবং রুশ এক্সপোর্টের মতো সংস্থা থেকে তেল সংগ্রহ করে দৈনিক ৬ লক্ষ ৬০ হাজার ব্যারেল ক্ষমতাসম্পন্ন ইউনিটে সরবরাহ করছে, যা মূলত অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটায় (Agriculture Dairy)। আধিকারিকরা বলেন, “নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলি থেকে ভারত তেল কিনবে না, তবে ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় সেখান থেকে আমদানি পুনরায় শুরু হবে।” এক আধিকারিক বলেন, “নিষেধাজ্ঞা থাকাকালীন আমরা ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনিনি। এখন নিষেধাজ্ঞা উঠে গিয়েছে, তাই আমরা কিনব (US Trade Deal)।”
ট্রাম্পের দাবি
ট্রাম্পের আরও দাবি, ভারত ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—যার মধ্যে জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি, কয়লা ও অন্যান্য খাত অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি শুল্ক ও অশুল্ক বাধা তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ভারতীয় আধিকারিকদের বক্তব্য, এই বিপুল অঙ্কটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি বিমান কেনা এবং সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকে নির্দেশ করে, তাৎক্ষণিক আমদানির বাধ্যবাধকতাকে নয় (Agriculture Dairy)। এর আগে এক আধিকারিক সংবাদ মাধ্যমে বলেছিলেন, “মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি ওষুধ, টেলিকম, প্রতিরক্ষা, পেট্রোলিয়াম ও বিমান খাতের মতো ক্ষেত্রগুলির অন্তর্ভুক্ত। এটি বহু বছরের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে।” সরকারের দাবি, প্রস্তাবিত এই চুক্তি ভারতের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রফতানি বছরে প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়ে ৮৫.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানি হয়েছে ৪৬.০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (US Trade Deal)।
তবে আপাতত নয়াদিল্লি স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সংবেদনশীল কৃষি খাতগুলিকে আলোচনার টেবিলের বাইরে রাখা হবে। বার্তা পরিষ্কার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়তে ভারত আগ্রহী হলেও, দেশের কৃষকদের জীবিকার (Agriculture Dairy) সঙ্গে কোনওভাবেই আপস করা হবে না।

