Tag: Defence Industry

  • India Poland: প্রতিরক্ষা, পরমাণু শক্তি, মহাকাশে সহযোগিতা বাড়াতে আলোচনায় ভারত-পোল্যান্ড, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য

    India Poland: প্রতিরক্ষা, পরমাণু শক্তি, মহাকাশে সহযোগিতা বাড়াতে আলোচনায় ভারত-পোল্যান্ড, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও পরমাণু শক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করতে সম্মত হল ভারত ও পোল্যান্ড। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পোল্যান্ডের (India Poland) প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বর্তমান স্তর থেকে দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে জোর দেওয়া হয়। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার।

    ২০২৪ সালে মোদির পোল্যান্ড সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন গতি পায়। গত ৪৫ বছরে কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সেটিই ছিল প্রথম পোল্যান্ড সফর। বর্তমানে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা হয়ে উঠেছে দুই দেশের সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পোল্যান্ড ইউরোপের বৃহত্তম সামরিক আধুনিকীকরণ কর্মসূচি চালাচ্ছে। দেশটি তার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করছে।

    ‘চমৎকার’ আলোচনা (India Poland)

    টাস্কের সঙ্গে আলোচনাকে ‘চমৎকার’ বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি জানান, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, পরমাণু শক্তি, মহাকাশ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় উঠে আসে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতির জন্য ভারতের সাম্প্রতিক প্রস্তাবকে পোল্যান্ড স্বাগত জানিয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারতীয় আধিকারিকরা।

    টাস্কের সঙ্গে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে মোদি বলেন, “আজ আমরা প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও পরমাণু শক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করতে সম্মত হয়েছি। এই সমস্ত কৌশলগত ক্ষেত্রে যৌথ উন্নয়ন ও যৌথ উৎপাদনের জন্য আমরা পোল্যান্ডের সংস্থাগুলিকে ভারতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।”

    খনিজ ও কৌশলগত সম্পদের ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার গুরুত্ব তুলে ধরে টাস্ক বলেন, “রাজনৈতিক হুমকি সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট সচেতন। খনিজ ও কৌশলগত সম্পদের ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব স্বাধীন হয়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তাও আমরা বুঝি, যাতে পোল্যান্ড ও ভারত এই ক্ষেত্রগুলিতে আত্মনির্ভর হতে পারে।”

    কী বললেন মোদি

    মোদি বলেন, আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনের সময়ে ভারত এবং পোল্যান্ড, দুই দেশই অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তাঁর কথায়, “গত বছর পোল্যান্ডের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ঐতিহাসিকভাবে এক লাখ কোটি মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। আর, গত ত্রৈমাসিকে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৮ শতাংশ।”

    প্রস্তাবিত ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্য চুক্তি পোল্যান্ডে যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, প্লাস্টিক এবং প্রকৌশলজাত পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ভারতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে রেল, পরিবহণ ব্যবস্থা, উন্নত উৎপাদন শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং জৈবপ্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে পোল্যান্ডের কাছ থেকে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করবে ভারত।

    টাস্কের সঙ্গে প্রায় ১০০টি পোলিশ সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল ভারতে এসেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য পূরণে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে এই প্রতিনিধিদল গুরুত্ব দেবে বলেও জানান মোদি।

    নয়া অংশীদারিত্ব

    গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং পোল্যান্ডের প্রযুক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কয়লা থেকে গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রেও দুই দেশ নয়া অংশীদারিত্ব গড়ে তুলবে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং আর্থিক প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশের মধ্যে একটি ‘প্রারম্ভিক উদ্যোগ সেতু’ গড়ে তোলা হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

    পোল্যান্ডের ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল নয়াদিল্লি ও বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত দু’টি ব্যবসায়িক সম্মেলনে অংশ নেবে। প্রতিরক্ষা, কৃষি প্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ওষুধশিল্প, খনি, প্রযুক্তি এবং পরিকাঠামো ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখাই এই সম্মেলনগুলির লক্ষ্য। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার। পোল্যান্ডে ভারতীয় বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। সেখানে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলিরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে (India Poland)।

    টাস্ক বলেন, দুই দেশের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত বা এমন কোনও ঐতিহাসিক সমস্যা নেই, যা তাদের বিভক্ত করতে পারে। সেই কারণেই উভয় দেশ সহজেই পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পেরেছে। বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মোদির ভূমিকার প্রশংসা করে তাঁকে ‘আশার আলোকবর্তিকা’ বলেও উল্লেখ করেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী।

    টাস্কের বক্তব্য

    প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রসঙ্গে টাস্ক বলেন, “সম্প্রতি আমাদের ড্রোনগুলি অত্যন্ত কার্যকর ছিল। আমি নিশ্চিত, উপগ্রহ ও ড্রোনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংকটের সময় আমাদের দেশগুলিকে সাহায্য করেছে।”

    গত বছর কাশ্মীরে পহেলগাঁও হামলার জবাবে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে জঙ্গি পরিকাঠামো লক্ষ্য করে ভারত পরিচালিত ‘অপারেশন সিঁদুরে’র সময় ভারতীয় সেনার ব্যবহৃত পোলিশ ড্রোনের দিকেই টাস্ক ইঙ্গিত করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। পোল্যান্ডের ডব্লিউবি গোষ্ঠী ২০২২ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ১০০টি ‘ওয়ারমেট’ আত্মঘাতী ড্রোন সরবরাহ করেছিল। চলতি বছরের গোড়ায় পোল্যান্ডের আধিকারিকরা জানান, ভারতীয় সেনাবাহিনী আরও তিনটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

    ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে ইউক্রেনকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের কারণে পোল্যান্ডের নিজস্ব মজুত কমেছে। সেই মজুত পূরণ করতে ভারতীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদকদের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার বিষয়েও আগ্রহী ওয়ারশ। তবে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক নিয়ে পোল্যান্ডের কয়েকটি সংস্থার উদ্বেগ রয়েছে। প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়াতে নিরাপদে তথ্য আদানপ্রদানের বিষয়ে একটি চুক্তিও চূড়ান্ত করছে নয়াদিল্লি এবং ওয়ারশ।

    ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের পশ্চিম বিভাগের সচিব সিবি জর্জ সাংবাদিকদের জানান, দুই দেশ গোপনীয় তথ্যের পারস্পরিক সুরক্ষা ও আদানপ্রদান নিয়ে একটি চুক্তি তৈরির কাজ করছে। প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আস্থার ভিত্তিতে এই চুক্তি গড়ে উঠবে বলেই আশা।

    যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম তৈরি ও উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে পারস্পরিক আস্থা এবং তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখার ব্যবস্থা জরুরি বলেও জানান তিনি। দুই দেশ প্রতিরক্ষা শিল্প নিয়ে একটি সংলাপ এবং সন্ত্রাসবাদ দমন সংক্রান্ত একটি পৃথক আলোচনা চালু করতেও সম্মত হয়েছে। চলতি বছরের গোড়ায় ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব পোল্যান্ডের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, সন্ত্রাসবাদ দমন, প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ এবং জাহাজ নির্মাণ ক্ষেত্রে কৌশলগত সহযোগিতার অতিরিক্ত কাঠামো তৈরি (India Poland) করেছে বলেও জানান জর্জ।

    শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারতের করণীয়

    আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে মোদি বলেন, “ইউক্রেন হোক বা পশ্চিম এশিয়া, শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিটি অর্থবহ উদ্যোগকে ভারত সমর্থন করে যাবে।” রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে ভারতের অবস্থানকে পোল্যান্ড ‘অত্যন্ত প্রশংসা’ করেছে বলে জানান জর্জ। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাম্প্রতিক কথোপকথনে মোদি ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে ‘যুদ্ধের অবসানের’ দিকে এগোনোর যে আহ্বান জানিয়েছেন, সেটিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা, খাদ্যশস্য ও জ্বালানি রফতানি এবং পরস্পরের উপর আক্রমণ না করার সম্ভাবনা নিয়েও ভারত রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে বিভিন্ন প্রস্তাব ভাগ করে নিয়েছে বলেও জানান তিনি।

    জনগণের সম্পর্কের গুরুত্ব

    দুই দেশের নেতাই জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জামনগর ও কোলহাপুরের রাজপরিবার হাজার হাজার পোলিশ শিশু ও পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিল। ২০২২ সালে ইউক্রেন থেকে হাজার হাজার ভারতীয় পড়ুয়াকে সরিয়ে আনতেও পোল্যান্ড কর্তৃপক্ষ সহায়তা করেছিলেন। বর্তমানে পোল্যান্ডে প্রায় ৩০ হাজার ভারতীয় বসবাস করেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩,৫০০ জনই পড়ুয়া।

    প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং বাণিজ্য—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর এই উদ্যোগ ভারত-পোল্যান্ড সম্পর্ককে আরও কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ভিত্তি দিতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য পূরণে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ এখন বিশেষ গুরুত্ব পেতে চলেছে (India Poland) বলেই অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

     

  • India Defence Production: ৫ বছরে দ্বিগুণ! প্রতিরক্ষা উৎপাদনে রেকর্ড ভারতের, বদলে যাচ্ছে শক্তির সমীকরণ

    India Defence Production: ৫ বছরে দ্বিগুণ! প্রতিরক্ষা উৎপাদনে রেকর্ড ভারতের, বদলে যাচ্ছে শক্তির সমীকরণ

    সুশান্ত দাস

    প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে ভারত। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দেশের মোট প্রতিরক্ষা উৎপাদনের মূল্য পৌঁছেছে রেকর্ড ১.৭৮ লক্ষ কোটি টাকায়, যা ২০২০-২১ অর্থবর্ষের ৮৪,৬৪৩ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ১১০ শতাংশ বেশি। সহজ ভাষায়, ৫ বছরে প্রতিরক্ষা উৎপাদন বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তির অন্যতম দ্রুততম সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই সাফল্যকে।

    বৃদ্ধির নেপথ্যে ৫ কারণ

    তবে শুধু সংখ্যার বিচারে এই অগ্রগতি বিচার করলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে কীভাবে ভারত প্রতিরক্ষা উৎপাদনে এত বড় লাফ দিতে সক্ষম হল? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ— সরকারি নীতিগত সংস্কার, বেসরকারি শিল্পের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ, প্রতিরক্ষা রফতানির বিস্তার, দেশীয় অস্ত্র ও সামরিক প্ল্যাটফর্মের উন্নয়ন এবং বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা সামরিক ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে নতুন সুযোগের সৃষ্টি।

    আমদানি-নির্ভরতা থেকে আত্মনির্ভরতার পথে

    দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানিকারক দেশ ছিল ভারত। যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন, আর্টিলারি ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নত সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিদেশি সরবরাহকারীদের উপর নির্ভরশীলতা ছিল অত্যন্ত বেশি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নির্ভরতা একটি কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করে। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আবহে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে গত এক দশকে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের নকশা, গবেষণা, উন্নয়ন ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে যেখানে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনের মূল্য ছিল ৪৩,৭৪৬ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৫-২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৭৮ লক্ষ কোটি টাকায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সম্প্রতি দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে বলেন, স্থল, জল ও আকাশ—তিন ক্ষেত্রেই ভারত উল্লেখযোগ্য দেশীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলেছে এবং জাতীয় নিরাপত্তায় আত্মনির্ভরতার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এই উৎপাদন-সাফল্যকে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা-শিল্পভিত্তির প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এই অর্জনের পেছনে রয়েছে সরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থা, বেসরকারি শিল্প এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের আওতায় গৃহীত বিভিন্ন নীতিগত সংস্কারের সম্মিলিত অবদান।

    নীতিগত সংস্কারেই তৈরি হয়েছে ভিত

    প্রতিরক্ষা উৎপাদনে এই লাফের অন্যতম প্রধান কারণ হল ধারাবাহিক নীতিগত সংস্কার। কেন্দ্রীয় সরকার ‘পজিটিভ ইন্ডিজেনাইজেশন লিস্ট’ চালু করে, যার ফলে শতাধিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের আমদানি সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয় এবং সেগুলির ক্রয় দেশীয় প্রস্তুতকারকদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। এর পাশাপাশি, প্রতিরক্ষা ক্রয় প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে, যাতে দেশীয় সংস্থাগুলি দ্রুত চুক্তি পেতে পারে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI)-এর সীমাও শিথিল করা হয়েছে। স্টার্ট-আপ এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি উন্নয়নের লক্ষ্যে চালু হয়েছে ‘ইনোভেশনস্ ফর ডিফেন্স এক্সিলেন্স’ (iDEX) প্রকল্প। ফলে নতুন প্রযুক্তি, গবেষণা এবং স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

    বৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি বেসরকারি শিল্প

    ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলির মধ্যে অন্যতম হল বেসরকারি শিল্পের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা। যদিও এখনও মোট উৎপাদনের প্রায় ৭৬ শতাংশ আসে ডিফেন্স পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিংস (DPSU) এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার কাছ থেকে, তবু বেসরকারি সংস্থাগুলির অংশীদারিত্ব দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে বেসরকারি শিল্পের অবদান রেকর্ড ৪২,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট উৎপাদনের ২৪ শতাংশ। এক বছর আগে এই অংশীদারিত্ব ছিল ২২ শতাংশ। বড় শিল্পগোষ্ঠী, বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা সংস্থা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) এবং প্রযুক্তি-ভিত্তিক স্টার্ট-আপ মিলিয়ে এখন একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা উৎপাদন পরিবেশ গড়ে উঠছে। শিল্পমহলের মতে, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয়করণের মতো উদ্যোগগুলিই এই সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং বেসরকারি খাতের বাড়তি অংশগ্রহণ ভারতের কৌশলগত সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

    দেশীয় যুদ্ধাস্ত্র প্রকল্পের পরিপক্বতা

    প্রতিরক্ষা উৎপাদন বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হল বহু বছর ধরে চলা দেশীয় অস্ত্র ও সামরিক প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন প্রকল্পগুলির বাস্তবায়নের পালে হাওয়া লাগা। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (HAL)-এর তৈরি তেজস হালকা যুদ্ধবিমান প্রকল্প। দীর্ঘদিন ধরে বিলম্ব ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার পর বর্তমানে তেজস এমকে-১এ উৎপাদন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পাশাপাশি আরও উন্নত এমকে-২ সংস্করণের কাজও এগোচ্ছে। একইভাবে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। আগামী প্রজন্মের আকাশ-এনজি (Akash-NG) প্রকল্প এর পাল্লা, গতিশীলতা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকারিতা আরও বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান, গোলাবারুদ, রেডার এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থার মতো একাধিক ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

    প্রতিরক্ষা রফতানিতে রেকর্ড বৃদ্ধি

    প্রতিরক্ষা উৎপাদনের পাশাপাশি রফতানিতেও নজির গড়েছে ভারত। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দেশের প্রতিরক্ষা রফতানি পৌঁছেছে রেকর্ড ৩৮,৪২৪ কোটি টাকায়। এর ফলে দেশীয় প্রস্তুতকারকদের জন্য শুধু ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী নয়, আন্তর্জাতিক বাজারও উন্মুক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রফতানি বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে কোনও পণ্যের গুণমান, নির্ভরযোগ্যতা এবং খরচ—তিন ক্ষেত্রেই সক্ষমতা প্রমাণ করতে হয়। বিদেশি ক্রেতারা ভারতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জামকে এখন ক্রমশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচার করছে। এর ফলে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ছে, উৎপাদন খরচ কমছে এবং গবেষণা ও উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

    বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ

    ভারতের এই অগ্রগতি এমন সময়ে এসেছে, যখন গোটা বিশ্বে সামরিক ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় ২.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২.৮৮৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি টানা একাদশ বছরের বৃদ্ধির রেকর্ড। ভারতও বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ সামরিক ব্যয়কারী দেশের মধ্যে রয়েছে। চিন ও পাকিস্তান-সংক্রান্ত নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় ৮.৯ শতাংশ বেড়ে ৯২.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ইউরোপ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশে সামরিক আধুনিকীকরণের প্রবণতা ভারতের মতো উদীয়মান প্রতিরক্ষা উৎপাদন কেন্দ্রগুলির জন্য নতুন বাজার ও সুযোগ তৈরি করছে।

    সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

    যদিও বর্তমান সাফল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, তবু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন যে ভারতের সামনে এখনও বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উন্নত এরো ইঞ্জিন, বিশেষ ধরনের প্রোপালশন প্রযুক্তি, অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর, পরবর্তী প্রজন্মের সেন্সর, মাইক্রো-ইলেকট্রনিক্স এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারত এখনও বিদেশি সরবরাহকারীদের উপর নির্ভরশীল। পরবর্তী ধাপে আরও বড় সাফল্য অর্জনের জন্য গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো, দেশীয় সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করা এবং উচ্চমূল্যের উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করা অপরিহার্য।

    আত্মনির্ভরতা থেকে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা শক্তির পথে

    ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের এই রেকর্ড উৎপাদন শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিফলন। যে যাত্রা শুরু হয়েছিল আমদানি-নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে, তা এখন ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর শিল্পনীতিতে রূপ নিচ্ছে—যার লক্ষ্য ভারতকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করা। বিশ্ব যখন ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগ, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সামরিক আধুনিকীকরণের পথে এগোচ্ছে, তখন ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের এই উত্থান আগামী দশকে দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

LinkedIn
Share