তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
আর মাত্র কয়েক দিন! তারপরেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। কিন্তু উৎসবের এই মরশুমেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গি। গত কয়েক সপ্তাহে রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। তাই ডেঙ্গির দাপট কমাতে একাধিক দিকে বাড়তি নজর দিচ্ছে রাজ্য প্রশাসন। দুর্গাপুজোর সময় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যাতে কম হয়, সে জন্য নেওয়া হচ্ছে বিশেষ পরিকল্পনা।
আগামী এক মাস ‘হাই রিস্ক পিরিয়ড’
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যজুড়ে ডেঙ্গির পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। আগামী এক মাসকে ডেঙ্গির জন্য ‘হাই রিস্ক পিরিয়ড’ হিসেবে দেখছে স্বাস্থ্য প্রশাসন। স্বাস্থ্য দফতরের এক কর্তা জানান, সেপ্টেম্বরের শেষ দুই সপ্তাহে রাজ্যে নতুন করে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন।
উত্তরবঙ্গের তুলনায় দক্ষিণবঙ্গে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যার নিরিখে শীর্ষে রয়েছে মুর্শিদাবাদ। গত ১৫ দিনে সেখানেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গি আক্রান্তের খবর মিলেছে। এরপরেই রয়েছে নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া এবং কলকাতা। এই জেলাগুলিতেও ডেঙ্গি সংক্রমণ যথেষ্ট উদ্বেগজনক বলে স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর।
প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছেন দেড়শোর বেশি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সেপ্টেম্বরের শুরুতেই রাজ্যে ডেঙ্গি পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। বর্ষার জেরে এই সময় মশাবাহিত রোগের প্রকোপ সাধারণত বাড়ে। সেই আশঙ্কাই এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। রাজ্যের একাধিক জেলায় ডেঙ্গি পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে।
স্বাস্থ্য দফতরের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে প্রতিদিন গড়ে দেড়শোর বেশি মানুষ নতুন করে ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাজ্যে মোট ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে কয়েকশো ডেঙ্গি রোগী চিকিৎসাধীন। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের তৎপরতা আরও বাড়ানো হয়েছে।
ডেঙ্গি মোকাবিলায় মুখ্যসচিবের বৈঠক
ডেঙ্গি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্প্রতি বৈঠক করেছেন রাজ্যের মুখ্যসচিব। বৈঠকে বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কলকাতা পুরসভার শীর্ষকর্তাদের পাশাপাশি স্বাস্থ্য দফতরের গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিক এবং বিভিন্ন জেলার প্রশাসনিক শীর্ষকর্তারাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। ডেঙ্গি প্রবণ এলাকাগুলি চিহ্নিত করে সেখানে মশা নিধনে বাড়তি প্রশাসনিক সক্রিয়তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী এক মাসকে ‘হাই রিস্ক পিরিয়ড’ ধরে প্রশাসনের সব স্তরকে সক্রিয় থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
পুজোর আগে জমা জলে বাড়তি নজর
নিম্নচাপ এবং লাগাতার বৃষ্টির জেরে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় জমা জলের সমস্যা তৈরি হয়েছে। একাধিক জেলায় জমা জলের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। প্রশাসনের একাংশের মতে, জমা জল মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
তাই পুজোর মরশুমে ডেঙ্গির দাপট নিয়ন্ত্রণে জমা জলের দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের শীর্ষ মহল থেকে স্থানীয় প্রশাসনকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, কোথায় কোথায় জল জমছে, তার সঠিক তথ্য রাখতে হবে। সেই অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
পঞ্চায়েত ও পুরসভাকে বাড়তি সক্রিয়তার নির্দেশ
নবান্নে সম্প্রতি প্রশাসনের শীর্ষ মহলের বৈঠকে মুখ্যসচিব পঞ্চায়েত এবং পুরসভার কর্মীদের আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পুরসভা ও পঞ্চায়েত এলাকার কোথায় জল জমেছে, সে সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত মশার লার্ভা নষ্ট করার কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
নর্দমা পরিষ্কারের পাশাপাশি নিয়মিত মশানিধন স্প্রে, রাসায়নিক তরল ও পাউডার রাস্তা এবং নর্দমার পাশে প্রয়োগ করার উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। এলাকাভিত্তিক এই কাজগুলি ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তার উপরেও নজরদারি করতে বলা হয়েছে। এজন্য প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জমা জলের ‘আতুরঘর’ ভাঙাই বড় চ্যালেঞ্জ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, জমা জলের সমস্যা কমাতে পারলে রাজ্যে ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা তুলনামূলক সহজ হবে। কারণ, জমা জলেই মশার সহজে বংশবিস্তার হয়। তাই মশার ‘আতুরঘর’ চিহ্নিত করে তা নষ্ট করাই এখন অন্যতম বড় লক্ষ্য। তবে বর্ষার মরশুম শেষ হয়ে গেলেই ডেঙ্গির প্রকোপ কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসেও ডেঙ্গির প্রকোপ মারাত্মক আকার নিয়েছে। তাই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রুখতে আগাম সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্কুলগুলিতেও বাড়তি নজর
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, স্বাস্থ্য দফতরের পাশাপাশি পুর ও পঞ্চায়েত দফতরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে কাজ চলছে। শিক্ষা দফতরের সঙ্গেও সমন্বয় করে ডেঙ্গি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
কারণ, ডেঙ্গির প্রকোপে শিশুদের ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা থাকে। স্কুল থেকেও শিশুদের মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই পুজোর আগে স্কুলগুলিতে মশার দাপট কমানোর দিকেও বাড়তি নজর দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের লক্ষ্য, উৎসবের মরশুমে ডেঙ্গির প্রকোপ যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখা।


