মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ‘‘দেশের নবীন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলে, তাদের কোনওভাবেই রেয়াত করা হবে না।’’ ফের ভিডিও বার্তায় প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সংসদে পাবলিক এক্সামিনেশন (প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিন্স) সংশোধনী বিল, ২০২৬ পাস হওয়ার পর বৃহস্পতিবার ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী মোদি (PM Modi on Paper Leak) বলেন,‘‘পেপার লিক মাফিয়া ও দেশের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা খেলা করেছে তাদের ছাড়া হবে না।’’ প্রধানমন্ত্রী জানান, বহু দশক ধরে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার প্রশ্নফাঁসের মতো সমস্যার মোকাবিলা করে এসেছে। এই ধরনের অপরাধ লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করেছে। তাই পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ধারাবাহিকভাবে সংস্কার চালিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্র।
শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন সময়ের দাবি
লোকসভায় বুধবারই প্রশ্নফাঁস-বিরোধী সংশোধনী বিল (পাবলিক এগজামিনেশন-প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিনস্— অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬) পাস হয়ে গিয়েছিল। বৃহস্পতিবার তা রাজ্যসভাতেও পাস হয়েছে। তার পরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন করে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। সমাজমাধ্যমে ওই ভিডিওতে তিনি জানিয়েছেন, দেশের পরীক্ষা পদ্ধতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ ভাবেই ধীরে ধীরে বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে তাঁর সরকার। মোদি বলেন, ‘‘পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং রাজ্যগুলির পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা একের পর এক উদ্যোগ নিচ্ছি। শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে পরীক্ষায় দুর্নীতি রোধ করতে হবে।’’
দু’মিনিটের ভিডিও বার্তা প্রধানমন্ত্রীর
২০২৪ সালের প্রশ্নফাঁস-বিরোধী বিলে কিছু সংশোধন করে এই সংক্রান্ত অপরাধে শাস্তি প্রায় দ্বিগুণ করতে চাইছে সরকার। খসড়া বিলে মন্ত্রিসভা আগেই অনুমোদন দিয়েছিল। তা গত সোমবার লোকসভায় পেশ করা হয়। দু’দিন আলোচনার পর বুধবার ধ্বনি ভোটে লোকসভায় ওই বিল পাস হয়েছিল। রাজ্যসভাতেও ধ্বনি ভোটে তা পাস হয়েছে বৃহস্পতিবার। বিল সংসদের উচ্চ কক্ষে পাস হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী দু’মিনিটের ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘‘দেশের পরীক্ষা পদ্ধতিকে নির্ভরযোগ্য করে তোলার জন্য টাস্ক ফোর্স গঠন থেকে শুরু করে ফাস্ট ট্র্যাক আদালত— অনেক কিছু করা হয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে প্রত্যেক রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই ধরনের প্রশ্নফাঁসের সমস্যা হচ্ছে। এতে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ বার বার বিপন্ন হচ্ছে। দেশব্যাপী, রাজ্য এবং কেন্দ্রের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন অনিবার্য।’’
কঠোর আইনই একমাত্র পথ
ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাঁর কথায়, ‘‘পেপার মাফিয়া ও প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত চক্র, যারা দেশের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে, তাদের কোনওভাবেই ছাড়া হবে না। এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন অত্যন্ত প্রয়োজন।’’ সংসদের উভয় কক্ষে পাস হওয়ার পর এবার কেবল রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের অপেক্ষা। তা পেলেই বিলটি আইনে পরিণত হয়ে যাবে।
‘পরীক্ষা সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’
সংসদের দুই কক্ষেই বিলটি নিয়ে দু’দিন ধরে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মোদি। তিনি বলেন, ‘‘প্রশ্নফাঁস যারা ঘটাচ্ছে, এই ধরনের কোনও গোষ্ঠীকে বরদাস্ত করা হবে না। তার জন্য কঠোর আইন জরুরি। আমরা সেই মতো সংসদে বিল পেশ করেছিলাম। সংসদের দুই কক্ষেই অনেক সদস্য এই সংক্রান্ত আলোচনায় যোগ দিয়েছেন। আজ উভয় কক্ষে বিলটি পাস হয়েছে। পরীক্ষা পদ্ধতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ মিটল। এই ধরনের কাজ চলতে থাকবে। আসুন আমরা সকলে মিলে বিকশিত ভারতের স্বপ্ন পূরণ করতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলি।’’
কী আছে সংশোধনী বিলটিতে?
এই বিলে প্রশ্নফাঁস এবং পরীক্ষা সংক্রান্ত যে কোনও অনিয়মে কঠোর শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছে। রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির হাতে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের কার্যক্রমেও জোর দেওয়া হয়েছে। এই বিল আইনে পরিণত হলে প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত বা পরীক্ষায় যে কোনও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির ন্যূনতম পাঁচ বছর এবং সর্বোচ্চ ১০ বছরের জেল হতে পারে। ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানারও বিধান রয়েছে। তা ছাড়া, সংগঠিত অপরাধের ক্ষেত্রে এই বিলে ন্যূনতম সাত বছরের জেল এবং ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত কোনও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম হলে তার মোকাবিলার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন ২০২৪ সালের আগে ছিল না। প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত বিতর্কের মুখে ওই বছর আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। তার প্রাথমিক লক্ষ্যই হল ইউপিএসসি, এসএসসি, রেল, ব্যাঙ্কিং সেক্টরে নিয়োগের পরীক্ষা, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) দ্বারা পরিচালিত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলিতে অনিয়ম এবং প্রশ্নফাঁস ঠেকানো। এ বার সেই পুরনো আইন সংশোধন করে শাস্তির পরিধি আরও বিস্তৃত করছে সরকার। কেন্দ্র সরকারের দাবি, এই সংশোধনী আইনের মাধ্যমে দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ ও স্বচ্ছ করা হবে এবং ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।
