Tag: Freedom of expression

  • Durga Puja: দুর্গাপুজোকে ঘিরে হিংসা, প্রশাসনিক বাধা-রাজনৈতিক বিতর্ক, নতুন করে সামনে ফের পুরনো প্রশ্ন

    Durga Puja: দুর্গাপুজোকে ঘিরে হিংসা, প্রশাসনিক বাধা-রাজনৈতিক বিতর্ক, নতুন করে সামনে ফের পুরনো প্রশ্ন

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও অন্যতম বড় পরিসর। ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজোকে (Durga Puja) মানবতার বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ইউনেস্কো। তাদের নথিতে দুর্গাপুজোকে ধর্ম, শিল্প, কারুশিল্প ও সমবেত সামাজিক অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

    তবে গত এক দশকে দুর্গাপুজোকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক হিংসাত্মক ঘটনা, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ, পুলিশি পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে এসেছে। এর মধ্যে কিছু ঘটনায় পুজোমণ্ডপ বা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের অভিযোগ রয়েছে, আবার কিছু ঘটনায় প্রতিবাদ, মতপ্রকাশের অধিকার এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে উৎসবের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

    শারদোৎসব না দুর্গাপুজো? (Durga Puja)

    ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিধানসভায় দুর্গাপুজোর মণ্ডপের কাছে বামপন্থী সংগঠনগুলির বইয়ের স্টল নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, যে সব বামপন্থী বইয়ের স্টলে “দুর্গাপুজো”র পরিবর্তে “শারদোৎসব” শব্দ ব্যবহার করা হবে, সেই স্টলকে পুজো কমিটিগুলির অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। তাঁর অভিযোগ, “শারদোৎসব” শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎসবের ধর্মীয় চরিত্রকে খাটো করা হচ্ছে।

    সিপিআই(এম)-এর তরফে এই বক্তব্যের বিরোধিতা করা হয়েছে। দলটির সঙ্গে যুক্ত বইয়ের স্টলগুলির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের কথাও সামনে এসেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৫৪ সালে পার্ক সার্কাসে মুজফ্ফর আহমেদের উদ্যোগে এই ধরনের প্রথম বামপন্থী-সংযুক্ত বইয়ের স্টল বসেছিল। সেখানে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে সাহিত্য ও অন্যান্য বই বিক্রি করা হয়েছিল।

    সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, “গণতন্ত্র মানে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাবনার সহাবস্থান।” দলের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, তাদের বইয়ের স্টলে স্বামী বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ বিভিন্ন ভারতীয় ব্যক্তিত্বের উপর বইও থাকে।

    ফলে বিতর্কটি কেবল একটি শব্দ ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দুর্গাপুজোকে প্রধানত ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দেখা হবে, নাকি ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবেও তার পরিচয় থাকবে—তা নিয়েও রাজনৈতিক মতপার্থক্য সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের দুর্গাপুজোর সময় কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ঘটনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

    হাওড়ার শ্যামপুরে অশান্তি

    অক্টোবর ২০২৪-এ হাওড়ার শ্যামপুরে একটি ছবি নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি পরে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরে গড়ায়। পুলিশের তরফে ৬৭ জনকে গ্রেফতারের কথা জানানো হয়। এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি এবং মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবায় বিধিনিষেধের কথাও প্রকাশ্যে আসে। একই ঘটনায় পুজো কমিটির এক সদস্যের বিরুদ্ধেও মামলা হয়।

    গার্ডেনরিচের পুজোমণ্ডপে উত্তেজনা

    ১১ অক্টোবর কলকাতার গার্ডেনরিচের নিউ বেঙ্গল স্পোর্টিং ক্লাবের পুজোমণ্ডপে একদল যুবকের প্রবেশ ও ধর্মীয় আচার চলাকালীন বাজানো শব্দ নিয়ে আপত্তির অভিযোগ ওঠে। পুজো কমিটির অভিযোগ, ৫০-৬০ জন সেখানে এসে অনুষ্ঠান বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিলেন এবং প্রতিমা ভাঙার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ অভিযোগ পাওয়ার পর মামলা করে তদন্ত শুরু করে।

    তবে ঘটনাটির প্রেক্ষাপট নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য আলাদা। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবারের নমাজের সময়ে পুজোর শব্দ নিয়ে আপত্তি থেকে বচসার সূত্রপাত এবং পরে স্থানীয় প্রবীণদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি (Durga Puja) নিয়ন্ত্রণে আসে।

    বিসর্জনকে ঘিরে সংঘর্ষ

    নরকেলডাঙায় কালীপুজোর বিসর্জনের সময় সংঘর্ষ, পাথর ও কাচের বোতল ছোড়ার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক চর্চা হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে পুলিশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, ঘটনাটির সূত্রপাত একটি মোটরবাইক পার্কিং নিয়ে বিবাদের জেরে এবং নির্দিষ্ট কোনও বিসর্জন মিছিলকে লক্ষ্য করে হামলা হয়নি। পুলিশের বক্তব্য, নির্ধারিত বিসর্জনের শোভাযাত্রা পরে নিরাপত্তার মধ্যে সম্পন্ন হয়।

    এই ঘটনায় জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য অর্চনা মজুমদারও রাজ্যপালের কাছে পুলিশি আচরণ নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের খবর।

    আরজি কর আন্দোলন এবং পুজোর সময় পুলিশের পদক্ষেপ

    ২০২৪ সালের পুজোর সময় আরজি কর-কাণ্ডের প্রতিবাদও দুর্গাপুজোর পরিসরে এসে পড়ে। ৯ অক্টোবর জুনিয়র চিকিৎসকদের “অভয়া পরিক্রমা” কর্মসূচিকে কলকাতা পুলিশ আটকে দেয়। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে চিকিৎসকদের উত্তেজনা তৈরি হয়।

    ১৫ অক্টোবর সরকারি দুর্গাপুজো কার্নিভালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তপোব্রত রায়কে প্রতিবাদী ব্যাজ পরার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাঁকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। মামলাটির তদন্তে কলকাতা হাইকোর্ট অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশও দেয়। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, ব্যাজে লেখা বক্তব্যকে আপত্তিকর মনে করে পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছিল।

    বস্তুত, আরজি করকাণ্ডের প্রতিবাদ, প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘাত এবং উৎসবের সরকারি অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।

    ১১২ ফুটের দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে বিতর্ক

    নদিয়ার রানাঘাটে ২০২৪ সালে ১১২ ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমা স্থাপনের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। আয়োজকদের বক্তব্য, প্রশাসনিক অনুমতি না মেলায় পুজো বন্ধ রাখতে হয়। পরে ওই জায়গায় মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছিল। এখানে প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং আয়োজকদের পুজো আয়োজনের অধিকার—দুই দিকই আলোচনায় আসে।

    সাংবাদিক গ্রেফতারির ঘটনায় বিতর্ক

    ২০২৪ সালের নভেম্বরে কলকাতার একটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক অনন্য গুপ্তকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো একটি প্রতিবেদনে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও বিশৃঙ্খলা তৈরির অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা অনন্যর গ্রেফতারির সমালোচনা করেন।

    ২০১৪-র বর্ধমান বিস্ফোরণ

    দুর্গাপুজোর সময় পশ্চিমবঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় ২০১৪ সালের বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণও গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রচলিত কিছু প্রতিবেদনে তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। বিস্ফোরণটি ঘটে ২ অক্টোবর ২০১৪ সালে; কিন্তু ১৯ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় ২৮ অগাস্ট ২০১৯ সালে। দোষী সাব্যস্তদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। মামলাটি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্কের তদন্তের সঙ্গেও সম্পর্কিত ছিল।

    অতএব, ঘটনাটিকে “২০১৪ সালের ২৮ আগস্টের মামলা” বলা সঠিক নয়; ২৮ আগস্ট ২০১৯ ছিল দোষী সাব্যস্ত হওয়ার তারিখ।

    দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন

    ইউনেস্কোর নথিতে কলকাতার দুর্গাপুজোকে শুধু ধর্মীয় আচার হিসেবে নয়, শিল্পী, কারিগর, পুজো কমিটি, পুরোহিত, ঢাকি এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, উৎসবের সময়ে শ্রেণি, ধর্ম ও জাতিগত বিভাজন অনেকাংশে অতিক্রম করে মানুষ পুজোমণ্ডপ পরিদর্শনে অংশ নেয়।

    এই কারণেই পুজোকে ঘিরে হিংসা, প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ কিংবা মতপ্রকাশের উপর নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ—প্রতিটি ঘটনাই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও নাগরিক অধিকারের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

    তবে ঘটনাগুলির প্রকৃতি এক নয়। কোথাও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার অভিযোগ, কোথাও ব্যক্তিগত বা স্থানীয় বিবাদ, কোথাও রাজনৈতিক আন্দোলন, আবার কোথাও প্রশাসনিক অনুমতি বা আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন রয়েছে। ফলে সব ঘটনাকে একই ধরনের “পরিকল্পিত হামলা” হিসেবে দেখার আগে প্রত্যেকটির প্রেক্ষাপট, পুলিশের বক্তব্য, মামলা ও আদালতের পর্যবেক্ষণ আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

    সুমুখে যেসব প্রশ্ন

    ২০২৬ সালের বইয়ের স্টল-বিতর্ক এই পুরনো আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে দুর্গাপুজোর ধর্মীয় পরিচয়কে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার দাবি রয়েছে। অন্যদিকে বামপন্থী দলগুলি দীর্ঘদিনের বই বিক্রির ঐতিহ্য এবং মতাদর্শগত প্রকাশের অধিকারের কথা বলছে।

    একই সঙ্গে, দুর্গাপুজোকে (Durga Puja) ইউনেস্কোর স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ—সবক’টিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

    পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো তাই একই সঙ্গে ধর্মীয় আচার, সাংস্কৃতিক উৎসব, সামাজিক সমাবেশ এবং রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্র। ২০২৬-এর পুজোর আগে বইয়ের স্টল ঘিরে নতুন বিতর্ক দেখিয়ে দিল, উৎসবের পরিচয় ও জনপরিসরে তার অর্থ নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখনও যথেষ্ট তীব্র। সামনে (West Bengal) প্রশাসন, পুজো কমিটি, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষ কীভাবে এই মতপার্থক্য সামলান, তার উপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে উৎসবের পরিবেশ।

     

  • Sonia Gandhi Book Row: সোনিয়া গান্ধীর বই প্রকাশ ঘিরে বিতর্ক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশকের দায়িত্ব

    Sonia Gandhi Book Row: সোনিয়া গান্ধীর বই প্রকাশ ঘিরে বিতর্ক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশকের দায়িত্ব

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কোনও রাজনৈতিক নেতার স্মৃতিকথা তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে। সেখানে ব্যক্তিগত স্মৃতি, রাজনৈতিক মূল্যায়ন এবং সমকালীন ঘটনাবলী সম্পর্কে লেখকের নিজস্ব ব্যাখ্যা থাকলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সেই বই প্রকাশে বাধা দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। কিন্তু কোনও বইয়ে প্রধানমন্ত্রী, রাজনৈতিক সংগঠন (Congress), ভারত-চিন সীমান্ত কিংবা ভারতীয় ভূখণ্ডে চিনের তথাকথিত অনুপ্রবেশের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কোনও দাবি থাকলে বিষয়টি শুধুমাত্র মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন সামনে আসে তথ্য, প্রমাণ এবং প্রকাশকের দায়িত্বের প্রশ্ন। এই বিতর্কের কেন্দ্রেই রয়েছে সোনিয়া গান্ধীর (Sonia Gandhi Book Row) প্রস্তাবিত স্মৃতিকথা “বিলংগিং: এ জার্নি অফ লাভ”। বইটির আন্তর্জাতিক সংস্করণ আগামী ১০ নভেম্বর, ২০২৬ প্রকাশিত হওয়ার কথা। পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউসের আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটে বইটিকে ৫৪৪ পৃষ্ঠার একটি স্মৃতিকথা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

    ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশ ঘিরে বিতর্ক (Sonia Gandhi Book Row)

    ভারতে বইটির প্রকাশনা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়, যখন বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া এবং সোনিয়া গান্ধীর মধ্যে পাণ্ডুলিপির কিছু অংশ নিয়ে সম্পাদকীয় মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ, ভারত-চিন সম্পর্ক এবং চিনের কথিত অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত কিছু অংশ নিয়ে সম্পাদকীয় পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে সোনিয়া সেই পরিবর্তনগুলি মেনে নেননি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। এর পরেই কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রশ্ন ওঠে, একই বই বিদেশে প্রকাশিত হলেও ভারতে কেন প্রকাশিত হচ্ছে না। দলের কয়েকজন নেতা বিষয়টিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনও ধরনের চাপ দেওয়া হয়েছিল কি না, সেই অভিযোগও তোলেন। কিন্তু বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে প্রকাশকের বক্তব্যের পর।

    পেঙ্গুইনের বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন

    ২৮ অগাস্ট পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া প্রকাশ্যে জানায় যে ভারতে “বিলংগিং” বইটির প্রকাশক তারা নয়। একই সঙ্গে সংস্থাটি জানায়, সোনিয়া সম্পাদকীয় পরিবর্তন মেনে না নেওয়ায় তারা বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত বদল করেছে—এমন দাবি পুরো পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে তুলে ধরে না। প্রকাশকের বক্তব্য অনুযায়ী, তথ্য যাচাই করা এবং লেখকদের সম্পাদকীয় পরামর্শ দেওয়া প্রকাশনা প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। সংশ্লিষ্ট আলোচনার সময় বইটি প্রকাশ করার বিষয়ে তারা আগ্রহী ছিল বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে। তবে গোপন আলোচনার বিষয়ে তারা আর কোনও মন্তব্য করতে চায়নি (Congress)। এই বক্তব্যের পর বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে এসেছে—প্রকাশক নিজেই যখন সরকারি চাপের অভিযোগ নিশ্চিত করছে না, তখন সরাসরি মোদি সরকারের সঙ্গে বই প্রকাশ না হওয়ার সিদ্ধান্তকে যুক্ত করার ভিত্তি কী?

    প্রশ্ন শুধু সোনিয়ার বই নিয়ে নয়

    মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অর্থ কি কোনও লেখক যে কোনও ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সরকার বা সেনাবাহিনী সম্পর্কে যে কোনও দাবি করতে পারবেন এবং প্রকাশককে তা তথ্য যাচাই ছাড়াই প্রকাশ করতে হবে? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে সম্পাদকীয় প্রক্রিয়ার প্রয়োজনই বা কোথায়? বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দায়িত্বশীল প্রকাশনা সংস্থাগুলিতে সম্পাদকীয় পর্যালোচনা, তথ্য যাচাই এবং আইনি পর্যালোচনা প্রকাশনা প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। কোনও বইয়ে জীবিত ব্যক্তিকে নিয়ে অভিযোগ, সরকারের কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে গুরুতর মন্তব্য, সামরিক অভিযান সংক্রান্ত তথ্য অথবা কোনও দেশের সীমান্ত নিয়ে দাবি থাকলে সেই দাবির ভিত্তি খতিয়ে দেখা স্বাভাবিক। লেখকের লেখার অধিকার রয়েছে, কিন্তু কোনও প্রকাশককে নির্দিষ্ট আকারে সেই লেখা প্রকাশ করতে বাধ্য করা যায় না।

    ভারত-চিন সীমান্তের প্রশ্ন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়

    সোনিয়ার বইকে ঘিরে বিতর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশটি ভারত-চিন সম্পর্ক এবং চিনের তথাকথিত অনুপ্রবেশের সঙ্গে যুক্ত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সীমান্তে চিনের কার্যকলাপ, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা, ভারতীয় ভূখণ্ডের অবস্থান এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর পদক্ষেপ সাধারণ রাজনৈতিক মন্তব্যের বিষয় নয়। এই বিষয়গুলির সঙ্গে সরাসরি দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কোনও স্মৃতিকথায় যদি বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ে চিন ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিল, কোনও সরকার পরিস্থিতি যথাযথভাবে সামাল দিতে পারেনি, অথবা কোনও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল, তাহলে পাঠকের জানার অধিকার রয়েছে—এগুলি কি লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতি, রাজনৈতিক মূল্যায়ন, নাকি যাচাই করা তথ্য? এখানেই প্রকাশকের দায়িত্ব শুরু হয়। তথ্য চাওয়া সেন্সরশিপ নয়। বরং বহু ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করাই প্রকাশকের দায়িত্ব। কোনও রাজনৈতিক নেতা যদি লেখেন, কোনও নির্দিষ্ট বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট কথা বলেছিলেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ হতে পারে। কিন্তু একই বইয়ে কোনও সামরিক ঘটনা, সীমান্ত বিরোধ বা সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে তুলে ধরা হলে সেই দাবির প্রকৃতি বদলে যায় (Sonia Gandhi Book Row)। তখন প্রশ্ন উঠবেই—এর উৎস কী? কোনও নথি রয়েছে কি? অন্যান্য সূত্র কী বলছে? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল কি? সরকারি নথি বা জনসমক্ষে থাকা তথ্য দিয়ে দাবিটির সত্যতা নিশ্চিত করা যায় কি? এই প্রশ্নগুলি করা লেখকের কণ্ঠরোধ করা নয়, বরং পাঠকের জানার অধিকার রক্ষা করা (Congress)।

    কংগ্রেসের যুক্তি এবং তার দুর্বল জায়গা

    কংগ্রেসের নেতারা গোটা ঘটনাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অশোক গেহলট, কমল নাথ-সহ দলের একাধিক নেতার প্রশ্ন, বিদেশে বইটি প্রকাশিত হতে পারলে ভারতে প্রকাশের ক্ষেত্রে বাধা কোথায় এবং কোনও ধরনের চাপ দেওয়া হয়েছিল কি না। অবশ্যই এটি গুরুতর অভিযোগ। কিন্তু গুরুতর অভিযোগের জন্যও প্রয়োজন জোরালো প্রমাণ। যদি কেন্দ্রীয় সরকার পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়াকে বইয়ের কোনও অংশ বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে থাকে, তাহলে সেই নথি প্রকাশ করা উচিত। কোনও সরকারি আধিকারিক প্রকাশকের উপর চাপ দিয়ে থাকলে তার প্রমাণও সামনে আনা উচিত। কোনও মন্ত্রক বইটি আটকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে থাকলে সেই নির্দেশ প্রকাশ্যে আসা উচিত। বর্তমানে প্রকাশকের যে বক্তব্য সামনে এসেছে, তাতে এমন কোনও সরকারি নির্দেশের উল্লেখ নেই। বরং সরকারি চাপের অভিযোগ নিশ্চিত করার পরিবর্তে প্রকাশক সম্পাদকীয় প্রক্রিয়া এবং তথ্য যাচাইকেই প্রকাশনার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তাই এই পর্যায়ে “মোদি সরকার বইটি আটকে দিয়েছে”—এমন বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়, বরং রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই দেখা যায়।

    লেখকের স্বাধীনতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশকের স্বাধীনতা

    এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে কি প্রকাশকের স্বাধীনতাকে উপেক্ষা করা যায় (Sonia Gandhi Book Row)? সোনিয়ার নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনই কোনও পাণ্ডুলিপিতে তথ্য যাচাই প্রয়োজন বলে মনে হলে প্রকাশকের লেখককে প্রশ্ন করার অধিকারও রয়েছে। লেখক কোনও পরিবর্তন গ্রহণ করতে না চাইলে সেটিও তাঁর অধিকার। একইভাবে, সেই আকারে বই প্রকাশ করতে প্রকাশক অনিচ্ছুক হলে সেটিও প্রকাশকের অধিকার। গণতন্ত্র উভয় পক্ষের স্বাধীনতার কথা বলে। এক পক্ষের স্বাধীনতা যখন অন্য পক্ষের উপর বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়, তখনই ব্যবস্থাটি অসুস্থ হয়ে ওঠে।

    পেঙ্গুইনের আগের বিতর্কও কি প্রাসঙ্গিক?

    পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়ার নাম এর আগেও বিতর্কিত প্রকাশনা সংক্রান্ত ঘটনায় উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের জুনে ২০১৩ সালের মুজফফরনগর দাঙ্গার উপর ভিত্তি করে জো সাকোর গ্রাফিক প্রতিবেদন “দ্য ওয়ান্স অ্যান্ড ফিউচার রায়ট” ভারতে বিতরণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল সংস্থাটি। সাকোর দাবি ছিল, বইয়ে ব্যবহৃত কয়েকটি উদ্ধৃতি নিয়ে পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া পরিবর্তন চেয়েছিল। অতএব, সোনিয়ার বইকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। তবে “মোদিকে প্রশ্ন করা” এবং “মোদিকে দোষারোপ করা”—এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। সরকারকে প্রশ্ন করা বিরোধী দলের অধিকার। প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করাও গণতান্ত্রিক অধিকার। ভারত-চিন নীতি নিয়ে সরকারের কাছে জবাব চাওয়াও সম্পূর্ণ বৈধ। কিন্তু কোনও প্রমাণ ছাড়াই প্রকাশকের সিদ্ধান্তকে সরকারের পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় (Congress)। প্রশ্ন করা গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু প্রমাণ ছাড়াই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা গণতন্ত্রের মানকে দুর্বল করে।

    সরকার বদলালেও কি তথ্য যাচাইয়ের মানদণ্ড বদলাবে?

    কংগ্রেস যদি মনে করে বইটি প্রকাশের ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল, তাহলে তাদের সেই দাবির প্রমাণ সামনে আনা উচিত। কিন্তু প্রমাণ না থাকলে প্রতিটি সম্পাদকীয় মতপার্থক্যকে মোদি সরকারের ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরলে রাজনৈতিক বিতর্কের গভীরতা কমে যায়। আগামী দিনে সরকার বদলালে কি এই মানদণ্ডও বদলে যাবে? এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তার আগে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার ছিল। ভবিষ্যতে অন্য কোনও দল ক্ষমতায় আসতে পারে। তাহলে কি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকাশনার স্বাধীনতার মানদণ্ডও বদলে যাবে? উত্তর হওয়া উচিত—না। আজ বিজেপি সরকারের সঙ্গে যুক্ত কোনও নেতাকে নিয়ে প্রকাশিত বইয়ে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তথ্য যাচাই প্রয়োজন। আগামীকাল যদি কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় থাকে এবং কোনও কংগ্রেস নেতাকে নিয়ে গুরুতর অভিযোগসম্বলিত বই প্রকাশিত হয়, তাহলেও তথ্য যাচাই প্রয়োজন হবে। এটাই গণতান্ত্রিক নীতি। রাজনৈতিক দল বদলায়। সরকার বদলায়। প্রধানমন্ত্রী বদলায়। কিন্তু তথ্য যাচাইয়ের মানদণ্ড বদলানো উচিত নয় (Sonia Gandhi Book Row)।

    সেনাবাহিনী নিয়ে কে কী লিখতে পারেন, প্রশ্নটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

    চিন এবং ভারতীয় ভূখণ্ড সংক্রান্ত অংশের কথা সামনে আসায় জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বিতর্ককে দেখা প্রয়োজন। ভারতীয় সেনাবাহিনী কোনও রাজনৈতিক দল নয়। সীমান্তে সেনাবাহিনীর অভিযান, সিদ্ধান্ত এবং মোতায়েন নিয়ে গুরুতর কোনও দাবি জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্মৃতিকথার অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী সম্পর্কিত কোনও বক্তব্য যাচাই না করেই গ্রহণ করা সমীচীন নাও হতে পারে। এখানে উদ্দেশ্য কোনও সরকারকে রক্ষা করা হওয়া উচিত নয়। কোনও সরকার সীমান্তে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক প্রশ্ন থাকা উচিত। সেনাবাহিনীর কোনও ত্রুটি হয়ে থাকলে তারও প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। চিন কোনও পদক্ষেপ নিয়ে থাকলে তারও প্রমাণ থাকা দরকার। আবার অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও প্রমাণের ভিত্তিতে খণ্ডন করা উচিত।দেশপ্রেমের অর্থ সরকারের বলা প্রতিটি কথাকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের নামে কোনও যাচাই না-করা দাবিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাও দেশপ্রেম নয়। শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের মূল প্রশ্ন তাই শুধু সোনিয়ার বই প্রকাশিত হবে কি না, তা (Congress) নয়। প্রশ্ন হল—গণতন্ত্রে লেখকের স্বাধীনতা, প্রকাশকের স্বাধীনতা এবং পাঠকের সত্য জানার অধিকার—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনই সংবেদনশীল দাবির ক্ষেত্রে তথ্য ও প্রমাণের গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না (Sonia Gandhi Book Row)।

     

  • Mohan Bhagwat: ভাগবতের কানাডা সফরের অনুমতি চেয়ে কার্নিকে চিঠি শতাধিক হিন্দু সংগঠনের

    Mohan Bhagwat: ভাগবতের কানাডা সফরের অনুমতি চেয়ে কার্নিকে চিঠি শতাধিক হিন্দু সংগঠনের

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কানাডায় আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের (Mohan Bhagwat) সফরের অনুমতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে চিঠি দিল শতাধিক কানাডীয় (Canada Visit) হিন্দু সংগঠন ও নাগরিক অধিকার গোষ্ঠী। ভাগবতকে কানাডায় প্রবেশের অযোগ্য ঘোষণা করার যে দাবি উঠেছে, তা প্রত্যাখ্যান করে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত যেন রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে নয়, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে নেওয়া হয়—চিঠিতে এমনই আবেদন জানানো হয়েছে।

    কানাডা সরকারকে চিঠি (Mohan Bhagwat)

    কার্নির পাশাপাশি জননিরাপত্তা মন্ত্রী গ্যারি আনন্দসাঙ্গারী, অভিবাসন মন্ত্রী লেনা মেটলেজ দিয়াব এবং বিদেশমন্ত্রী অনিতা আনন্দের কাছেও চিঠির প্রতিলিপি পাঠানো হয়েছে। আরএসএস প্রধানকে কানাডায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি এবং সংগঠনটিকেও নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে কিছু খালিস্তানপন্থী নিউ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাংসদ, যাঁদের মধ্যে জেনি কোয়ান ও হিদার ম্যাকফারসন রয়েছেন। কিছু ইসলামপন্থী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনও একই দাবি তুলেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।

    চিঠিতে বলা হয়েছে, কানাডার বৃহৎ হিন্দু জনগোষ্ঠীর কাছে ভাগবতের প্রস্তাবিত সফর “যথেষ্ট আগ্রহের বিষয়”। শতাধিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, “আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারী ১০১টিরও বেশি কানাডীয় সংগঠন ও নাগরিক অধিকার গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবতের কানাডা সফরের প্রস্তাবের প্রতি আমাদের সমর্থন জানাতে লিখছি। এই সফর কানাডার হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, যার মধ্যে হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ১০ লাখেরও বেশি কানাডীয় নাগরিক রয়েছেন।”

    আরএসএস ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন

    চিঠিতে আরএসএসকে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, জনপরিসরে মতপ্রকাশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সামাজিক প্রকল্প এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সংগঠনটি পরিচিত। সেখানে আরও বলা হয়েছে, “তাই আমরা নিউ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাংসদ জেনি কোয়ান ও হিদার ম্যাকফারসন এবং কয়েকটি সংগঠনের সাম্প্রতিক সেই আহ্বান নিয়ে উদ্বিগ্ন, যেখানে কানাডা সরকারকে ভাগবতকে দেশে প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং তাঁকে প্রবেশের অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।”

    ভাগবতের (Mohan Bhagwat) কানাডা সফর ঠেকানোর এই প্রচেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করেছে স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলি। তাদের বক্তব্য, ভাগবতের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলি তোলা হয়েছে, সেগুলির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। দুই সাংসদের তরফে ভাগবতের বিরুদ্ধে ঘৃণাত্মক বক্তব্যের ইতিহাস, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হিংসাকে সমর্থন, পরিকল্পিতভাবে ভয় দেখানো এবং সন্ত্রাসবাদী বা অপরাধমূলক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের মতো অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে চিঠিতে দাবি করা হয়েছে।

    চিঠিতে যা লেখা হয়েছে

    এই বিষয়ে চিঠিতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, “গুরুতর অভিযোগের জন্য বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।”

    আরও বলা হয়েছে, “এগুলি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ। স্পষ্ট, বিশ্বাসযোগ্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ ছাড়া এগুলিকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে ব্যবহার করা বা সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয় (Canada Visit)।”

    চিঠিতে কানাডীয় কর্তৃপক্ষকে অভিযোগগুলির সমর্থনে থাকা প্রমাণ খুঁজে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বলা হয়েছে, কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে তা যথাযথ আইনি ও সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল্যায়ন করতে হবে।

    ভাগবতের উপস্থিতি কানাডার জননিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে কিংবা সামাজিক অশান্তির কারণ হতে পারে—এমন আশঙ্কাও খারিজ করেছে সংগঠনগুলি। তাদের প্রশ্ন, কানাডায় ভাগবত বা আরএসএসের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার নির্দিষ্ট কোনও নজির রয়েছে কি না। তাঁর কানাডা সফর জননিরাপত্তাকে বিপন্ন করবে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে।

    চিঠিতে বলা হয়েছে, “কানাডার অভিবাসন ও জননিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত আইন, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে হওয়া উচিত,  অনুমান বা রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়।”

    হিন্দু সংগঠনগুলির বক্তব্য

    সংগঠনগুলির বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনাও বৈধ। তবে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও বিদেশি নেতাকে কানাডায় প্রবেশে বাধা দেওয়া হলে তা (Mohan Bhagwat) বহুত্ববাদ ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলতে পারে।

    চিঠিতে আরও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, যথেষ্ট প্রমাণ ছাড়াই ভাগবতকে কানাডায় প্রবেশ করতে না দিলে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর তার বৃহত্তর প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে কানাডীয় হিন্দু ও তাঁদের সংগঠনগুলির সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

    সংগঠনগুলির বক্তব্য, “কানাডার বহুসাংস্কৃতিক ব্যবস্থা এই নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত যে বিভিন্ন ধর্ম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মানুষ জনজীবনে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। অন্য সব ধর্মীয় বা অ-ধর্মীয় পটভূমির কানাডীয়দের মতো হিন্দুরাও মর্যাদা, নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সংগঠনের অধিকার এবং আইনের চোখে সমতার অধিকারী।”

    “হিন্দুফোবিয়া”য় উদ্বেগ

    ভাগবতের বিরুদ্ধে চলা প্রচারাভিযানকে কিছু কানাডীয় হিন্দু “হিন্দুবিরোধী পক্ষপাত” বা “হিন্দুফোবিয়া” হিসেবে দেখছেন বলেও চিঠিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, কয়েকটি সংগঠন বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মতামত দিয়ে কানাডার সব নাগরিক কিংবা সমস্ত কানাডীয় হিন্দুর অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করা উচিত নয়।

    চিঠিতে ভাগবতের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “ভাগবতের বক্তব্যের মূল গুরুত্ব সব সময় সামাজিক সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক পরিচয়, সমাজসেবা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগের উপর ছিল। তাই আমরা রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সংগঠনগুলিকে তাঁদের প্রকাশ্য বক্তব্যে দায়িত্বশীল হওয়ার এবং এমন ভাষা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানাই, যা কানাডার বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়গুলির মধ্যে বিভাজন আরও গভীর করতে পারে (Mohan Bhagwat)।”

    চিঠির শেষাংশে সংগঠনগুলি বলেছে, “কানাডার প্রয়োজন আরও আলোচনা, বিভাজন নয়; আরও প্রমাণ, অভিযোগ নয়; আরও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক চাপ নয়; এবং তার বহুসাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি আরও সম্মান। কোনও একটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক নেতাকে স্বাগত জানানোর বৈধ অধিকারকে স্তব্ধ করার প্রচেষ্টা নয়। আমরা সম্মানের সঙ্গে কানাডা সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, মোহন ভাগবতের প্রস্তাবিত সফর বিবেচনার সময় সমতা, বহুত্ববাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সংগঠনের অধিকার এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার নীতিগুলি বজায় রাখা হোক।”

    চিঠিতে যারা স্বাক্ষর করেছে

    এই যৌথ উদ্যোগে কানাডা ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন, কানাডিয়ান আর্য সমাজ, ব্র্যাম্পটন হিন্দু সোসাইটি, হিন্দু সোসাইটি অব কানাডা, হিন্দু মিশন অব কানাডা, হিন্দু সভা টেম্পল, হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কানাডা-সহ একাধিক মন্দির, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠন অংশ নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে (Canada Visit)।

    চিঠিতে আরও দাবি করা হয়েছে, ভাগবতের প্রস্তাবিত সফরকে কেন্দ্র করে ভারতবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী—ইসলামপন্থী, বামপন্থী ও খালিস্তানপন্থী সংগঠনগুলির সমন্বয়ে একটি প্রচারাভিযান চালানো হচ্ছে। অনলাইন আবেদন, লিখিত আবেদন এবং প্রতিবাদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্য—এই তিন দেশের সরকারের উপর চাপ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

    তবে ভাগবতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং বিভিন্ন সংগঠনের পাল্টা দাবিগুলি চিঠিতে উল্লিখিত বক্তব্যের ভিত্তিতেই এসেছে, এগুলির সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাধীন যাচাই ও প্রমাণের মূল্যায়ন প্রয়োজন (Mohan Bhagwat)।

     

  • Taslima Nasreen: ১৯ বছর পর কলকাতায় তসলিমা, ফিরল ২০০৭-এর সেই বিতর্কিত স্মৃতি

    Taslima Nasreen: ১৯ বছর পর কলকাতায় তসলিমা, ফিরল ২০০৭-এর সেই বিতর্কিত স্মৃতি

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ৩৪ বছরের বাম সূর্য অস্ত গিয়েছে। পাটে বসেছে ১৫ বছরের তৃণমূল-ভাস্করও। চলতি বছরই রাজ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে প্রথম বিজেপি সরকারের। তার পরেই এক এক করে খুলে পড়ছে বাম এবং তৃণমূল সরকারের মুখোশ (Taslima Nasreen)। স্রেফ ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতিকে হাতিয়ার করেই কেউ ৩৪, কেউ আবার দিব্যি আরাম-আয়েশ করে ১৫ বছর কাটিয়ে দিয়েছে মহাকরণ এবং তারই পোর্টেবল সংস্করণ নবান্নে (Left Front Govt)। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দাবার বোড়ে করে আদতে আখের গুছিয়ে গিয়েছেন বাম এবং তৃণমূলের ভোট কারবারিরা।

    পদ্ম জমানায় কলকাতায় ‘মুক্তমনা’ তসলিমা (Taslima Nasreen)  

    রাজ্যে পালাবদলের পর সরকার গড়েছে বিজেপি। এই পদ্ম জমানায়ই বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছেন ‘মুক্তমনা’রা। ২০০৭ সালে বাম জমানায় প্রবল আন্দোলনের জেরে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে। ‘দ্বিখণ্ডিত’র জননী বড় দুঃখে ছেড়েছিলেন তাঁর ‘সেকেন্ড হোম’ কলকাতা। ১৯ বছর পর সেই তিনিই ফিরলেন আবারও কলকাতায়। যখন শহর ছেড়েছিলেন, চাক্ষুষ করেছিলেন মৌলবাদীদের দাপাদাপি। আর যখন ফিরলেন, তখন দেখলেন আক্ষরিক অর্থেই একটু একটু করে গড়ে উঠছে সোনার বাংলা। প্রায় ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে তসলিমা নিজেই বলেছেন, এই শহরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর। তাঁর প্রত্যাবর্তনের আবহে ফের আলোচনায় এসেছে—কেন ২০০৭ সালে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে হয়েছিল, কীভাবে কলকাতার রাজপথে হিংসাত্মক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সেই পরিস্থিতিতে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিকা কী ছিল।

     ‘লজ্জা’ থেকে নির্বাসন, শুরুটা বাংলাদেশে

    তসলিমার নির্বাসনের ইতিহাস অবশ্য কলকাতায় শুরু হয়নি। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার আগে থেকেই তাঁর লেখা নিয়ে মৌলবাদী সংগঠনগুলির তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়েছিল। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের প্রেক্ষাপট উঠে আসে তাঁর বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘লজ্জা’-য়। বইটি প্রকাশের পর তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলি তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তসলিম। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থেকেছেন। কিন্তু মাতৃভাষা ও বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও ছিন্ন হয়নি।

    কলকাতায় আশ্রয়, তারপর নতুন সংঘাত

    ২০০৪ সালে ভারতে থাকার অনুমতি পাওয়ার পর কলকাতায় আসেন তসলিমা। শহরের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশ তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিল। কলকাতাকেই তিনি নিজের নতুন ঠিকানা হিসেবে দেখতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর লেখা ও বক্তব্যকে ঘিরে বিরোধ থামেনি। ২০০৩ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘দ্বিখণ্ডিত’ পশ্চিমবঙ্গে নিষিদ্ধ করেছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। পরে কলকাতা হাইকোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে বইটি নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে (Taslima Nasreen)।

    কলকাতার রাজপথে অশান্তি

    ২০০৭ সালের ২১ নভেম্বর তসলিমাকে ঘিরে কলকাতায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। অল ইন্ডিয়া মাইনরিটি ফোরামের নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা তসলিমার ভারতে থাকার অনুমতি বাতিল এবং তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি তোলে। বিক্ষোভ দ্রুত হিংসার রূপ নেয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ইটবৃষ্টি, যানবাহনে আগুন এবং পথ অবরোধে স্তব্ধ হয়ে যায় কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকা (Left Front Govt)। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত সেনা নামাতে হয়। সে দিন প্রায় ৪০ জন আহত হন, যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন পুলিশকর্মী। বহু মানুষকে গ্রেফতার করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় রাতের কারফিউ জারি করা হয়েছিল। অর্থাৎ, তসলিমাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিক্ষোভ শুধু একটি সাহিত্যিক বা ধর্মীয় বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, বামফ্রন্ট সরকার মৌলবাদী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বদলে তসলিমাকেই সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁদের যুক্তি, একজন লেখিকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার বদলে সরকার বিক্ষোভকারীদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছিল। অগত্যা বাংলা ছাড়তে হয় তসলিমাকে।

    নিরাপদ আশ্রয় থেকে জয়পুরে, দিল্লিতে

    কলকাতার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে তসলিমাকে চলে যেতে হয় জয়পুরে। সেখানেও প্রতিবাদ-আন্দোলন শুরু হয় বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকাকে নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লিতে। যদিও নিরাপত্তাজনিত কারণে দিল্লিতেও তাঁর চলাফেরায় ছিল নানা বিধিনিষেধের বেড়ি। ২০০৮ সালে পরিস্থিতির চাপে তিনি সাময়িকভাবে ভারত ছেড়ে সুইডেনে চলে যান। পরে আবার ভারতে ফিরে এসে দিল্লিতে বসবাস শুরু করেন (Taslima Nasreen)।

    বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

    ২০০৭ সালের ঘটনায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ভূমিকা আজও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। সমালোচকদের বক্তব্য, নিজেকে সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত এবং মুক্তচিন্তার সমর্থক হিসেবে তুলে ধরা এক মুখ্যমন্ত্রীর সরকারের কাছ থেকে আরও দৃঢ় অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল। তাঁদের প্রশ্ন—রাজপথে হিংসা ছড়ানো বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে কেন একজন লেখিকাকেই শেষ পর্যন্ত রাজ্য ছাড়তে হল?

    ‘তুষ্টিকরণের রাজনীতি’

    ২০০৭ সালের ঘটনার পর থেকেই বামেদের বিরুদ্ধে ‘তোষণের রাজনীতি’র অভিযোগ উঠেছে (Left Front Govt)। সমালোচকদের বক্তব্য, মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও, সরকার সেদিন শেষ পর্যন্ত মৌলবাদী চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছিল। পরবর্তী সময়ে তসলিমা নাসরিনকে ভারতে থাকার অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। বিজেপির সমর্থকেরা দাবি করেন, মৌলবাদী হুমকির কাছে নতি স্বীকার না করে তসলিমাকে ভারতে থাকার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের ভূমিকা প্রশংসনীয়। তবে তসলিমার ভারতে থাকা মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া অনুমতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রশাসনিক বিষয়। একে কোনও একটি রাজনৈতিক দলের একক কৃতিত্ব হিসেবে দেখার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সিদ্ধান্ত ও সময়কাল আলাদা করে বিচার করা প্রয়োজন (Taslima Nasreen)।

    ১৯ বছর পর ফের কলকাতায়

    দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে কলকাতায় ফিরেছেন তসলিমা। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন অনুরাগীরা। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই কলকাতায় প্রত্যাবর্তন হয় তাঁর। বিমানবন্দরে পা দিয়েই তসলিমা জানান, কলকাতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এখনও গভীর। তিনি বলেন, এই প্রত্যাবর্তন তাঁর কাছে আবেগের। এমনকি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকলে কলকাতায় আরও বেশি সময় থাকার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একজন নির্বাসিত লেখিকার শহরে ফেরার ঘটনা নয়। ২০০৭ সালের সেই রাত, রাজপথের হিংসা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় মৌলবাদ, প্রশাসনের ভূমিকা (Left Front Govt) এবং অবশ্যই তোষণ-তুষ্টিকরণের রাজনীতি—সব কিছুই আবারও জাগরুক বঙ্গবাসীর স্মৃতিতে (Taslima Nasreen)।

     

  • Sheikh Hasina: “বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে দেশে আবারও অন্ধকার সময় ফিরে আসবে”, বাংলাদেশবাসীকে সতর্ক করলেন হাসিনা

    Sheikh Hasina: “বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে দেশে আবারও অন্ধকার সময় ফিরে আসবে”, বাংলাদেশবাসীকে সতর্ক করলেন হাসিনা

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: “বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে দেশে আবারও ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মতো অন্ধকার সময় ফিরে আসবে।” কথাগুলি বললেন বাংলাদেশের (Bangladesh) পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)। প্রসঙ্গত, ওই সময় বাংলাদেশের রাশ ছিল বিএনপির হাতে। সংবাদ মাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসিনা জানান, তিনি খুব শীঘ্রই বাংলাদেশে ফিরে যাবেন। আওয়ামি লিগের এই নেত্রী ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে রয়েছেন ভারতে।

    জনকল্যাণ নিশ্চিত করা জরুরি (Sheikh Hasina)

    হাসিনা বলেন, “ফিরে আসার বিষয়টি কোনও নির্দিষ্ট তারিখ বা সময়ের ওপর নির্ভর করে না। আমরা বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এটি শুধু আমার ফিরে আসার জন্য নয়, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যও জরুরি।” তিনি বলেন, “আমি একটি বিষয় খুব পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমার অনুপস্থিতি মানে আমার নীরবতা নয়। আমি প্রতিটি মুহূর্তে দেশের জন্য লড়াই করছি এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে, আন্তর্জাতিক আইনগত কাঠামোর মধ্যে এবং বৈশ্বিক গণমাধ্যমের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে কাজ করছি।” চলতি বছর সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসে বিএনপি। তার পরেই দেশটিতে ভারতবিরোধী নানা মন্তব্য করার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছে।

    ভারত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু

    এ প্রসঙ্গে হাসিনা জানান, ভারত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং প্রতিবেশী (Sheikh Hasina)। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সমর্থন ছিল প্রশ্নাতীত। তিনি বলেন, “অবশ্য আমাদের দেশে ভারতবিরোধী বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও আদর্শগতভাবে দেউলিয়া গোষ্ঠীগুলির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও এই চর্চায় যোগ দিয়েছে।” তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা প্রায়ই আওয়ামি লিগের বিরুদ্ধে (Sheikh Hasina) ভারতের কাছে নতি স্বীকার করা এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি করার অভিযোগ তুলত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ১৮ মাসের শাসন কালে কিংবা বিএনপি—কেউই এমন একটি চুক্তিরও প্রমাণ দিতে পারেনি, যা জাতীয় স্বার্থবিরোধী।

    ফের ভিসা পরিষেবা চালুর পথে দুই দেশ

    বছর দেড়েকের অস্থিরতার পর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভারত ও বাংলাদেশ পুরো মাত্রায় ফের ভিসা পরিষেবা চালুর পথে এগোচ্ছে (Bangladesh)। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই সব ধরনের ক্যাটাগরিতে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ভিসা চালু করেছে। এদিকে, ভারতও ফের ধীরে ধীরে ভিসা কার্যকলাপ শুরু করার পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ভারত সফরের এক মাস পরেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাঁর সফরে ভিসা স্বাভাবিকীকরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়গুলির মধ্যে ছিল। উল্লেখ্য, ভারতে থাকা বাংলাদেশের সব ভিসা কেন্দ্র—নয়াদিল্লির হাইকমিশন এবং কলকাতা, আগরতলা, মুম্বই ও চেন্নাইয়ের কনস্যুলার বিভাগ (Bangladesh), এখন আগের মতোই কাজকর্ম শুরু করেছে (Sheikh Hasina)।

     

LinkedIn
Share