Tag: Gopal Patha

  • Direct Action Day: ৭৮-এ পা ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র, জেনে নিন হিন্দু নিপীড়নের রক্তাক্ত ইতিহাস

    Direct Action Day: ৭৮-এ পা ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র, জেনে নিন হিন্দু নিপীড়নের রক্তাক্ত ইতিহাস

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র (Direct Action Day) ৭৮তম বার্ষিকী মনে করিয়ে দেয়, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ কত দ্রুত একটি সভ্যতাকে গ্রাস করতে পারে। ১৯৪৬ সালের ১৬ অগাস্ট মুসলিম লীগের একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি অল্প সময়ের মধ্যেই উপমহাদেশের ইতিহাসে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহতম হিংসার অন্যতম ঘটনায় পরিণত হয় (Calcutta Horrors History)। আজ, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নতুন করে হামলা ও নিপীড়নের অভিযোগ সামনে আসায়, ১৯৪৬-এর সেই অন্ধকার দিনের স্মৃতি ফের আলোচনায় এসেছে।

    পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের অভিযোগ (Direct Action Day)

    ১৯৪৬ সালের ১৬ অগাস্টের ঘটনাকে আকস্মিক দাঙ্গা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই—এমনটাই দাবি করা হয়েছে এই ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে। মুসলিম লীগের নেতা মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর ডাইরেক্ট অ্যাকশনের আহ্বানকে হিন্দু সমাজের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন, আতঙ্ক সৃষ্টি এবং পাকিস্তান গঠনের দাবি মেনে নিতে চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

    রমজানের ১৭তম দিনের সঙ্গে কর্মসূচিটির সময় মিলে যাওয়াকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে বদরের যুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে এই দিনের সম্পর্ককে সামনে রেখে দাবি করা হয়েছে, কর্মসূচিটির মধ্যে ধর্মীয় বিজয়ের ঐতিহাসিক বয়ানের রাজনৈতিক ব্যবহার ছিল।

    কলকাতায় কর্মসূচির আগে ব্যাপক প্রস্তুতির অভিযোগও উঠে আসে। বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৬ অগাস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছিলেন এবং বিপুল সংখ্যক মুসলিমের সমাবেশ নিশ্চিত করেছিলেন।এর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থাকে কার্যত অচল করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

    কলকাতা ময়দানের বিশাল সমাবেশে প্রায় এক লাখ মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। অভিযোগ, সেখানে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীকে সংযত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সমাবেশে যারা যোগ দিয়েছিল, তাদের হাতে ছিল লোহার রড, লাঠি এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র। সমাবেশ শেষ হওয়ার পর সংগঠিত দলগুলি কলকাতার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার হত্যাযজ্ঞ ইতিহাসে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ নামে পরিচিত।

    ৭২ ঘণ্টার ভয়াবহতা

    পরবর্তী তিন দিনে কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে হিন্দুদের দোকানপাট লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। এরপর আবাসিক এলাকাগুলিতেও হামলা শুরু হয়। আমহার্স্ট স্ট্রিট, বোরতলা ও জোড়াসাঁকোর মতো হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

    মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। অপেক্ষাকৃত কম হিসাবেও প্রায় চার হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হয়, আবার কিছু সূত্রে মৃতের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। মাত্র তিন দিনের মধ্যে এক লাখেরও বেশি হিন্দু গৃহহীন হয়ে পড়েছিলেন।

    হামলার নৃশংসতার বিবরণ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। নারী ও শিশুদের ওপর নৃশংসতা, হত্যা, অঙ্গহানি এবং মৃতদেহের ওপর পাশবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল। প্রত্যক্ষদর্শী ফিলিপ ট্যালবট সেই সময়ের কলকাতার রাস্তায় বিকৃত ও ক্ষতবিক্ষত দেহ, ঠেলাগাড়িতে স্তূপ করে রাখা মৃতদেহ এবং নর্দমায় পড়ে থাকা মরদেহের ভয়াবহ দৃশ্যের বর্ণনা করেছিলেন (Direct Action Day)।

    হামলার লক্ষ্য শুধু মানুষ বা সম্পত্তি ছিল না। হিন্দু মন্দিরে হামলা, ধর্মীয় প্রতীক অপবিত্র করা এবং ধর্মীয় গ্রন্থ পোড়ানোর অভিযোগও রয়েছে। কলকাতা ভবিষ্যতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হতে পারে—এই ধারণা থেকেই হিন্দুদের উপস্থিতি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ।

    গোপাল পাঁঠার নেতৃত্বে হিন্দু প্রতিরোধ

    এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতিতে গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যিনি গোপাল পাঁঠা নামে পরিচিত, হিন্দুদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অনুগামী, এবং ‘ভারতীয় জাতীয় বাহিনী’র নেতা ছিলেন। তাঁর সংগঠনে ৭০০ থেকে ৮০০ জন সদস্য ছিলেন (Calcutta Horrors History)।

    স্থানীয় কুস্তিগির ও মাংসের দোকানের মালিক হিসেবে পরিচিত গোপাল পরিস্থিতি বুঝে বিভিন্ন শ্রেণির হিন্দু যুবকদের সংগঠিত করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অভিবাসী শ্রমিক, দুধওয়ালা, কামার এবং মারওয়াড়ি ব্যবসায়ীরা। আর্থিক সাহায্যও মিলেছিল বিভিন্ন মহল থেকে।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাদের কাছ থেকে সংগৃহীত অস্ত্র এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় জোগাড় করা অস্ত্র ব্যবহার করে তাঁর বাহিনী ১৮ অগাস্ট পাল্টা প্রতিরোধ শুরু করে। প্রথমে হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পরে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলাই ছিল তাঁদের কৌশল।

    এই পাল্টা প্রতিরোধের ফলে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হয়। তিন দিনের মধ্যে মুসলিম পক্ষের হতাহতের সংখ্যা হিন্দুদের মৃত্যুর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়। এরপর সোহরাওয়ার্দী গোপালের কাছে অভিযান বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়ে দূত পাঠান। ২১ অগাস্ট সোহরাওয়ার্দী সরকারকে বরখাস্ত করা হয়। সাময়িক প্রশমিত হয় কলকাতার হিন্দু জনসংখ্যার ওপর তাৎক্ষণিক হুমকি।

    সোহরাওয়ার্দী ও মুসলিম লীগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

    ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র ঘটনাপ্রবাহে সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর হাতে স্বরাষ্ট্র ও তথ্য দফতরের দায়িত্বও ছিল। ফলে আইনশৃঙ্খলা এবং সরকারি প্রচারের ওপর তাঁর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ছিল।

    জানা গিয়েছে, ভয়ঙ্কর হিংসার সময়ও পুলিশকে নিষ্ক্রিয় থাকার নির্দেশ দিয়ে সোহরাওয়ার্দী কার্যত হামলাকারীদেরই সাহায্য করেছিলেন। দাঙ্গার সময় তিনি পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষগুলিতে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি পরিচালনা করছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে কয়েকটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

    মুসলিম লীগের রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, এই হত্যাযজ্ঞের উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থানকে অসম্ভব করে তুলে দেশভাগের পক্ষে বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি করা। অর্থাৎ দ্বিজাতিতত্ত্বকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই হিংসার ভূমিকা ছিল।

    কলকাতার বাইরে বাংলার গ্রামাঞ্চলেও হিংসা ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে নোয়াখালির ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড একই ধরনের সংগঠিত হিংসার উদাহরণ (Calcutta Horrors History)।

    বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ঘটনাকে ১৯৪৬-এর সঙ্গে তুলনা

    ২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতাচ্যুত হন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ নতুন করে সামনে আসে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দু’হাজারেরও বেশি হিন্দুবিরোধী হিংসার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ১৫২টি মন্দিরে হামলা এবং ২৩ জন হিন্দুর মৃত্যুও রয়েছে (Direct Action Day)।

    এই ঘটনাগুলিকে ১৯৪৬ সালের কলকাতার হিংসার সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে হিন্দুদের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে সংগঠিত হামলার ধারা এখনও দেখা যায়।

    বাংলাদেশের জনসংখ্যায় হিন্দুদের অনুপাতের পরিবর্তনকেও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৪০ সালে যেখানে হিন্দুদের অনুপাত প্রায় ২৮ শতাংশ ছিল, বর্তমানে তা প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নিপীড়ন, জোরপূর্বক ধর্মান্তর এবং দেশত্যাগের মতো কারণ।

    ২০২১ সালে দুর্গাপুজোর সময় হামলা, ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের রায়ের পর জামাত-সমর্থিত হিংসার অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের শেখ হাসিনা-পরবর্তী হামলাকে একই ধারার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যা অভিযোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় এই ধরনের হামলা আরও দ্রুত সংগঠিত হয়েছে।

    আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন

    হিন্দুদের ওপর হিংসার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া নিয়েও সমালোচনা হয়েছে বারংবার। পশ্চিমি সরকার এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলি হিন্দুবিরোধী হিংসাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না—এমন অভিযোগ তুলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ধরনের নীরবতা হামলাকারীদের জবাবদিহির বাইরে থাকার সুযোগ করে দেয়।

    বীর সাভারকরের পুরনো সতর্কবার্তাকেও এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় আনা হয়েছে। তাঁর দাবি ছিল, কংগ্রেসের তোষণনীতির পরিণতি শেষ পর্যন্ত হিন্দুদের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। পরবর্তী ইতিহাসের আলোকে সেই আশঙ্কাকে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে (Direct Action Day)।

    ইতিহাসের শিক্ষা কী?

    ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখনও পুরোপুরি গ্রহণ করা হয়নি—এমনটাই এই বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য (Calcutta Horrors History)। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ধর্মীয় পরিচয়ের সংঘাত যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখন একটি সমাজে সহাবস্থান গুরুতরভাবে বিপন্ন হতে পারে।

    হিন্দুদের বিরুদ্ধে হিংসার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণ নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা না করলে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন—এমন দাবিও করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরে সক্রিয় আদর্শগত নেটওয়ার্কগুলির ভূমিকা নিয়েও সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।

    ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে দিবস তাই শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়, ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তাও বলে অভিমত প্রতিবেদন লেখকের। ১৯৪৬ সালের ১৬ অগাস্ট কলকাতার রাস্তায় সাম্প্রদায়িকতার যে আগুন জ্বলেছিল, তার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিধ্বনি এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে অতীতের ঘটনাগুলিকে স্বীকার করা, বিশ্লেষণ করা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা (Direct Action Day)।

     

  • Gopal Patha: ৮০ বছরের ‘ঐতিহাসিক ভুল’ সংশোধন! সুরাবর্দির নাম সরিয়ে কলকাতায় গোপাল পাঁঠার নামে রাস্তা

    Gopal Patha: ৮০ বছরের ‘ঐতিহাসিক ভুল’ সংশোধন! সুরাবর্দির নাম সরিয়ে কলকাতায় গোপাল পাঁঠার নামে রাস্তা

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কলকাতা পুরসভার (KMC) সিদ্ধান্তে এবার নতুন নাম পেল পার্ক সার্কাস এলাকার সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ (Suhrawardy Name Removed)। ২০ জুন জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, রাস্তার নতুন নাম হবে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ (Gopal Patha)। পশ্চিমবঙ্গ দিবসের আবহে নেওয়া এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবসের শুভক্ষণে সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ-এর নাম পরিবর্তন করে স্বর্গীয় গোপাল মুখার্জির নামে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ করার জন্যে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের গৃহীত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই। এটি শুধুমাত্র একটি নাম পরিবর্তন নয়, ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন।’

    কার নামে ছিল সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ?

    কলকাতার এই রাস্তার নামকরণ হয়েছিল ১৯৩৩ সালে। নামটি রাখা হয়েছিল বিশিষ্ট চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য স্যার হাসান সুরাবর্দির (Sir Hassan Suhrawardy) নামে। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন খ্যাতনামা সার্জন এবং জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকের কাছে এই নামটি যুক্ত হয়ে যায় তাঁর ভাইপো হুসেন সঈদ সুরাবর্দির (Huseyn Shaheed Suhrawardy) সঙ্গে, যিনি ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (Premier) ছিলেন এবং কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন।

    কে ছিলেন গোপাল পাঁঠা?

    গোপাল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যিনি ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে বেশি পরিচিত, ছিলেন কলকাতার এক প্রভাবশালী স্থানীয় সংগঠক। ১৯৪৬ সালের ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে (Direct Action Day)-এর সময় তিনি হিন্দু মহল্লাগুলির আত্মরক্ষার জন্য স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বলে বহু ঐতিহাসিক ও সামাজিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর সমর্থকদের দাবি, দাঙ্গার সময় তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করেন এবং কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরোধ সংগঠিত করেন। এই কারণে অনেকের কাছে তিনি ‘বউবাজারের সিংহ’ বা ‘কলকাতার রক্ষাকর্তা’ হিসেবেও পরিচিত।

    ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা ও সুরাবর্দি বিতর্ক

    ১৯৪৬ সাল, নেহরু তখন দিল্লিতে অন্তর্বর্তীকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী। আর অখণ্ড বাংলার শাসনের দায়িত্ব পেয়েছিল মুসলিম লিগ এবং মুখ‍্যমন্ত্রী ছিলেন সুরাবর্দি। তাঁর নির্দেশেই ১৬ অগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-র প্রেক্ষিতে কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তী সময়ে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে পরিচিত হয়। কলকাতায় ছিল মহড়া, আর পুরো বিষয়টি কার্যকর করা হয় নোয়াখালিতে। ১৯৩১ সালে কলকাতায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ৩১.৭০ শতাংশ ছিল বাইরের রাজ‍্য থেকে আসা এবং ৩০ শতাংশ ছিল কলকাতার বাইরের জেলাগুলি থেকে আসা লোকজন। ৬০ লক্ষ মানুষের বাস কলকাতায় ছিল ১২০০ জনের পুলিশ বাহিনী, এর মধ্যে মুসলমান ৬৩ জন। এছাড়া ডেপুটি কমিশনার ও একজন ও.সি ছিলেন মুসলমান। মুসলমান দাঙ্গাবাজদের বেশির ভাগ ছিল গ্রাম থেকে আসা লোক। এর মধ্যে ছিল মুসলমান শ্রমিক, কষাই, খালাসি, ছ‍্যাকড়া গাড়ির চালক।

    হিন্দুদের প্রতিরোধে নেতৃত্বে গোপাল

    মুসলিম লিগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজে ভূমিকা ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের শিক্ষিত যুবক, ছাত্র সমাজ ও মধ্যবিত্তদের। ১৯৪৬-এর ১৬ আগস্টের সকালে মুসলিম লিগ যখন অ্যাকশান শুরু করে, তখনও পর্যন্ত কলকাতার হিন্দুরা বিষয়টা বুঝে উঠতে পারেনি। কারণ, ওই দিন বিকেলে কলকাতার তথাকথিত প্রগতিশীল “ধর্মনিরপেক্ষ” হিন্দুরা ময়দানে মনুমেন্টের তলায় মুসলিম লিগ ও ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির যৌথ মিটিং শুনতে গিয়েছিল। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লিগের নেতৃত্বে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ শুরু হলে রুখে দাঁড়ান গোপাল মুখোপাধ্যায় ও তাঁর ভারতীয় জাতীয় বাহিনী। মূলত একার হাতেই সেদিন কলকাতাকে বাঁচিয়েছিলেন তিনি। প্রবাদ হয়ে গিয়েছে গোপাল ছিলেন বলে টালা ট্যাঙ্ক আছে, শিয়ালদহ স্টেশন আছে, আপনি, আমি রয়েছি। আর সেই প্রবাদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উল্টোদিকে এক চিলতে মাংসের দোকান। প্রসঙ্গত ১৯৪৬ সালের ১৬ অগস্ট ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ রুখে ছিলেন যিনি সেই গোপাল মুখোপাধ্যায়েরও পাঁঠার মাংসের দোকান ছিল। যে কারণে গোপাল পাঁঠা নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন। তাঁকে স্মরণ করেই এবার থেকে বেনিয়াপুকুর এলাকার রাস্তার নাম সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ থেকে বদলে হল গোপাল মুখার্জি রোড।

    কেন বদলানো হল রাস্তার নাম?

    রাজ্য বিজেপি এবং বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের মতে, গোপাল মুখোপাধ্যায়ের অবদান দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত হয়েছে। তাঁদের দাবি, কলকাতার ইতিহাসে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি দিতেই এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকদের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ ইতিহাসের জটিল ঘটনাগুলিকে একপাক্ষিকভাবে ব্যাখ্যা করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁদের বক্তব্য, সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নামটি মূলত স্যার হাসান সুরাবর্দির সম্মানে রাখা হয়েছিল, যাঁর পরিচয় তাঁর রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ভাইপোর থেকে আলাদা। এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে খুশি গোপাল মুখোপাধ্যায় তথা গোপাল পাঁঠার পরিবার। তারা বলছে, ‘এক ঐতিহাসিক দিনে, ঐতিহাসিক ভুলের, ঐতিহাসিক সংশোধন হল। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে আমরা খুশি। অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ পরিবারের দাবি, এমন উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া উচিৎ ছিল। আবেগে ভাসছেন তাঁরা।

    রাজনৈতিক তাৎপর্য

    পর্যবেক্ষকদের মতে, রাস্তার নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং ইতিহাস, পরিচয় ও স্মৃতির রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। একপক্ষ এটিকে ‘ঐতিহাসিক সংশোধন’ বলে মনে করছে, অন্যপক্ষের মতে এটি ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যার অংশ। ফলে গোপাল মুখোপাধ্যায়ের নামে রাস্তার নামকরণ শুধুমাত্র একটি নাম পরিবর্তন নয়, বরং বাংলার বিভাজন-পূর্ব ইতিহাস, ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা এবং স্বাধীনতার আগে-পরে রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কথায়, পশ্চিমবঙ্গের ‘প্রকৃত নায়কদের’ স্মরণ এবং ইতিহাসের ‘ভুল সংশোধনের’ সময় এসে গিয়েছে।

LinkedIn
Share