তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
স্কুল থেকে ফিরেই কেউ ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। আবার কেউ বাড়িতে আত্মীয় আসলে, চলে যায় বন্ধুর বাড়ি। আবার কখনও পরীক্ষার আগের রাতে মাথায় যন্ত্রণা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যায় ভোগে! বয়স তাদের ১২ থেকে ১৭! কয়েক বছর আগেও তাদের দুষ্টুমি আর উচ্ছ্বাসে গোটা বাড়ি নাজেহাল হতো। কিন্তু বয়ঃসন্ধিকালের দোড়গোড়ায় আসতেই বদলে যাচ্ছে আচরণ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে। এমনকি বাবা-মায়ের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। যার ফলে একাধিক জটিলতা বাড়ছে। সম্প্রতি ইউনিসেফের এক রিপোর্টে বয়ঃসন্ধিকালে থাকা ছেলেমেয়েদের মানসিক জটিলতা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। যা দেখে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, স্কুল ও পরিবারের মধ্যে আগাম সচেতনতা তৈরি না হলে পরবর্তী প্রজন্মকে আরও বেশি ভুগতে হতে পারে।
কী বলছে ইউনিসেফের রিপোর্ট?
সম্প্রতি ইউনিসেফের প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দেশ জুড়ে একটা সমীক্ষা চালানো হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগের পর্বে অর্থাৎ মূলত বয়ঃসন্ধিকালে থাকা প্রতি ৭ জন ছেলেমেয়ের মধ্যে ১ জন মানসিক জটিলতায় ভুগছে। ওই সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতীয় ছেলেমেয়েদের মধ্যে সামাজিক আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে। বিশেষত ব্যবহারের পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য ভাবে হচ্ছে। সামাজিক মেলামেশার প্রতি অনীহা বা ভয় দেখা দিচ্ছে। অন্যদের সঙ্গে কথা বলার আত্মবিশ্বাস কমছে। নিজের মত প্রকাশ নিয়ে বাড়তি আড়ষ্টতা তৈরি হচ্ছে। সিদ্ধান্তহীনতায় তারা ভুগছে। আর এই সবকিছুই তাদের মনের উপরে গভীর প্রভাব ফেলছে। যার জেরে একাকিত্ব , উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং অবসাদের মতো মানসিক সমস্যা বাড়ছে। কম বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ার অন্যতম কারণ এই মানসিক জটিলতা।
কেন এই সমস্যা হচ্ছে?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বয়ঃসন্ধিকালে থাকা ছেলেমেয়েদের মনের পরিবর্তন স্বাভাবিক। শরীরে একাধিক হরমোনের পরিবর্তন হয়। আর সেই পরিবর্তনের সূত্র ধরেই এই বয়সে মনে নানান জটিলতা তৈরি হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের প্রতি অনীহা, পরিবারের সঙ্গে সমস্যা ভাগ করতে না পারার সমস্যা কিংবা অত্যাধিক দুশ্চিন্তার মতো আচরণ দেখা দিলে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমে রাশ টানা
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, পরিবারের সদস্য কিংবা আত্মীয়দের সঙ্গে কথা না বলার প্রবণতা তৈরি হয় অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের জন্য। তাঁরা জানাচ্ছেন, ছোটো থেকেই বিনোদনের অর্থ হয়ে উঠেছে মোবাইলের স্ক্রিন। নিজের মতো সময় কাটানোই হলো বিনোদন। এটা জেনেই অনেক শিশু বড় হচ্ছে। ঘরে নিজের মতো ভিডিও গেম খেলা বা মোবাইল দেখা সবচেয়ে আনন্দের, এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। ছোটো থেকেই দিনের কিছুটা সময় মা-বাবা কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে কাটানোর অভ্যাস তৈরি জরুরি। পরিবারের সঙ্গে বসে গল্প করা এবং তাঁদের সারাদিন কীভাবে কাটলো, সেই গল্প শোনার অভ্যাস জরুরি। এই ভাবে সময় কাটালে ছোটো থেকেই পরিবারের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হবে। যেকোনও কথা পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায় এই বিশ্বাস গড়ে উঠবে। এরফলে বয়ঃসন্ধিকালে মনের ও শরীরের পরিবর্তনও ছেলেমেয়েরা সহজেই পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নেবে। নিজের সমস্যা ভাগ করতে তখন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। এর ফলে যেকোনো সমস্যা জটিল রূপ নেবে না।
অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, কোয়ালিটি টাইমের অভাব বয়ঃসন্ধিকালে এই ধরনের মানসিক জটিলতার জন্ম দিচ্ছে। অভিভাবকদের সপ্তাহের কিছুটা সময় বয়ঃসন্ধিকালে থাকা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বিশেষ ভাবে কাটানো জরুরি। আধুনিক ব্যস্ত জীবনে সেই ঘাটতি প্রবল ভাবে দেখা দিচ্ছে। এমন কিছু কাজ অভিভাবক ও সেই ছেলেমেয়ের একসঙ্গে করতে হবে, যাতে তাদের পরস্পরের সাহায্য প্রয়োজন। তাঁদের পরামর্শ, সপ্তাহে একদিন সঙ্গে রান্না করা কিংবা বাগানে গাছের পরিচর্যা করা বা ঘর গোছানোর মতো এমন কিছু কাজ। এই ধরনের কাজ একসঙ্গে করলে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় হবে। বয়ঃসন্ধিকালে থাকা ছেলেমেয়েরা সহজেই পরস্পরের সাহায্য সম্পর্কে বুঝতে পারবে। তখন অনেক কথাই সহজে বলতে পারবে। একাকিত্বের মতো সমস্যা তৈরি হবে না।
অতিরিক্ত উদ্বেগ থেকে মানসিক চাপ
কেরিয়ার বা পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ বয়ঃসন্ধিকালে থাকা ছেলেমেয়েদের আরও বেশি মানসিক চাপ তৈরি করছে বলেই জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাঁরা জানাচ্ছেন, এর ফলে স্কুল পড়ুয়ারাও প্যানিক অ্যাটাকের মতো সমস্যায় ভুগছে। অতিরিক্ত চাপ দেওয়া নয়। বরং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর দিকে স্কুল ও পরিবারের নজর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশপাশি নতুন ধরনের পেশা সম্পর্কে তাদের জানানো এবং তাদের থেকেও জানা জরুরি। তাহলে মানসিক উদ্বেগ কমবে।
কেন বয়ঃসন্ধিকালের এই সমস্যা ভবিষ্যতে বিপদ তৈরি করতে পারে?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, বয়ঃসন্ধিকালে উদ্বেগ, একাকিত্ব এবং বিষন্নতার মতো সমস্যা ভবিষ্যতে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সামাজিক যোগাযোগের প্রতি অনীহা তাদের আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি তৈরি করতে পারে। যার প্রভাব ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনেও সূদূর প্রসারিত হয়। তাছাড়া বয়ঃসন্ধিকাল থেকে একাকিত্ব গ্রাস করলে একধরণের অবসাদ তৈরি হয়। সিদ্ধান্তহীনতার জন্ম নেয়। যার ফলে যেকোনো কাজের দক্ষতা কমে। পড়াশোনা ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ে। তাই বয়ঃসন্ধিকালের সন্তানের কী ধরনের মানসিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে, সেই দিকে নজর রাখা জরুরি বলেই জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ।
কীভাবে খেয়াল রাখবেন?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সন্তানের আচরণের পরিবর্তন নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ ঘরে নিজের মতো থাকার অভ্যাস একেবারেই স্বাস্থ্যকর নয়। সেই নিয়ে আগাম সচেতনতা জরুরি। তাছাড়া তার বন্ধুদের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক, সেই সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল থাকা প্রয়োজন। তাহলে তার আচরণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করা যেতে পারে। পরিবারের পাশপাশি বয়ঃসন্ধিকালে থাকা ছেলেমেয়েদের নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের বাড়তি যত্ন জরুরি বলেই মনে করছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁরা জানাচ্ছেন, এই বয়সের ছেলেমেয়েরা দিনের অনেকটা সময় স্কুলে কাটায়। তাই তাদের আচরণ সম্পর্কে স্কুল সবচেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল হয়। তাদের আচরণ নিয়ে কোনো বাড়তি সমস্যা তৈরি হলে পরিবারকে জানানো, প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তাহলেই পরিস্থিতি জটিল হবে না।






