তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
দেশ জুড়ে বাড়ছে বিপদ! রোগের বোঝা পাহাড় প্রমাণ! কিন্তু তারপরেও হুঁশ ফিরছে না। বরং ‘নতুন ফাঁদে’ জড়িয়ে পড়ছে তরুণ প্রজন্মের একাংশ। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সতর্ক না হলে সমস্যা আরও জটিল হবে। ওয়ার্ল্ড নো টোবাকো ডে-তে তাই চলতি বছরের স্লোগান হল— ‘‘Unmasking The Appeal’’।
কোন নতুন ফাঁদের কথা জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা?
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বিশ্ব জুড়ে তামাক প্রস্তুতকারী সংস্থারা নতুন ভাবে নিজেদের উপস্থাপন করছেন। একাধিক তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন হচ্ছে নয়া কায়দায়। এর ফলে সরাসরি সেটা তামাকজাত পণ্য মনে না হলেও, আসলে সেটা তামাকজাত দ্রব্য। যা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। তাঁরা জানাচ্ছেন, একাধিক তামাকজাত দ্রব্যের বর্তমানে নানান সুগন্ধী পানমশলা হিসাবে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। একঘেয়েমি কাটাতে খাওয়া যেতে পারে, এমন ভাবেও নানা রকম তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন চলছে। এগুলো সম্পর্কে সতর্ক করতে না পারলেই বিপদ আরও বাড়বে, বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, চলতি বছরে তাই এই দিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তামাকজাত পণ্যের এই নতুন চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন, আসলে কতখানি ক্ষতিকারক সে সম্পর্কে সর্বস্তরে সচেতন করা জরুরি। সেই সম্পর্কেই আরও বেশি কর্মসূচি নেওয়া হবে
কেন এই নতুন ফাঁদ বিপদ বাড়াচ্ছে?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, ভারতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য সেবনের প্রবণতা মারাত্মক বেশি। একাধিক সরকারি সমীক্ষার রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, ভারতের ৪৮ শতাংশ পুরুষ এবং ২১ শতাংশ মহিলা তামাক সেবন করেন। প্রতি বছর ১৪ লাখ মানুষ তামাকজাত দ্রব্যের সেবনের জন্য মারা যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে তামাকের ক্ষতিকারক দিক নিয়ে আরো বেশি আলোচনা এবং সচেতনতা জরুরি। কিন্তু সম্প্রতি তামাকজাত দ্রব্য নতুন ভাবে বাজারে দাপট বাড়াচ্ছে। সুগন্ধী পান মশলা হিসাবে অনেকেই এই তামাকজাত দ্রব্য কিনছেন। খাচ্ছেন। এরপরে আসক্তি তৈরি হচ্ছে। অজান্তেই অনেকেই তামাকাসক্ত হয়ে পড়ছেন। তাই এই নতুন ধরনের পণ্যের সত্যতা জানা জরুরি। চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, সচেতনতা বাড়লে, তবেই এই ধরনের পান মশলা জাতীয় দ্রব্য খাওয়ার আগে মানুষ ভালোভাবে বিবেচনা করতে পারবে। তাই এই নতুন বিজ্ঞাপনের ফাঁদ সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি।
তামাকজাত দ্রব্য নিয়ে কেন উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা?
- ● চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, ভারতে যেসব ক্যান্সারে মৃত্যু হার সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে অন্যতম হলো ফুসফুসের ক্যান্সার। প্রতি বছর কয়েক লাখ ভারতীয় ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং মারা যান। অধিকাংশ ক্যান্সার আক্রান্তের নিয়মিত তামাকজাত দ্রব্য যেমন গুটখা কিংবা সিগারেট, বিড়ির মতো তামাজাত দ্রব্য ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। এ দেশে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ধূমপান, তামাকজাত দ্রব্যের সেবন।
- ● ফুসফুসের পাশপাশি ভারতে মুখ ও গলার ক্যান্সার মারাত্মক হারে বাড়ছে। ভারতীয় ক্যান্সার আক্রান্ত পুরুষদের এক তৃতীয়াংশ মুখ ও গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ব্যয়বহুল দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা করানোর পরেও সকলে পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পান না। আবার অনেকেই সময়ের আগেই জীবন হারিয়ে ফেলেন। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, মুখ ও গলার ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও অন্যতম কারণ তামাকজাত দ্রব্য সেবন।
- ● তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ধূমপান এবং গুটখার মতো তামাকজাত দ্রব্য সেবনের প্রবণতা বাড়ছে। তাই ভারতে স্ট্রোক ও হৃদরোগের সমস্যাও বাড়ছে। কম বয়সিদের মধ্যে এই ধরনের অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস বাড়ার জেরেই তিরিশের চৌকাঠ পেরনোর পরেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পাশপাশি স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকের মতো বিপদও বাড়ছে।
- ● ধূমপান ফুসফুসের পাশপাশি লিভার এবং কিডনির কার্যক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে শরীরে একাধিক রোগ ও সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
- ● দেশজুড়ে নিউমোনিয়ার দাপট বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধূমপান করার জেরে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তাই নিউমোনিয়ার মতো সংক্রামক রোগ বাড়ছে।
- ● এছাড়া তামাকজাত আসক্তি বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। গর্ভাবস্থায় নানান জটিলতা তৈরি করে।
স্কুল স্তর থেকেই সচেতনতা জরুরি
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, দেশের কম বয়সি ছেলেমেয়েদের তামাক আসক্তি সুস্থ জীবন যাপনের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে উঠছে। যে নিজে তামাকজাত দ্রব্য সেবন করছে, তার যেমন একাধিক শারীরিক সমস্যা হতে পারে, তার আশপাশে যারা থাকছেন, তাদের জন্য তামাক বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তাই তামাকজাত দ্রব্য নিয়ে স্কুল স্তর থেকেই সচেতনতা জরুরি। যাতে বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই ছেলেমেয়েরা এই সম্পর্কে সজাগ থাকতে পারে।
