মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দীর্ঘ ৪০ বছর পর নিউজিল্যান্ডে পা পড়ল ভারতের কোন প্রধানমন্ত্রীর (PM Modi in New Zealand)। শুক্রবার অকল্যান্ডে পৌঁছলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন। এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে মনে করা হচ্ছে। এই সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদিও। ১৯৮৬ সালের পর কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিউজিল্যান্ড সফর করেননি। এই দীর্ঘ বিরতির পর মোদির সফর দুই দেশের মধ্যে পুরনো বন্ধুত্বকে নতুন করে চাঙ্গা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে সফরের শুরু হয়। দুই নেতা হাত মিলিয়ে কথা বলেন এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
‘ঐতিহাসিক’ সফর আখ্যা মোদির
অকল্যান্ডে পা রাখার পরেই নিজের নিউজিল্যান্ড সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ বললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম X-এ একটি পোস্টে তিনি নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সনকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানানোর জন্য ধন্যবাদ দেন। তিনি লেখেন, “কিছুক্ষণ আগেই অকল্যান্ডে পৌঁছলাম। বিমানবন্দরে স্বাগত জানানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী লাক্সনকে ধন্যবাদ। এই সফর ঐতিহাসিক, কারণ চার দশক পর কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিউজিল্যান্ডে এলেন।” নিজের পোস্টের সঙ্গে সফরের কিছু ছবিও শেয়ার করেন মোদি। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং অকল্যান্ডে কমিউনিটি ভাষণ নিয়ে নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী লাক্সনের সঙ্গে ভারত-নিউজিল্যান্ড বন্ধুত্বের সব দিক নিয়ে আলোচনার জন্য আমি মুখিয়ে আছি। আগামী কাল অকল্যান্ডে একটি কমিউনিটি অনুষ্ঠানেও ভাষণ দেব।” শুক্রবার অকল্যান্ডে বিমান থেকে নামার পরেই প্রধানমন্ত্রী মোদিকে স্বাগত জানান নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন। দুই নেতা একে অপরকে উষ্ণ আলিঙ্গন করেন। লাক্সনের আমন্ত্রণেই মোদির এই সফর। দীর্ঘ ৪০ বছর পর এটিই নিউজিল্যান্ডে কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সরকারি সফর।
প্রধানমন্ত্রী মোদির কর্মসূচি
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, অকল্যান্ডে দুই প্রধানমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসবেন। গত দু’বছরে দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতি, বিশেষ করে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে কতটা উন্নতি হয়েছে, তা পর্যালোচনা করে দেখবেন তাঁরা। বিদেশ মন্ত্রক আরও জানিয়েছে, অকল্যান্ডে থাকাকালীন প্রধানমন্ত্রী মোদি সেখানকার বিশিষ্ট শিল্পপতি ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের সঙ্গেও কথা বলবেন। ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে মজবুত সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে তিনি প্রবাসী ভারতীয়দের এক বড় সমাবেশে ভাষণও দেবেন। এই বছরের এপ্রিলে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement) সই হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী মোদির এই সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন গতি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ ক্রিস্টোফার লাক্সন যখন ভারত সফরে এসেছিলেন, তখন দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে নয়াদিল্লিতে বৈঠক হয়েছিল।
ভারত-নিউজিল্যান্ড ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট
সফরের সবচেয়ে বড় খবর হল ভারত-নিউজিল্যান্ড ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (FTA) নিয়ে অগ্রগতি। দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরে এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হওয়ায় উভয় দেশই উচ্ছ্বসিত। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হলে দুই দেশের বাণিজ্য অনেক বেড়ে যাবে। বিশেষ করে কৃষি পণ্য, দুগ্ধজাত দ্রব্য, আইটি সেবা, শিক্ষা এবং পর্যটন খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস লাক্সন বলেন, “ভারত আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। প্রধানমন্ত্রী মোদির সফর আমাদের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এফটিএ চুক্তি দুই দেশের অর্থনীতির জন্য গেম চেঞ্জার হবে।” অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, “নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যিক নয়, সাংস্কৃতিক ও মানুষের মধ্যে সংযোগও গভীর। এই সফর সেই বন্ধনকে আরও মজবুত করবে।” দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে কয়েক বিলিয়ন ডলারের। ভারত নিউজিল্যান্ড থেকে দুধ, মাংস, ফলমূল এবং ওয়াইন আমদানি করে, অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড ভারত থেকে ওষুধ, আইটি সেবা, টেক্সটাইল এবং মেশিনারি পায়। চুক্তির ফলে শুল্ক হ্রাস পাবে, যা উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য লাভজনক হবে। সফরের এজেন্ডায় শুধু বাণিজ্য নয়, প্রতিরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষা এবং প্রযুক্তি সহযোগিতাও রয়েছে।
বিনা শুল্কে বাণিজ্য
ইতিমধ্যেই নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত ভারত–নিউজিল্যান্ড বাণিজ্য চুক্তি (India New Zealand Trade Deal) কার্যকর হলে প্রথম দিন থেকেই নিউজিল্যান্ডের ভারতের উদ্দেশে রফতানির ৫৭ শতাংশ পণ্যের ওপর কোনও শুল্ক (ট্যারিফ) থাকবে না। সামাজিক মাধ্যম এক্স (X)-এ পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন বলেন, এই বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে নিউজিল্যান্ডের ব্যবসায়ীদের জন্য ভারতের বিশাল বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। ভারত সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মোদির এই সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং বিভিন্ন কৌশলগত ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত–নিউজিল্যান্ড দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দফতর।
ইন্দো-প্যাসিফিক সফরের শেষ পর্ব
নিউজিল্যান্ড সফরটি প্রধানমন্ত্রী মোদির তিন দেশব্যাপী ইন্দো-প্যাসিফিক সফরের শেষ পর্যায়। এর আগে তিনি ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া সফর করেছেন। এই সফরের মূল লক্ষ্য ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করা। বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, নির্ভরযোগ্য সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন), উদীয়মান প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি এবং একটি মুক্ত, উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক গড়ে তোলার লক্ষ্যকেও এই সফরে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে ভারত এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বৈচিত্র্যময় করা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করার দিকে জোর দিচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী মোদির নিউজিল্যান্ড সফর এবং সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তিকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
