মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আগামী মাসের জন্য রাশিয়ার থেকে প্রায় ৬ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল কিনেছে ভারত (India Russian oil purchase), এমনই দাবি করেছে একটি আন্তর্জাতিক রিপোর্ট। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিক হয়নি। ফলে তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটাতে এই বড় পরিমাণ তেল কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জানা গিয়েছে, ব্রেন্ট ক্রুডের তুলনায় প্রতি ব্যারেলে ৫ থেকে ১৫ ডলার বেশি দামে এই তেল কেনা হয়েছে, যা বাজারে সরবরাহের টানাপোড়েন ও উচ্চ চাহিদারই ইঙ্গিত দেয়।
রুশ বাজারে ফিরল ভারত
এই কেনাকাটা সম্ভব হয়েছে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ৩০ দিনের একটি বিশেষ ছাড়ের কারণে। মার্চের শুরুর আগে যেসব রুশ তেলবাহী জাহাজে তেল তোলা হয়েছিল, সেগুলির ডেলিভারি নেওয়ার অনুমতি দেয় ওয়াশিংটন। পরে এই ছাড়ের সময়সীমা আরও বাড়ানো হয়, যাতে হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থার প্রভাব কিছুটা কমানো যায়। গত ডিসেম্বরের পর থেকে মার্কিন চাপের কারণে ভারতীয় রিফাইনারিগুলি রুশ তেল কেনা কমিয়ে দিয়েছিল। তবে বর্তমানে আবারও সেই বাজারে ফিরেছে হিন্দুস্থান মিত্তল এনার্জি লিমিটেড (Hindustan Mittal Energy Ltd) এবং ম্যাঙ্গালোর রিফাইনারি পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেড (Mangalore Refinery & Petrochemicals Ltd)-এর মতো সংস্থাগুলি।
লাভবান রাশিয়া
সাম্প্রতিক মাসগুলিতে ভারত সৌদি আরব ও ইরাক থেকেও তেল আমদানি বাড়িয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু হওয়ার পর পারস্য উপসাগরে বহু তেলবাহী জাহাজ আটকে পড়ে, যার ফলে সরবরাহে আরও চাপ তৈরি হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ মহলের ধারণা, হরমুজ প্রণালীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন ছাড় বলবৎ থাকতে পারে। এদিকে, ভারতের মতো বড় ক্রেতার চাহিদা বাড়ায় রাশিয়াও লাভবান হচ্ছে। ইউক্রেন সংঘাত শুরুর পর ২০২২ সালের মার্চের পর থেকে এবারই রাশিয়ার তেল রফতানি থেকে সর্বোচ্চ আয় হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
বিকল্প উৎসের সন্ধানে ভারত
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। দেশের মোট খনিজ তেলের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে বিদেশ থেকে। ফলে কোনও একটি দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী দেশ ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে সেই আমদানিতে বহুবার বাধা এসেছে। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত এখন ভেনেজুয়েলার মতো বিকল্প উৎস থেকেও তেল আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। বর্তমানে ভারত তার জ্বালানি আমদানির উৎসকে বহুমুখী করে তুলেছে। অর্থাৎ, একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে তেল ও গ্যাস সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রাশিয়া। এ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং কুয়েত ভারতের জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বিশেষ করে ইরাক বহু বছর ধরেই ভারতের অন্যতম প্রধান তেল রফতানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত।
আমদানির বৈচিত্র্যই ভারতের বড় শক্তি
শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নয় ভারতের তেল আমদানি। আমেরিকা থেকেও এখন বিপুল পরিমাণে তেল ও গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে। শেল অয়েল বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাজারে বড় খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আফ্রিকার নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলার মতো দেশ থেকেও তেল কেনে ভারত। শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নয় ভারতের আমদানি। আমেরিকা থেকেও এখন বিপুল পরিমাণে তেল ও গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে। শেল অয়েল বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাজারে বড় খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আফ্রিকার নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলার মতো দেশ থেকেও তেল কেনে ভারত। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি আমদানির এই বৈচিত্র্যই ভারতের বড় শক্তি। এপ্রিল মাসে ভেনেজুয়েলা থেকে প্রায় ৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানির সম্ভাবনা রয়েছে, যা ২০২০ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে একক কোনও অঞ্চলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে ভারত।
কেন্দ্রের প্রচেষ্টায় ভারতে সরবরাহ চলছে
বিশ্ববাজারে অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও ভারতে তেল ও গ্যাস সরবরাহ চলছে। সম্প্রতি রুশ তেলবোঝাই ট্যাঙ্কার ‘মাউন্ট অ্যাকুয়া টাইটান’ ২২ মার্চ ভারতের উপকূলে পৌঁছেছে এবং ম্যাঙ্গালুরুর কাছে আরব সাগরে নোঙর করে রয়েছে। একই সময়ে টেক্সাস থেকে এলপিজি বোঝাই একটি কার্গো জাহাজও নিউ ম্যাঙ্গালোর বন্দরে পৌঁছেছে, যা জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, দেশের কোনও বন্দরে জট তৈরি হয়নি এবং পারস্য উপসাগর এলাকায় থাকা ২২টি ভারতীয় জাহাজ ও ৬১১ জন নাবিক নিরাপদ রয়েছেন। পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে কেন্দ্র। বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা জানিয়েছেন, সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে ১৪ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল ও এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে কিছু চার্জ মকুব করেছে নিউ ম্যাঙ্গালোর বন্দর কর্তৃপক্ষ। উল্লেখ্য, ‘জাগ লাডকি’ নামের একটি ভারতীয় ট্যাঙ্কার সফলভাবে গুজরাটের মুন্দ্রা বন্দরে পৌঁছেছে। পাশাপাশি ‘শিবালিক’ ও ‘নন্দা দেবী’ নামের এলপিজি বাহক জাহাজও হরমুজ প্রণালী পার হয়ে ভারতে পৌঁছেছে, যা সরকারি সহায়তায় দেশে জ্বালানি আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় থাকারই প্রমাণ।
