মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মে মাসের ৭ থেকে ১০ তারিখের সংঘাতকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ‘জয়’ হিসেবে তুলে ধরলেও রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে (UNGA) সেই দাবিকে তীব্র কটাক্ষ করল ভারত। ভারতের বক্তব্য, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় পাকিস্তানের একাধিক বিমানঘাঁটি ও সামরিক পরিকাঠামোর যে ক্ষয়ক্ষতির ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, তা পাকিস্তানের ‘জয়’-এর দাবির সঙ্গে একেবারেই মেলে না। ৮০তম রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ‘রাইট অব রিপ্লাই’-এর মাধ্যমে ভারতের বক্তব্য তুলে ধরেন রাষ্ট্রসংঘে ভারতের স্থায়ী মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি পেটাল গেহলট। তিনি বলেন, “ধ্বংস হওয়া রানওয়ে এবং পুড়ে যাওয়া হ্যাঙ্গার যদি জয় বলে মনে হয়, তা হলে পাকিস্তান সেই জয় উপভোগ করতেই পারে।”
পাকিস্তানের ‘জয়ের’ দাবি নিয়ে ভারতের পাল্টা বক্তব্য
রাষ্ট্রসংঘে নিজের ভাষণে শাহবাজ শরিফ মে মাসের সামরিক সংঘাতে পাকিস্তান জয়ী হয়েছে বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান যুদ্ধ জিতেছে এবং এখন তারা শান্তি জিততে চায়। ভারতের সঙ্গে সমস্ত অমীমাংসিত বিষয়ে আলোচনার কথাও বলেন তিনি। এর জবাবে গেহলট বলেন, সংঘাতের ঘটনাপ্রবাহ পাকিস্তানের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর বক্তব্য, ৯ মে পর্যন্ত পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে আরও হামলার হুমকি দিচ্ছিল। কিন্তু ১০ মে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী সরাসরি ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংঘর্ষ বন্ধের আবেদন জানায়। ভারতের প্রতিনিধি আরও অভিযোগ করেন, অতীতের মতোই ভারতীয় সাধারণ নাগরিকদের উপর একটি সন্ত্রাসবাদী হামলার সঙ্গে পাকিস্তানের যোগ ছিল। ভারত তার নাগরিকদের সুরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করেছে।
‘সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিতে হামলার ছবি তার প্রমাণ’
অপারেশন সিঁদুরে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোয় ভারতীয় হামলার প্রসঙ্গও রাষ্ট্রসংঘে তুলে ধরেন গেহলট। তাঁর দাবি, বাহাওয়ালপুর ও মুরিদকে সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিতে ভারতীয় হামলার পর নিহত জঙ্গিদের ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। তিনি বলেন, “একটি ছবি হাজার কথার সমান।” তাঁর অভিযোগ, পাকিস্তানের সামরিক ও অসামরিক আধিকারিকরা যেসব সন্ত্রাসবাদীকে প্রকাশ্যে সম্মান জানিয়ে থাকেন, তা পাকিস্তানের নীতির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ভারতের বক্তব্যে পাকিস্তানে ওসামা বিন লাদেনের দীর্ঘদিন অবস্থানের প্রসঙ্গও উঠে আসে। পাশাপাশি পাকিস্তানের কয়েকজন মন্ত্রীর সন্ত্রাসবাদী শিবির নিয়ে করা মন্তব্যের উল্লেখ করে গেহলট ইসলামাবাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে ভারতের বক্তব্য, সন্ত্রাসবাদী এবং তাদের মদতদাতাদের আলাদা করে দেখা হবে না। একইসঙ্গে পারমাণবিক হুমকির আড়ালে সন্ত্রাসবাদ চালানোর কোনও সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান।
শাহবাজের বক্তব্য ‘নাটক’
কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভারতকে আক্রমণ করার পর রাষ্ট্রসংঘে তারও জবাব দেয় নয়াদিল্লি। গেহলট বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল “অযৌক্তিক নাটক”। তাঁর দাবি, কোনও ধরনের রাজনৈতিক নাটক বা মিথ্যা তথ্য বাস্তব ঘটনাকে আড়াল করতে পারে না। ভারতের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, পহেলগাঁওয়ে ২৬ জন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যুর পর পাকিস্তান ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাদের আড়াল করেছিল। ভারতীয় পক্ষ ওই সংগঠনকে পাকিস্তান-সমর্থিত বলে দাবি করেছে।
শান্তি চাইলে সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো বন্ধ করতে হবে
শাহবাজ শরিফ ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে শান্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও ভারত জানিয়ে দিয়েছে, শান্তির পথ নিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট। গেহলট বলেন, পাকিস্তান যদি সত্যিই ভারতের সঙ্গে শান্তি চায়, তা হলে অবিলম্বে সন্ত্রাসবাদী প্রশিক্ষণ শিবির বন্ধ করতে হবে। দিল্লির নিশানায় থাকা সন্ত্রাসবাদীদের ভারতের হাতে তুলে দিতে হবে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও জনপরিসরের বক্তব্য নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, “ঘৃণা, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতায় ডুবে থাকা একটি দেশ” রাষ্ট্রসংঘে ধর্মীয় সহনশীলতা নিয়ে অন্য দেশকে উপদেশ দিচ্ছে—বিষয়টি “অত্যন্ত পরিহাসের”।
তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা নয়, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনও দেশের মধ্যস্থতার সম্ভাবনাও ফের খারিজ করেছে নয়াদিল্লি। গেহলট বলেন, ভারত ও পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই একমত যে দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলি দ্বিপাক্ষিকভাবেই সমাধান করা হবে। তাই এ ক্ষেত্রে কোনও তৃতীয় পক্ষের ভূমিকার জায়গা নেই—এটাই ভারতের দীর্ঘদিনের জাতীয় অবস্থান। অন্যদিকে শাহবাজ শরিফ দাবি করেছেন, পাকিস্তান শক্তিশালী অবস্থান থেকেই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের “সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্ব”-এর প্রশংসা করেন। তবে ভারত বরাবরই বলে এসেছে, সংঘর্ষ বন্ধের বিষয়ে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি অপারেশনসের (DGMO) মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমেই সমঝোতা হয়েছিল।
অপারেশন সিঁদুরের প্রেক্ষাপট
২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে ২৬ জন সাধারণ নাগরিক নিহত হওয়ার পর ৭ মে ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে ভারত। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী পরবর্তীতে পাকিস্তানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোয় হামলার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে। ভারতের দাবি অনুযায়ী, মুরিদকে ও বাহাওয়ালপুরের সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো ছাড়াও পাকিস্তানের একাধিক বিমানঘাঁটি, রাডার, গোলাবারুদ ভাণ্ডার এবং কমান্ড ও কন্ট্রোল কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। মে মাসে এক সাংবাদিক বৈঠকে এয়ার মার্শাল এ কে ভারতী পাকিস্তানের নূর খান বিমানঘাঁটির বিস্ফোরণের ছবি এবং রহিম ইয়ার খান বিমানঘাঁটির ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়ের দৃশ্য প্রকাশ করেছিলেন। ভারতীয় পক্ষের দাবি, করাচির মালির ক্যান্টনমেন্টের কাছাকাছি এলাকাতেও সামরিক স্থাপনায় নির্দিষ্ট হামলা চালানো হয়েছিল।
পাকিস্তানের ‘জয়’-এর দাবি খারিজ
ভারতের দাবি, অপারেশন সিঁদুরে লস্কর-ই-তইবা (LeT), জইশ-ই-মহম্মদ (JeM) এবং হিজবুল মুজাহিদিনের একাধিক সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটি ধ্বংস করা হয় এবং ১০০-রও বেশি জঙ্গি নিহত হয়। পাকিস্তান পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালেও ভারত সেগুলির অনেকগুলি প্রতিহত করে এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় বলে নয়াদিল্লির দাবি। চার দিনের এই সামরিক উত্তেজনার অবসান ঘটে ১০ মে। ভারতীয় পক্ষের বক্তব্য, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পরই সংঘর্ষ বন্ধ হয়। রাষ্ট্রসংঘে ভারতের সাম্প্রতিক বক্তব্যে মূলত সেই ঘটনাপ্রবাহই তুলে ধরে পাকিস্তানের ‘জয়’-এর দাবি খারিজ করার চেষ্টা করা হয়েছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, প্রকাশ্যে আসা সামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির ছবি ও অন্যান্য তথ্য পাকিস্তানের বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
