Tag: India Russia Defence Cooperation

  • Modi Putin Meeting: এস-৪০০, এসইউ-৫৭ থেকে ব্রহ্মোস— শুক্রবার মোদি-পুতিন বৈঠকে প্রতিরক্ষায় হতে পারে বড় সিদ্ধান্ত

    Modi Putin Meeting: এস-৪০০, এসইউ-৫৭ থেকে ব্রহ্মোস— শুক্রবার মোদি-পুতিন বৈঠকে প্রতিরক্ষায় হতে পারে বড় সিদ্ধান্ত

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দিল্লিতে মুখোমুখি বৈঠকে বসতে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই বৈঠক হতে চলেছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আগে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব। প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, জ্বালানি, পরমাণু সহযোগিতা থেকে শুরু করে পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি—একাধিক বিষয়ে আলোচনা হতে পারে দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে।

    মোদি-পুতিন বৈঠকে বড় অংশ জুড়ে থাকবে প্রতিরক্ষা

    তবে মোদি-পুতিন বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাই বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ উন্নয়নের দিকে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাশিয়ার এসইউ-৫৭ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এবং ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পরবর্তী পর্যায়।

    এস-৪০০-এর শেষ ইউনিট কবে? বড় প্রশ্ন বৈঠকে

    মোদি-পুতিন আলোচনায় সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম হতে পারে এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাকি থাকা শেষ ইউনিটের সরবরাহ। ২০১৮ সালে প্রায় ৫.৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তিতে রাশিয়ার কাছ থেকে পাঁচটি এস-৪০০ ব্যবস্থা কেনার সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। এর মধ্যে চারটি ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই ভারতে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পঞ্চম এবং শেষ ইউনিটের সরবরাহে বিলম্ব হয়েছে।

    তবে মস্কো যে চুক্তির প্রতিশ্রুতি পূরণে এখনও দায়বদ্ধ, তা স্পষ্ট করেছে ক্রেমলিন। সম্প্রতি ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও জানিয়েছেন, রাশিয়া চুক্তি অনুযায়ী নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে। ভারতের জন্য এস-৪০০-এর গুরুত্বও যথেষ্ট বেশি। দীর্ঘ পাল্লায় বিমান এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের মতো আকাশপথের হুমকি শনাক্ত ও প্রতিহত করার ক্ষমতার কারণে এটি ভারতের বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে শেষ এস-৪০০ ইউনিটের সরবরাহের সময়সূচি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

    এসইউ-৫৭: শুধু যুদ্ধবিমান কেনা নয়, প্রযুক্তি হস্তান্তরেও নজর ভারতের

    মোদি-পুতিন বৈঠকে আরেকটি বড় বিষয় হতে পারে রাশিয়ার এসইউ-৫৭ পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান। ভারতের বাজারে এসইউ-৫৭-কে দীর্ঘদিন ধরেই তুলে ধরছে মস্কো। কিন্তু ভারতের আগ্রহ শুধু সরাসরি যুদ্ধবিমান কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর, দেশে উৎপাদন এবং ভারতীয় অস্ত্র ও প্রযুক্তির সঙ্গে রুশ যুদ্ধবিমানের সংযুক্তি—এই বিষয়গুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

    ভারত গত কয়েক বছরে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এসইউ-৫৭ নিয়ে কোনও সম্ভাব্য চুক্তি হলে তার মূল্যায়ন শুধু কতগুলি বিমান কেনা হবে, সেই প্রশ্নে আটকে থাকবে না। ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—কতটা প্রযুক্তি দেশে আসবে, উৎপাদনে ভারতীয় সংস্থাগুলির ভূমিকা কতটা থাকবে এবং ভবিষ্যতে এই যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে ভারত কতটা স্বাধীনতা পাবে। অর্থাৎ, এসইউ-৫৭ নিয়ে আলোচনা হলে তা ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্ক থেকে প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হতে পারে।

    ব্রহ্মোসে এবার নতুন ক্ষমতা, নতুন বাজারের লক্ষ্য

    ভারত ও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সবচেয়ে সফল উদাহরণগুলির একটি হল ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। দুই দেশ যৌথভাবে তৈরি করা এই ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যেই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছে। এবার ব্রহ্মোসের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

    ক্রেমলিনের তরফে ইতিমধ্যেই ব্রহ্মোসের উন্নয়ন এবং নতুন ক্ষমতা যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সামনে আসছে ব্রহ্মোস-এনজি—বর্তমান ব্রহ্মোসের তুলনায় ছোট ও হালকা সংস্করণ।এই কমপ্যাক্ট সংস্করণের অন্যতম সুবিধা হতে পারে আরও বেশি সংখ্যক যুদ্ধবিমানে এটিকে সংযুক্ত করার সুযোগ। ভারতের দেশীয় তেজস-এর মতো তুলনামূলক হালকা যুদ্ধবিমানেও এর ব্যবহার সম্ভব হলে ভারতীয় বিমানবাহিনীর আকাশভিত্তিক আক্রমণক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।

    শুধু ভারতীয় বাহিনীর প্রয়োজন নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও ব্রহ্মোসের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার দিকে নজর রয়েছে দুই দেশের। যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং তৃতীয় দেশে রফতানি—এই মডেল ভবিষ্যতে ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

    ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের নতুন মডেল: অস্ত্র কেনা থেকে যৌথ উৎপাদন

    ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর বিপুল সংখ্যক প্ল্যাটফর্ম ও অস্ত্র ব্যবস্থার সঙ্গে রুশ প্রযুক্তির দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্কের চরিত্রও বদলাচ্ছে। ভারত এখন চায় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির পাশাপাশি দেশের মাটিতে উৎপাদন, প্রযুক্তি অর্জন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে।

    অন্যদিকে, রাশিয়াও শুধুমাত্র অস্ত্র বিক্রির পরিবর্তে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি ভাগাভাগি, উৎপাদন এবং তৃতীয় দেশের বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী।  ব্রহ্মোস এই পরিবর্তিত মডেলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিশেষ করে ফিলিপিন্স ব্রহ্মোসের প্রথম বিদেশি ক্রেতা হওয়ার পর ভারতীয় প্রতিরক্ষা রফতানির ক্ষেত্রেও এই প্রকল্পের গুরুত্ব বেড়েছে।

    ইউক্রেন যুদ্ধের পরও কেন গুরুত্বপূর্ণ রাশিয়া?

    রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে মস্কোর সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় সরবরাহ এবং রসদ সংক্রান্ত নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ভারত তার প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। তারপরও রাশিয়া ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার।

    এই বাস্তবতায় মোদি-পুতিন বৈঠকের গুরুত্ব শুধু নতুন কোনও অস্ত্র চুক্তির সম্ভাবনায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং পুরনো চুক্তিগুলির বাস্তবায়ন, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার কাঠামো—সবই আলোচনায় আসতে পারে। বিশেষ করে এস-৪০০-এর শেষ ইউনিটের সরবরাহ এবং ভবিষ্যতের যৌথ উৎপাদন প্রকল্পগুলি নিয়ে স্পষ্টতা দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের পরবর্তী দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

    ব্রিকসের আগে মোদি-পুতিন বৈঠক, নজরে ভূ-রাজনীতিও

    ১১ সেপ্টেম্বর মোদি-পুতিন বৈঠকের পরই ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে বসবে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সেখানে বিশ্বের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনেতার উপস্থিতি প্রত্যাশিত। তাঁদের মধ্যে থাকবেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও। ফলে মোদি-পুতিন বৈঠককে শুধু দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা আলোচনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ছবির একটি বড় অংশ বাদ পড়বে।

    প্রতিরক্ষার পাশাপাশি বাণিজ্য, জ্বালানি, পরমাণু সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আসতে পারে এই বৈঠক থেকে।

    প্রতিরক্ষায় দ্বিপাক্ষিক প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতায় জোর

    এস-৪০০-এর বাকি সরবরাহ, এসইউ-৫৭-এর প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ব্রহ্মোসের নতুন সংস্করণ ও রফতানি—তিনটি বিষয়ই আলাদা হলেও এর মধ্যে একটি অভিন্ন সূত্র রয়েছে। সেটি হল—ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে শুধুমাত্র অস্ত্র কেনাবেচার সম্পর্ক থেকে আরও গভীর প্রযুক্তিগত ও শিল্প সহযোগিতার দিকে নিয়ে যাওয়া। মোদি-পুতিন বৈঠকে সেই পরিবর্তনের কতটা স্পষ্ট রূপরেখা সামনে আসে, এখন সেদিকেই নজর প্রতিরক্ষা মহলের।

  • BrahMos-II Hypersonic Missile: ছোট হাইপারসনিক ব্রহ্মস বানাতে হাত মেলাল ভারত-রাশিয়া, কাঁপছে শত্রুশিবির

    BrahMos-II Hypersonic Missile: ছোট হাইপারসনিক ব্রহ্মস বানাতে হাত মেলাল ভারত-রাশিয়া, কাঁপছে শত্রুশিবির

    সুশান্ত দাস

    ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অন্যতম সফল প্রকল্প ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র এবার আরও আধুনিক রূপ পেতে চলেছে। দুই দেশ যৌথভাবে ব্রহ্মসের ছোট আকারের হাইপারসনিক সংস্করণ (BrahMos-II) তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভারতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ। এই নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে আরও দ্রুত, দূরপাল্লার এবং বহুমাত্রিক আঘাত হানার সক্ষমতা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। ব্রহ্মসের প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আলিপভ বলেন, “ব্রহ্মস ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার এক প্রতীকী উদাহরণ। বর্তমানে এর ছোট এবং হাইপারসনিক সংস্করণ তৈরির কাজ চলছে, যা ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর মাল্টি-ডোমেন স্ট্রাইক ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।”

    কী এই ব্রহ্মস?

    ব্রহ্মস হল ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল। ব্রহ্মপুত্র এবং মস্কভা নদীর নামের সংমিশ্রণ থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘ব্রহ্মস’। বর্তমানে এটি বিশ্বের দ্রুততম কার্যকর সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলির অন্যতম। ব্রহ্মস অ্যারোস্পেসের তথ্য অনুযায়ী, এই ক্ষেপণাস্ত্র স্থল, সমুদ্র, আকাশ এবং সাবমেরিন— সব ধরনের প্ল্যাটফর্ম থেকেই উৎক্ষেপণ করা যায়। ভারতীয় সেনা, নৌবাহিনী এবং বায়ুসেনা— তিন বাহিনীর কাছেই এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতীয় বায়ুসেনার সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান থেকে ব্রহ্মসের বিমান-উৎক্ষেপণযোগ্য সংস্করণ সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন থেকেও এর বিভিন্ন সংস্করণ ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমান ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের গতি ঘণ্টায় প্রায় ম্যাক ৩, অর্থাৎ শব্দের গতির তিনগুণ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।

    অপারেশন ‘সিঁদুর’-এ ব্রহ্মসের ব্যবহার

    ডেনিস আলিপভ স্মরণ করিয়ে দেন, গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত স্বল্পস্থায়ী সামরিক সংঘর্ষ ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ব্রহ্মস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তাঁর দাবি, ওই সংঘর্ষে ভারত ১৫ থেকে ২০টি ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং পাকিস্তানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য সব তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও ব্রহ্মসের কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

    হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র কী?

    সাধারণভাবে ম্যাক ৫ বা তার বেশি গতিতে উড়তে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রকে হাইপারসনিক বলা হয়। ব্রহ্মস অ্যারোস্পেসের ভবিষ্যৎ প্রকল্প ‘ব্রহ্মস ২’-কে একটি হাইপারসনিক অস্ত্র হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে ব্যবহার করা হবে অত্যাধুনিক ‘এয়ার-ব্রিদিং স্ক্র্যামজেট’ ইঞ্জিন প্রযুক্তি।

    এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের মূল সুবিধা হল—

    • ● লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছতে অত্যন্ত কম সময় লাগে।
    • ● প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ কমে যায়।
    • ● আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে আটকানো অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে।
    • ● উচ্চ গতি, নির্ভুলতা এবং বেঁচে থাকার ক্ষমতার সমন্বয় তৈরি হয়।

    সামরিক কৌশলবিদদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে হাইপারসনিক অস্ত্রই বড় শক্তিগুলির প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে।

    কেন গুরুত্বপূর্ণ যৌথ উন্নয়নের এই সিদ্ধান্ত?

    সম্প্রতি ভারত ব্রহ্মস-২ প্রকল্পকে কিছুটা পিছিয়ে দিয়ে নিজস্ব হাইপারসনিক প্রযুক্তি উন্নয়নের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা মহলে আলোচনা চলছিল। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ মার্কিন ডলার বা তারও বেশি হতে পারে। এত ব্যয়বহুল অস্ত্র সাধারণ লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সবসময় অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। এছাড়া স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন প্রযুক্তি হস্তান্তর নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে এসেছিল। ফলে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নীতির আওতায় দেশীয় প্রযুক্তি বিকাশে জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি। তবে নতুন করে যৌথ উন্নয়নের ঘোষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দুই দেশই প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে।

    ছোট ব্রহ্মস কেন বড় পরিবর্তন আনতে পারে?

    এমনিতে, ব্রহ্মসের ছোট সংস্করণ নিয়ে আগে থেকেই কাজ করছে ভারত। এই আরও ছোট, হালকা, পরবর্তী প্রজন্মের ‘ব্রহ্মস-এনজি’কে (BrahMos-NG) বুদ্ধিমান এবং স্টেলথ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র করে তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। যা নিয়ে ইতিমধ্যেই ভারতে কাজ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। মূলত, এয়ার লঞ্চড ভার্সান বা যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ সংস্করণ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। বর্তমানে ব্রহ্মস সুখোই সু-৩০ যুদ্ধবিমান থেইকে নিক্ষেপ করা যায়। কারণ, এত ভারী ক্ষেপণাস্ত্র বহন করার ক্ষমতা শুধুমাত্র সুখোইয়ের মতো ভারী যুদ্ধবিমানের রয়েছে। কিন্তু ভারত চাইছে, কেবলমাত্র সু-৩০ নয়, ব্রহ্মস যাতে বাকি যুদ্ধবিমান যেমন তেজস, রাফাল সর্বত্র প্ল্যাটফর্মেই বহনযোগ্য হয়। সেই জন্য হালকা, ছোট সংস্করণ তৈরি করা হচ্ছে।

    এই ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য সুবিধাগুলি হল—

    • ● একাধিক ধরনের যুদ্ধবিমানে সহজে বহন করা যাবে।
    • ● একই বিমানে আগের তুলনায় বেশি সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা সম্ভব হবে।
    • ● দ্রুত মোতায়েন করা যাবে।
    • ● রেডারে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কমবে।
    • ● সামরিক অভিযানে আরও বেশি নমনীয়তা তৈরি হবে।

    প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ছোট আকারের কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্রই ভবিষ্যতের চাহিদা।

    ১৯৯৮ থেকে আজ: ব্রহ্মসের যাত্রাপথ

    ১৯৯৮ সালে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিতে ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস প্রতিষ্ঠিত হয়। গত আড়াই দশকে প্রকল্পটি শুধুমাত্র একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এটি দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে ঐতিহ্যগত ‘ক্রেতা-বিক্রেতা’ মডেল থেকে প্রযুক্তি ভাগাভাগি, যৌথ গবেষণা এবং যৌথ উৎপাদনের স্তরে উন্নীত করেছে। আলিপভ বলেন, ব্রহ্মস প্রকল্পই পরবর্তীকালে সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান এবং টি-৯০ ট্যাঙ্কের ভারতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত উৎপাদনের পথ প্রশস্ত করেছিল। তিনি একে-২০৩ রাইফেলের যৌথ উৎপাদনকেও এই সহযোগিতার সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

    সু-৫৭ যুদ্ধবিমান ও এস-৪০০ উৎপাদনের ইঙ্গিত

    রুশ রাষ্ট্রদূত জানান, ভবিষ্যতে রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সু-৫৭-ভিত্তিক প্রকল্প এবং এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উৎপাদন ক্ষেত্রেও ভারত-রাশিয়া সহযোগিতা বাড়তে পারে। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

    রাশিয়াও কিনতে চায় ব্রহ্মস

    এক সময় রাশিয়া ছিল ব্রহ্মস প্রকল্পের প্রযুক্তিগত অংশীদার। এবার সেই রাশিয়াই নিজ সেনাবাহিনীতে ব্রহ্মস অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ দেখিয়েছে। ব্রহ্মস অ্যারোস্পেসের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর জয়তীর্থ জোশী জানিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। যৌথ ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলেকজান্ডার ম্যাকসিচেভ জানান, রুশ নৌবাহিনী এবং স্থলবাহিনীর জন্য ব্রহ্মস সরবরাহ করতে কোম্পানি প্রস্তুত।

    বিশ্ববাজারে বাড়ছে ব্রহ্মসের চাহিদা

    শুধু ভারত নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ব্রহ্মস। ২০২২ সালে ফিলিপাইনস ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে ব্রহ্মস কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম ব্যাচ সরবরাহ করা হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দ্বিতীয় ব্যাচ পৌঁছে যায়। সম্প্রতি ভিয়েতনামের সঙ্গে ৬২০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির কথাও নিশ্চিত করেছে ভারত। এমনকি, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে উন্নত পর্যায়ের আলোচনা চলছে। ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাহিদার ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ব্রহ্মস অ্যারোস্পেসের আয় প্রায় ৪৮.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

    ভারতের প্রতিরক্ষা কূটনীতির নতুন মুখ

    বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মস এখন আর শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়। এটি ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কৌশলগত কূটনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ছোট আকারের ব্রহ্মস-এনজি এবং ভবিষ্যতের হাইপারসনিক ব্রহ্মস-২ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভারত শুধু নিজের সামরিক শক্তিই বাড়াবে না, বরং বৈশ্বিক অস্ত্রবাজারেও আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করতে পারবে। ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন অধ্যায় হিসেবে এই প্রকল্পগুলির দিকে এখন নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।

LinkedIn
Share