মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: যে কোনও দেশের কাছ থেকে তেল কিনতে পারে ভারত। সেটা দিল্লির ইচ্ছে। ভারত কখনওই একমাত্র রাশিয়া থেকে তেল কিনত এমন নয়। ভারত বিভিন্ন জায়গা থেকে নিজেদের প্রয়োজন মতো অপরিশোধিত তেল নেবে এতে নতুনত্ব কিছু নেই। এমনই মত রাশিয়ার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবির পর বিশ্ব রাজনীতিতে শোরগোল শুরু হলেও, ভারতের তেল আমদানি নীতি নিয়ে কার্যত ‘নির্ভয়’ বার্তা দিল রাশিয়া (India-Russia Oil Trade)। বুধবার ক্রেমলিন (Kremlin) স্পষ্ট জানিয়েছে, ভারত কোন দেশ থেকে তেল কিনবে সেটা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। নয়াদিল্লির এই তেল আমদানির বৈচিত্র্যকরণের প্রচেষ্টাকে স্বাভাবিক বলেই মনে করছে মস্কো।
কী বলল রাশিয়া
ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশাসন বলছে, শুধুমাত্র মস্কোই নয়াদিল্লিকে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করে না। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, “আমরা, অন্যান্য সকল আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতোই খুব ভালো করে জানি যে রাশিয়া ভারতে তেল এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যের একমাত্র সরবরাহকারী নয়। ভারত সর্বদা অন্যান্য দেশ থেকে এই পণ্যগুলি কিনেছে। অতএব, আমরা এখানে নতুন কিছু দেখতে পাচ্ছি না।” একদিন আগেই আবশ্য পেসকভ বলেছিলেন যে, রাশিয়ার তেল ক্রয় বন্ধ করার বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে রাশিয়া কোনও বিবৃতি পায়নি। তিনি বলেন, ‘‘রাশিয়া বরাবরই ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ককে মূল্যবান বলে মনে করে এবং দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত অংশীদারি এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়।’’
ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য লাভজনক
রাশিয়ার বিদেশ মন্ত্রক জোর দিয়ে বলেছে যে, হাইড্রোকার্বন বাণিজ্য নয়াদিল্লি এবং মস্কো উভয়ের জন্যই লাভজনক। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এক প্রেস বিবৃতিতে বলেছেন, “আমরা এখনও নিশ্চিত যে ভারতের রাশিয়ান হাইড্রোকার্বন ক্রয় উভয় দেশের জন্যই লাভজনক এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অবদান রাখবে। আমরা ভারতে আমাদের পার্টনারদের সঙ্গে এই ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত।” প্রসঙ্গত, ২০২১ সাল পর্যন্ত ভারত যত অপরিশোধিত তেল আমদানি করত, তার মধ্যে রাশিয়ার তেল ছিল মাত্র ০.২ শতাংশ। তবে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর, যখন পশ্চিমের দেশগুলি মস্কোকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল, তখন নয়াদিল্লি – বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক – রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল ছাড়ের বৃহত্তম ক্রেতা হয়ে ওঠে। তবে, রিয়েল-টাইম অ্যানালিটিক্স সংস্থা কপলারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম তিন সপ্তাহে ভারতের রুশ তেল আমদানি নেমে এসেছে দৈনিক প্রায় ১১ লক্ষ ব্যারেলে। আগের মাসে যা ছিল গড়ে ১২.১ লক্ষ ব্যারেল এবং ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তা ২০ লক্ষ ব্যারেলেরও বেশি ছিল।
বিশ্ব বাজারে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়
রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দিতে সম্মত হয়েছে ভারত। ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তিতে তা রয়েছে বলে দাবি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে, ভারত সরকার এ বিষয়ে এখনও স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। সম্প্রতি ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল উল্লেখ করেছিলেন, বিশ্ব বাজারে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়। তবে পেসকভ স্পষ্ট করে বলেন, ‘রাশিয়া এখনও পর্যন্ত ভারতের কাছ থেকে রুশ তেল কেনা বন্ধ করার বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বার্তা পায়নি। নয়াদিল্লির থেকে এমন কোনও ইঙ্গিত আসেনি।’ রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পক্ষেই সওয়াল করেন রুশ বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েলও সাফ জানিয়েছেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
রাশিয়া থেকে তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন
ভারতীয় পণ্যের ওপর আমেরিকার অতিরিক্তি ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরও ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে প্রতিদিন ১৫ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমিদানি করে গেছে। নয়াদিল্লি রাশিয়ান অপরিশোধিত তেলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্রেতা, যা ভারতের মোট আমদানির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া থেকে কেনা তেল পুরোপুরি বন্ধ করা ভারতের পক্ষে কঠিন। ন্যাশনাল এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ডের এক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, রাশিয়ার ‘উরাল’ (পর্বতমালার) তেল ভারতের শোধনাগারগুলির জন্য অত্যন্ত উপযোগী, যা মার্কিন তেলের থেকে আলাদা। তাছাড়া রাশিয়া দৈনিক প্রায় ১৫-২০ লক্ষ ব্যারেল তেল দেয়, যা আমেরিকার পক্ষে জোগান দেওয়া সহজ নয়। ন্যাশনাল এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ডের বিশ্লেষক ইগর ইউশকভ বলেন, ‘মার্কিন শেল তেল মূলত হালকা গ্রেডের, আর রাশিয়া ভারতকে যে ইউরাল ক্রুড সরবরাহ করে তা ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ। যা ভারতীয় রিফাইনারিগুলোতে ব্যবহৃত হয়। ভারতকে মার্কিন তেল অন্য গ্রেডের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করতে হবে, এতে খরচ বেড়ে যাবে। সরাসরি বদলি সম্ভব নয়।’
ভারতের ওপর চাপ কেন
ট্রাম্প সরকারের অভিযোগ, ভারতের তেল কেনার জন্যই ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থ পাচ্ছে রাশিয়া। যদিও বিভিন্ন পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে ভারতের সমালোচনাকারী দেশগুলি নিজেরাই রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যে লিপ্ত হচ্ছে! পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, শুধু ২০২৪ সালেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়ার মধ্যে ৬৭৫০০ কোটি ইউরোর (প্রায় ১৮ লক্ষ ৩২ হাজার কোটি টাকা) দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য হয়েছে। সেই হিসাবে দেখতে গেলে ভারত-রাশিয়ার মোট বাণিজ্যের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু তা-ই নয়, ২০২৪ সালে ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির পরিমাণও ১৬৫ লক্ষ টনে গিয়ে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে।

