Tag: Jaishankar Speech

  • S Jaishankar: ‘ভারত কখনও ইউরোপকে বিপদে ফেলেনি’, রুশ তেল ইস্যুতে পশ্চিমকে কড়া বার্তা জয়শঙ্করের

    S Jaishankar: ‘ভারত কখনও ইউরোপকে বিপদে ফেলেনি’, রুশ তেল ইস্যুতে পশ্চিমকে কড়া বার্তা জয়শঙ্করের

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) কেনার জন্য পশ্চিমা দেশগুলির সমালোচনার মুখে বারবার পড়তে হয়েছে ভারতকে। তবে সেই সমালোচনার জবাবে আবারও দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বৃহস্পতিবার ফিনল্যান্ডে আয়োজিত ‘কুলতারান্তা টকস্’ (Kultaranta Talks)-এ এক আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে তিনি ভারতের জ্বালানি নীতির পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন এবং ইউরোপের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন।

    ‘ভারত তেল কেনে দাম এবং প্রাপ্যতার ভিত্তিতে’

    ফিনল্যান্ডের বিদেশমন্ত্রী এলিনা ভালতোনেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সহকারী বিদেশমন্ত্রী লানা নুসেইবেহর সঙ্গে ‘ইমার্জিং পাওয়ার্স অ্যান্ড দ্য নিউ জিওপলিটিক্যাল কম্পিটিশন’ (Emerging Powers and the New Geopolitical Competition) শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন জয়শঙ্কর। সেখানে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে ভারত কেন রুশ তেল আমদানি বাড়িয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি তেল কিনি তার দাম এবং প্রাপ্যতার ভিত্তিতে।” বিদেশমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য ভারতের প্রধান তেল সরবরাহকারী অঞ্চল হলেও সেই সময় ইউরোপীয় দেশগুলি বিপুল পরিমাণে মধ্যপ্রাচ্যের তেল কিনতে শুরু করে। ফলে ভারতের জন্য বিকল্প উৎস খুঁজে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। জয়শঙ্করের কথায়, “সেই সময় বাজারে যে তেল সহজলভ্য ছিল, তার বড় অংশই ছিল রুশ তেল। কারণ ইউরোপীয় দেশগুলি কার্যত মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বড় অংশ কিনে নিচ্ছিল। পরিস্থিতিই আমাদের একটি নির্দিষ্ট দিকে যেতে বাধ্য করেছিল।”

    ‘নৈতিকতার প্রশ্নে’ ইউরোপকে পাল্টা আক্রমণ

    আলোচনার সময় সঞ্চালক ভারতের এই নীতির মধ্যে কোনও ‘নৈতিক অস্পষ্টতা’ বা ‘মোরাল অ্যাম্বিগুইটি’ রয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তোলেন। জবাবে জয়শঙ্কর ইউরোপীয় দেশগুলির প্রতি তীব্র কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, “কোনও ইউরোপীয় দেশ ভারতীয় অস্ত্রের আক্রমণের শিকার হয়নি। কিন্তু আমি দুঃখের সঙ্গে বলছি, ইউরোপীয় অস্ত্র ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে— এমন উদাহরণ রয়েছে।” বিদেশমন্ত্রীর এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত অভিযোগ করে আসছে যে, ইউরোপের একাধিক দেশ পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে, যেগুলি পরবর্তীতে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। জয়শঙ্কর আরও বলেন, “বহু বছর ধরে ইউরোপীয় দেশগুলি এমন অস্ত্র বিক্রি করেছে যা ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ ভারত কখনও এমন কোনও কাজ করেনি যা ইউরোপের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে।”

    ইউরোপের ‘দ্বিচারিতা’ নিয়ে প্রশ্ন

    রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য ভারতকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করালেও ইউরোপের নিজেদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জয়শঙ্কর। তিনি মনে করিয়ে দেন, ইউরোপীয় দেশগুলি দীর্ঘ সময় ধরে রাশিয়ার গ্যাস আমদানি অব্যাহত রেখেছিল এবং এখনও বিভিন্ন উপায়ে রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি। ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি জানান, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশগুলির মধ্যে অন্যতম ভারতের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সংগ্রহ করা একটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রয়োজন।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও তুলে ধরলেন

    জয়শঙ্কর আলোচনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, বৈশ্বিক বাজারে তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা এড়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ভারতকে রুশ তেল কেনার বিষয়ে উৎসাহিত করেছিল। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান যে, ভারতের রুশ তেল আমদানির সিদ্ধান্ত কেবলমাত্র জাতীয় স্বার্থের কারণেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে।

    ভারতের জ্বালানি কৌশলের বড় পরিবর্তন

    রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ভারতের মোট তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া যখন ছাড় মূল্যে তেল বিক্রি শুরু করে, তখন ভারত সেই সুযোগ গ্রহণ করে। ফলে গত কয়েক বছরে রাশিয়া ভারতের অন্যতম বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশই রাশিয়া থেকে আসে।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে—

    • ● ভারতের জ্বালানি আমদানির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
    • ● আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সত্ত্বেও দেশীয় জ্বালানির দাম তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
    • ● বৈশ্বিক তেল বাজারে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছে ভারত।
    • ● ভারতের কৌশলগত স্বার্থ ও জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হয়েছে।

    বহুমুখী কূটনীতির বার্তা

    জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক মন্তব্য আবারও স্পষ্ট করে দিল যে, ভারত বর্তমান বহুমেরু বিশ্বের বাস্তবতায় নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। পশ্চিমা চাপ কিংবা ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে থেকে ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বাধীনতার নীতি বজায় রেখেই নয়াদিল্লি তার জ্বালানি ও বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করতে চায়। ফিনল্যান্ডের মঞ্চ থেকে দেওয়া জয়শঙ্করের বক্তব্য শুধু রুশ তেল ইস্যুতেই নয়, বরং ভারত-ইউরোপ সম্পর্ক, বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতি এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।

LinkedIn
Share