মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ ও দীর্ঘদিনের ছাত্র আন্দোলনের জেরে বড়সড় সিদ্ধান্ত নিল ঝাড়খণ্ড সরকার (Jharkhand Recruitment Row)। মঙ্গলবার রাতে একসঙ্গে আটটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে রাজ্যে ২০১৪ সাল থেকে হওয়া ৪৪টি নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। বাতিল হওয়া পরীক্ষাগুলির মধ্যে ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (JPSC)-এর পাশাপাশি আউটসোর্সিং সংস্থা টিডিপিএল (TDPL)-এর মাধ্যমে পরিচালিত পরীক্ষাও রয়েছে। বাতিলের তালিকায় রয়েছে ড্রাগ ইনস্পেক্টর, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, ডেপুটি কালেক্টর, ডেন্টাল ডাক্তার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার, সিভিল জজ, অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর এবং ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগ পরীক্ষা। সরকারি পলিটেকনিকের লেকচারার, সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার-সহ আরও বেশ কিছু প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত পদে নিয়োগ পরীক্ষাও এই তালিকায় রয়েছে।
ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠনের আবেদন
শুধু পরীক্ষা বাতিল নয়, নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টের কাছে ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠনের আবেদন জানাবে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি জেপিএসসি এবং জেএসএসসি—দুই কমিশনেই একটি করে অভ্যন্তরীণ ভিজিল্যান্স সেল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জেপিএসসি এবং জেএসএসসি (JPSC ও JSSC)-র নিয়োগ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করার জন্য গঠিত কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন প্রবীণ আইএএস আধিকারিক অমিতাভ কৌশল। ওই কমিটিকে আগামী দুই মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।
চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা
এই সিদ্ধান্তের সূত্রপাত সোমবারের রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে। সেখানে জেএসএসসি কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল (JSSC Combined Graduate Level বা CGL) পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল এই পরীক্ষা বাতিল করা। একইসঙ্গে টিডিপিএল-এর মাধ্যমে পরিচালিত সমস্ত পরীক্ষা এবং ওই সংস্থার প্রকাশিত ফলাফলও বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তেই নতুন করে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। জেএসএসসি কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল পরীক্ষায় সফল হয়ে ইতিমধ্যেই সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া ২,০০০-এরও বেশি প্রার্থী তাঁদের চাকরি নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছেন। সম্প্রতি তাঁরা রাজ্য সচিবালয় থেকে রাঁচির বিরসা চকের দিকে মিছিল করে তাঁদের নিয়োগ যাতে বহাল থাকে, সেই দাবি জানান।
কেন এই দোলাচল
পরীক্ষা পরিচালনাকারী এক বেসরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন ফাঁস ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে অসন্তোষ দানা বেঁধেছিল। সিআইডি (CID) তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। জানা যায়, পরীক্ষার আগে পরীক্ষার্থীদের হাজারিবাগ, বোকারো, আসানসোল এমনকি নেপালের মতো বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়ে প্রায় ১৫০টির মধ্যে ১২০টি প্রশ্নের সঠিক উত্তর মুখস্থ করানো হয়। এই নিয়ে মামলা গড়ায় ঝাড়খণ্ড হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। গত ডিসেম্বর মাসে হাইকোর্ট সন্দেহজনকদের বাদ দিয়ে বাকিদের নিয়োগপত্র দেওয়ার নির্দেশ দেয় এবং চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শীর্ষ আদালতও পরীক্ষা বাতিলের আর্জি খারিজ করে দেয়। সেই আইনি সুরক্ষার ভরসাতেই চাকরিপ্রার্থীরা চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজ্য সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে সেই স্বস্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম
গত কয়েক মাস ধরে ঝাড়খণ্ডে জেপিএসসি এবং জেএসএসসি (JPSC ও JSSC)-র নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ বাড়ছিল। পরীক্ষার ফল প্রকাশে দেরি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং দীর্ঘ অপেক্ষা নিয়ে বারবার সরব হয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় জেএসএসসি-সিজিএল পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর। বছরের পর বছর সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া প্রার্থীদের কাছে এই অভিযোগ ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। অনেকেই একাধিকবার পরীক্ষায় বসেছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে নিয়োগের অপেক্ষায় ছিলেন। ফলে কোনও পরীক্ষা বাতিল হলে তাঁদের বহু বছরের প্রস্তুতি ও পরিশ্রম বিফলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনে মাথা নোয়াল সরকার
ঝাড়খণ্ডের (Jharkhand Recruitment Row) এই আন্দোলন জাতীয় স্তরে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম নিয়ে চলা বিতর্কের মধ্যেই আরও বড় আকার নেয়। দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি (CJP)-র নেতৃত্বে চলা ছাত্র আন্দোলনও দেশের তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভকে সামনে এনেছিল। ঝাড়খণ্ডের আন্দোলনকারীরাও ওই আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। দুই আন্দোলনের ইস্যু আলাদা হলেও মূল দাবিতে মিল রয়েছে—স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ ব্যবস্থা। ঝাড়খণ্ডে আন্দোলনের সূচনা হয় ২৯ জুলাই, রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে। জেপিএসএসসি ও জেএসএসসি-র নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থার দাবিতে সেখানে আন্দোলনে বসেন চাকরিপ্রার্থীরা।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা
পরবর্তীতে আন্দোলনে রাজনৈতিক সমর্থনও বাড়ে। ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র নাথ মাহতো ২ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন, যার ফলে সরকারের উপর চাপ আরও বাড়তে থাকে। অবশেষে ৪৪টি নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল, জেপিএসএসসি-জেএসএসসি-তে ভিজিল্যান্স সেল গঠন এবং অনিয়মের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টের উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পথে হাঁটল ঝাড়খণ্ড সরকার। তবে বাতিল হওয়া পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত চাকরিপ্রার্থী এবং ইতিমধ্যেই চাকরিতে যোগ দেওয়া সফল প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
