মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পহেলগাঁওয়ের কায়দায় হামলা দেশের বাণিজ্যনগরী মুম্বইয়ে (Naya Nagar Attack)। আমেরিকা ফেরত যুবক হামলা চালাল দুই নিরাপত্তারক্ষীর উপর। কোপানোর আগে তাঁদের ধর্ম জিজ্ঞেস করা হয় বলে অভিযোগ। তাঁদের ‘কলমা’ পড়ে দেখাতে বলা হয় বলেও দাবি। ‘কলমা’ না পড়তে পারায় ওই দুই নিরাপত্তারক্ষীর উপর হামলা চালায় যুবক। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা ঘটে মুম্বইয়ের মিরা রোড এলাকায়। ছুরির আঘাতে গুরুতর জখম হয়েছেন দুই নিরাপত্তারক্ষী। গোটা ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সিসিটিভি দেখে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তের পরে মহারাষ্ট্র অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়াড (ATS)-এর অনুমান, এটি সম্ভবত ‘লোন উলফ’ জঙ্গি হামলা। যুবকের সঙ্গে আইএসএস-এরও যোগসূত্র মিলেছে বলে খবর।
‘কলমা’ পড়তে না পারাতেই হামলা
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার ভোর ৪টে নাগাদ অভিযুক্ত জাইব জুবের আনসারি একটি নির্মীয়মাণ ভবনের সামনে ডিউটিতে থাকা দুই নিরাপত্তারক্ষী—রাজকুমার মিশ্র ও সুব্রত সেনের কাছে যায়। প্রথমে রাস্তা জিজ্ঞাসা করার পরে তাঁদের ধর্ম সম্পর্কে জানতে চায় এবং কলমা পাঠ করতে বলে। তারা তা করতে না পারায় ছুরি বের করে ঝাঁপিয়ে পড়ে ৩১ বছর বয়সি জাইব। পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে হামলার দেড় ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টা সহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। হামলায় গুরুতর জখম দুই নিরাপত্তারক্ষীর মধ্যে রাজকুমার মিশ্রের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অন্যদিকে, সুব্রত সেন কোনওরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে একটি কেবিনে আশ্রয় নেন। পরে দু’জনকেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হঠাৎই হাজির হয়ে হামলা
ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার ভোর ৪টে নাগাদ ওকহার্ট (Wockhardt) হাসপাতালের পেছনের একটি নির্মীয়মান বহুতলে। সেখানে কর্তব্যরত দুই নিরাপত্তারক্ষী, রাজকুমার মিশ্র এবং সুব্রত সেনের সামনে হঠাৎই হাজির হয় আনসারি। অভিযোগ, ধর্ম জানতে চাওয়ার পর তাঁদের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। রাজকুমার কোনওমতে নিজেকে বাঁচিয়ে হাসতপাতালে পৌঁছলেও, সুব্রত সেন গুরুতর আহত অবস্থায় গার্ড রুমের ভেতর লুকিয়ে পড়ে। যখন সুব্রত সেন রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন, তখন ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন পাশের বাড়ির বাসিন্দা নায়েব শেখ। কাজ থেকে ফেরার পথে তিনি সুব্রতকে ওভাবে দেখতে পেয়ে তড়িঘড়ি থানায় নিয়ে যান এবং সেখান থেকে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে দুই নিরাপত্তারক্ষীরই চিকিৎসা চলছে এবং তাঁদের অবস্থা স্থিতিশীল।
সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত
ঘটনার প্রায় ঘণ্টা দেড়েকের মধ্য়ে অভিযুক্ত জুবেরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয় তাকে। নয়া নগর থানায় প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। খুনের চেষ্টা এবং দুই গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতায় ইন্ধন জোগানোর মামলা দায়ের হয়েছে তার বিরুদ্ধে। আদালতে পেশ করা হলে ৪ মে পর্যন্ত পুলিশ হেফাজত হয়েছে তার। মহারাষ্ট্র পুলিশের সন্ত্রাসদমন শাখা তদন্ত শুরু করেছে। ভুয়ো খবর নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে সকলকে। ধৃত জুবেরের মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে এই মুহূর্তে। হাতে লেখা কিছু নোটও উদ্ধার হয়েছে জুবেরের বাড়ি থেকে। প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, জুবেরের অনলাইন কার্যকলাপে উগ্রপন্থী প্রচারের প্রভাব থাকতে পারে। পাশাপাশি তার মানসিক ও সামাজিক অবস্থাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযুক্তের আইএস-যোগ
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত জাইব আনসারি ২০১৯ সাল পর্যন্ত পড়াশোনার কারণে আমেরিকায় ছিল। এর পরেই ৩১ বছর বয়সি যুবক ভারতে ফিরে আসে। থাকত আনসারি মীরা রোডের ভাড়া বাড়িতে। সেই বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে এবং অভিযুক্ত জাইবের কাছ থেকে কিছু নোট উদ্ধার হয়েছে, যেখানে ‘আইএসআইএস’, ‘জিহাদ’, ‘গাজা’ ইত্যাদি শব্দ লেখা ছিল। এ ছাড়া চিঠিতে সে জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএস-এ যোগ দেওয়ার ইচ্ছার কথা লিখেছিল। এমনকি এই হামলাকেই সে ‘প্রথম পদক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেছে। পুলিশ সূত্রে খবর, জাইব অনলাইনে নিয়মিত আইএসআইএস-সম্পর্কিত ভিডিয়ো দেখত। তার ওয়াচ লিস্ট থেকে সামনে এসেছে একাধিক বিস্ফোরক তথ্য। জঙ্গি মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘লোন উলফ’ ধরনের জঙ্গি হামলার চেষ্টা কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অনলাইন মাধ্যমে উগ্রপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত
পুলিশের অনুমান, অনলাইন মাধ্যমে উগ্রপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারেন সে ।স্থানীয় সূত্রে খবর, জাইব মীরা রোডে একাই থাকত এবং অনলাইনে কেমিস্ট্রি পড়াত সে। তদন্তকারীরা এখন তার মোবাইল ও ল্যাপটপ খতিয়ে দেখছেন—কোনও আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক বা হ্যান্ডলারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না তা জানার জন্য। পুলিশের মতে, এটি পরিকল্পিত বড়সড় চক্রের অংশ, নাকি সম্পূর্ণ এককভাবে চালানো ‘লোন উলফ’ হামলা—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গোটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হলেও প্রশাসন সাধারণ মানুষকে গুজব না ছড়ানোর আবেদন জানিয়েছে।
পহেলগাঁও হামলার ছায়া
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পহেলগাঁও-য়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় ২৬ জন হিন্দু পর্যটক নিহত হন। হামলাকারীরা ধর্ম শনাক্ত করতে ‘কালমা’ বলতে বলেছিল—এই একই কায়দার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে মিরা রোডের ঘটনায়। বর্তমানে এটিএস কুরলা, মিরা রোড ও থানে এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছে। গোটা ঘটনায় কোনও বৃহত্তর জঙ্গি নেটওয়ার্ক জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ সূত্রে খবর, এই হামলার পেছনে ব্যক্তিগত হতাশা, মানসিক অস্থিরতা নাকি উগ্র মতাদর্শ—কোনটি প্রধান কারণ, তা জানতে বিস্তারিত তদন্ত চলছে।
