Tag: madhyom news

madhyom news

  • Ramakrishna 664: “স্ত্রীলোক নিয়ে মায়ার সংসার করা! তাতে ঈশ্বরকে ভুলে যায়, যিনি জগতের মা, তিনিই এই মায়ার রূপ—স্ত্রীলোকের রূপ ধরেছেন”

    Ramakrishna 664: “স্ত্রীলোক নিয়ে মায়ার সংসার করা! তাতে ঈশ্বরকে ভুলে যায়, যিনি জগতের মা, তিনিই এই মায়ার রূপ—স্ত্রীলোকের রূপ ধরেছেন”

    ৫৩ কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    বুদ্ধদেব কি ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানতেন? নরেন্দ্রকে শিক্ষা

    ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৬, ২২শে এপ্রিল

    রাখাল, শশী, মাস্টার, নরেন্দ্র, ভবনাথ, সুরেন্দ্র, রাজেন্দ্র, ডাক্তার

    শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তসঙ্গে—“কামিনী-কাঞ্চন বড় জঞ্জাল” 

    বাগানের সেই দোতলার ‘হল’ ঘরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন। শরীর উত্তরোত্তর অসুস্থ হইতেছে, আজ আবার ডাক্তার মহেন্দ্র সরকার ও ডাক্তার রাজেন্দ্র দত্ত দেখিতে আসিয়াছেন—যদি চিকিৎসার দ্বারা কোন উপকার হয়। ঘরে নরেন্দ্র, রাখাল, শশী, সুরেন্দ্র, মাস্টার, ভবনাথ ও অন্যন্য অনেক ভক্তেরা আছেন।

    বাগানটি পাকপারার বাবুদের। ভাড়া দিতে হয়—প্রায় ৬০-৬৫ টাকা। ছোকরা ভক্তেরা প্রায় বাগানেই থাকেন। তাঁহারাই নিশিদিন ঠাকুরের সেবা করেন। গৃহী ভক্তেরা সর্বদা আসেন ও মাঝে মাঝে রাত্রেও থাকেন। তাঁহাদেরও নিশিদিন ঠাকুরের সেবা করিবার ইচ্ছা। কিন্তু সকলে কর্মে বদ্ধ—কোন না কোন কর্ম করিতে হয়। সর্বদা ওখানে থাকিয়া সেবা করিতে পারেন না। বাগানের খরচ চালাইবার জন্য যাহার যাহা শক্তি ঠাকুরের সেবার্থ প্রদান করেন; অধিকাংশ খরচ সুরেন্দ্র দেন! তাঁহারই নামে বাগানভাড়ার লেখাপড়া হইয়াছে। একটি পাচক ব্রাহ্মণ ও একটি দাসী সর্বদা নিযুক্ত আছে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) ডাক্তার সরকার ইত্যদির প্রতি — বড় খরচা হচ্ছে।

    ডাক্তার (ভক্তদিগকে দেখাইয়া) — তা এরা সব প্রস্তুত। বাগানের খরচ সমস্ত দিতে এদের কোন কষ্ট নাই। (শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি) — এখন দেখ, কাঞ্চন চাই।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (নরেন্দ্রের প্রতি) — বল্‌ না?

    ঠাকুর নরেন্দ্রকে উত্তর দিতে আদেশ করিলেন। নরেন্দ্র চুপ করিয়া আছেন। ডাক্তার আবার কথা কহিতেছেন।

    ডাক্তার — কাঞ্চন চাই। আবার কামিনীও চাই।

    রাজেন্দ্র ডাক্তার — এঁর পরিবার রেঁধে বেড়ে দিচ্ছেন।

    ডাক্তার সরকার (ঠাকুরের প্রতি) — দেখলে?

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— বড় জঞ্জাল!

    ডাক্তার সরকার — জঞ্জাল না থাকলে তো সবাই পরমহংস।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — স্ত্রীলোক গায়ে ঠেকলে অসুখ হয়; যেখানে ঠেকে সেখানটা ঝনঝন করে, যেন শিঙি মাছের কাঁটা বিঁধলো।

    ডাক্তার — তা বিশ্বাস হয়, — তবে না হলে (Kathamrita) চলে কই?

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—টাকা হাতে করলে হাত বেঁকে যায়! নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। টাকাতে যদি কেউ বিদ্যার সংসার করে,—ঈশ্বরের সেবা—সাধু-ভক্তের সেবা করে—তাতে দোষ নাই।

    “স্ত্রীলোক নিয়ে মায়ার সংসার করা! তাতে ঈশ্বরকে ভুলে যায়। যিনি জগতের মা, তিনিই এই মায়ার রূপ—স্ত্রীলোকের রূপ ধরেছেন। এটি ঠিক জানলে আর মায়ার সংসার করতে ইচ্ছা হয় না। সব স্ত্রীলোককে ঠিক মা বোধ হলে তবে বিদ্যার সংসার করতে পারে। ঈশ্বর দর্শন না হলে স্ত্রীলোক কি বস্তু বোঝা যায় না।”

    হোমিওপ্যাথিক ঔষধ খাইয়া ঠাকুর কয়দিন একটু ভাল আছেন।

    রাজেন্দ্র সেরে উঠে আপনার হোমিওপ্যাথি মতে ডাক্তারি করতে (Kathamrita) হবে। আর তা না হলে বেঁচে বা কি ফল? (সকলের হাস্য)

    নরেন্দ্র — Nothing like leather (যে মুচির কাজ করে, সে বলে, চামড়ার মতো উৎকৃষ্ট জিনিস এ জগতে আর কিছু নাই।) (সকলের হাস্য)

    কিয়ৎক্ষণ পরে ডাক্তারেরা চলিয়া গেলেন।

  • Ramakrishna 663: “ইন্দ্রিয়সুখের আনন্দ, আর-একদিকে ঈশ্বরকে পেয়ে আনন্দ, এই দুই কখন সমান হতে পারে? ঋষিরা এ ব্রহ্মানন্দ ভোগ করেছিলেন”

    Ramakrishna 663: “ইন্দ্রিয়সুখের আনন্দ, আর-একদিকে ঈশ্বরকে পেয়ে আনন্দ, এই দুই কখন সমান হতে পারে? ঋষিরা এ ব্রহ্মানন্দ ভোগ করেছিলেন”

    ৫৩ কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    বুদ্ধদেব কি ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানতেন? নরেন্দ্রকে শিক্ষা

    ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৬, ২২শে এপ্রিল

    রাখাল, শশী, মাস্টার, নরেন্দ্র, ভবনাথ, সুরেন্দ্র, রাজেন্দ্র, ডাক্তার

    কাশীপুরের বাগান। রাখাল, শশী ও মাস্টার সন্ধ্যার সময় উদ্যানপথে পাদচারণ করিতেছেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পীড়িত—বাগানে চিকিৎসা করাইতে আসিয়াছেন। তিনি উপরে দ্বিতলের ঘরে আছেন, ভক্তেরা তাঁহার সেবা করিতেছেন (Kathamrita)। আজ বৃহস্পতিবার, ২২শে এপ্রিল ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দ, গুড ফ্রাইডে-এর পূর্বদিন।

    মাস্টার — তিনি তো গুণাতীত বালক।

    শশী ও রাখাল — ঠাকুর (Ramakrishna) বলেছেন, তাঁর ওই অবস্থা।

    রাখাল—যেমন একটা টাওয়ার। সেখানে বসে সব খবর পাওয়া যায়, দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু কেউ যেতে পারে না, কেউ নাগাল পায় না।

    মাস্টার—ইনি বলেছেন, এ-অবস্থায় সর্বদা ঈশ্বরদর্শন হতে পারে। বিষয়রস নাই, তাই শুষ্ক কাঠ শীঘ্র ধরে যায়।

    শশী—বুদ্ধি কত রকম, চারুকে বলছিলেন। যে বুদ্ধিতে ভগবানলাভ হয়, সেই ঠিক বুদ্ধি। যে বুদ্ধিতে টাকা হয়, বাড়ি হয়, ডেপুটির কর্ম হয়, উকিল হয় সে বুদ্ধি চিঁড়েভেজা বুদ্ধি। সে বুদ্ধিতে জোলো দইয়ের মতো চিঁড়েটা ভেজে মাত্র। শুকো দইয়ের মতো উঁচুদরের দই নয়। যে বুদ্ধিতে ভগবানলাভ হয়, সেই বুদ্ধিই শুকো দইয়ের মতো উৎকৃষ্ট দই।

    মাস্টার—আহা! কি কথা!

    শশী—কালী তপস্বী ঠাকুরের কাছে বলেছিলেন, ‘কি হবে আনন্দ? ভীলদের তো আনন্দ আছে। অসভ্য হো-হো নাচছে-গাইছে।’

    রাখাল—উনি বললেন, সে কি? ব্রহ্মানন্দ আর বিষয়ানন্দ এক? জীবেরা বিষয়ানন্দ নিয়ে আছে। বিষয়াসক্তি সব না গেলে ব্রহ্মানন্দ হয় না। একদিকে টাকার আনন্দ, ইন্দ্রিয়সুখের আনন্দ, আর-একদিকে ঈশ্বরকে পেয়ে আনন্দ। এই দুই কখন সমান হতে পারে? ঋষিরা এ ব্রহ্মানন্দ ভোগ করেছিলেন।

    মাস্টার (Ramakrishna)—কালী এখন বুদ্ধদেবকে চিন্তা করেন কিনা তাই সব আনন্দের পারের কথা বলছেন।

    রাখাল—তাঁর কাছেও বুদ্ধদেবের কথা তুলেছিল। পরমহংসদেব বললেন, “বুদ্ধদেব অবতার, তাঁর সঙ্গে কি ধরা? বড় ঘরের বড় কথা।” কালী বলেছিল, “তাঁর শক্তি তো সব। সেই শক্তিতেই ঈশ্বরের আনন্দ আর সেই শক্তিতেই তো বিষয়ানন্দ হয় —”

    মাস্টার—ইনি কি বললেন?

    রাখাল—ইনি বললেন (Kathamrita), সে কি? সন্তান উৎপাদনের শক্তি আর ঈশ্বরলাভের শক্তি কি এক?

    শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তসঙ্গে—“কামিনী-কাঞ্চন বড় জঞ্জাল”

    বাগানের সেই দোতলার ‘হল’ ঘরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন। শরীর উত্তরোত্তর অসুস্থ হইতেছে, আজ আবার ডাক্তার মহেন্দ্র সরকার ও ডাক্তার রাজেন্দ্র দত্ত দেখিতে আসিয়াছেন—যদি চিকিৎসার দ্বারা কোন উপকার হয়। ঘরে নরেন্দ্র, রাখাল, শশী, সুরেন্দ্র, মাস্টার, ভবনাথ ও অন্যন্য অনেক ভক্তেরা আছেন।

  • Ramakrishna 661: “আমাকে কেউ কেউ ঈশ্বর বলে, আমি বললাম, ‘হাজার লোকে ঈশ্বর বলুক, আমার যতক্ষণ সত্য বলে না বোধ হয়, ততক্ষণ বলব না”

    Ramakrishna 661: “আমাকে কেউ কেউ ঈশ্বর বলে, আমি বললাম, ‘হাজার লোকে ঈশ্বর বলুক, আমার যতক্ষণ সত্য বলে না বোধ হয়, ততক্ষণ বলব না”

    ৫৩ কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    বুদ্ধদেব কি ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানতেন? নরেন্দ্রকে শিক্ষা

    অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৬, ২১শে এপ্রিল

    নরেন্দ্র ও ঈশ্বরের অস্তিত্ব — ভবনাথ, পূর্ণ, সুরেন্দ্র

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে (Ramakrishna) দর্শন করিয়া হীরানন্দ গাড়িতে উঠিতেছেন। গাড়ির কাছে নরেন্দ্র, রাখাল দাঁড়াইয়া তাঁহার সহিত মিষ্টালাপ করিতেছেন। বেলা দশটা। হীরানন্দ আবার কাল আসিবেন।

    আজ বুধবার, ৯ই বৈশাখ, চৈত্র কৃষ্ণা তৃতীয়া। ২১শে এপ্রিল, ১৮৮৬। নরেন্দ্র উদ্যানপথে বেড়াইতে বেড়াইতে মণির সহিত কথা কহিতেছেন। বাটিতে মা ও ভাইদের বড় কষ্ট — এখনও সুবন্দোবস্ত করিয়া দিতে পারেন নাই। তজ্জন্য চিন্তিত আছেন।

    নরেন্দ্র (Ramakrishna)— বিদ্যাসাগরের ইস্কুলের কর্ম আর আমার দরকার নাই। গয়াতে যাব মনে করেছি। একটা জমিদারীর ম্যানেজারের কর্মের কথা একজন বলেছে। ঈশ্বর-টীশ্বর নাই।

    মণি (সহাস্যে) — সে তুমি এখন বলছ; পরে বলবে না। Scepticism ঈশ্বরলাভের পথের একটা স্টেজ; এই সব স্টেজ পার হলে আরও এগিয়ে পড়লে তবে ভগবানকে পাওয়া যায়, — পরমহংসদেব বলেছেন।

    নরেন্দ্র — যেমন গাছ দেখছি, অমনি করে কেউ ভগবানকে দেখেছে (Kathamrita)?

    মণি — হাঁ, ঠাকুর দেখেছেন।

    নরেন্দ্র — সে মনের ভুল হতে পারে।

    মণি — জে যে অবস্থায় যা দেখে, সেই অবস্থায় তা তার পক্ষে রীয়্যালিটি (সত্য)। যতক্ষণ স্বপন দেখছ। একটা বাগানে গিয়েছ, ততক্ষণ বাগানটি তোমার পক্ষে রীয়্যালিটি; কিন্তু তোমার অবস্থা বদলালে — যেমন জাগরণ অবস্থায় — তোমার ওটা ভুল বলে বোধ হতে পারে! যে অবস্থায় ঈশ্বরদর্শন করা যায়, — সে অবস্থা হলে তখন রীয়্যালিটি (সত্য) বোধ হবে।

    নরেন্দ্র — আমি ট্রুথ চাই। সেদিন পরমহংস মহাশয়ের সঙ্গেই খুব তর্ক করলাম।

    মণি (সহাস্যে) — কি হয়েছিল (Kathamrita)?

    নরেন্দ্র (Ramakrishna)— উনি আমায় বলছিলেন, ‘আমাকে কেউ কেউ ঈশ্বর বলে।’ আমি বললাম, ‘হাজার লোকে ঈশ্বর বলুক, আমার যতক্ষণ সত্য বলে না বোধ হয়, ততক্ষণ বলব না।’

    “তিনি বললেন — ‘অনেকে যা বলবে, তাই তো সত্য — তাই তো ধর্ম!’

    “আমি বললাম, ‘নিজে ঠিক না বুঝলে অন্য লোকের কথা শুনব না’।”

    মণি (সহাস্যে) — তোমার ভাব Copernicus, Berkeley — এদের মতো। জগতের লোক বললছে, — সূর্য চলছে, Copernicus তা শুনলে না; জগতের লোক বলছে External World (জগৎ) আছে, Berkeley তা শুনলে না। তাই Lewis বলেছেন, ‘Why was not Berkeley a philosophical Copernicus?’

  • Ramakrishna 662: “ঠাকুর বলছেন, তাঁকে বিচার করে জানা যায় না, বিশ্বাসেই সমস্ত হয়, —জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, আলাপ—সব”

    ৫৩ কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    বুদ্ধদেব কি ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানতেন? নরেন্দ্রকে শিক্ষা

    অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৬, ২১শে এপ্রিল

    নরেন্দ্র ও ঈশ্বরের অস্তিত্ব — ভবনাথ, পূর্ণ, সুরেন্দ্র

    নরেন্দ্র (Ramakrishna)— উনি আমায় বলছিলেন, ‘আমাকে কেউ কেউ ঈশ্বর বলে।’ আমি বললাম, ‘হাজার লোকে ঈশ্বর বলুক, আমার যতক্ষণ সত্য বলে না বোধ হয়, ততক্ষণ বলব না।’

    “তিনি বললেন — ‘অনেকে যা বলবে, তাই তো সত্য — তাই তো ধর্ম!’

    “আমি বললাম, ‘নিজে ঠিক না বুঝলে অন্য লোকের কথা শুনব না’।”

    মণি (সহাস্যে) — তোমার ভাব Copernicus, Berkeley — এদের মতো। জগতের লোক বললছে, — সূর্য চলছে, Copernicus তা শুনলে না; জগতের লোক বলছে External World (জগৎ) আছে, Berkeley তা শুনলে না। তাই Lewis বলেছেন, ‘Why was not Berkeley a philosophical Copernicus?’

    নরেন্দ্র — একখানা History of philosophy দিতে পারেন?

    মণি — কি, Lewis?

    নরেন্দ্র  — না, Ueberweg; — German পড়তে হবে।

    মণি (Ramakrishna)—তুমি বলছো, সামনে গাছের মতন কেউ কি দেখেছে? তা ঈশ্বর মানুষ হয়ে যদি এসে বলেন, ‘আমি ঈশ্বর!’ তাহলে তুমি কি বিশ্বাস করবে? তুমি ল্যাজারাস্‌-এর গল্প তো জান? যখন ল্যাজারাস্‌ পরলোকে গিয়ে এব্রাহাম-কে বললে যে, আমি আত্মীয়বন্ধুদের বলে আসি যে সত্যই পরলোক আর নরক আছে। এব্রাহাম বললেন (Kathamrita), তুমি গিয়ে বললে কি তারা বিশ্বাস করবে? তারা বলবে, কে একটা জোচ্চোর এসে এই সব কথা বলছে।

    “ঠাকুর বলছেন, তাঁকে বিচার করে জানা যায় না। বিশ্বাসেই সমস্ত হয়, — জ্ঞান, বিজ্ঞান। দর্শন, আলাপ, — সব।”

    ভবনাথ বিবাহ করিয়াছেন। তাঁহার অন্নচিন্তা হইয়াছে। তিনি মাস্টারের কাছে আসিয়া বলিতেছেন, “বিদ্যাসাগরের নূতন ইস্কুল হবে, শুনলাম। আমারও তো খ্যাঁটের যোগাড় করতে হবে। ইস্কুলের একটা কাজ করলে হয় না?”

    রামলাল—পূর্ণের গাড়িভাড়া—সুরেন্দ্রের খসখসের পরদা

    বেলা তিনটে-চারটে। ঠাকুর শুইয়া আছেন। রামলাল পদসেবা করিতেছেন। ঘরে সিঁথির গোপাল ও মণি আছেন। রামলাল দক্ষিণেশ্বর হইতে আজ ঠাকুরকে দেখিতে আসিয়াছেন।

    ঠাকুর মণিকে জানালা বন্ধ করিয়া দিতে — ও পায়ে হাত বুলাইয়া দিতে বলিতেছেন।

    শ্রীযুক্ত পূর্ণকে গাড়িভাড়া করিয়া কাশীপুরের উদ্যানে আসিতে বলিয়াছিলেন। তিনি দর্শন করিয়া গিয়াছেন। গাড়িভাড়া মণি দিবেন। ঠাকুর গোপালকে ইঙ্গিত করিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছেন, “এঁর কাছে (টাকা) পেয়েছ?”

    গোপাল — আজ্ঞা, হাঁ।

    রাত নয়টা হইল। সুরেন্দ্র, রাম প্রভৃতি কলিকাতায় ফিরিয়া যাইবার উদ্যোগ করিতেছেন।

    বৈশাখ মাসের রৌদ্র — দিনের বেলা ঠাকুরের ঘর বড়ই গরম হয়। সুরেন্দ্র তাই খসখস আনিয়া দিয়াছেন। পরদা করিয়া জানালায় টাঙ্গাইয়া দিলে ঘর বেশ ঠাণ্ডা হইবে।

    সুরেন্দ্র — কই, খসখস কেউ পরদা করে টাঙ্গিয়ে দিলে না (Ramakrishna)? — কেউ মনোযোগ করে না।

    একজন ভক্ত (সহাস্যে) — ভক্তদের এখন ব্রহ্মজ্ঞানের অবস্থা। এখন ‘সোঽহম্‌’ — জগৎ মিথ্যা। আবার ‘তুমি প্রভু, আমি দাস (Kathamrita)’ এই ভাব যখন আসবে তখন এই সব সেবা হবে! (সকলের হাস্য)

  • Ramakrishna 660: “প্রেম-ভক্তির পথে থাকলে দেহে মন আসে, তা না হলে আমি কে? মানুষও নই—দেবতাও নই—আমার সুখও নাই, দুঃখও নাই”

    Ramakrishna 660: “প্রেম-ভক্তির পথে থাকলে দেহে মন আসে, তা না হলে আমি কে? মানুষও নই—দেবতাও নই—আমার সুখও নাই, দুঃখও নাই”

    ৫৩ কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    সপ্তদশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৬, ১৮ই এপ্রিল

    বুদ্ধদেব কি ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানতেন? নরেন্দ্রকে শিক্ষা

    “তুমি কেবল দুঃখটাই মনে করে রেখেছো। তিনি যে এত সুখ দিয়েছেন — তা ভুলে যাও কেন? তাঁর কত কৃপা! তিনটি বড় বড় জিনিস আমাদের দিয়েছেন—মানুষজন্ম, ঈশ্বরকে জানবার ব্যাকুলতা, আর মহাপুরুষের সঙ্গ দিয়েছেন। মনুষ্যত্বং মুমুক্ষুত্বং মহাপুরুষসংশ্রয়ঃ।”

    সকলে চুপ করিয়া আছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— আমার কিন্তু বেশ বোধ হয়, ভিতরে একটি আছে।

    রাজেন্দ্রলাল দত্ত আসিয়া বসিলেন। হোমিওপ্যাথিক মতে ঠাকুরের চিকিৎসা করিতেছেন। ঔষধাদির কথা হইয়া গেলে, ঠাকুর (Kathamrita) অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া মনোমোহনকে দেখাইতেছেন।

    ডাক্তার রাজেন্দ্র — উনি আমার মামাতো ভাইয়ের ছেলে।

    নরেন্দ্র নিচে আসিয়াছেন। আপনা-আপনি গান গাহিতেছেন:

    সব দুঃখ দূর করিলে দরশন দিয়ে, মোহিলে প্রাণ।
    সপ্তলোক ভুলে শোক, তোমারে পাইয়ে,
    কোথা আমি অতি দীন-হীন।

    নরেন্দ্রের একটু পেটের অসুখ করিয়াছে। মাস্টারকে বলিতেছেন — “প্রেম-ভক্তির পথে থাকলে দেহে মন আসে। তা না হলে আমি কে? মানুষও নই — দেবতাও নই — আমার সুখও নাই, দুঃখও নাই।”

    ঠাকুরের আত্মপূজা—সুরেন্দ্রকে প্রসাদ—সুরেন্দ্রের সেবা

    রাত্রি নয়টা হইল। সুরেন্দ্র প্রভৃতি ভক্তেরা ঠাকুরের কাছে পুষ্পমালা আনিয়া নিবেদন করিয়াছেন! ঘরে বাবুরাম, সুরেন্দ্র, লাটু, মাস্টার প্রভৃতি আছেন।

    ঠাকুর (Ramakrishna) সুরেন্দ্রের মালা নিজে গলায় ধারণ করিয়াছেন, সকলেই চুপ করিয়া বসিয়া আছেন। যিনি অন্তরে আছেন, ঠাকুর তাঁহারই বুঝি পূজা করিতেছেন!

    হঠাৎ সুরেন্দ্রকে ইঙ্গিত করিয়া ডাকিতেছেন। সুরেন্দ্র শয্যার কাছে আসিলে প্রসাদীমালা (যে মালা নিজে পরিয়াছিলেন) লইয়া নিজে তাঁহার গলায় পরাইয়া দিলেন!

    সুরেন্দ্র মালা পাইয়া প্রণাম করিলেন। ঠাকুর আবার তাঁহাকে ইঙ্গিত করিয়া পায়ে হাত বুলাইয়া দিতে বলিতেছেন। সুরেন্দ্র কিয়ৎক্ষণ ঠাকুরের (Kathamrita) পদসেবা করিলেন।

    কাশীপুর উদ্যানে ভক্তগণের সংকীর্তন

    ঠাকুর (Ramakrishna) যে ঘরে আছেন, তাহার পশ্চিমদিকে একটি পুষ্করিণী আছে। এই পুষ্করিনীর ঘাটের চাতালে কয়েকটি ভক্ত খোল-করতাল লইয়া গান গাইতেছেন। ঠাকুর লাটুকে দিয়া বলিয়া পাঠাইলেন — “তোমরা একটু হরিনাম কর।”

    মাস্টার, বাবুরাম প্রভৃতি এখনও ঠাকুরের কাছে বসিয়া আছেন। তাঁহারা শুনিতেছেন, ভক্তেরা গাইতেছেন:

    হরি বোলে আমার গৌর নাচে।

    ঠাকুর গান শুনিতে শুনিতে বাবুরাম, মাস্টার প্রভৃতিকে ইঙ্গিত করিয়া বলিতেছেন — “তোমরা নিচে যাও। ওদের সঙ্গে গান কর, — আর নাচবে।”

    তাঁহারা নিচে আসিয়া কীর্তনে যোগদান করিলেন।

    কিয়ৎক্ষণ পরে ঠাকুর আবার লোক পাঠাইয়াছেন। বলেছেন (Kathamrita), এই আখরগুলি দেবে — “গৌর নাচতেও জানে রে! গৌরের ভাবের বালাই যাই রে! গৌর আমার নাচে দুই বাহু তুলে!”

    কীর্তন সমাপ্ত হইল। সুরেন্দ্র (Ramakrishna)  ভাবাবিষ্টপ্রায় হইয়া গাইতেছেন —

             আমার পাগল বাবা, পাগলী আমার মা।
    আমি তাদের পাগল ছেলে, আমার মায়ের নাম শ্যামা ॥
    বাবা বব বম্‌ বলে, মদ খেয়ে মা গায়ে পড়ে ঢলে,
    শ্যামার এলোকেশে দোলে;
    রাঙা পায়ে ভ্রমর গাজে, ওই নূপুর বাজে শুন না।

  • Ramakrishna 659: “বিচার যদি কর, তাহলে ঈশ্বর আছেন, কেমন করে বলবে? আর বিশ্বাসের উপর যদি যাও, তাহলে সেব্য-সেবক মানতেই হবে”

    Ramakrishna 659: “বিচার যদি কর, তাহলে ঈশ্বর আছেন, কেমন করে বলবে? আর বিশ্বাসের উপর যদি যাও, তাহলে সেব্য-সেবক মানতেই হবে”

    ৫৩ কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    সপ্তদশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৬, ১৮ই এপ্রিল

    বুদ্ধদেব কি ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানতেন? নরেন্দ্রকে শিক্ষা

    বেলা নয়টা হইয়াছে, ঠাকুর মাস্টারের সহিত কথা কহিতেছেন, ঘরে শশীও আছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) — নরেন্দ্র আর শশী কি বলছিল — কি বিচার করছিল?

    মাস্টার (শশীর প্রতি) — কি কথা হচ্ছিল গা?

    শশী — নিরঞ্জন বুঝি বলেছে?

    শ্রীরামকৃষ্ণ — ‘ঈশ্বর নাস্তি অস্তি’, এই সব কি কথা হচ্ছিল (Kathamrita)?

    শশী (সহাস্যে) — নরেন্দ্রকে ডাকব?

    শ্রীরামকৃষ্ণ — ডাক।         [নরেন্দ্র আসিয়া উপবেশন করিলেন।]

    (মাস্টারের প্রতি) — “তুমি কিছু জিজ্ঞাসা কর। কি কথা হচ্ছিল, বল।”

    নরেন্দ্র — পেট গরম হয়েছে। ও আর কি বলবো।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — সেরে যাবে।

    মাস্টার (সহাস্যে) — বুদ্ধ অবস্থা কিরকম?

    নরেন্দ্র — আমার কি হয়েছে, তাই বলবো।

    মাস্টার — ঈশ্বর আছেন — তিনি কি বলেন?

    নরেন্দ্র — ঈশ্বর আছেন কি করে বলছেন? তুমিই জগৎ সৃষ্টি করছো। Berkely কি বলেছেন, জানো তো?

    মাস্টার — হাঁ, তিনি বলেছেন বটে — Their esse is percipii (The existence of external objects depends upon their perception.) — “যতক্ষণ ইন্দ্রিয়ের কাজ চলেছে, ততক্ষণই জগৎ!’

    পূর্বকথা—তোতাপুরীর ঠাকুরকে উপদেশ—“মনেই জগৎ”

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— ন্যাংটা বলত, “মনেই জগৎ, আবার মনেতেই লয় হয়।’

    “কিন্তু যতক্ষণ আমি আছে, ততক্ষণ সেব্য-সেবকই ভাল।”

    নরেন্দ্র (মাস্টারের প্রতি) — বিচার যদি কর, তাহলে ঈশ্বর আছেন, কেমন করে বলবে? আর বিশ্বাসের উপর যদি যাও, তাহলে সেব্য-সেবক মানতেই হবে। তা যাদি মানো — আর মানতেই হবে — তাহলে দয়াময়ও বলতে (Kathamrita) হবে।

  • Ramakrishna 659: “অর্জুন অত বড় জ্ঞানী। সঙ্গে কৃষ্ণ। তবু অভিমন্যুর শোকে একেবারে অধীর! কিশোরী আসে না কেন?”

    Ramakrishna 659: “অর্জুন অত বড় জ্ঞানী। সঙ্গে কৃষ্ণ। তবু অভিমন্যুর শোকে একেবারে অধীর! কিশোরী আসে না কেন?”

    ৫৩ কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    ষোড়শ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৬, ১৭ই – ১৮ই এপ্রিল

    কাশীপুর উদ্যানে নরেন্দ্র প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে বাস করিতেছেন। শরীর খুব অসুস্থ — কিন্তু ভক্তদের মঙ্গলের জন্য সর্বদাই ব্যাকুল। আজ শনিবার, ৫ই বৈশাখ, চৈত্র শুক্লা চতুর্দশী (১৭ই এপ্রিল, ১৮৮৬)। পূর্ণিমাও পড়িয়াছে।

    কয়দিন ধরিয়া প্রায় প্রত্যহ নরেন্দ্র দক্ষিণেশ্বরে যাইতেছেন — পঞ্চবটীতে ঈশ্বরচিন্তা করেন — সাধনা করেন। আজ সন্ধ্যার সময় ফিরিলেন। সঙ্গে শ্রীযুক্ত তারক ও কালী।

    রাত আটটা হইয়াছে। জ্যোৎস্না ও দক্ষিণে হাওয়া বাগানটিকে সুন্দর করিয়াছে। ভক্তেরা অনেকে নিচের ঘরে ধ্যান করিতেছেন। নরেন্দ্র মণিকে বলিতেছেন — “এরা ছাড়াচ্ছে” (অর্থাৎ ধ্যান করিতে করিতে উপাধি বর্জন করিতেছে)।

    কিয়ৎক্ষণ পরে মণি উপরের হলঘরে ঠাকুরের কাছে বসিয়া আছেন। ঠাকুর তাঁহাকে ডাবর ও গামছা পরিষ্কার করিয়া আনিতে আজ্ঞা করিলেন (Kathamrita)। তিনি পশ্চিমের পুষ্করিণীর ঘাট হইতে চাঁদের আলোতে ওইগুলি ধুইয়া আনিলেন।

    পরদিন সকালে (১৮ই এপ্রিল, ৬ই বৈশাখ, ১২৯৩, পূর্ণিমা) ঠাকুর মণিকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তিনি গঙ্গাস্নানের পর ঠাকুরকে দর্শন করিয়া হলঘরের ছাদে গিয়াছিলেন।

    মণির পরিবার পুত্রশোকে ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়াছেন। ঠাকুর তাঁহাকে বাগানে আসিবার কথা ও এখানে আসিয়া প্রসাদ পাইতে বলিলেন।

    ঠাকুর (Ramakrishna) ইশারা করিয়া বলিতেছেন — “এখানে আসতে বলবে — দুদিন থাকবে; — কোলের ছেলেটিকে যেন নিয়ে আসে; — আর এখানে এসে খাবে।”

    মণি — যে আজ্ঞা। খুব ঈশ্বরে ভক্তি হয়, তাহলে বেশ হয়।

    শ্রীরামকৃষ্ণ ইশারা করিয়া বলিতেছেন — “উহুঁ: — (শোক) ঠেলে দেয় (ভক্তিকে)। আর এত বড় ছেলে!

    “কৃষ্ণকিশোরের ভবনাথের মতো দুই ছেলে। দুটো আড়াইটে পাস। মারা গেল। অত বড় জ্ঞানী! — প্রথম প্রথম সামলাতে পারলে না। আমায় ভাগ্যিস ঈশ্বর দেন নি!

    “অর্জুন অত বড় জ্ঞানী। সঙ্গে কৃষ্ণ। তবু অভিমন্যুর শোকে একেবারে অধীর! কিশোরী আসে না কেন?”

    একজন ভক্ত — সে রোজ গঙ্গাস্নানে যায়।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — এখানে আসে না কেন?

    ভক্ত — আজ্ঞে আসতে বলব।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (লাটুর প্রতি) — হরিশ আসে না কেন?

    মেয়েদের লজ্জাই ভূষণ — পূর্বকথা — মাস্টারের বাড়িতে শুভাগমন

    মাস্টারের বাটীর নয়-দশ বছরের দুইটি মেয়ে ঠাকুরের কাছে কাশীপুর বাগানে আসিয়া ‘দুর্গানাম জপ সদা’, ‘মজলো আমার মন ভ্রমরা’ ইত্যাদি গান শুনিয়াছিল। ঠাকুর যখন মাস্টারের শ্যামপুকুরের তেলিপাড়ার বাটিতে শুভাগমন করেন (৩০শে অক্টোবর, ১৮৮৪; ১৫ই কার্তিক, বৃসস্পতিবার, উত্থান একাদশীর দিন) তখন এই দুটি মেয়ে ঠাকুরকে গান শুনাইয়াছিল। ঠাকুর গান শুনিয়া অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। যখন ঠাকুরের কাছে কাশীপুর বাগানে আজ তাহারা উপরে গান গাহিতেছিল, ভক্তেরা (Kathamrita) নিচে হইতে শুনিয়াছিলেন। তাঁহারা আবার তাহাদের নিচে ডাকাইয়া গান শুনিলেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি) — তোমার মেয়েদের আর গান শিখিও না। আপনা-আপনি গায় সে এক। যার তার কাছে গাইলে লজ্জা ভেঙে যাবে, লজ্জা মেয়েদের বড় দরকার।

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের আত্মপূজা — ভক্তদের প্রসাদ প্রদান

    ঠাকুরের (Ramakrishna) সম্মুখে পুষ্পপাত্রে ফুল-চন্দন আনিয়া দেওয়া হইয়াছে। ঠাকুর শয্যায় বসিয়া আছেন। ফুল-চন্দন দিয়া আপনাকেই পূজা করিতেছেন। সচন্দন পুষ্প কখনও মস্তকে, কখনও কণ্ঠে, কখনও হৃদয়ে, কখনও নাভিদেশে, ধারণ করিতেছেন।

    মনোমোহন কোন্নগর হইতে আসিলেন ও ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া উপবিষ্ট হইলেন। ঠাকুর আপনাকে এখনও পূজা করিতেছেন। নিজের গলায় পুষ্পমালা দিলেন।

    কিয়ৎক্ষণ পরে যেন প্রসন্ন হইয়া মনোমোহনকে নির্মাল্য প্রদান করিলেন। মণিকে একটি চম্পক দিলেন।

  • Ramakrishna 658: “পাগল হোক আর ভক্তদের কাছে মারই খাক আপনার তো অষ্টপ্রহর চিন্তা করছে! সে যে ভাবেই করুক, তার কখনও মন্দ হবে না!”

    Ramakrishna 658: “পাগল হোক আর ভক্তদের কাছে মারই খাক আপনার তো অষ্টপ্রহর চিন্তা করছে! সে যে ভাবেই করুক, তার কখনও মন্দ হবে না!”

    ৫৩ কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৬, ১৬ই এপ্রিল

    অবতার বেদবিধির পার — বৈধীভক্তি ও ভক্তি উন্মাদ

    শ্রীরামকৃষ্ণ (গিরিশাদি ভক্তের প্রতি) — পাগলীর মধুরভাব। দক্ষিণেশ্বরে (Ramakrishna) একদিন গিছল। হঠাৎ কান্না। আমি জিজ্ঞাসা করলুম, কেন কাঁদছিস? তা বলে, মাথাব্যথা করছে। (সকলের হাস্য)

    “আর-একদিন গিছল। আমি খেতে বসেছি। হঠাৎ বলছে, ‘দয়া করলেন না?’ আমি উদারবুদ্ধিতে খাচ্চি। তারপর বলছে, ‘মনে ঠেল্লেন কেন?’ জিজ্ঞাসা করলুম, ‘তোর কি ভাব?’ তা বললে, ‘মধুরভাব!’ আমি বললাম, ‘আরে আমার যে মাতৃযোনি! আমার যে সব মেয়েরা মা হয়!’ তখন বলে, ‘তা আমি জানি না।’ তখন রামলালকে ডাকলাম (Kathamrita)। বললাম, ‘ওরে রামলাল, কি মনে ঠ্যালাঠেলি বলছে শোন দেখি।’ ওর এখনও সেই ভাব আছে।”

    গিরিশ — সে পাগলী — ধন্য! পাগল হোক আর ভক্তদের কাছে মারই খাক আপনার তো অষ্টপ্রহর চিন্তা করছে! সে যে ভাবেই করুক, তার কখনও মন্দ হবে না!

    “মহাশয়, কি বলব! আপনাকে চিন্তা করে আমি কি ছিলাম, কি হয়েছি! আগে আলস্য ছিল, এখন সে আলস্য ঈশ্বরে নির্ভর হয়ে দাঁড়িয়েছে! পাপ ছিল, তাই এখন নিরহংকার হয়েছি! আর কি বলব!”

    ভক্তেরা (Ramakrishna) চুপ করিয়া আছেন। রাখাল পাগলীর কথা উল্লেখ করিয়া দুঃখ করিতেছেন। বললেন, দুঃখ হয়, সে উপদ্রব করে আর তার জন্য অনেকে কষ্টও পায়।

    নিরঞ্জন (রাখালের প্রতি) — তোর মাগ আছে তাই তোর মন কেমন করে। আমরা তাকে বলিদান দিতে পারি।

    রাখাল (বিরক্ত হইয়া) — কি বাহাদুরি! ওঁর সামনে ওই সব কথা!

    গিরিশকে উপদেশ—টাকায় আসক্তি—সদ্ব্যবহার—ডাক্তার কবিরাজের দ্রব্য

    শ্রীরামকৃষ্ণ (গিরিশের প্রতি) — কামিনী-কাঞ্চনই সংসার। অনেকে টাকা গায়ের রক্ত মনে করে। কিন্তু টাকাকে বেশি যত্ন করলে একদিন হয়তো সব বেরিয়ে যায়।

    “আমাদের দেশে মাঠা আল বাঁধে। আল জানো? যারা খুব যত্ন করে চারিদিকে আল দেয়, তাদের আল জলের তোড়ে ভেঙে যায়। যরা একদিকে খুলে ঘাসের চাপড়া দিয়ে রাখে, তাদের কেমন পলি পড়ে, কত ধান হয়।

    “যারা টাকার সদ্ব্যবহার করে, ঠাকুরসেবা (Ramakrishna), সাধু ভক্তের সেবা করে, দান করে তাদেরই কাজ হয়। তাদেরই ফসল হয়।

    “আমি ডাক্তার কবিরাজের জিনিস খেতে পারি না। যারা লোকের কষ্ট থেকে টাকা রোজগার করে! ওদের ধন যেন রক্ত-পুঁজ!”

    এই বলিয়া ঠাকুর দুইজন চিকিৎসকের নাম করিলেন (Kathamrita)।

    গিরিশ — রাজেন্দ্র দত্তের খুব দরাজ মন; কারু কাছে একটি পয়সা লয় না। তার দান-ধ্যান আছে।

  • Ramakrishna 657: “কি সংসারী কি ত্যাগী সব্বাইকে ভাল করে দিতে পারেন! মলয়ের হাওয়া বইলে, আমি বলি, সব কাঠ চন্দন হয়”

    Ramakrishna 657: “কি সংসারী কি ত্যাগী সব্বাইকে ভাল করে দিতে পারেন! মলয়ের হাওয়া বইলে, আমি বলি, সব কাঠ চন্দন হয়”

    ৫৩ কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৬, ১৬ই এপ্রিল

    অবতার বেদবিধির পার — বৈধীভক্তি ও ভক্তি উন্মাদ

    গিরিশ পুনর্বার ঘরে আসিয়া ঠাকুরের সম্মুখে বসিয়াছেন ও পান খাইতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) — রাখাল-টাখাল এখন বুঝেছে কোন্‌টা ভাল, কোন্‌টা মন্দ; কোন্‌টা সত্য, কোন্‌টা মিথ্যা। ওরা যে সংসারে গিয়ে থাকে, সে জেনেশুনে। পরিবার আছে, ছেলেও হয়েছে — কিন্তু বুঝেছে যে সব মিথ্যা। অনিত্য। রাখাল-টাখাল এরা সংসারে লিপ্ত হবে না।

    “যেমন পাঁকাল মাছ। পাঁকের ভিতর বাস, কিন্তু গায়ে পাঁকের দাগটি পর্যন্ত নাই!”

    গিরিশ — মহাশয়, ও-সব আমি বুঝি না। মনে করলে সব্বাইকে নির্লিপ্ত আর শুদ্ধ করে দিতে পারেন। কি সংসারী কি ত্যাগী সব্বাইকে ভাল করে দিতে পারেন! মলয়ের হাওয়া বইলে, আমি বলি, সব কাঠ চন্দন হয় —

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) — সার না থাকলে চন্দন হয় না। শিমূল আরও কয়টি গাছ, এরা চন্দন হয় না।

    গিরিশ — তা শুনি না।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — আইনে এরূপ আছে।

    গিরিশ — আপনার সব বে-আইনি!

    ভক্তেরা অবাক্‌ হইয়া শুনিতেছেন। মণির হাতের পাখা এক-একবার স্থির হইয়া যাইতেছে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — হাঁ, তা হতে পারে; ভক্তি-নদী ওথলালে ডাঙ্গায় একবাঁশ জল।

    “যখন ভক্তি উন্মাদ হয়, তখন বেদবিধি মানে না। দূর্বা তোলে; তা বাছে না! যা হাতে আসে, তাই লয়। তুলসী তোলে, পড়পড় করে ডাল ভাঙে! আহা কি অবস্থাই গেছে (Kathamrita)!

    (মাস্টারের প্রতি) — “ভক্তি হলে আর কিছুই চাই না!”

    মাস্টার — আজ্ঞা হাঁ।

    সীতা ও শ্রীরাধা—রামাবতার ও কৃষ্ণাবতারের বিভিন্ন ভাব

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— একটা ভাব আশ্রয় করতে হয়। রামাবতারে শান্ত, দাস্য, বাৎসল্য, সখ্য ফখ্য। কৃষ্ণাবতারে ও-সবও ছিল, আবার মধুরভাব।

    “শ্রীমতীর মধুরভাব — ছেনালি আছে। সীতার শুদ্ধ সতীত্ব — ছেনালি নাই।

    “তাঁরই লীলা। যখন যে ভাব।”

    বিজয়ের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে কালীবাড়িতে একটি পাগলের মতো স্ত্রীলোক ঠাকুরকে গান শুনাইতে যাইত। শ্যামাবিষয়ক গান ও ব্রহ্ম সঙ্গীত। সকলে পাগলী বলে (Kathamrita)। সে কাশীপুরের বাগানেও সর্বদা আসে ও ঠাকুরের কাছে যাবার জন্য বড় উপদ্রব করে। ভক্তদের সেই জন্য সর্বদা ব্যস্ত থাকতে হয়।

  • Ramakrishna 656: “মৌমাছি কেবল ফুলে বসে—মধু খাবে বলে, অন্য কোন জিনিস মৌমাছির ভাল লাগে না”

    Ramakrishna 656: “মৌমাছি কেবল ফুলে বসে—মধু খাবে বলে, অন্য কোন জিনিস মৌমাছির ভাল লাগে না”

    ৫৩ কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    চতুর্দশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৬, ১৬ই এপ্রিল
    ঠাকুর গিরিশ প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে — ভক্তের প্রতি ঠাকুরের স্নেহ

    ঠাকুর (Ramakrishna) সর্বদা কথা কহিতে পারেন না, বড় কষ্ট হয়। নিজের ওষ্ঠাধর অঙ্গুলি দ্বারা স্পর্শ করিয়া ইঙ্গিত করিলেন, “পরিবারদের খাওয়া-দাওয়া কিরূপে হবে — তাদের কিসে চলবে?”

    গিরিশ — তা কি করবেন জানি না।

    সকলে চুপ করিয়া আছেন। গিরিশ খাবার খাইতে খাইতে কথা আরম্ভ করিলেন।

    গিরিশ — আচ্ছা, মহাশয় — কোনটা ঠিক! কষ্টে সংসার ছাড়া না সংসারে থেকে তাঁকে ডাকা?

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) — গীতায় দেখনি? অনাসক্ত হয়ে সংসারে থেকে কর্ম করলে, সব মিথ্যা জেনে জ্ঞানের পর সংসারে থাকলে, ঠিক ঈশ্বরলাভ হয়।

    “যারা কষ্টে ছাড়ে, তারা হীন থাকের লোক (Kathamrita)।

    “সংসারী জ্ঞানী কিরকম জানো? যেমন সার্সীর ঘরে কেউ আছে। ভিতর বার দুই দেখতে পায়।”

    আবার সকলে চুপ করিয়া আছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি) — কচুরি গরম আর খুব ভাল।

    মাস্টার (গিরিশের প্রতি) — ফাগুর দোকানের কচুরি! বিখ্যাত।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) — বিখ্যাত!

    গিরিশ (খাইতে খাইতে, সহাস্যে) — বেশ কচুরি।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — লুচি থাক, কচুরি খাও। (মাস্টারকে) কচুরি কিন্তু রজোগুণের।

    গিরিশ খাইতে খাইতে আবার কথা তুলিলেন।

    সংসারীর মন ও ঠিক ঠিক ত্যাগীর মনের প্রভেদ

    গিরিশ (শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি) — আচ্ছা মহাশয়, মনটা এত উঁচু আছে, আবার নিচু হয় কেন?

    শ্রীরামকৃষ্ণ — সংসারে থাকতে গেলেই ও-রকম হয়। কখনও উঁচু, কখনও নিচু। কখনও বেশ ভক্তি হচ্ছে, আবার কমে যায়। কামিনী-কাঞ্চন নিয়ে থাকতে হয় কিনা, তাই হয়। সংসারে ভক্ত কখন ঈশ্বরচিন্তা, হরিনাম করে; কখন বা কামিনী-কাঞ্চনে মন দিয়ে ফেলে। যেমন সাধারণ মাছি — কখন সন্দেশে বসছে, কখন বা পচা ঘা বা বিষ্ঠাতেও বসে।

    “ত্যাগীদের আলাদা কথা। তারা কামিনী-কাঞ্চন থেকে মন সরিয়ে এনে কেবল ঈশ্বরকে দিতে পারে; কেবল হরিরস পান করতে পারে (Kathamrita)। ঠিক ঠিক ত্যাগী হলে ঈশ্বর বই তাদের আর কিছু ভাল লাগে না। বিষয়কথা হলে উঠে যায়; ঈশ্বরীয় কথা হলে শুনে। ঠিক ঠিক ত্যাগী হলে নিজেরা ঈশ্বরকথা বই আর অন্যবাক্য মুখে আনে না।

    “মৌমাছি কেবল ফুলে বসে—মধু খাবে বলে, অন্য কোন জিনিস মৌমাছির ভাল লাগে না।”

    গিরিশ দক্ষিণের ছোট ছাদটির উপর হাত ধুইতে গেলেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) — ঈশ্বরের অনুগ্রহ চাই, তবে তাঁতে সব মন হয়। অনেকগুলো কচুরি খেলে, ওকে বলে এসো আজ আর কিছু না খায়।

LinkedIn
Share