Tag: Mahendranath Gupta

  • Ramakrishna 618: “অশ্বত্থ গাছে যে পাতা নড়ছে, সেও ঈশ্বরের ইচ্ছায়—তাঁর ইচ্ছা বই একটি পাতাও নড়বার জো নাই!”

    Ramakrishna 618: “অশ্বত্থ গাছে যে পাতা নড়ছে, সেও ঈশ্বরের ইচ্ছায়—তাঁর ইচ্ছা বই একটি পাতাও নড়বার জো নাই!”

    ৫২ শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    ত্রয়োবিংশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৬শে অক্টোবর

    FREE WILL OR GOD’S WILL

    যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া’

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—আমি তো মুখ্যু, আমি কিছু জানি না, তবে এ-সব বলে কে? আমি বলি, ‘মা, আমি যন্ত্র, তুমি যন্ত্রী; আমি ঘর, তুমি ঘরণী; আমি রথ, তুমি রথী; যেমন করাও তেমনি করি, যেমন বলাও তেমনি বলি, যেমন চালাও তেমনি চলি; নাহং নাহং, তুঁহু তুঁহু।’ তাঁরই জয়; আমি তো কেবল যন্ত্র মাত্র! শ্রীমতী যখন সহস্রধারা কলসী লয়ে যাচ্ছিলেন, জল একটুকুও পড়ে নাই, সকলে তাঁর প্রশংসা করতে লাহল; বলে এমন সতী হবে না। তখন শ্রীমতী বললেন (Kathamrita), ‘তোমরা আমার জয় কেন দাও; বল, কৃষ্ণের জয়, কৃষ্ণের জয়! আমি তাঁর দাসী মাত্র।’ ওই অবস্থায় ভাবে বিজয়কে বুকে পা দিলুম; এদিকে তো বিজয়কে এত ভক্তি করি, সেই বিজয়ের গায়ে পা দিলুম, তার কি বল দেখি!

    ডাক্তার — তারপর সাবধান হওয়া উচিত।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) হাতজোড় করে — আমি কি করব? সেই অবস্থাটা এলে বেহুঁশ হয়ে যাই! কি করি, কিছুই জানতে পারি না।

    ডাক্তার — সাবধান হওয়া উচিত, হাতজোড় করলে কি হবে?

    শ্রীরামকৃষ্ণ — তখন কি আমি কিছু করতে পারি? — তবে তুমি আমার অবস্থা কি মনে কর? যদি ঢঙ মনে কর তাহলে তোমার সায়েন্স-মায়েন্স সব ছাই পড়েছো।

    ডাক্তার — মহাশয়, যদি ঢঙ মনে করি তাহলে কি এত আসি? এই দেখ, সব কাজ ফেলে এখানে আসি; কত রোগীর বাড়ি যেতে পারি না, এখানে এসে ছয়-সাত ঘণ্টা ধরে থাকি।

    ন যোৎস্য’ — ভগবদ্‌গীতা — ঈশ্বরই কর্তা, অর্জুন যন্ত্র 

    শ্রীরামকৃষ্ণ  (Ramakrishna)— সেজোবাবুকে বলেছিলাম, তুমি মনে করো না, তুমি একটা বড়মানুষ, আমায় মানছো বলে আমি কৃতার্থ হয়ে গেলুম! তা তুমি মানো আর নাই মানো। তবে একটি কথা আছে (Kathamrita) — মানুষ কি করবে, তিনিই মানাবেন। ঈশ্বরীয় শক্তির কাছে মানুষ খড়কুটো!

    ডাক্তার — তুমি কি মনে করেছো অমুক মাড় তোমায় মেনেছে বলে আমি তোমায় মানব? তবে তোমায় সম্মান করি বটে, তোমায় রিগার্ড করি, মানুষকে যেমন রিগার্ড করে —

    শ্রীরামকৃষ্ণ — আমি কি মানতে বলছি গা?

    গিরিশ ঘোষ — উনি কি আপনাকে মানতে বলছেন?

    ডাক্তার (শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি) — তুমি কি বলছো — ঈশ্বরের ইচ্ছা?

    শ্রীরামকৃষ্ণ — তবে আর কি বলছি! ঈশ্বরীয় শক্তির কাছে মানুষ কি করবে? অর্জুন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে বললেন, আমি যুদ্ধ করতে পারব না, জ্ঞাতি বধ করা আমার কর্ম নয়। শ্রীকৃষ্ণ বললেন — ‘অর্জুন! তোমায় যুদ্ধ করতেই হবে, তোমার স্বভাবে করাবে!’ শ্রীকৃষ্ণ সব দেখিয়ে দিলেন, এই এই লোক মরে রয়েছে। শিখরা ঠাকুর বাড়িতে এসেছিল; তাঁদের মতে অশ্বত্থ গাছে যে পাতা নড়ছে, সেও ঈশ্বরের ইচ্ছায় — তাঁর ইচ্ছা বই একটি পাতাও নড়বার জো নাই!

  • Ramakrishna 617: “তাঁর কৃপা হলে জ্ঞানের অভাব থাকে না, মূর্খ বিদ্বান হয়, বোবার কথা ফুটে! তাই বলছি, বই পড়লেই পণ্ডিত হয় না”

    Ramakrishna 617: “তাঁর কৃপা হলে জ্ঞানের অভাব থাকে না, মূর্খ বিদ্বান হয়, বোবার কথা ফুটে! তাই বলছি, বই পড়লেই পণ্ডিত হয় না”

     শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৬শে অক্টোবর
    ভক্তসঙ্গে — শুধু পাণ্ডিত্যে কি আছে?

    সকলে বিশ্বাস করে ওই দোকানেই আসে, ভাবে এরা পরমভক্ত, কখনও ঠকাতে যাবে না। একদল খদ্দের এলে দেখত কোনও কারিগর বলছে ‘কেশব!’ (Ramakrishna) ‘কেশব!’ আর-একজন কারিগর খানিক পরে নাম করছে ‘গোপাল!’ ‘গোপাল!’ আবার খানিকক্ষণ পরে একজন কারিগর বলছে, ‘হরি’, ‘হরি’, তারপর কেউ বলছে (Kathamrita) ‘হর; হর!’ কাজে কাজেই এত ভগবানের নাম দেখে খরিদ্দারেরা সহজেই মনে করত, এ-স্যাকরা অতি উত্তম লোক। — কিন্তু ব্যাপারটা কি জানো? যে বললে, ‘কেশব, কেশব!’ তার মনের ভাব, এ-সব (খদ্দের) কে? যে বললে ‘গোপাল! গোপাল!’ তার অর্থ এই যে আমি এদের চেয়ে চেয়ে দেখলুম, এরা গরুর পাল। (হাস্য)

    যে বললে ‘হরি হরি’—তার অর্থ এই যে, যদি গরুর পাল, তবে হরি অর্থাৎ হরণ করি। (হাস্য) যে বললে, ‘হর হর!’—তার মানে এই—তবে হরণ কর, হরণ কর; এরা তো গরুর পাল! (হাস্য)

    “সেজোবাবুর সঙ্গে আর-একজায়গায় গিয়েছিলাম (Kathamrita); অনেক পণ্ডিত আমার সঙ্গে বিচার করতে এসেছিল। আমি তো মুখ্যু! (সকলের হাস্য) তারা আমার সেই অবস্থা দেখলে, আর আমার সঙ্গে কথাবার্তা হলে বললে, মহাশয়! আগে যা পড়েছি, তোমার সঙ্গে কথা কয়ে সে সব পড়া বিদ্যা সব থু হয়ে গেল! এখন বুঝেছি, তাঁর কৃপা হলে জ্ঞানের অভাব থাকে না, মূর্খ বিদ্বান হয়, বোবার কথা ফুটে! তাই বলছি, বই পড়লেই পণ্ডিত হয় না।”

    পূর্বকথা—প্রথম সমাধি—আবির্ভাব ও মূর্খের কণ্ঠে সরস্বতী

    “হাঁ, তাঁর কৃপা হলে জ্ঞানের কি আর অভাব থাকে? দেখ না, আমি মুখ্যু, কিছুই জানি না, তবে এ-সব কথা বলে কে? আবার এ-জ্ঞানের ভাণ্ডার অক্ষয় (Ramakrishna)। ও দেশে ধান মাপে, ‘রামে রাম, রামে রাম’, বলতে বলতে। একজন মাপে, আর যাই ফুরিয়ে আসে, আর-একজন রাশ ঠেলে দেয়। তার কর্মই ওই, ফুরালেই রাশ ঠেলে। আমিও যা কথা কয়ে যাই, ফুরিয়ে আসে আসে হয়, মা আমার অমনি তাঁর অক্ষয় জ্ঞান-ভাণ্ডারের রাশ ঠেলে দেন!

    “ছেলেবেলায় তাঁর আর্বিভাব হয়েছিল। এগারো বছরের সময় মাঠের উপর কি দেখলুম! সবাই বললে, বেহুঁশ হয়ে গিছলুম, কোন সাড় ছিল না। সেই দিন থেকে আর-একরকম হয়ে গেলুম। নিজের ভিতর আর-একজনকে দেখতে লাগলাম! যখন ঠাকুর পূজা করতে যেতুম, হাতটা অনেক সময় ঠাকুরের দিকে না গিয়ে নিজের মাথার উপর আসত, আর ফুল মাথায় দিতুম! যে ছোকরা আমার কাছে থাকত, সে আমার কাছে আসত না; বলত, তোমার মুখে কি এক জ্যোতিঃ দেখছি, তোমার বেশি কাছে যেতে ভয় হয়!”

    কলিকাতা বেনেটোলা নিবাসী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পরমভক্ত শ্রীঅধরলাল সেনের বাটীতে শ্রীযুক্ত বঙ্কিমচন্দ্র চাটুজ্যের সহিত শ্রীশ্রীপরমহংসদেবের (Ramakrishna) দেখা হইয়াছিল। বঙ্কিমবাবু তাঁহাকে এই একবার মাত্র দর্শন করিয়াছিলেন।

  • Ramakrishna 616: “কি রকম ভক্ত আছে গো? ‘গোপাল!’ ‘গোপাল!’ যারা বলেছিল, সেইরকম ভক্ত নাকি?”

    Ramakrishna 616: “কি রকম ভক্ত আছে গো? ‘গোপাল!’ ‘গোপাল!’ যারা বলেছিল, সেইরকম ভক্ত নাকি?”

    ৫২ শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৬শে অক্টোবর
    ভক্তসঙ্গে — শুধু পাণ্ডিত্যে কি আছে?

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— বঙ্কিম তোমাদের একজন পণ্ডিত। বঙ্কিমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল — আমি জিজ্ঞাসা করলুম, মানুষের কর্তব্য কি? তা বলে (Kathamrita), ‘আহার, নিদ্রা আর মৈথুন।’ এই সকল কথাবার্তা শুনে আমার ঘৃণা হল। বললুম যে, তোমার এ কিরকম কথা! তুমি তো বড় ছ্যাঁচ্‌ড়া। যা সব রাতদিন চিন্তা করছো, কাজে করছো, তাই আবার মুখ দিয়ে বেরুচ্চে। মূলো খেলেই মূলোর ঢেঁকুর উঠে। তারপর অনেক ঈশ্বরীয় কথা হল। ঘরে সংকীর্তন হল। আমি আবার নাচলুম। তখন বলে, মহাশয়! আমাদের ওখানে একবার যাবেন। আমি বললুম, সে ঈশ্বরের ইচ্ছা। তখন বলে, আমাদের সেখানেও ভক্ত আছে, দেখবেন। আমি হাসতে হাসতে বললুম, কি রকম ভক্ত আছে গো? ‘গোপাল!’ ‘গোপাল!’ যারা বলেছিল, সেইরকম ভক্ত নাকি?

    ডাক্তার — ‘গোপাল!’ ‘গোপাল।’ সে ব্যাপারটা কি?

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— একটি স্যাকরার দোকান ছিল। বড় ভক্ত, পরম বৈষ্ণব — গলায় মালা, কপালে তিলক, হস্তে হরিনামের মালা। সকলে বিশ্বাস করে ওই দোকানেই আসে, ভাবে এরা পরমভক্ত, কখনও ঠকাতে যাবে না। একদল খদ্দের এলে দেখত কোনও কারিগর বলছে ‘কেশব!’ ‘কেশব!’ আর-একজন কারিগর খানিক পরে নাম করছে ‘গোপাল!’ ‘গোপাল!’ আবার খানিকক্ষণ পরে একজন কারিগর বলছে, ‘হরি’, ‘হরি’, তারপর কেউ বলছে ‘হর; হর!’ কাজে কাজেই এত ভগবানের নাম দেখে খরিদ্দারেরা সহজেই মনে করত, এ-স্যাকরা অতি উত্তম লোক। — কিন্তু ব্যাপারটা কি জানো? যে বললে, ‘কেশব, কেশব!’ তার মনের ভাব, এ-সব (খদ্দের) কে? যে বললে ‘গোপাল! গোপাল!’ তার অর্থ এই যে আমি এদের চেয়ে চেয়ে দেখলুম, এরা গরুর পাল। (হাস্য)

    যে বললে ‘হরি হরি’ — তার অর্থ এই যে, যদি গরুর পাল(Kathamrita), তবে হরি অর্থাৎ হরণ করি। (হাস্য) যে বললে, ‘হর হর!’ — তার মানে এই — তবে হরণ কর, হরণ কর; এরা তো গরুর পাল! (হাস্য)

  • Ramakrishna 615: “অনকগুলি ভক্ত সম্মুখে উপবিষ্ট; তন্মধ্যে শ্রীযুক্ত গিরিশ ঘোষ, ছোট নরেন্দ্র, শরৎ ইত্যাদি”

    Ramakrishna 615: “অনকগুলি ভক্ত সম্মুখে উপবিষ্ট; তন্মধ্যে শ্রীযুক্ত গিরিশ ঘোষ, ছোট নরেন্দ্র, শরৎ ইত্যাদি”

    শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৬শে অক্টোবর
    ভক্তসঙ্গে — শুধু পাণ্ডিত্যে কি আছে?

    এই সকল কথা হইতে হইতে শ্রীশ্রীঠাকুর পরমহংসদেব শ্যমপুকুরে (Ramakrishna) যে বাড়িতে চিকিৎসার্থ অবস্থান করিতেছেন, সেই বাড়ির সম্মুখে ডাক্তারের গাড়ি আসিয়া লাগিল। তখন বেলা ১টা। ঠাকুর দোতলার ঘরে বসিয়া আছেন। অনকগুলি ভক্ত সম্মুখে উপবিষ্ট; তন্মধ্যে শ্রীযুক্ত গিরিশ ঘোষ, ছোট নরেন্দ্র, শরৎ ইত্যাদি। সকলের দৃষ্টি সেই মহাযোগী সদানন্দ মহাপুরুষের দিকে। সকলে যেন মন্ত্রমুগ্ধ সর্পের ন্যায় রোজার সম্মুখে বসিয়া আছেন। অথবা বরকে লইয়া বরযাত্রীরা যেন আনন্দ করিতেছেন। ডাক্তার ও মাস্টার আসিয়া প্রণাম করিয়া আসন গ্রহণ (Kathamrita) করিলেন।

    ডাক্তারকে দেখিয়া হাসিতে হাসিতে শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) বলিতেছেন, “আজ বেশ ভাল আছি।”

    ক্রমে ভক্তসঙ্গে ঈশ্বর সম্বন্ধীয় অনেক কথাবার্তা চলিতে লাগিল।

    পূর্বকথা—রামনারায়ণ ডাক্তার—বঙ্কিম সংবাদ

    শ্রীরামকৃষ্ণ — শুধু পণ্ডিত কি হবে, যদি বিবেক-বৈরাগ্য না থাকে। ঈশ্বরের পাদপদ্ম চিন্তা করলে আমার একটি অবস্থা হয়। পরনের কাপড় পড়ে যায়, শিড়্‌ শিড় করে পা থেকে মাথা পর্যন্ত কি একটা উঠে। তখন সকলকে তৃণজ্ঞান হয়। পণ্ডিতের যদি দেখি বিবেক নাই, ঈশ্বরে ভালবাসা নাই, খড়কুটো মনে হয়।

    “রামনারায়ণ ডাক্তার আমার সঙ্গে তর্ক করছিল; হঠাৎ সেই অবস্থাটা হল। তারপর তাঁকে বললুম, তুমি কি বলছো? তাঁকে তর্ক করে কি বুঝবে! তাঁর সৃষ্টিই বা কি বুঝবে। তোমার তো ভারী তেঁতে বুদ্ধি। আমার অবস্থা দেখে সে কাঁদতে লাগল — আর আমার পা টিপতে লাগল।”

    ডাক্তার — রামনারায়ণ (Ramakrishna) ডাক্তার হিন্দু কি না! আবার ফুল-চন্দন লয়! সত্য হিন্দু কি না।

    মাস্টার (স্বগতঃ) — ডাক্তার বলেছিলেন, আমি শাঁকঘণ্টায় (Kathamrita) না।।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — বঙ্কিম তোমাদের একজন পণ্ডিত। বঙ্কিমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল — আমি জিজ্ঞাসা করলুম, মানুষের কর্তব্য কি? তা বলে, ‘আহার, নিদ্রা আর মৈথুন।’ এই সকল কথাবার্তা শুনে আমার ঘৃণা হল। বললুম যে, তোমার এ কিরকম কথা! তুমি তো বড় ছ্যাঁচ্‌ড়া। যা সব রাতদিন চিন্তা করছো, কাজে করছো, তাই আবার মুখ দিয়ে বেরুচ্চে।

  • Ramakrishna 6134: “অহংকার যদি থাকে, কিছুদিনের মধ্যে আর থাকবে না, তাঁর কাছে বসলে জীবের অহংকার পলায়ন করে অহংকার চূর্ণ হয়”

    Ramakrishna 6134: “অহংকার যদি থাকে, কিছুদিনের মধ্যে আর থাকবে না, তাঁর কাছে বসলে জীবের অহংকার পলায়ন করে অহংকার চূর্ণ হয়”

    ৫২ শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    একবিংশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৬শে অক্টোবর
    মাস্টার ও ডাক্তার সংবাদ

    ডাক্তার—হাঁ, তা বটে।

    ডাক্তার গাড়িতে উঠিলেন, দু-চারিটি রোগী দেখিয়া পরমহংসদেবকে দেখিতে যাইবেন। পথে আবার মাস্টারের সঙ্গে কথা হইতে লাগিল। ‘চক্রবর্তীর অহংকার’ ডাক্তার এই কথা তুলিলেন।

    মাস্টার — পরমহংসদেবের (Ramakrishna) কাছে তাঁর যাওয়া-আসা আছে। অহংকার যদি থাকে, কিছুদিনের মধ্যে আর থাকবে না। তাঁর কাছে বসলে জীবের অহংকার পলায়ন করে অহংকার চূর্ণ হয়। ওখানে অহংকার নাই কি না, তাই। নিরহংকারের নিকট আসলে অহংকার পালিয়ে খায়। দেখুন, বিদ্যাসাগর মহাশয় অত বড়লোক, কত বিনয় আর নম্রতা দেখিয়েছেন। পরমহংসদেব তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন, বাদুড়বাগানের বাড়িতে। যখন বিদায় লন, রাত তখন ৯টা। বিদ্যাসাগর লাইব্রেরীঘর থেকে বরাবর সঙ্গে সঙ্গে, নিজে এক-একবার বাতি ধরে, এসে গাড়িতে তুলে দিলেন; আর বিদায়ের (Kathamrita) সময় হাতজোড় করে রহিলেন।

    ডাক্তার — আচ্ছা, এঁর বিষয় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কি মত?

    মাস্টার — সেদিন খুব ভক্তি করেছিলেন। তবে কথা কয়ে দেখেছি, বৈষ্ণবেরা যাকে ভাব-টাব বলে, সে বড় ভালবাসেন না। আপনার মতের মতো।

    ডাক্তার — হাতজোড় করা, পায়ে মাথা দেওয়া, আমি ও-সব ভালবাসি না। মাথাও যা, পাও তা। তবে যার পা অন্য জ্ঞান আছে, সে করুক।

    মাস্টার — আপনি ভাব-টাব ভালবাসেন না। পরমহংসদেব (Ramakrishna) আপনাকে ‘গম্ভীরাত্মা’ মাঝে মাঝে বলেন, বোধ হয় মনে আছে। তিই কাল আপনাকে বলেছিলেন যে, ডোবাতে হাতি নামলে জল তোলপাড় হয়, কিন্তু সায়ের দীঘি বড়, তাতে হাতি নামলে জল নড়েও না। গম্ভীরাত্মার ভিতর ভাবহস্তী নামলে তার কিছু করতে পারে না। তিনি বলেন, আপনি ‘গম্ভীরাত্মা’।

    ডাক্তার — I don’t deserve the Compliment, ভাব আর কি? feelings; ভক্তি, আর অন্যান্য feelings — বেশি হলে কেউ চাপতে পারে, কেউ পারে না (Kathamrita)।

    মাস্টার — Explanation কেউ দিতে পারে একরকম করে — কেউ পারে না; কিন্তু মহাশয়, ভাবভক্তি জিনিসটা অপূর্ব সামগ্রী। Stebbing on Darwinism আপনার library-তে দেখলাম। Stebbing বলেন, Human mind যার দ্বারাই হউক — evolution দ্বারাই হোক বা ঈশ্বর আলাদা বসে সৃষ্টিই করুন — equally wonderful. তিনি একটি বেশ উপমা দিয়েছেন — theory of light. Whether you know the undulatory theory of light or not, light in either case is equally wonderful.

  • Ramakrishna 613: “অন্ত কোথা তাঁর, অন্ত কোথা তাঁর, এই সবে সদা জিজ্ঞাসে হে। চেতন নিকেতন পরশ রতন সেই নয়ন অনিমেষ”

    Ramakrishna 613: “অন্ত কোথা তাঁর, অন্ত কোথা তাঁর, এই সবে সদা জিজ্ঞাসে হে। চেতন নিকেতন পরশ রতন সেই নয়ন অনিমেষ”

    ৫২ শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    একবিংশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৬শে অক্টোবর
    মাস্টার ও ডাক্তার সংবাদ

    মাস্টার ডাক্তারের বাড়ি উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, ডাক্তার দুই-একজন বন্ধু সঙ্গে বসিয়া আছেন।

    ডাক্তার (মাস্টারের প্রতি)—এই একমিনিট হল তোমার কথা কচ্ছিলাম (Kathamrita)। দশটায় (Ramakrishna) আসবে বললে, দেড় ঘণ্টা বসে। ভাবলুম, কেমন আছেন, কি হল। (বন্ধুকে) ‘ওহে সেই গানটা গাও তো’।

    বন্ধু গাহিতেছেন:

    কর তাঁর নাম গান, যতদিন দেহে রহে প্রাণ।
    যাঁর মহিমা জ্বলন্ত জ্যোতিঃ, জগৎ করে হে আলো;
    স্রোত বহে প্রেমপীযূষ-বারি, সকল জীব সূখকারী হে।
    করুণা স্মরিয়ে তনু হয় পুলকিত বাক্যে বলিতে কি পারি।
    যাঁর প্রসাদে এক মুহূর্তে সকল শোক অপসারি হে।
    উচ্চে নিচে দেশ দেশান্তে, জলগর্ভে, কি আকাশে;
    অন্ত কোথা তাঁর, অন্ত কোথা তাঁর, এই সবে সদা জিজ্ঞাসে হে।
    চেতন নিকেতন পরশ রতন সেই নয়ন অনিমেষ,
    নিরঞ্জন সেই, যাঁর দরশনে, নাহি রহে দুঃখ লেশ হে।

    ডাক্তার (মাস্টারকে) — গানটি খুব ভাল, — নয়? ওইখানটি কেমন?

    ‘অন্ত কোথা তাঁর, অন্ত কোথা তাঁর, এই সবে সদা জিজ্ঞাসে।’

    মাস্টার — হাঁ, ও-খানটি বড় চমৎকার! খুব অনন্তের ভাব।

    ডাক্তার (সস্নেহে) — অনেক বেলা হয়েছে, তুমি খেয়েছো তো? আমার দশটার মধ্যে খাওয়া হয়ে যায়, তারপর আমি ডাক্তারী করতে বেরুই। না খেয়ে বেরুলে অসুখ করে। ওহে, একদিন তোমাদের খাওয়াব মনে করেছি।

    মাস্টার — তা বেশ তো, মহাশয় (Ramakrishna)।

    ডাক্তার — আচ্ছা, এখানে না সেখানে? তোমরা যা বল (Kathamrita)। —

    মাস্টার — মহাশয়, এইখানেই হোক, আর সেইখানেই হোক, সকলে আহ্লাদ করে খাব।

    এইবার মা কালীর কথা হইতেছে।

    ডাক্তার — কালী তো একজন সাঁওতালী মাগী। (মাস্টারের উচ্চহাস্য)

    মাস্টার — ও-কথা কোথায় আছে?

    ডাক্তার — শুনেছি এইরকম। (মাস্টারের হাস্য)

    পূর্বদিন শ্রীযুক্ত বিজয়কৃষ্ণ ও অন্যান্য ভক্তের ভাবসমাধি (Ramakrishna) হইয়াছিল। ডাক্তারও উপস্থিত ছিলেন। সেই কথা হইতেছে।

    ডাক্তার — ভাব তো দেখলুম। বেশি ভাব কি ভাল?

    মাস্টার — পরমহংসদেব বলে যে, ঈশ্বরচিন্তা করে যে ভাব হয় তা বেশি হলে কোন ক্ষতি হয় না। তিনি বলেন যে মণির জ্যোতিতে আলো হয় আর শরীর স্নিগ্ধ হয়, কিন্তু গা পুড়ে যায় না!

    ডাক্তার — মণির জ্যোতিঃ; ও যে Reflected light!

    মাস্টার — তিনি আরও বলেন, অমৃতসরোবরে ডুবলে মানুষ মরে যায় না। ঈশ্বর অমৃতের সরোবর। তাঁতে ডুবলে মানুষের অনিষ্ট হয় না; বরং মানুষ অমর হয়। অবশ্য যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকে।

  • Ramakrishna 636: “বাড়ি ত্যাগ করে করে সব আসছে, দেখ না নরেন্দ্র তীব্র বৈরাগ্য হলে সংসার পাতকুয়ো বোধ হয়, আত্মীয়েরা কালসাপ বোধ হয়”

    Ramakrishna 636: “বাড়ি ত্যাগ করে করে সব আসছে, দেখ না নরেন্দ্র তীব্র বৈরাগ্য হলে সংসার পাতকুয়ো বোধ হয়, আত্মীয়েরা কালসাপ বোধ হয়”

    ৫৩ কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৬, ৫ই জানুয়ারি

    ভক্তদের তীব্র বৈরাগ্য — সংসার ও নরক যন্ত্রণা

    পরদিন মঙ্গলবার, ৫ই জানুয়ারি ২২শে পৌষ। অনেকক্ষণ অমাবস্যা আছে। বেলা ৪টা বাজিয়াছে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ শয্যায় বসিয়া আছেন, মণির সহিত নিভৃতে কথা কহিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) — ক্ষীরোদ যদি ৺গঙ্গাসাগর যায় তাহলে তুমি কম্বল একখানা কিনে দিও।

    মণি — যে আজ্ঞা।

    ঠাকুর একটু চুপ করিয়া আছেন। আবার কথা কহিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — আচ্ছা, ছোকরাদের একি হচ্ছে বল দেখি? কেউ শ্রীক্ষেত্রে পালাচ্ছে — কেউ গঙ্গাসাগরে!

    “বাড়ি ত্যাগ করে করে সব আসছে। দেখ না নরেন্দ্র (Kathamrita)। তীব্র বৈরাগ্য হলে সংসার পাতকুয়ো বোধ হয়, আত্মীয়েরা কালসাপ বোধ হয়।”

    মণি — আজ্ঞা, সংসারে ভারী যন্ত্রণা!

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) — নরকযন্ত্রণা! জন্ম থেকে। দেখছ না। — মাগছেলে নিয়ে কি যন্ত্রণা!

    মণি — আজ্ঞা হাঁ। আর আপনি বলেছিলেন, ওদের (সংসারে ঢুকে নাই তাদের) লেনাদেনা নাই, লেনাদেনার জন্য আটকে থাকতে হয়।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — দেখছ না — নিরঞ্জনকে! ‘তোর এই নে আমার এই দে’ — বাস! আর কোনও সম্পর্ক নাই। পেছুটান নাই!

    “কামিনী-কাঞ্চনই সংসার। দেখ না, টাকা থাকলেই বাঁধতে ইচ্ছা করে।” মণি হো-হো করিয়া হাসিয়া ফেলিলেন। ঠাকুরও হাসিলেন।

    মণি — টাকা বার করতে অনেক হিসাব আসে। (উভয়ের হাস্য) তবে দক্ষিণেশ্বরে বলেছিলেন, ত্রিগুণাতীত হয়ে সংসারে থাকতে পারলে এক হয়।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — হাঁ বালকের মতো।

    মণি — আজ্ঞা, কিন্তু বড় কঠিন, বড় শক্তি চাই।

    ঠাকুর একটু চুপ করিয়া আছেন।

    মণি — কাল ওরা দক্ষিণেশ্বরে ধ্যান করতে গেল। আমি স্বপ্ন দেখলাম।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— কি দেখলে?

    মণি — দেখলাম যেন নরেন্দ্র প্রভৃতি সন্ন্যাসী হয়েছেন — ধুনি জ্বেলে বসে আছেন। আমিও তাদের মধ্যে বসে আছি। ওরা তামাক খেয়ে ধোঁয়া মুখ দিয়ে বার ক’চ্চে, আমি বললাম, গাঁজার ধোঁয়ার গন্ধ।

    সন্ন্যাসী কে — ঠাকুরের পীড়া ও বালকের অবস্থা 

    শ্রীরামকৃষ্ণ — মনে ত্যাগ হলেই হল, তাহলেও সন্ন্যাসী।

    ঠাকুর চুপ করিয়া আছেন। আবার কথা কহিতেছেন (Kathamrita)।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — কিন্তু বাসনায় আগুন দিতে হয়, তবে তো!

    মণি — বড়বাজারে মারোয়াড়ীদের পণ্ডিতজীকে বলেছিলেন, ‘ভক্তিকামনা আমার আছে।‘ — ভক্তিকামনা বুঝি কামনার মধ্যে নয়?

  • Ramakrishna 613: “শ্রীরামকৃষ্ণের কথামৃত পান করিয়া ডাক্তার একেবারে মুগ্ধ হইয়া যান…কামিনী-কাঞ্চন-ত্যাগপ্রদর্শী সোপান আরোহণ করিতে সবে শিখিতেছেন”

    Ramakrishna 613: “শ্রীরামকৃষ্ণের কথামৃত পান করিয়া ডাক্তার একেবারে মুগ্ধ হইয়া যান…কামিনী-কাঞ্চন-ত্যাগপ্রদর্শী সোপান আরোহণ করিতে সবে শিখিতেছেন”

    ৫২ শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    বিংশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৬শে অক্টোবর
    শ্রীরামকৃষ্ণ—গিরিশ, মাস্টার, ছোট নরেন্দ্র, কালী, শরৎ রাখাল, ডাক্তার সরকার প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে

    পরদিন আশ্বিনের কৃষ্ণা তৃতীয়া তিথি, সোমবার, ১১ই কার্তিক — ২৬শে অক্টোবর, ১৮৮৫। শ্রীশ্রীপরমহংসদেব (Ramakrishna) কলিকাতায় ওই শ্যামপুকুরের বাটীতে চিকিৎসার্থ রহিয়াছেন। ডাক্তার সরকার চিকিৎসা করিতেছেন। প্রায় প্রত্যহ আসেন, আর তাঁহার নিকট পীড়ার সংবাদ লইয়া লোক সর্বদা যাতায়াত করে।

    শরৎকাল। কয়েকদিন হইল শারদীয়া দুর্গাপূজা হইয়া গিয়াছে। এ মহোৎসব শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্যমণ্ডলী হর্ষ-বিষাদে অতিবাহিত করিয়াছেন। তিন মাস ধরিয়া গুরুদেবের কঠিন পীড়া — কণ্ঠদেশে — ক্যান্সার। সরকার ইত্যদি ডাক্তার ইঙ্গিত করিয়াছেন, পীড়া চিকিৎসার অসাধ্য। হতভাগ্য শিষ্যেরা এ-কথা শুনিয়া একান্তে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করেন। এক্ষণে এই শ্যামপুকুরের বাটীতে আছেন। শিষ্যরা প্রাণপণে শ্রীরামকৃষ্ণের সেবা করিতেছেন। নরেন্দ্রাদি কৌমারবৈরাগ্যযুক্ত শিষ্যগণ এই মহতী সেবা উপলক্ষে কামিনী-কাঞ্চন-ত্যাগপ্রদর্শী সোপান আরোহণ করিতে সবে শিখিতেছেন।

    এত পীড়া কিন্তু দলে দলে লোক দর্শন করিতে আসিতেছেন (Kathamrita)— শ্রীরামকৃষ্ণের (Ramakrishna) কাছে আসিলেই শান্তি ও আনন্দ হয়। অহেতুক-কৃপাসিন্ধু! দয়ার ইয়ত্তা নাই — সকলের সঙ্গেই কথা কহিতেছেন, কিসে তাহাদের মঙ্গল হয়। শেষে ডাক্তারেরা, বিশেষতঃ ডাক্তার সরকার, কথা কহিতে একেবারে নিষেধ করিলেন। কিন্তু ডাক্তার নিজে ৬।৭ ঘণ্টা করিয়া থাকেন। তিনি বলেন, “আর কাহারও সহিত কথা কওয়া হবে না, কেবল আমার সঙ্গে কথা কইবে।”

    শ্রীরামকৃষ্ণের কথামৃত পান করিয়া ডাক্তার একেবারে মুগ্ধ হইয়া যান। তাই এতক্ষণ ধরিয়া বসিয়া থাকেন।

    বেলা দশটার সময় ডাক্তারকে সংবাদ দিবার জন্য মাস্টার যাইবেন, তাই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সহিত কথাবার্তা হইতেছে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি) — অসুখটা খুব হাল্কা হয়েছে। খুব ভাল আছি। আচ্ছা, তবে ঔষধে কি এরূপ হয়েছে? তাহলে ওই ঔষধটা খাই না কেন?

    মাস্টার — আমি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি, তাঁকে সব বলব; তিনি যা ভাল হয় তাই বলবেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— দেখ, পূর্ণ দুই-তিনদিন আসে নাই, বড় মন কেমন কচ্ছে।

    মাস্টার — কালীবাবু, তুমি যাও না পূর্ণকে ডাকতে (Kathamrita)।

    কালী — এই যাব।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি)—ডাক্তারের ছেলেটি বেশ! একবার আসতে বলো।

  • Ramakrishna 612: “সখি, তোর চক্ষে জল নাই…তোর হৃদয়ে বিরহ অগ্নি সদা জ্বলছে; চক্ষে জল উঠছে আর সেই অগ্নির তাপে শুকিয়ে যাচ্ছে!”

    Ramakrishna 612: “সখি, তোর চক্ষে জল নাই…তোর হৃদয়ে বিরহ অগ্নি সদা জ্বলছে; চক্ষে জল উঠছে আর সেই অগ্নির তাপে শুকিয়ে যাচ্ছে!”

    ৫২ শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৫শে অক্টোবর
    ভক্তসঙ্গে— শ্রীরামকৃষ্ণ ও ক্রোধজয়

    এই কাণ্ডের পর সকলে আবার আসন গ্রহণ করিলেন। রাত আটটা হইয়া গিয়াছে। আবার কথাবার্তা হইতে লাগিল।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) ডাক্তারের প্রতি — এই যা ভাব-টাব দেখলে তোমার সায়েন্স কি বলে? তোমার কি এ-সব ঢঙ বোধ হয়?

    ডাক্তার (শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি) — যেখানে এত লোকের হচ্ছে সেখানে natural (আন্তরিক) বোধ হয়, ঢঙ বোধ হয় না। (নরেন্দ্রের প্রতি) যখন তুমি গাচ্ছিলে ‘দে মা পাগল করে, আর কাজ নাই মা জ্ঞান বিচারে’ তখন আর থাকতে পারি নাই। দাঁড়াই আর কি! তারপর অনেক কষ্টে ভাব চাপলুম; ভাবলুম যে display করা হবে না।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (ডাক্তারের প্রতি, সহাস্যে) — তুমি যে অটল অচল সুমেরুবৎ। (সকলের হাস্য) তুমি গম্ভীরাত্মা, রূপসনাতনের ভাব কেউ টের পেতো না — যদি ডোবাতে হাতি নামে, তাহলেই তোলপাড় হয়ে যায়। কিন্তু সায়ের দীঘিতে নামলে তোলপাড় হয় না। কেউ হয়তো টেরও পায় না। শ্রীমতী সখীকে বললেন, ‘সখি, তোরা তো কৃষ্ণের বিরহে কত কাঁদছিস। কিন্তু দেখ, আমি যে কঠিন, আমার চক্ষে একবিন্দুও জল নাই।’ তখন বৃন্দা বললেন, সখি, তোর চক্ষে জল নাই, তার অনেক মানে আছে। তোর হৃদয়ে বিরহ অগ্নি সদা জ্বলছে; চক্ষে জল উঠছে আর সেই অগ্নির তাপে শুকিয়ে যাচ্ছে!

    ডাক্তার — তোমার সঙ্গে তো কথায় পারবার জো নাই। (হাস্য)

    ক্রমে অন্য কথা পড়িল। শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) নিজের প্রথম ভাবাবস্থা বর্ণনা করিতেছিলেন। আর কাম-ক্রোধাদি কিরূপে বশ করিতে হয়।

    ডাক্তার — তুমি ভাবে পড়েছিলে, আর-একজন দুষ্ট লোক তোমায় বুট জুতার গোঁজা মেরেছিল — সে-সব কথা শুনেছি।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Kathamrita)— সে কালীঘাটের চন্দ্র হালদার। সেজোবাবুর কাছে প্রায় আসত। আমি ঈশ্বরের আবেশে মাটিতে অন্ধকারে পড়ে আছি। চন্দ্র হালদার ভাবত, আমি ঢঙ করে ওইরকম হয় থাকি, বাবুর প্রিয়পাত্র হব বলে। সে অন্ধকারে এসে বুট জুতার গোঁজা দিতে লাগল। গায়ে দাগ হয়েছিল। সবাই বলে, সেজোবাবুকে বলে দেওয়া যাক। আমি বারণ করলুম।

    ডাক্তার — এও ঈশ্বরের খেলা; ওতেও লোক শিখবে, ক্রোধ কিরকম করে বশীভূত করতে হয়। ক্ষমা কাকে বলে, লোক শিখবে।

    বিজয় ও নরেন্দ্রের ঈশ্বরীয় রূপ দর্শন

    ইতিমধ্যে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সম্মুখে বিজয়ের সঙ্গে ভক্তদের অনেক কথাবার্তা হইতেছে।

    বিজয় — কে একজন আমার সঙ্গে সদা-সর্বদা থাকেন, আমি দূরে থাকলেও তিনি জানিয়ে দেন, কোথায় কি হচ্ছে।

    নরেন্দ্র — Guardian angel-এর মতো।

    বিজয় — ঢাকায় এঁকে (পরমহংসদেবকে) দেখেছি! গা ছুঁয়ে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Kathamrita) হাসিতে হাসিতে) — সে তবে আর-একজন!

    নরেন্দ্র — আমিও এঁকে নিজে অনেকবার দেখেছি! (বিজয়ের প্রতি) তাই কি করে বলব — আপনার কথা বিশ্বাস করি না।

  • Ramakrishna 611: “আমায় দে মা পাগল করে, আর কাজ নাই জ্ঞান বিচারে…বরিষে অমৃতধার, জুড়ায় শ্রবণ ও প্রাণরমণ হে”

    Ramakrishna 611: “আমায় দে মা পাগল করে, আর কাজ নাই জ্ঞান বিচারে…বরিষে অমৃতধার, জুড়ায় শ্রবণ ও প্রাণরমণ হে”

    ৫২ শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৫শে অক্টোবর
    ভক্তসঙ্গে প্রেমানন্দে

    সাধুর সর্বজীবে দয়া 

    ডাক্তার আবার কাকের ভয়ে শকুনি পালায়। আমি বলি শুধু মানুষ কেন, সব জীবেরই সেবা করা উচিত। আমি প্রায়ই চড়ুই পাখিকে ময়দা দিই। ছোট ছোট ময়দার গুলি করে ছুঁড়ে ফেলি, আর ছাদে ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ুই পাখি এসে খায়।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— বাঃ, এটা খুব কথা। জীবকে খাওয়ানো সাধুর কাজ; সাধুরা পিঁপড়েদের চিনি দেয়।

    ডাক্তার — আজ গান হবে না?

    শ্রীরামকৃষ্ণ (নরেন্দ্রের প্রতি) — একটু গান কর না।

    নরেন্দ্র গাহিতেছেন (Kathamrita), তানপুরা সঙ্গে। অন্য বাজনাও হইতে লাগিল —

    সুন্দর তোমার নাম দীন-শরণ হে,
    বরিষে অমৃতধার, জুড়ায় শ্রবণ ও প্রাণরমণ হে।
    এক তব নাম ধন, অমৃত-ভবন হে,
    অমর হয় সেইজন, যে করে কীর্তন হে।
    গভীর বিষাদরাশি নিমেষে বিনাশে,
    যখনি তব নামসুধা শ্রবণে পরশে;
    হৃদয় মধুময় তব নাম গানে,
    হয় হে হৃদয়নাথ, চিদানন্দ ঘন হে।

    নরেন্দ্র গাহিতেছেন, তানপুরা সঙ্গে। অন্য বাজনাও হইতে লাগিল —

    সুন্দর তোমার নাম দীন-শরণ হে,
    বরিষে অমৃতধার, জুড়ায় শ্রবণ ও প্রাণরমণ হে।
    এক তব নাম ধন, অমৃত-ভবন হে,
    অমর হয় সেইজন, যে করে কীর্তন হে।
    গভীর বিষাদরাশি নিমেষে বিনাশে,
    যখনি তব নামসুধা শ্রবণে পরশে;
    হৃদয় মধুময় তব নাম গানে,
    হয় হে হৃদয়নাথ, চিদানন্দ ঘন হে।

    গান   —   আমায় দে মা পাগল করে।
    আর কাজ নাই মা জ্ঞান বিচারে ৷৷
    (ব্রহ্মময়ী দে মা পাগল ক’রে)
    (ওমা) তোমার প্রেমের সুরা, পানে কর মাতোয়ারা,
    ওমা ভক্তচিত্তহরা ডুবাও প্রেমসাগরে ৷৷
    তোমার এ পাগলাগারদে, কেহ হাসে কেহ কাঁদে,
    কেহ নাচে আনন্দ ভরে;
    ঈশা বুদ্ধ শ্রীচৈতন্য ওমা প্রেমের ভরে অচৈতন্য,
    হায় কবে হব মা ধন্য, (ওমা) মিশে তার ভিতরে ৷৷

    গানের পর আবার অদ্ভুত দৃশ্য। সকলেই ভাবে উন্মত্ত। পণ্ডিত পাণ্ডিত্যাভিমান ত্যাগ করিয়া দাঁড়াইয়াছেন (Kathamrita)। বলছেন, “আমায় দে মা পাগল করে, আর কাজ নাই জ্ঞান বিচারে।” বিজয় সর্বপ্রথমে আসনত্যাগ করিয়া ভাবোন্মত্ত হইয়া দাঁড়াইয়াছেন। তাহার পরে শ্রীরামকৃষ্ণ। ঠাকুর দেহের কঠিন অসাধ্য ব্যাধি একেবারে ভুলিয়া গিয়াছেন। ডাক্তার সম্মুখে। তিনিও দাঁড়াইয়েছেন। রোগীরও হুঁশ নাই, ডাক্তারেরও হুঁশ নাই। ছোট নরেনের ভাবসমাধি হইল। লাটুরও ভাবসমাধি হইল। ডাক্তার সায়েন্স্‌ পড়িয়াছেন, কিন্তু অবাক্‌ হইয়া এই অদ্ভুত ব্যাপার দেখিতে লাগিলেন। দেখিলেন, যাঁহাদের ভাব হইয়াছে, তাঁহাদের বাহ্য চৈতন্য (Ramakrishna) কিছুই নাই, সকলেই স্থির, নিস্পন্দ; ভাব উপশম হইলে কেহ কাঁদিতেছেন, কেহ কেহ হাসিতেছেন। যেন কতকগুলি মাতাল একত্র হইয়াছে।

LinkedIn
Share