মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কূটনীতি সাধারণত বৈঠকের টেবিলেই হয়। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই ছবিও। এবার সেই কূটনীতির সাক্ষী হল একটি বিলাসবহুল সাঁজোয়া গাড়ি। দিল্লিতে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাঁজোয়া অরাস সেনেট লিমুজিনে একসঙ্গে সফর করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পুতিন (BRICS Summit Modi Putin)। ১১ সদস্যের ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের এক দিন আগে এই দৃশ্য ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশেষ আগ্রহ। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর দুই নেতা একই গাড়িতে করে দিল্লির ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত ইনোপ্রোম (INNOPROM) প্রদর্শনীতে যান। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত গাড়ি-কে নিরাপত্তার কারণে প্রায়ই ‘ফোর্ট্রেস অন হুইলস’ বা ‘চাকার উপর দুর্গ’ বলা হয়। গত বছর চিনে সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন (SCO) সম্মেলনের সময়ও মোদিকে পুতিনের সঙ্গে এই গাড়িতে সফর করতে দেখা গিয়েছিল।
মোদি-পুতিন বিশেষ বৈঠক
ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শুক্রবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১১ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা হয়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, মহাকাশ, দক্ষতা ও কর্মী চলাচল এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ—সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন দুই রাষ্ট্রনেতা। চলতি বছরে এটি মোদি ও পুতিনের দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। এর আগে ৩১ অগস্ট ২০২৬-এ বিশকেকে ২৬তম সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) সম্মেলনের ফাঁকে তাঁদের বৈঠক হয়েছিল। বৈঠকে ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য ও শিল্প সহযোগিতা আরও বাড়ানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাশিয়ার আন্তর্জাতিক শিল্প প্রদর্শনী ‘INNOPROM India’-কে স্বাগত জানান দুই নেতা। ৯ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ভারতে আয়োজিত এই শিল্প প্রদর্শনী দুই দেশের বাণিজ্যিক ও শিল্প সম্পর্ক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তাঁরা। মোদি ও পুতিন দু’জনেই প্রদর্শনীটি পরিদর্শন করেন এবং সেখানে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন।
বন্ধু পুতিনকে বিশেষ উপহার মোদির
ইনোপ্রোম (INNOPROM) হল আন্তর্জাতিক শিল্প প্রদর্শনী। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নির্মাতা ও ক্রেতাদের একত্রিত করার পাশাপাশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রদর্শন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করাই এই প্রদর্শনীর অন্যতম উদ্দেশ্য। এর আগে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে পুতিনকে বিশেষ উপহার দেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। তিনি রুশ প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দেন প্রাচীন তামিল শাস্ত্র ‘তিরুক্কুরাল’-এর রুশ অনুবাদ। তাঁতিবংশের সাধক ও কবি তিরুবল্লুভরের রচিত এই গ্রন্থে মানবজীবনের বিভিন্ন দিকের কথা তুলে ধরা হয়েছে। পুতিনকে উপহার দেওয়ার সময় মোদি বলেন, প্রায় দু’হাজার বছর আগে তিরুবল্লুভর ‘তিরুক্কুরাল’ রচনা করেছিলেন। মানবজীবনের বিভিন্ন দিক এই গ্রন্থে উঠে এসেছে। রুশ ভাষায় এর অনুবাদ ভারত ও রাশিয়ার মানুষের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়াবে এবং দুই দেশের সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে আশাবাদী প্রধানমন্ত্রী। পরে সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টে মোদি লেখেন, মহান তিরুবল্লুভরের চিরন্তন জ্ঞানকে ভাষা ও দেশের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে দিতে পুতিনকে ‘তিরুক্কুরাল’-এর রুশ অনুবাদ উপহার দিয়েছেন তিনি।
ভারত ও রাশিয়া দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক
ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির বৈঠকে দুই নেতাকে হাসিমুখে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে দেখা যায়। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, ভারত-রাশিয়ার ‘স্পেশাল অ্যান্ড প্রিভিলেজড স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ (Special and Privileged Strategic Partnership)-এর বিভিন্ন দিক নিয়ে মোদি ও পুতিনের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ—সহ একাধিক ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন তাঁরা। উল্লেখ্য, পুতিন শেষবার ভারত সফরে এসেছিলেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। তবে চলতি মাসের শুরুতেই কিরগিজস্তানে এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে ফের মুখোমুখি বৈঠক হয়েছিল মোদী-পুতিনের। এবার দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের আগে তাঁদের বৈঠক এবং একই গাড়িতে সফর ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের উষ্ণতার নতুন ছবি তুলে ধরল।
পশ্চিম এশিয়া এবং কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে আলোচনা
এছাড়াও পশ্চিম এশিয়া এবং কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল-সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়েও মতবিনিময় করেন দুই রাষ্ট্রনেতা। পশ্চিম এশিয়া ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাতের কারণে সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা প্রভাবিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সংঘাতের সমাধানে আলোচনা ও কূটনীতিকেই এগিয়ে যাওয়ার পথ হিসেবে ভারত সমর্থন করে বলে ফের জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ভারত প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
রাশিয়া সফরে মোদিকে আমন্ত্রণ পুতিনের
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল রুশ প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ। পুতিন প্রধানমন্ত্রী মোদিকে রাশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেখানে অনুষ্ঠিত হবে ২৪তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন। মোদী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। দুই দেশের কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে সম্মেলনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হবে। বৈঠকে বহুপাক্ষিক ক্ষেত্রে ভারত-রাশিয়ার সহযোগিতা নিয়েও মতবিনিময় করেন মোদি ও পুতিন। বিশেষ করে ২০২৬ সালে ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বের সময়ে দুই দেশের সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়। তিন দিনের ভারত সফরে শুক্রবার নয়াদিল্লিতে পৌঁছন পুতিন। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কে ভি সিং। পুতিনের সঙ্গে রয়েছেন উচ্চপর্যায়ের রুশ প্রতিনিধি দল। তাঁর এই সফরে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
