Tag: mrfa deal

  • Rafale Deal Crisis: “আইসিডি না দিলে, রাফাল চুক্তি হবে না”, ফ্রান্সকে সাফ জানিয়ে দিল ভারত

    Rafale Deal Crisis: “আইসিডি না দিলে, রাফাল চুক্তি হবে না”, ফ্রান্সকে সাফ জানিয়ে দিল ভারত

    সুশান্ত দাস

    ১১৪টি অতিরিক্ত রাফাল এফ-৪ (Rafale F4) বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনায় এখন এক বিরাট কৌশলগত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে। শুরুতে এটি ভারত-ফ্রান্স প্রতিরক্ষা সম্পর্কের অন্যতম বড় সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হলেও, বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একটি অত্যন্ত প্রযুক্তিগত কিন্তু কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল বিষয়— ইন্টারফেস কন্ট্রোল ডকুমেন্ট (ICD) এবং সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ। কেন্দ্রীয় সূত্রের খবর, প্রতিরক্ষামন্ত্রকের স্পষ্ট অবস্থান— “আইসিডি না দিলে, চুক্তি হবে না”—প্রমাণ করছে যে আজকের ভারত আর শুধুমাত্র উন্নত প্ল্যাটফর্ম কেনায় আগ্রহী নয়। বরং যুদ্ধক্ষমতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে চাইছে।

    কেন রাফাল এফ-৪ চুক্তি ভারতের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

    ভারতীয় বায়ুসেনা দীর্ঘদিন ধরেই স্কোয়াড্রন ঘাটতি-র সমস্যায় ভুগছে। চিন ও পাকিস্তানের দ্বিমুখী সামরিক চাপের মধ্যে দ্রুত আধুনিকীকরণ ভারতের জন্য জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে ১১৪টি রাফাল এফ-৪ যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে—

    • ● বায়ুসেনার যুদ্ধক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো
    • ● উচ্চমানের বহুমুখী যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত করা
    • ● দেশীয় উৎপাদন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে মেক ইন ইন্ডিয়া-কে এগিয়ে নেওয়া

    প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী—

    • ● ১৮টি বিমান সরাসরি ফ্রান্স থেকে সরাসরি সরবরাহ করা হবে।
    • ● ৬০ শতাংশ প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে ৯৬টি বিমান ভারতে তৈরি
    • ● রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থা হ্যাল (HAL), টাটা (Tata) ও ফরাসি ইঞ্জিন প্রস্তুতকারী সংস্থা সাফরান (Safran)-এর শিল্প অংশীদারিত্ব
    • ● ভারতে নির্মিত জেটগুলিতে ৫০-৬০% দেশীয় উপাদান ব্যবহার করা হবে।
    • ● এটি সফল হলে ভারতীয় বিমান ও মহাকাশ শিল্পব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হত।

    মূল বিরোধ: ইন্টারফেস কন্ট্রোল ডকুমেন্ট বা আইসিডি হস্তান্তর (ICD)

    এমআরএফএ চুক্তি আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিমানের সোর্স কোড। এই সোর্স কোড হল যে কোনও যুদ্ধবিমানের মস্তিষ্ক। তবে, ফ্রান্স প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছিল যে সোর্স কোড তারা কখনই হস্তান্তর করবে না। ভারত তা মেনে নিয়ে বিকল্প প্রস্তাব পেশ করে। আলোচনার সময় নয়াদিল্লির তরফে বলা হয়, সোর্স কোড দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু, রাফালের আইসিডি অ্যাক্সেস দেওয়া হোক। আইসিডি মূলত একটি প্রযুক্তিগত নকশাপত্র, যা নির্ধারণ করে—

    • ● অস্ত্র সংযোজন কাঠামো
    • ● সেন্সর যোগাযোগ ব্যবস্থা
    • ● মিশন কম্পিউটার সংযোগব্যবস্থা
    • ● এভিওনিক্স তথ্য প্রবাহ

    ভারত আইসিডি চায় কারণ এটি ছাড়া দেশীয় অস্ত্র স্বাধীনভাবে সংযোজন করা সম্ভব নয়। ভারত যে দেশীয় সিস্টেমগুলি সংযোজন করতে চায়—

    • ● অ্যাস্ট্রা (Astra) দূরপাল্লার আকাশযুদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র
    • ● রুদ্রম (Rudram) অ্যান্টি-রেডিয়েশন ক্ষেপণাস্ত্র
    • ● স্মার্ট অ্যান্টি-এয়ারফিল্ড অস্ত্র (SAAW)
    • ● ব্রহ্মোস-এনজি (BrahMos-NG)
    • ● দেশীয় ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থা
    • ● ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দেশীয় বীরূপাক্ষ রেডার (Virupaksha Radar)

    ভারত জানে যে, আইসিডি না থাকলে প্রতিটি সংযোজনের জন্য রাফালের নির্মাণকারী সংস্থা দাসোর অনুমোদন লাগবে। এর ফলে ভবিষ্যতে ভারতের একাধিক সমস্যা হবে। যেমন—

    • ● অভিযানগত বিলম্ব হবে।
    • ● পুনরাবৃত্ত ব্যয় বৃদ্ধি হবে।
    • ● সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা বাড়বে।
    • ● যুদ্ধকালীন ঝুঁকি থেকে যাবে।

    সব মিলিয়ে, ভারতের কাছে এটি শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধা নয়, এটি যুদ্ধক্ষেত্রের সার্বভৌমত্ব-র প্রশ্ন।

    কেন ফ্রান্স প্রযুক্তিতে আপস করতে চাইছে না?

    কিন্তু এক্ষেত্রেও ফ্রান্স বেঁকে বসে। ফ্রান্সের অনীহার মূলত তিনটি কারণ হল—

    প্রথমত, স্পেকট্রা (SPECTRA) ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থার গোপনীয়তা হ্রাস পেতে পারে। রাফালের সবচেয়ে সংবেদনশীল সক্ষমতা হল স্পেক্ট্রা। এটি নিয়ন্ত্রণ করে—

    • ● হুমকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা
    • ● রেডার সতর্কীকরণ ব্যবস্থা
    • ● জ্যামিং ব্যবস্থা
    • ● প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
    • ● টিকে থাকার অ্যালগরিদম ব্যবস্থা

    ফ্রান্স মনে করে, এই জায়গায় প্রবেশাধিকার দিলে—

    • ● নিজস্ব মেধাস্বত্ব ফাঁস হতে পারে।
    • ● যুদ্ধনীতি প্রকাশ পেতে পারে।

    দ্বিতীয়ত, অনভিপ্রেত রফতানির নজির ঝুঁকি বাড়তে পারে। অর্থাৎ, ভারতকে যদি বেশি প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়, ভবিষ্যতে অন্যান্য ক্রেতারাও একই দাবি তুলতে পারে। এতে ফরাসি রপ্তানি মডেল দুর্বল হতে পারে।

    তৃতীয়ত, রুশ প্রযুক্তি ফাঁসের আশঙ্কা বাড়তে পারে। ভারত ব্রহ্মোস সংযোজন করতে চায়, যা ভারত-রাশিয়া যৌথ ব্যবস্থার অংশ। ফ্রান্স আশঙ্কা করছে, এর মাধ্যমে পশ্চিমা প্রযুক্তি পরোক্ষভাবে রুশ প্রকৌশল নেটওয়ার্কে পৌঁছাতে পারে।

    ভারতের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

    ভারতের প্রতিরক্ষা ক্রয়নীতি স্পষ্টভাবে বদলেছে। আগে দেশের লক্ষ্য ছিল— কেবলমাত্র উন্নত বিদেশি প্ল্যাটফর্ম (সামরিক অস্ত্র, সামরিক যান) কেনা। কিন্তু, ২০২৬ সালে ভারতের লক্ষ্য হল—

    • ● সার্বভৌম জীবনচক্র নিয়ন্ত্রণ
    • ● স্বাধীন উন্নয়ন ও আপগ্রেড ক্ষমতা
    • ● স্থানীয় রক্ষণাবেক্ষণ শিল্পব্যবস্থা

    ভারত বুঝেছে, আমদানিকৃত প্ল্যাটফর্ম তখনই কৌশলগত সম্পদ যখন—

    • ● সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ থাকে
    • ● অস্ত্র সংযোজন স্বাধীন হয়
    • ● বিদেশি অনুমোদন-নির্ভরতা না থাকে

    ২০১৬ সালের ৩৬টা রাফাল চুক্তি থেকে ভারতের শিক্ষা হয়েছে যে, সীমিত প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রকৃত কৌশলগত স্বনির্ভরতা দেয় না। ফলে নয়াদিল্লি এখন শুধু সংযোজন লাইন নয়, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব চাইছে। তবে, ভারতের এই দাবিও খারিজ করে ফ্রান্স। যার পরেই, ভারতের তরফে ফ্রান্স ও দাসোকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়— “আইসিডি না দিলে, চুক্তি হবে না”।

    চুক্তি ভেস্তে গেলে কী হতে পারে?

    এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাফাল চুক্তি না হলে ভারত কী করবে? এক্ষেত্রে ভারতের হাতে যে যে বিকল্প থাকবে, সেগুলি হল—

    প্রথমত, তেজস মার্ক ২ (Tejas Mk2) যুদ্ধবিমানের গতি বৃদ্ধি করতে পারে। রাফাল চুক্তি ভেঙে গেলে তেজস মার্ক ২-তে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন বাড়বে। এতে সুবিধা হবে—

    • ● পূর্ণ সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ
    • ● দেশীয় সংযোজন
    • ● জীবনচক্র সার্বভৌমত্ব

    অসুবিধাও আছে। যেগুলি হল—

    • ● উন্নয়নে বিলম্ব
    • ● সক্ষমতা পরিপক্বতার ঝুঁকি

    দ্বিতীয়ত, ভারত অ্যামকা (AMCA) কর্মসূচির গতি বৃদ্ধি করতে পারে। অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট (AMCA) ভারতের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম যুদ্ধবিমান প্রকল্প। রাফাল ব্যর্থ হলে অ্যামকা আরও কৌশলগত অগ্রাধিকার পাবে।

    তৃতীয়ত, রাশিয়া বিকল্প হিসেবে ফিরে আসা। রাশিয়ার প্রস্তাবিত সুখোই সু-৫৭ই (Su-57E) নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।

    রাশিয়ার সুবিধা—

    • ● গভীরতর প্রযুক্তি হস্তান্তর
    • ● স্থানীয় উৎপাদনে নমনীয়তা

    ঝুঁকি—

    • ● মার্কিন ক্যাটসা (CAATSA) নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি
    • ● রক্ষণাবেক্ষণ জটিলতা
    • ● ভূরাজনৈতিক বার্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ

    ফ্রান্সের জন্য চুক্তি বাতিলের ঝুঁকি কত বড়?

    অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে রাফাল চুক্তি বাতিল হলে, বড় সমস্যায় পড়ে যাবে ফ্রান্স। ফ্রান্সের কাছে এই চুক্তি শুধু রাজস্বের বিষয় নয়। ১১৪টি বিমানের অর্ডার মানে—

    • ● দাসো-র উৎপাদন ধারাবাহিকতা ব্যাহত হবে।
    • ● সরবরাহকারী শিল্পব্যবস্থার স্থায়িত্ব কমবে।
    • ● ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত উপস্থিতি হ্রাস পাবে ফ্রান্সের
    • ● ১৮ থেকে ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খোয়াবে ফ্রান্স, যা সেদেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেবে।
    • ● ভবিষ্যতে, ফ্রান্সের সঙ্গে সামরিক অংশিদারিত্বে যেতে চাইবে না অন্যান্য দেশ।

    ফ্রান্স ভালোই জানে যে, চুক্তি হারালে দেশের রফতানি বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইসঙ্গে, উৎপাদন লাইনে চাপ বাড়বে। তা সত্ত্বেও কিন্তু প্যারিস সফটওয়্যার সার্বভৌমত্বে আপস করতেও অনিচ্ছুক। ফলে ফ্রান্স একটি ধন্দে পড়ে গিয়েছে। একদিকে, প্রযুক্তি সুরক্ষা অন্যদিকে রফতানি টিকিয়ে রাখা। কয়েক দিন আগে, রাফাল এফ-৫ কর্মসূচি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয় সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। সেখানেও কারণ একই। প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত বিরোধ, বিশেষ করে অপট্রনিক্সের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে। যা ইতিমধ্যেই ফরাসি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করেছে। এবার একই ধরনের পরিস্থিতি এখন ভারতের ক্ষেত্রেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। আমিরশাহি এবং ভারতের ঘটনাগুলি পর্যবেক্ষণ করে অন্যান্য দেশও নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবে এবং ভবিষ্যতে ফ্রান্সের সঙ্গে অনুরূপ কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার আগে আরও বিস্তৃত প্রযুক্তিগত প্রবেশাধিকার ও নিশ্চয়তা দাবি করতে পারে।

    বৃহত্তর কৌশলগত তাৎপর্য

    ভারত-ফ্রান্সের এই বিরোধ দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতের অস্ত্রচুক্তি আর শুধুমাত্র হার্ডওয়্যার ক্রয় নয়। নতুন যুগের সামরিক শক্তি নির্ভর করছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। যেমন—

    • ● সফটওয়্যার মালিকানা
    • ● ডিজিটাল স্থাপত্য নিয়ন্ত্রণ
    • ● স্বাধীন উন্নয়ন সক্ষমতা
    • ● ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থার স্বায়ত্তশাসন

    ভারত এই আলোচনার মাধ্যমে একটি বড় বার্তা দিচ্ছে। তা হল— “ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ছাড়া স্থানীয় সংযোজন প্রকৃত দেশীয়করণ নয়।” ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি আর শুধুমাত্র একটি প্রতিরক্ষা ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন। অস্ত্র সংযোজন এবং সফটওয়্যারের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে, সবচেয়ে উন্নত প্ল্যাটফর্মও সক্ষমতার পরিবর্তে নির্ভরশীলতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এটি শুধু রাফাল চুক্তি নয়, ভবিষ্যতের পশ্চিমি প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের জন্যও একটি মানদণ্ড।

    টার্নিং পয়েন্ট…

    রাফাল এফ-৪ আলোচনা ভারত-ফ্রান্স সম্পর্কের একটি টার্নিং পয়েন্ট। ভারত এখন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, উন্নত প্ল্যাটফর্ম ক্রয়ের চেয়ে অভিযানগত সার্বভৌমত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্স মূল প্রযুক্তি সুরক্ষিত রাখতে চায়, আর ভারত বিদেশি-নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ স্থাপত্য মেনে নিতে রাজি নয়। ফলে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর। তা হল— ফ্রান্স কি ভারতকে যথেষ্ট ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ দিতে প্রস্তুত, নাকি সফটওয়্যার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিশ্বের অন্যতম বড় যুদ্ধবিমান চুক্তি ভেস্তে যাবে? বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত করছে—এই আলোচনা শুধু যুদ্ধবিমান কেনা নয়, বরং একবিংশ শতকের প্রতিরক্ষা শিল্পে সার্বভৌমত্ব বনাম নির্ভরতার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করছে।

  • India Defence Modernization 2026: ২০২৬ সালে ভারতের প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ— নজরে এই ১০ বড় প্রকল্প

    India Defence Modernization 2026: ২০২৬ সালে ভারতের প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ— নজরে এই ১০ বড় প্রকল্প

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতীয় প্রতিরক্ষার জন্য যুগান্তকারী হতে চলেছে ২০২৬ সাল। এ বছর, দেশের সামরিক ক্ষেত্রে একাধিক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ও উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে, যা দেশের প্রতিরক্ষাকে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে। ২০২৬ সালকে ভারতের প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে বর্ণনা করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের অনুমান, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা একাধিক বড় সামরিক ক্রয় ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্প এই বছর সরকারি অনুমোদন অথবা চুক্তি স্বাক্ষরের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। যা আগামী কয়েক দশকে ভারতীয় স্থলসেনা, বায়ুসেনা, নৌবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কার্যকরী সক্ষমতা নির্ধারণ করবে। পাশাপাশি, এগুলি দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প ও বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ রূপরেখাও গড়ে দেবে। এমনই ১০টি সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে, যা নিয়ে চলতি বছর বড় সিদ্ধান্ত হতে চলেছে বলে আশাপ্রকাশ করা হচ্ছে।

    ১. মাল্টি-রোল ফাইটার এয়ারক্রাফ্ট (MRFA) প্রকল্পে ১১৪টি যুদ্ধবিমান

    ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য ১১৪টি মাল্টি-রোল ফাইটার এয়ারক্রাফ্ট (MRFA) কেনার বিষয়টি ২০২৬ সালে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ও একাধিক প্রশাসনিক স্থগিতাবস্থার পর, এই প্রকল্প এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে বিক্রেতা নির্বাচন ও বাণিজ্যিক দরকষাকষি চূড়ান্ত হতে পারে। ভারতীয় বায়ুসেনার ক্রমহ্রাসমান স্কোয়াড্রন সংখ্যা মোকাবিলা করা এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সংখ্যাগত ও গুণগত ভারসাম্য বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এই প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নিতে আগ্রহী।

    ২. বায়ুসেনার মিডিয়াম ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফ্ট (MTA) প্রকল্পে গতি

    মিডিয়াম ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফ্ট (MTA) প্রকল্পটি ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিক গতি পেতে পারে। সামরিক পণ্যবাহী বিমানের সংখ্যা ও কার্যকরী ভূমিকা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হবে। এই প্রকল্পের আওতায় পুরনো অ্যান্টোনভ এএন-৩২ এবং ইলিউশিন আইএল-৭৬ বিমানের বিকল্প হিসেবে নতুন সামরিক পরিবহণ বিমান পেতে চাইছে বায়ুসেনা। এ বছর এক্ষেত্রে রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (RFP) জারি হওয়া এবং বিক্রেতা সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে লকহিড মার্টিন সি-১৩০জে, এমব্রায়ার সি-৩৯০ ও এয়ারবাস এ৪০০এম প্রতিযোগিতায় থাকতে পারে। সামরিক এয়ারলিফ্ট সক্ষমতায় এই চুক্তি ভারতকে কৌশলগত বড় সুবিধা দেবে।

    ৩. প্রজেক্ট ৭৫আই (P-75I) সাবমেরিন প্রকল্প কেন্দ্রের অনুমোদনের পথে

    দীর্ঘ বিলম্বের পর প্রজেক্ট ৭৫আই অবশেষে ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি (CCS)-এর অনুমোদনের দিকে এগোচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে এয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন (AIP) প্রযুক্তিসম্পন্ন ছয়টি আধুনিক প্রচলিত সাবমেরিনের জন্য চুক্তি করা হবে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিনের বাড়তে থাকা নৌ-উপস্থিতির মোকাবিলা এবং পুরনো সাবমেরিন অবসর নেওয়ার ফলে সৃষ্ট ঘাটতি পূরণে এই প্রকল্পকে ভারতীয় নৌবাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে। তবে, এক্ষেত্রে ফ্রান্স নির্মিত স্করপিন-সিরিজ নয়, বরং জার্মানি ও স্পেনের সংস্থার নকশা নিয়ে আলোচনাই মূল ফোকাসে রয়েছে।

    ৪. রণতরীতে দেশীয় যুদ্ধবিমান (TEDBF) প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়

    ভারতীয় নৌসেনার জন্য দেশীয় টুইন ইঞ্জিন ডেক বেসড ফাইটার (TEDBF) প্রকল্পটি ২০২৬ সালে ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটির অনুমোদন পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। ভারতের বিমানবাহী রণতরী থেকে পরিচালনার জন্য বিশেষভাবে নকশা করা এই যুদ্ধবিমান ভবিষ্যতে মিগ-২৯কে বহরের স্থলাভিষিক্ত হবে এবং নৌবাহিনীর কেরিয়ার এয়ার উইংয়ের মূল স্তম্ভে পরিণত হবে। এই অনুমোদন পূর্ণমাত্রার উন্নয়ন তহবিল ছাড় করবে এবং দেশীয় নৌবিমান নির্মাণে ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সুদৃঢ় করবে।

    ৫. অ্যামকা (AMCA) জেট ইঞ্জিন উন্নয়নে বিদেশি অংশীদারিত্ব চূড়ান্ত

    ২০২৬ সালের অন্যতম কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হবে অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট (AMCA)-এর ইঞ্জিন উন্নয়ন সংক্রান্ত অনুমোদন। যৌথ-উদ্যোগে ১১০–১৩০ কিলোনিউটন থ্রাস্ট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইঞ্জিন উন্নয়নের জন্য ভারত সম্ভবত বিদেশি অংশীদারিত্বের কাঠামো চূড়ান্ত করবে। ফ্রান্সের সাফরান (Safran) প্রধান অংশীদার হিসেবে উঠে আসতে পারে। এই সিদ্ধান্ত পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে ভারতের প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    ৬. অতিরিক্ত এস-৪০০ (S-400) ডেলিভারি ও অর্ডার বাড়ানোর সম্ভাবনা

    ২০২৬ সাল জুড়ে এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রেজিমেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানা গিয়েছে।চূড়ান্ত ইউনিটগুলি পূর্ণাঙ্গ আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় সম্পূর্ণ করবে বলে আশা। একইসঙ্গে, মূল চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত এস-৪০০ ইউনিট কেনা নিয়েও আলোচনা চলছে, যা ভারতের দীর্ঘপাল্লার আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপারেশন সিঁদুর থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য হুমকি ও ঝুঁকির মূল্যায়ন ভারতের দীর্ঘপাল্লার আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

    ৭. মিডিয়াম অল্টিটিউড লং এন্ডুরেন্স ড্রোন (MALE Drone) প্রকল্প চুক্তির পর্যায়ে

    ভারতের দীর্ঘদিন ধরে চলা মিডিয়াম অল্টিটিউড লং এন্ডুরেন্স (MALE) ড্রোন প্রকল্পটি ২০২৬ সালে বাস্তব অগ্রগতি দেখতে পারে। মার্কিন এমকিউ-৯বি রিপার (MQ-9B Reaper) ড্রোন সংগ্রহ এগোলেও, এখন মূল জোর দেওয়া হচ্ছে দেশীয় তাপাস (TAPAS) বা আর্চার-এনজি (Archer-NG) প্ল্যাটফর্মের উপর, যা স্থল ও সমুদ্র উভয় ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি নিশ্চিত করবে। এই দেশীয় ড্রোনগুলির চুক্তি চূড়ান্ত হলে শত্রু অঞ্চলে গোয়েন্দা, নজরদারি ও রেকি— সংক্ষেপে আইএসআর (ISR) থেকে শুরু করে আঘাত হানার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

    ৮. প্রজেক্ট-৭৭ (P-77) পারমাণবিক শক্তিচালিত অ্যাটাক সাবমেরিন (SSN)

    ২০২৬ সালে অতিরিক্ত রাজনৈতিক ও আর্থিক অনুমোদন পেতে পারে ভারতের দেশীয় পারমাণবিক শক্তিচালিত ঘাতক সাবমেরিন (SSN) নির্মাণ প্রকল্প— প্রজেক্ট-৭৭। এই সাবমেরিনগুলি বিমানবাহী রণতরীর নিরাপত্তা, শত্রু সাবমেরিন ট্র্যাকিং এবং গভীর সমুদ্রে আধিপত্য বজায় রাখতে অপরিহার্য। এই অনুমোদন ভারতের শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ ‘ব্লু-ওয়াটার নেভি’ গঠনের সংকল্পকে জোরালোভাবে তুলে ধরবে।

    ৯. কুইক রিঅ্যাকশন সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (QRSAM) চুক্তি

    দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কুইক রিঅ্যাকশন সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (QRSAM) প্রকল্পের চুক্তি ২০২৬ সালে চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ব্যবস্থা স্থলসেনার সাঁজোয়া বাহিনীকে ড্রোন, হেলিকপ্টার ও নিচু দিয়ে উড়ে আসা বিমানের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে। ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড (BEL) এই সিস্টেমের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্ডারের আশা করছে।

    ১০. আকাশ-এনজি (Akash-NG) চুক্তিতে পরবর্তী প্রজন্মের আকাশ প্রতিরক্ষা

    দেশীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সর্বশেষ সংস্করণ আকাশ-এনজি (নিউ জেনারেশন) প্রকল্পও ২০২৬ সালে বড় উৎপাদন চুক্তি পেতে পারে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে সফল পরীক্ষার পর উন্নত রেঞ্জ, নির্ভুল লক্ষ্যভেদ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন এই ব্যবস্থা বর্তমান আকাশ প্রতিরক্ষা স্তরকে আরও শক্তিশালী করবে।

    সব মিলিয়ে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সামনে থাকা এই সিদ্ধান্তগুলি ২০২৬ সালকে ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক বছর করে তুলতে চলেছে। এই সময়ে নেওয়া পদক্ষেপগুলি শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক সক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে ভারতের সামরিক কাঠামো, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং কৌশলগত স্বনির্ভরতাকে নতুন দিশা দেবে।

LinkedIn
Share