মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: নেপালের ভয়াবহ বন্যার (Nepal Floods Rescue Operation) ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মিলল আশার আলো। ভয়াবহ বন্যার নয় দিন পর নেপালের রাসুয়া জেলার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ (Trishuli 3A tunnel in Nepal) থেকে জীবিত উদ্ধার হলেন দুই কর্মী। শুক্রবার উদ্ধারকাজের সময় তাঁদের সন্ধান মেলে। জীবিত অবস্থায় দু’জনকে উদ্ধার ঘিরে সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকা আরও কর্মীদের বেঁচে থাকার আশা জোরালো হয়েছে। উদ্ধার হওয়া দুই কর্মী হলেন কাঠমান্ডুর বাসিন্দা ৪৫ বছরের কবীর মহার্জন এবং সপ্তরী জেলার ৩০ বছরের সঞ্জয় সাহ। কবীর আপার ত্রিশূলী-৩এ-এর হাইড্রোপাওয়ার অটোমেশন প্রকল্পের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতেন। সঞ্জয় ছিলেন ফোরম্যান।
মনের জোরেই উদ্ধার
নেপালের জ্বালানি, জলসম্পদ ও সেচমন্ত্রীর সচিবালয়ের তরফে জানানো হয়েছে, দু’জনকেই উদ্ধার করার পর বিমানপথে কাঠমান্ডু নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শুক্রবার প্রথমে সঞ্জয়কে উদ্ধার করা হয়। পরে উদ্ধার করা হয় কবীরকে। এর আগে সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে মানুষের আওয়াজ শুনতে পান উদ্ধারকারীরা। এরপর ভিতরে আটকে থাকা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগও স্থাপন করা সম্ভব হয়। তাঁদের আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য বারবার আশ্বস্ত করেন উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। নেপাল সেনা ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা এরপর আরও জোরদার করেন উদ্ধার অভিযান। শেষ পর্যন্ত সেই অভিযানেই মিলল সাফল্য। ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও ধসের পর কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে টানেলের মুখ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ১৭০ মিটার গভীরে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে দিন-রাত অভিযান চালায় নেপাল সেনা, প্রযুক্তিবিদ এবং উদ্ধারকারী দল। শেষ পর্যন্ত জীবিত অবস্থায় তাঁদের বের করে আনা হয়েছে।
মৃতের সংখ্যা ১২০০ ছাড়িয়েছে
গত ২৬ আগস্ট ত্রিশূলী নদীর উপত্যকা দিয়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড বয়ে যায়। প্রবল জলের তোড়ে নদী করিডরের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই বিপর্যয়ে অন্তত ১,২৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫,০৫৩ জন এখনও নিখোঁজ। বন্যার পর থেকেই নেপালি সেনা, সশস্ত্র পুলিশ এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষদের সন্ধানে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
চলছে সুড়ঙ্গ ড্রিলিং ও হোলিংয়ের কাজ
বন্যার ভয়াবহ প্রভাব পড়ে ৬০ মেগাওয়াটের আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেও। প্রকল্পের সুড়ঙ্গ ও অন্যান্য পরিকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর থেকেই সুড়ঙ্গ ও বিভিন্ন স্থাপনার ভিতরে কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খুঁজে দেখতে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। উদ্ধার অভিযানে নেপাল সেনা ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি চিনা বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত রয়েছেন। পাঁচটি এক্সক্যাভেটর, কম্প্রেসর ও ব্রেকার ব্যবহার করে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ পরিষ্কার করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে সুড়ঙ্গ ড্রিলিং ও হোলিংয়ের কাজ। সুড়ঙ্গের বিভিন্ন অংশে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে থাকা বাকিদের সন্ধান চালানো হচ্ছে। উদ্ধারকারী দলের কাছে আরও কয়েকজন শ্রমিক সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকার তথ্য রয়েছে বলেও জানিয়েছেন নিউপানে। ফলে প্রতিটি অংশ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সুড়ঙ্গের ভিতরে বড় পাথর সরাতেই সাফল্য
উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভিতরে একটি বড় পাথরও দেখতে পান। সেটি সরাতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করা হয়, যাতে আরও ভিতরে পৌঁছে আটকে থাকা ব্যক্তিদের সন্ধান করা যায়। এদিকে, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থাগুলির সংগঠন ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত প্রায় ৯৪৫ জনের এখনও কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। দুই কর্মীকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় তাই নতুন করে আশার আলো দেখছেন উদ্ধারকারীরা। সুড়ঙ্গের ভিতরে আরও কেউ আটকে থাকলে তাঁদেরও দ্রুত জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হবে—এখন সেই লক্ষ্যেই জোরকদমে চলছে অভিযান।
এভাবেও ফিরে আসা যায়!
ভূগোলের দৃষ্টিতে এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে টানেলের ভিতরে তৈরি হওয়া বদ্ধ বায়ুস্তর বা ‘এয়ার পকেট’। বাইরে থেকে বিপুল পরিমাণ জল, কাদা ও পলি ঢুকে টানেলের একাধিক অংশ বন্ধ করে দিলেও সব জায়গা যে একইভাবে জলে পূর্ণ হয়ে যাবে, এমন নয়। কোনও অংশ তুলনামূলকভাবে শুকনো থাকলে সেখানে আটকে থাকা মানুষের জন্য সীমিত পরিমাণে শ্বাস নেওয়ার বাতাসের জায়গা তৈরি হতে পারে। ভূ-প্রাকৃতিক দিক থেকেও ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হিমালয়ের নদীখাত অত্যন্ত খাড়া হওয়ায় আকস্মিক বন্যার সময় জলের সঙ্গে পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের গতি এবং ধ্বংসক্ষমতা অনেক বেশি হয়। ফলে টানেলের মুখের সামনে ৪০ মিটার দীর্ঘ ও প্রায় ২০ মিটার উচ্চতার ধ্বংসস্তূপ জমে যাওয়ায় উদ্ধারকারীদের প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়ায় প্রবেশপথ তৈরি করা। রিপোর্ট অনুযায়ী, উদ্ধারকারী দল ইতিমধ্যেই টানেলের ভিতরে ঢুকেছিল এবং আরও গভীরে পৌঁছনোর জন্য বোল্ডার সরানোর প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। অবশেষে মিলল সাফল্য।
উদ্ধার অভিযানে পাশে ভারত
নেপালের চিলিমে ও লাংটাং এলাকার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির সুড়ঙ্গে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাল ভারতের উদ্ধারকারী দল। নেপালি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথ ভাবে কাজ করছে তারা। বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, “চিলিম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুরঙ্গে অবস্থান নেওয়ার পর ভারতীয় সুরঙ্গ উদ্ধারকারী দলকে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অত্যন্ত সংকীর্ণ ও অপ্রশস্ত স্থান, দুর্গম ভৌগোলিক গঠনের কারণে বিশেষ সরঞ্জামের ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং সুরঙ্গের ভেতরের কর্দমাক্ত মেঝের কারণে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্ভাবনী কৌশল এবং তৈরি করা বিশেষ ভেলায় ভর দিয়ে দলটি সুরঙ্গের আরও গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। ভেতরে কেউ আটকে থাকলে তাকে উদ্ধারে দলটির প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”
