Tag: Project-75I

  • Project 75I: ভারতের সঙ্গে সাবমেরিন চুক্তি সই করতে প্রস্তুত, বড় দাবি জার্মানির, ৮০ হাজার কোটি টাকার অঙ্কই নেপথ্য কারণ!

    Project 75I: ভারতের সঙ্গে সাবমেরিন চুক্তি সই করতে প্রস্তুত, বড় দাবি জার্মানির, ৮০ হাজার কোটি টাকার অঙ্কই নেপথ্য কারণ!

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারত-জার্মানি প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বড়সড় অগ্রগতির ইঙ্গিত। প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৮০ হাজার কোটি) মূল্যের ছয়টি অত্যাধুনিক প্রচলিত শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরির চুক্তিতে সই করতে প্রস্তুত বার্লিন। জার্মান রাষ্ট্রদূত জ্যাসপার ভিক জানিয়েছেন, চুক্তির নথিপত্র জার্মানির তরফে চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। এখন ভারতের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষা।

    প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি ভারতের প্রজেক্ট-৭৫(আই)-এর আওতায়। জার্মানির থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস (TKMS) এবং ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত মাজাগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড (MDL) যৌথভাবে ভারতে ছয়টি সাবমেরিন তৈরি করবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এটি শুধু বিদেশ থেকে তৈরি সাবমেরিন কেনার চুক্তি নয়। ভারতে উৎপাদন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরই এই অংশীদারিত্বের অন্যতম মূল লক্ষ্য।

    সইয়ের জন্য প্রস্তুত জার্মানি, অপেক্ষা ভারতের অনুমোদনের

    ২৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জার্মান রাষ্ট্রদূত জ্যাসপার ভিক জানান, জার্মানির দিক থেকে চুক্তির নথি চূড়ান্ত। ভারতের তরফে প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া শেষ হলেই চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব। তিনি জানান, জার্মানি “যে কোনও মুহূর্তে” চুক্তিতে সই করতে প্রস্তুত।

    অর্থাৎ, এই মুহূর্তে মূল বিষয় চুক্তির জার্মান অংশের প্রস্তুতি নয়, বরং ভারতের প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পূর্ণ করা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকল্পটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার, যদিও চূড়ান্ত চুক্তিমূল্য ভারতের অনুমোদন ও চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরই নিশ্চিত হবে।

    ছয় সাবমেরিন তৈরি হবে ভারতেই

    প্রজেক্ট-৭৫(আই)-এর আওতায় ছয়টি পরবর্তী প্রজন্মের প্রচলিত সাবমেরিন তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলিতে থাকবে এয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন (AIP) প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির সাহায্যে প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনের তুলনায় দীর্ঘ সময় জলের নীচে অবস্থান করা সম্ভব হয়, কারণ বারবার বায়ুমণ্ডলীয় অক্সিজেনের জন্য ভেসে ওঠার প্রয়োজন কমে যায়।

    প্রকল্পটির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সাবমেরিনগুলির নির্মাণ ভারতে করার পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশের নিজস্ব সাবমেরিন উৎপাদন পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করা। ২০২৫ সালেই থাইসেনক্রুপ এবং মাঝগাঁও এই প্রকল্প নিয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি আলোচনায় প্রবেশ করেছিল।

    শুধু সাবমেরিন নয়, প্রযুক্তি হস্তান্তরই বড় বিষয়

    জার্মান রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে ‘রিয়েল পার্টনারশিপ’ বা প্রকৃত অংশীদারিত্বের কথা। অর্থাৎ, থাইসেনক্রুপ শুধু তৈরি সাবমেরিন ভারতে সরবরাহ করবে না; ভারতীয় শিল্প সংস্থার সঙ্গে মিলে দেশেই উৎপাদন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে।

    এর প্রভাব একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই। সাবমেরিন নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ইঞ্জিনিয়ারিং, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, সেন্সর, যুদ্ধব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সাপ্লাই চেনের একাধিক ভারতীয় সংস্থা এই সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। থাইসেনক্রুপও জানিয়েছে, মাঝগাঁও-এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব ভারতের দেশীয় সাবমেরিন নির্মাণ সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত।

    জার্মানির প্রতিরক্ষা রফতানি নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

    এই সাবমেরিন চুক্তির তাৎপর্য শুধু ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য নতুন প্ল্যাটফর্ম পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জার্মানির ভারতের প্রতি প্রতিরক্ষা রফতানি নীতির পরিবর্তনও।

    জ্যাসপার ভিক জানিয়েছেন, ভারতকে ঘিরে জার্মানির প্রতিরক্ষা রফতানি নীতিতে কার্যত “১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন” এসেছে। ভারতের জন্য লাইসেন্স দেওয়া এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বার্লিন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত বলে তিনি জানিয়েছেন। জার্মানির দৃষ্টিতে ভারত একটি বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

    ইউক্রেন যুদ্ধ, দ্রুত বদলে যাওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুদ্ধে ড্রোন ও অন্যান্য মনুষ্যবিহীন ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব—এই পরিবর্তনের পটভূমিতে রয়েছে বলে জার্মান পক্ষের বক্তব্য।

    কেন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি?

    ভারতের জন্য এই প্রকল্পের গুরুত্ব কয়েকটি স্তরে দেখা যায়।

    • প্রথমত, সাবমেরিন বহর আধুনিকীকরণ। ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য প্রচলিত সাবমেরিনের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়ানো দীর্ঘদিনের প্রয়োজন। প্রজেক্ট-৭৫(আই) সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
    • দ্বিতীয়ত, দেশে সাবমেরিন তৈরির সক্ষমতা বৃদ্ধি। বিদেশি প্রযুক্তি ও ভারতীয় উৎপাদন পরিকাঠামোর সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় শিল্পের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
    • তৃতীয়ত, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বৈচিত্র্য। রাশিয়া ভারতের দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নয়াদিল্লি একাধিক দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। জার্মানির সঙ্গে গভীরতর অংশীদারিত্ব সেই বৈচিত্র্যকেই আরও বিস্তৃত করবে।
    • চতুর্থত, ইউরোপীয় প্রযুক্তির সঙ্গে বৃহত্তর সংযোগ। জার্মানির সঙ্গে সাবমেরিন প্রকল্প সফলভাবে এগোলে ভবিষ্যতে নৌবাহিনীর বাইরেও অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তির প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যৌথ কাজের সুযোগ বাড়তে পারে।

    সাবমেরিনের বাইরে ড্রোন, সাইবার, ক্ষেপণাস্ত্রেও সহযোগিতা?

    জার্মান রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ ভারত-জার্মানি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র শুধু সাবমেরিনে সীমাবদ্ধ নয়। মনুষ্যবিহীন ব্যবস্থা, সাইবার সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং সেন্সর—এই ক্ষেত্রগুলিতেও দুই দেশ সহযোগিতা বাড়াতে পারে।

    এর ফলে সাবমেরিন চুক্তিকে একটি পৃথক প্রতিরক্ষা ক্রয়চুক্তি হিসেবে না দেখে ভারত-জার্মানি প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতার বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা যায়। ভারতীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে জার্মান সংস্থাগুলির যৌথ কাজ বাড়লে ভবিষ্যতে সহ-উৎপাদন ও প্রযুক্তি সহযোগিতার আরও ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

    ইন্দো-প্যাসিফিকেও বাড়ছে ভারত-জার্মানি যোগাযোগ

    সামরিক ক্ষেত্রেও ভারত ও জার্মানির যোগাযোগ বাড়ছে। দুই দেশের বাহিনী বিভিন্ন আকাশ ও সামুদ্রিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে। পাশাপাশি জার্মানি নয়াদিল্লির ইন্দো-প্যাসিফিক ইনফরমেশন ফিউশন সেন্টারে একজন লিয়াজোঁ অফিসার মোতায়েন করেছে। এর লক্ষ্য ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য আদানপ্রদান ও মেরিটাইম ডোমেন অ্যাওয়ারনেস বাড়ানো।

    এছাড়া চলতি বছর দুই দেশ প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা আরও গভীর করার লক্ষ্যে একটি ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোডম্যাপের মাধ্যমে সহযোগিতার কাঠামো এগিয়ে নিয়েছে। ফলে প্রজেক্ট-৭৫(আই)-কে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের বৃহত্তর শিল্পভিত্তিক পরিবর্তনের একটি অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

    অতীতেও জার্মান প্রযুক্তির সাবমেরিন ভারতে এসেছে

    ভারত-জার্মানি সাবমেরিন সহযোগিতা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ভারতের মাজাগন ডক ১৯৮০-র দশকে জার্মান ডিজাইনের টাইপ-২০৯ শ্রেণির সাবমেরিন নির্মাণ করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা ভারতের সাবমেরিন নির্মাণ পরিকাঠামোর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

    তবে প্রজেক্ট-৭৫(আই)-এর পরিসর অনেক বড়। এবার লক্ষ্য শুধু সাবমেরিন তৈরি নয়, উন্নত প্রযুক্তি, দেশীয় উৎপাদন এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প সক্ষমতাকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।

    বদলাচ্ছে ভারত-জার্মানি প্রতিরক্ষা সমীকরণ

    সব মিলিয়ে, প্রজেক্ট-৭৫(আই) ভারতের জন্য ছয়টি নতুন সাবমেরিন পাওয়ার প্রকল্পের চেয়েও বেশি কিছু। একদিকে এটি ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রচলিত সাবমেরিন সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনে উন্নত প্রযুক্তি আনার সুযোগ তৈরি করছে।

    জার্মানির দিক থেকেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে ভারতকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে দেখার প্রবণতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। আর ভারতের জন্য জার্মানি হয়ে উঠছে উন্নত ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

    তবে এখনই চুক্তি সম্পূর্ণ হয়েছে বলা যাচ্ছে না। জার্মানি সইয়ের জন্য প্রস্তুত হলেও ভারতের প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ অনুমোদন এখনও বাকি। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলেই প্রজেক্ট-৭৫(আই) আনুষ্ঠানিক চুক্তির পর্যায়ে প্রবেশ করবে।

  • P-75I: চেয়েছিল পাকিস্তানও, আগ্রহ দেখায়নি বার্লিন! জার্মানির সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সাবমেরিন চুক্তির পথে ভারত! কী এই ‘প্রজেক্ট ৭৫আই’?

    P-75I: চেয়েছিল পাকিস্তানও, আগ্রহ দেখায়নি বার্লিন! জার্মানির সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সাবমেরিন চুক্তির পথে ভারত! কী এই ‘প্রজেক্ট ৭৫আই’?

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতীয় নৌসেনার (Indian Navy) সাবমেরিন শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট-৭৫ ইন্ডিয়া (P-75I) প্রকল্পে অবশেষে বড় অগ্রগতি ঘটল। ভারতীয় নৌবাহিনী এবং জার্মান সংস্থা টুসেনক্রপ মারিনা সিস্টেমস্ (TKMS)-এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা খরচ সংক্রান্ত আলোচনা শেষ হয়েছে। সূত্রের মতে, আগামী অর্থবছরের শুরুতেই এই বহুচর্চিত চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।

    প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্ব

    প্রজেক্ট-৭৫ ইন্ডিয়া (P-75I) প্রকল্পের আওতায় ভারতে ছয়টি আধুনিক ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন তৈরি হবে, যেগুলিতে থাকবে এয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন (AIP) ব্যবস্থা। এই প্রযুক্তির ফলে সাবমেরিন দীর্ঘ সময় জলের নিচে থাকতে পারবে, যা ভারতীয় নৌবাহিনীর নজরদারি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়াবে। এই প্রকল্প শুধুমাত্র একটি ডুবোজাহাজ কেনার চুক্তি নয়, বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কারণ, চুক্তিটি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের সঙ্গে এটি সরাসরি সংযুক্ত হতে চলেছে।

    খরচ ও দরকষাকষির বাস্তবতা

    প্রকল্পটির চূড়ান্ত মূল্য প্রকাশ না হলেও অনুমান করা হচ্ছে, মোট ব্যয় কমপক্ষে প্রায় ৯ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা)। এটিই হতে চলেছে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রচলিত শক্তিচালিত সাবমেরিন চুক্তি। প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা মাঝগাঁও ডকইয়ার্ড লিমিটেড (MDL) ও টুসেনক্রপ-এর দর ছিল ১.২ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। ২০১৮ সালে প্রকল্পের ‘অ্যাকসেপ্টেন্স অফ নেসেসিটি’ (AoN) অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল মাত্র ৪৩,০০০ কোটি টাকা। ফলে ব্যয়ের এই বিপুল বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিরক্ষা মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। পরে, জার্মান সংস্থার সঙ্গে নতুন করে দর-কষাকষি করে খরচের ভার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয় এমডিএলের নতুন ম্যানেজমেন্ট। নৌসেনার লক্ষ্য ছিল ৬০,০০০–৭০,০০০ কোটি টাকার মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত তা ৮০ থকে ৮২ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে বলে অনুমান।

    কানাডার চুক্তির সঙ্গে তুলনা

    আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের এই প্রকল্পের খরচকে ব্যতিক্রমী বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, কানাডা জার্মানির থেকে ১২টি এই একই ‘টাইপ-২১৪’ ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন কিনছে প্রায় ১২ লক্ষ কোটি ডলারে। অর্থাৎ, প্রতিটি সাবমেরিনের খরচ আনুমানিক ১ লক্ষ কোটি ডলার। অন্যদিকে, ভারতের ক্ষেত্রে এই দর পড়ছে প্রায় দেড়গুণ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের প্রকল্পের ব্যয় বেশি হওয়ার মূল কারণ প্রযুক্তি হস্তান্তর (Technology Transfer) এবং দেশীয় উৎপাদন পরিকাঠামো গড়ে তোলার দায়িত্ব। অন্যদিকে কানাডার ক্ষেত্রে সব সাবমেরিন জার্মানিতেই তৈরি হবে, প্রযুক্তি স্থানান্তরেরও কোনও শর্ত নেই। ফলে, সেই দিক দিয়ে দাম ঠিক আছে।

    প্রক্রিয়াগত বাধা ও সময়সীমা

    সূত্র জানাচ্ছে, খরচ সংক্রান্ত আলোচনা শেষ হলেও এখনও কিছু প্রশাসনিক ধাপ বাকি রয়েছে। ফাইলটি অর্থমন্ত্রক হয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা-বিষয়ক মন্ত্রিসভার কমিটি (CCS)-এর অনুমোদনের জন্য যাবে। এই প্রক্রিয়ার কারণেই চুক্তি স্বাক্ষর চলতি অর্থবছর থেকে পিছিয়ে পরবর্তী অর্থবছরে যেতে পারে। রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (RFP) অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের সাত বছরের মধ্যে প্রথম সাবমেরিন সরবরাহ করতে হবে, যেখানে ৪৫ শতাংশ দেশীয় উপাদান থাকবে। পরবর্তী বছরগুলিতে একটির পর একটি সাবমেরিন যুক্ত হবে এবং দেশীয়করণের হার ধীরে ধীরে ৬০ শতাংশে উন্নীত করা হবে।

    এই সাবমেরিন পাকিস্তানও চেয়েছিল, পাত্তা দেয়নি জার্মানি

    এই চুক্তির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক তাৎপর্যও রয়েছে। অতীতে পাকিস্তানও জার্মান সাবমেরিন প্রযুক্তি অর্জনের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল, যার মধ্যে টাইপ ২১৪ প্ল্যাটফর্মও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইসলামাবাদের সঙ্গে জ্বালানি, জলবায়ু প্রকল্প ও দক্ষতা উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা চালায় বার্লিন এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সহায়তাও প্রদান করে। তবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির ক্ষেত্রে জার্মানি এত সহজে পাকিস্তানের মতো দেশকে সন্তুষ্ট করবে না। ফলে, বার্লিন এই নিয়ে আগ্রহই দেখায়নি। সেখানে ভারতেই তৈরি হবে এই ৬টি সাবমেরিন। যার জন্য ভারতকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তি হস্তান্তর করতেও রাজি বার্লিন। এখানেই তফাত।

    সাবমেরিনের ক্ষেত্রে ভারত-জার্মানি দীর্ঘ সম্পর্ক

    সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সাবমেরিন নির্মাণ ও উন্নত সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে জার্মানির প্রধান অংশীদার হিসেবে ভারত উঠে এসেছে। এই প্রথম নয় যে, ভারত জার্মানির থেকে সাবমেরিন নিচ্ছে। এর আগে জার্মানি থেকে শিশুমার শ্রেণির ৪টি ডিজেল-বিদ্যুৎ ডুবোজাহাজ কিনেছিল ভারতীয় নৌসেনা। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত পুনর্গঠনকে নির্দেশ করে। ফলত, জার্মান প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককেই মজবুত করছে না, বরং অঞ্চলজুড়ে সাবমেরিন শক্তির সমীকরণেও নতুন মাত্রা যোগ করছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত এখন জার্মানির উন্নত সাবমেরিন প্রযুক্তির প্রধান গ্রাহক ও অংশীদার হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজ অবস্থান সুদৃঢ় করছে।

    ভারতের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ

    প্রজেক্ট-৭৫ ইন্ডিয়া (P-75I) প্রকল্প ভারতের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ও সামুদ্রিক কৌশলের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যদিও এর উচ্চ ব্যয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবু প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার দিক থেকে এটি দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভারত শুধু সাবমেরিন শক্তিতে নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা শিল্প মানচিত্রেও একটি শক্তিশালী উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। ভারত মহাসাগর অঞ্চলে (IOR) ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা ও সাবমেরিন মোতায়েনের প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রজেক্ট-৭৫ ইন্ডিয়া (P-75I) প্রকল্পের সাবমেরিন ভারতীয় নৌবাহিনীর সমুদ্রতল যুদ্ধক্ষমতায় একটি কৌশলগত সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

    আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষা

    বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উন্নতমানের সাবমেরিনগুলি কেবল প্রতিরক্ষা শক্তিই বাড়াবে না, বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় ভারতের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করবে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত মহাসাগর অঞ্চলে অন্যান্য নৌশক্তির দ্রুত সম্প্রসারিত সাবমেরিন বহর ভারতের জন্য একটি নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রজেক্ট-৭৫ ইন্ডিয়া (P-75I) সাবমেরিন যুক্ত হওয়ায় ভারতের দীর্ঘপাল্লার টহল ক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি সমুদ্রের গভীরে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতাও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ভারতীয় নৌবাহিনী অ্যান্টি-অ্যাক্সেস/এরিয়া-ডিনায়াল (A2/AD) কৌশলকে আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারবে এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হবে। সামগ্রিকভাবে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতীয় নৌবাহিনী সমুদ্রতলের ক্ষেত্রে একটি বিশ্বাসযোগ্য শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে।

  • India Germany Submarine Deal: মের্ৎসের সফরে স্বাক্ষরিত মউ, চলছে দরাদরি, চূড়ান্ত হওয়ার পথে ভারত–জার্মানি ঐতিহাসিক সাবমেরিন চুক্তি?

    India Germany Submarine Deal: মের্ৎসের সফরে স্বাক্ষরিত মউ, চলছে দরাদরি, চূড়ান্ত হওয়ার পথে ভারত–জার্মানি ঐতিহাসিক সাবমেরিন চুক্তি?

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: জার্মানির সঙ্গে মউ স্বাক্ষর করে দেশের নৌবাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা-শিল্প চুক্তি চূড়ান্ত করার দিকে এগোচ্ছে ভারত। জার্মান সাবমেরিন নির্মাতা থিসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস (TKMS)-এর সঙ্গে মুম্বইয়ের মাজগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড (MDL)-এর অংশীদারিত্বে ভারতীয় নৌসেনার জন্য ছয়টি অত্যাধুনিক প্রচলিত (ডিজেল-চালিত) সাবমেরিন নির্মাণের পথে এগোচ্ছে এই চুক্তি। এই মুহূর্তে ভারত সফরে এসেছেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। সোমবার তিনি গুজরাটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সারেন। এর পরই, দুই রাষ্ট্রনেতার উপস্থিতিতে একাধিক বিষয়ে মউ স্বাক্ষিরত করে তা বিনিময় উভয় পক্ষের শীর্ষ আধিকারিকরা।

    যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে, ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য ছয়টি প্রচলিত (কনভেনশনাল) সাবমেরিন কেনার বিষয়ে জার্মানির সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচক দিকেই এগোচ্ছে। তবে, চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। শীর্ষ কেন্দ্রীয় সূত্রের মতে, বর্তমানে চুক্তির প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন দিক নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা চলছে এবং একটি গঠনমূলক সমাধান নিয়ে আশাবাদ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে, বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রি বলেন, “এই ধরনের চুক্তিতে প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও বাণিজ্যিক আলোচনা থাকে। এসব আলোচনা ইতিবাচক গতিতে এগোচ্ছে। চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তবে আলোচনা ইতিবাচকভাবেই চলছে এবং আমরা একটি ইতিবাচক ফলাফলের আশা করছি।”

    ৭২০০০০০০০০০০ টাকার চুক্তি!

    কেন্দ্রীয় সূত্রের মতে, জার্মানির সঙ্গে এই সাবমেরিন নির্মাণের চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭২,০০০ কোটি টাকা) মূল্যের এই চুক্তির মাধ্যমে বহু প্রতিক্ষিত ‘প্রজেক্ট–৭৫আই’ টেন্ডারের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে। এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে. চা হবে দেশের সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে সর্ববৃহৎ অঙ্কের চুক্তি। নীতিগত পরিবর্তন, কঠোর প্রযুক্তিগত শর্ত এবং পরীক্ষিত ও টিকে থাকার ক্ষমতাসম্পন্ন সাবমেরিন প্রযুক্তির ওপর ভারতের জোরের কারণেই এই প্রকল্প দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল।

    এই চুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে ভারতীয় নৌবাহিনীর জার্মান ‘টাইপ–২১৪ নেক্সট জেনারেশন’ (Type-214NG) সাবমেরিন নির্বাচন। প্রায় ২,৫০০ টন ওজনের এই ডিজেল–ইলেকট্রিক সাবমেরিনে রয়েছে এয়ার–ইনডিপেন্ডেন্ট প্রোপালশন বা এআইপি (AIP) ব্যবস্থা। স্পেনের নাভান্তিয়া প্রস্তাবিত এস–৮০ প্লাস সাবমেরিনকে পিছনে ফেলে টাইপ–২১৪এনজি বেছে নেওয়া হয়েছে মূলত এই সাবমেরিনের পরীক্ষিত এআইপি প্রযুক্তি, উন্নত শব্দ-নীরবতা (অ্যাকোস্টিক স্টেলথ) এবং কম জীবনচক্র ঝুঁকির কারণে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সমুদ্র অঞ্চলে দীর্ঘ সময় গোপনে কাজ করাই যেখানে প্রধান লক্ষ্য, সেখানে জার্মান প্ল্যাটফর্মের পরিণত ও পরীক্ষিত প্রযুক্তিই সিদ্ধান্তে নির্ণায়ক হয়েছে।

    কেন এআইপি ও স্টেলথ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ?

    আধুনিক প্রচলিত সাবমেরিনের ক্ষেত্রে এআইপি এখন প্রায় অপরিহার্য। সাধারণ ডিজেল–ইলেকট্রিক সাবমেরিনকে ব্যাটারি চার্জের জন্য মাঝেমধ্যে ভেসে উঠতে বা স্নরকেল ব্যবহার করতে হয়, যা শত্রুপক্ষের নজরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়। এআইপি-যুক্ত সাবমেরিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ জলের নিচে থাকতে পারে, অত্যন্ত কম শব্দ ও ইলেকট্রোম্যাগনেটিক সিগনেচার বজায় রেখে টহল, নজরদারি ও আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করে।

    টাইপ–২১৪এনজি সাবমেরিনে ব্যবহৃত ফুয়েল–সেল নির্ভর এআইপি ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও কার্যত পরীক্ষিত প্রযুক্তি হিসেবে পরিচিত। বিপরীতে, স্পেনের বায়ো-ইথানল ভিত্তিক এআইপি প্রযুক্তি এখনও সমপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেনি। জলতলের যুদ্ধে যেখানে ব্যর্থতার কোনও সুযোগ নেই, সেখানে পরীক্ষিত প্রযুক্তিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে ভারতীয় নৌবাহিনী।

    ১৯৭১: করাচি আক্রমণ ও নৌশক্তির পাঠ

    স্টেলথ ও সহনশীলতার ওপর ভারতের জোরের পেছনে রয়েছে কঠোর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। ১৯৭১ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধে অপারেশন ট্রাইডেন্ট ও অপারেশন পাইথনের মাধ্যমে ভারতীয় নৌবাহিনী পাকিস্তানের প্রধান সমুদ্রবন্দর করাচিতে বিধ্বংসী হামলা চালায়। এই আঘাতে পাকিস্তানের নৌ লজিস্টিক্স ও জ্বালানি পরিকাঠামো কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তাদের সমুদ্রভিত্তিক অভিযান দীর্ঘমেয়াদে অচল হয়ে যায়।

    এই হামলা ছিল কেবল কৌশলগত নয়, গভীরভাবে কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন। এটি যুদ্ধের পরিণতি ত্বরান্বিত করে এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। প্রথমবারের মতো ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে যে, সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ স্থলযুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। তবুও পরবর্তী দশকগুলিতে ভারতের সাবমেরিন আধুনিকীকরণ ধীরগতিতে এগোয়। বিলম্বিত কেনাকাটা, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং নীতিগত জড়তার ফলে নৌবাহিনীর জলতল বহর পুরনো হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে প্রজেক্ট–৭৫আই কেবল একটি সামরিক ক্রয় নয়, ১৯৭১-এর শিক্ষা থেকে উদ্ভূত বহু প্রতীক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ।

    অপারেশন ‘সিঁদুর’ ও করাচির পুনরাবির্ভাব

    গত বছরের মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় এই শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে সামনে আসে। বড়সড় সন্ত্রাসী উসকানির পর ভারত–পাকিস্তান উত্তেজনা বাড়লে ৮ থেকে ১১ মে পর্যন্ত ভারতীয় নৌবাহিনী ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুতি’তে ছিল। বিশ্বাসযোগ্য সূত্রের দাবি, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে পাকিস্তানের আর্থিক ও লজিস্টিক প্রাণকেন্দ্র করাচি বন্দরে আঘাত হানার জন্য ভারত প্রস্তুত ছিল।

    আজও করাচি পাকিস্তানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড—দেশটির অধিকাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি আমদানি ও আর্থিক প্রবাহ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। ১৯৭১-এর পুনরাবৃত্তির বিশ্বাসযোগ্য হুমকি—এবার আরও উন্নত নজরদারি, ক্ষেপণাস্ত্র ও জলতল সক্ষমতা নিয়ে— প্রমাণ করে যে, নৌ শক্তি শট না ছুড়েও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অপারেশন ‘সিঁদুর’ আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সমুদ্রে, আর তা কাজে লাগাতে ভারতের দরকার শক্তিশালী জলতল আধিপত্য।

    এই প্রেক্ষাপটে ভারত–জার্মানি সাবমেরিন চুক্তির গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি নিছক শান্তিকালীন আধুনিকীকরণ নয়, বরং সাম্প্রতিক বাস্তব সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা সক্ষমতা বৃদ্ধি। নতুন প্রজন্মের সাবমেরিন যুক্ত হলে করাচির ওপর চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ভারতীয় নৌবাহিনীর ক্ষমতা আরও বাড়বে, যা নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও স্থায়ী জলতল আঘাতের মাধ্যমে প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করবে।

    প্রজেক্ট—৭৫আই-এ ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’

    এই চুক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—ছয়টি সাবমেরিনই ভারতে নির্মিত হবে। প্রধান নির্মাণ সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পাবে এমডিএল। টিকেএমএস নকশা কর্তৃত্ব, প্রকৌশল সহায়তা, পরামর্শ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সরবরাহ করবে। এর ফলে ভারত কেবল সাবমেরিন প্ল্যাটফর্মই নয়, গভীর প্রযুক্তিগত দক্ষতাও অর্জন করবে—যা ভবিষ্যতের নৌ শক্তি গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

LinkedIn
Share