মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দিল্লিতে বিজেপির (BJP) সদর দফতরে তৎপরতা তুঙ্গে। দলটি তাদের পরবর্তী জাতীয় সভাপতিকে নির্বাচনের (Election Process) প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পদে মনোনয়ন জমা পড়বে ১৯ জানুয়ারি, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হবে ২০ জানুয়ারি। দলীয় সূত্রে খবর, বর্তমান কার্যনির্বাহী সভাপতি নীতীন নাবিন কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে চলেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং বিদায়ী সভাপতি জগৎ প্রকাশ নাড্ডা-সহ বিজেপির শীর্ষ নেতারা তাঁর নাম প্রস্তাব করবেন বলে জানা যাচ্ছে। অন্য কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ফল কার্যত নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে বিজেপির জাতীয় সভাপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ঘিরে বরাবরই প্রশ্ন ওঠে, দলের অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালী কতটা গণতান্ত্রিক।
বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল (BJP)
নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে পরিচালিত ভোটের মতো নয় বিজেপির জাতীয় সভাপতি নির্বাচন। এটি পুরোপুরি দলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং এতে ভারতের নির্বাচন কমিশনের কোনও ভূমিকা থাকে না। দল একে একটি বেসরকারি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই দেখে, যেমন কোনও সমিতি বা সংগঠন তাদের পদাধিকারী নির্বাচন করে। নিজেদের বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করা বিজেপির সদস্যসংখ্যা ১৮ কোটির বেশি হলেও সাধারণ কর্মী বা সমর্থকরা সরাসরি জাতীয় সভাপতির জন্য ভোট দেন না। নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে দলের সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে হয়, যাকে বিজেপি তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি বলেই মনে করে। বিজেপির সংবিধানে নীচ থেকে ওপরের দিকে নির্বাচনের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো নির্ধারিত রয়েছে। বুথ বা স্থানীয় স্তর থেকে শুরু করে গ্রাম বা শহর, মণ্ডল, জেলা, রাজ্য এবং শেষে জাতীয় স্তর পর্যন্ত এই সাংগঠনিক নির্বাচন (BJP) সম্পন্ন হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি দলের অন্দরে “সংগঠন পর্ব” নামে পরিচিত এবং এটি ছ’বছরে একবার অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান সংগঠন পর্ব শুরু হয়েছে ২০২৪–২৫ সালে এবং এখন তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রক্রিয়া শুরু
এই প্রক্রিয়া শুরু হয় সদস্য সংগ্রহ অভিযান দিয়ে। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে যে কোনও ভারতীয় নাগরিক, যিনি দলের মানবতাবাদ এবং আদর্শ মেনে (Election Process) নেন, তিনি প্রাথমিক সদস্য হতে পারেন। সদস্যপদের মেয়াদ ছ’বছর এবং তা নবীকরণযোগ্য।এর মধ্য থেকে ‘সক্রিয় সদস্য’ বাছাই করা হয়। সক্রিয় সদস্য হতে গেলে অন্তত তিন বছর দলীয় কাজ করতে হয়, পার্টি ফান্ডে ১০০ টাকা অনুদান দিতে হয়, আন্দোলন বা কর্মসূচিতে অংশ নিতে হয় এবং দলীয় প্রকাশনার গ্রাহক হতে হয়। শুধুমাত্র সক্রিয় সদস্যরাই সাংগঠনিক নির্বাচনে ভোট দিতে বা উচ্চপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। বিজেপির সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সভাপতি নির্বাচিত হন একটি বিশেষ ইলেক্টোরাল কলেজের মাধ্যমে। এই কলেজে জাতীয় পরিষদ ও রাজ্য পরিষদের সদস্যরা থাকেন। লোকসভা আসনের সংখ্যার অনুপাতে রাজ্য থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন, পাশাপাশি সাংসদদের মনোনীত প্রতিনিধিরাও থাকেন (BJP)।
রাজ্য পরিষদের সদস্য
রাজ্য পরিষদের সদস্যরা জেলা ইউনিট থেকে নির্বাচিত হন এবং বিধায়ক ও সাংসদদের মনোনীত প্রতিনিধিরাও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকেন। এবার ইলেক্টোরাল কলেজে প্রায় ৫,৭০০ জন সদস্য রয়েছেন। দলীয় নিয়ম অনুযায়ী, অন্তত অর্ধেক রাজ্যে (প্রায় ১৯টি রাজ্য) সাংগঠনিক নির্বাচন শেষ না হলে জাতীয় সভাপতি নির্বাচন করা যায় না। সেই শর্ত এবার পূরণ হয়েছে। বিজেপির সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সভাপতি হতে গেলে কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রার্থীকে অন্তত ১৫ বছর প্রাথমিক সদস্য এবং অন্তত চার মেয়াদ ধরে সক্রিয় সদস্য থাকতে হয়, যা সাধারণত প্রায় ১২ বছরের সাংগঠনিক কাজের সমান। মনোনয়ন জমা দিতে হলে ইলেক্টোরাল কলেজের অন্তত ২০ জন সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন, যাঁরা কমপক্ষে পাঁচটি ভিন্ন রাজ্য থেকে হতে হবে, যেসব রাজ্যে জাতীয় পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। প্রার্থীকে লিখিত সম্মতিও দিতে হয় (Election Process)।
ইলেক্টোরাল কলেজের তালিকা
এই নির্বাচনের জন্য ১৬ জানুয়ারি ইলেক্টোরাল কলেজের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ১৯ জানুয়ারি দুপুর ২টা থেকে ৪টার মধ্যে মনোনয়ন জমা নেওয়া হবে এবং সেদিনই যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। সন্ধ্যায় মনোনয়ন প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে। যদি একাধিক বৈধ মনোনয়ন থাকে, তবে ২০ জানুয়ারি গোপন ব্যালটে ভোট হবে এবং সেদিনই ফল ঘোষণা করা হবে। তবে যদি একজন প্রার্থীই থাকেন, তবে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে, এবার যা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি (BJP)।বিজেপির ৪৫ বছরের ইতিহাসে কখনও জাতীয় সভাপতি পদে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচন হয়নি। প্রতিবারই সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন সর্বসম্মতি ক্রমে। দলীয় সূত্রের মতে, এটি বিজেপির অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য ও সমন্বয়ের সংস্কৃতির ফল।
আরএসএস
বিজেপি সংবিধানে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) নাম উল্লেখ না থাকলেও, বাস্তবে এই প্রক্রিয়ায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক ভূমিকা থাকে। আরএসএসের শীর্ষ নেতারা এবং বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নাম চূড়ান্ত করার আগে আলোচনা করে নেন। সংগঠনের মহাসচিব, যিনি সাধারণত আরএসএস থেকে আসেন, তিনিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই পদ্ধতিকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করা হয়, কারণ জাতীয় সভাপতি শুধুই প্রতীকী পদ নয়। তিনি দলের সাংগঠনিক দিশা নির্ধারণ করেন, নির্বাচনী কৌশল দেখাশোনা করেন এবং দল ও সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করেন। প্রকাশ্য লড়াই দলকে দুর্বল করতে পারে, যা বিজেপি এড়িয়ে চলতে চায় (BJP)।
জাতীয় সভাপতির মেয়াদ
বিজেপির সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সভাপতি টানা দুই মেয়াদ, অর্থাৎ মোট ছ’বছর দায়িত্বে থাকতে পারেন। এরপর বিরতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। যদিও বাস্তবে মেয়াদ বাড়ানোর ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে (Election Process)। জেপি নাড্ডা ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সভাপতি হন। তাঁর প্রথম মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালে, কিন্তু মেয়াদ বাড়িয়ে তাঁকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্বে রাখা হয়। বর্তমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবশেষে ২০২৬ সালে নতুন সভাপতির দিকে এগোচ্ছে বিজেপি। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হবে ২০ জানুয়ারি। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিজেপির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন বহু গুরুত্বপূর্ণ নেতা। এঁরা হলেন, অটল বিহারী বাজপেয়ী (১৯৮০–১৯৮৬), লালকৃষ্ণ আডবানি (১৯৮৬–১৯৯১), মুরলী মনোহর যোশী (১৯৯১–১৯৯৩), লালকৃষ্ণ আডবানি (১৯৯৩–১৯৯৮), কুশাভাউ ঠাকরে (১৯৯৮–২০০০),
বাঙ্গারু লক্ষ্মণ (২০০০–২০০১), কে জনা কৃষ্ণমূর্তি (২০০১–২০০২), এম বেঙ্কাইয়া নাইডু (২০০২–২০০৪), লালকৃষ্ণ আডবানি (২০০৪–২০০৫), রাজনাথ সিং (২০০৬–২০০৯), নীতীন গডকরি (২০০৯–২০১৩), রাজনাথ সিং (২০১৩–২০১৪), অমিত শাহ (২০১৪–২০২০), জগৎ প্রকাশ নাড্ডা (২০২০–২০২৬)।
অমিত শাহের মেয়াদ
এর মধ্যে ২০১৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত অমিত শাহের মেয়াদ ছিল দীর্ঘতম ও সবচেয়ে নির্বাচনী সাফল্যপূর্ণ, যখন বিজেপি লোকসভায় ৩০০-এরও বেশি আসন পায়। জেপি নাড্ডার মেয়াদে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সাংগঠনিক সংহতি বজায় রাখা হয়। বিজেপির জাতীয় সভাপতি নির্বাচনের পদ্ধতি দলটির কেন্দ্রীভূত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ চরিত্র স্পষ্ট করে। সিদ্ধান্ত শীর্ষস্তরে নেওয়া হয় এবং তা নির্বিঘ্নে সংগঠনের সর্বস্তরে বাস্তবায়িত হয়। এতে অভ্যন্তরীণ সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয় এবং ঐক্যের বার্তা দেওয়া যায় (Election Process)। তবে একই সঙ্গে একটি বড় প্রশ্নও থেকে যায়, দল যত বড় হচ্ছে, ভবিষ্যতে কি কখনও শীর্ষ সাংগঠনিক পদে প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাবে? আপাতত বিজেপি তাদের ঐতিহ্যগত সর্বসম্মতির পথেই অবিচল, এবং আসন্ন জাতীয় সভাপতি (BJP) নির্বাচনও সেই পরিচিত পথেই এগোচ্ছে।