মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতের প্রাচীন সামুদ্রিক ঐতিহ্যের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হল বুধবার। গুজরাটের পোরবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথম বিদেশ সফর সফলভাবে সম্পন্ন করে ওমানের মাস্কাট বন্দরে নোঙর করল ভারতীয় নৌবাহিনীর ঐতিহ্যবাহী পালতোলা জাহাজ আইএনএসভি কৌন্ডিন্য। বন্দরে পৌঁছনোর পর জাহাজটিকে দেওয়া হয় বিশেষ ওয়াটার স্যালুট। ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী ‘স্টিচড সেল শিপে’র এই সাফল্যকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামুদ্রিক ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবনের প্রচেষ্টার এক উজ্জ্বল নিদর্শন বলে অভিহিত করেছেন কেন্দ্রীয় বন্দর, নৌ-পরিবহণ ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়াল।
নরেন্দ্র মোদির দূরদর্শী নেতৃত্বের উজ্জ্বল উদাহরণ (INSV Kaundinya Crew)
তিনি বলেন, “আইএনএসভি কৌন্ডিন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দূরদর্শী নেতৃত্বের উজ্জ্বল উদাহরণ। ভারতের প্রাচীন জাহাজ নির্মাণ কৌশলকে পুনরুজ্জীবিত করে তা বিশ্বের দরবারে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরাই ছিল তাঁর সংকল্প।” মন্ত্রী বলেন, “এই জাহাজ আমাদের সামুদ্রিক ঐতিহ্যের কালজয়ী শক্তি, দক্ষতা ও টেকসই উদ্ভাবনের প্রতীক।” মন্ত্রী জানান, ইনএসভি কৌন্ডিন্যের নকশা অনুপ্রাণিত পঞ্চম শতাব্দীর একটি জাহাজ থেকে, যার চিত্র অজন্তা গুহার দেওয়ালে পাওয়া গিয়েছে। জাহাজটির নামকরণ করা হয়েছে কিংবদন্তি ভারতীয় নাবিক কৌন্ডিন্যর নামে, যিনি ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছেছিলেন।
স্টিচড সেলিং ভেসেল
জাহাজটি ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর গুজরাটের পোরবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। অভিযানে অংশ নেন চারজন অফিসার ও ১৩ জন নৌসেনা। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন কমান্ডার বিকাশ শেওরান, এবং অফিসার-ইন-চার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কমান্ডার ওয়াই হেমন্ত কুমার। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সঞ্জীব সান্যালও এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন এবং তিনি নিয়মিতভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় যাত্রার আপডেট শেয়ার করেন। আইএনএসভি কৌন্ডিন্য একটি ঐতিহ্যবাহী স্টিচড সেলিং ভেসেল, যা ভারতের প্রাচীন সামুদ্রিক ইতিহাসে ব্যবহৃত সেলাই করা কাঠের জাহাজ নির্মাণ পদ্ধতিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে।
অর্থায়ন করে সংস্কৃতি মন্ত্রক
এই প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুলাই মাসে সংস্কৃতি মন্ত্রক, ভারতীয় নৌবাহিনী এবং হোডি ইনোভেশনসের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে শুরু হয়। প্রকল্পটির অর্থায়ন করে সংস্কৃতি মন্ত্রক। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কিল লেয়িং-এর পর, কেরালার দক্ষ কারিগরদের একটি দল ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে জাহাজটি নির্মাণ করেন। মাস্টার শিপরাইট বাবু শঙ্করনের নেতৃত্বে নারকেল ফাইবার, কয়ার দড়ি ও প্রাকৃতিক রেজিন ব্যবহার করে কাঠের তক্তা সেলাই করে তৈরি করা হয় জাহাজের গঠন। প্রাচীন জাহাজগুলির কোনও নীলনকশা না থাকায়, অজন্তার গুহাচিত্র ও অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্র থেকে নকশা নির্ধারণ করা হয়।
জাহাজটির নকশা ও কাঠামোগত স্থায়িত্ব যাচাই করা হয় আইআইটি মাদ্রাজের ওশান ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে হাইড্রোডাইনামিক মডেল টেস্টিং এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর নিজস্ব প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের মাধ্যমে।
জাহাজটির পালে রয়েছে গণ্ডভেরুণ্ড ও সূর্য প্রতীক, সামনের অংশে খোদাই করা সিংহ-ওয়ালি, এবং ডেকে শোভা পাচ্ছে হরপ্পা যুগের আদলে তৈরি পাথরের নোঙর, যা প্রাচীন ভারতীয় সামুদ্রিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। আইএনএসভি কৌন্ডিন্য শুধুমাত্র একটি জাহাজ নয়, বরং এটি ভারতের প্রাচীন সমুদ্রযাত্রা, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।









