তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
জীবন যাপনের সময় বেড়েছে! আধুনিক চিকিৎসা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার জেরে দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকার সুযোগ বেড়েছে! কিন্তু জীবন যাপনের মান বেড়েছে কি? এই নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে সাম্প্রতিক তথ্য! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তরফে প্রকাশিত এক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। মানুষের জীবনকাল বাড়লেও, প্রৌঢ় বয়সে তাঁদের জীবন যাপনের মান বাড়েনি। বরং বিশ্ব জুড়ে বয়স্কদের হেনস্থার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে! যার ফলে, তাদের জীবন যাপন আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব তাঁদের স্বাস্থ্যের উপরেও পড়ছে। তাই ১৫ জুন ওয়ার্ল্ড ওল্ডার অ্যাবিউজ অ্যাওয়ারনেস ডে-তে বিশ্ব জুড়ে নানান সচেতনতা কর্মশালার আয়োজন হয়েছে। হেনস্থা হলে কী করতে হবে, সেই সম্পর্কে জানানোর পাশপাশি এ বছরে জোর দেওয়া হয়েছে, হেনস্থা হওয়ার আগেই কীভাবে সবকিছু আটকে দেওয়া যায়।
কী বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সমস্ত দেশেই প্রবীণ নাগরিকদের উপরে হেনস্থা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি। অর্থাৎ ৬০ বছরের উর্ধ্বে বয়স্ক মানুষেরা নানান ভাবে হেনস্থার শিকার হন। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি ৬ জন প্রবীণ নাগরিকের মধ্যে ১ জন হেনস্থার শিকার হন। আমেরিকা এবং ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতেও প্রবীণ নাগরিকদের হেনস্থার ঘটনা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি। তবে বাদ নেই ভারত! প্রবীণ নাগরিকদের স্বাস্থ্য নিয়ে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে কাজ করা এক সংস্থার সাম্প্রতিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের ১১ শতাংশের বেশি প্রবীণ নাগরিক হেনস্থার শিকার হন। যা তাঁদের স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। সমাজের পক্ষেও এই ঘটনা ঠিক নয়।
কী ধরনের হেনস্থা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে?
প্রবীণ নাগরিকদের হেনস্থার রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে, সংশ্লিষ্ট মহল জানাচ্ছেন, অধিকাংশ হেনস্থা হয় মানসিক। একাধিক ঘটনায় দেখা গিয়েছে, অধিকাংশ বয়স্ক মানুষ পরবর্তী প্রজন্মের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেন না। ফলে এক ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়। প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গেও মানিয়ে চলতে পারেন না। ফলে তাঁদের অধিকাংশ কাজ করতে অনেকটা সময় লাগে। বুঝতেও সময় লাগে। অনেক সময়েই তাঁদের ‘বোঝা’ উপলব্ধি করানো হয়। তার ফলে তাঁরা নানান মানসিক সমস্যার শিকার হন। তাঁদের মধ্যে একাকিত্বের সমস্যা বাড়ে। তাঁরা মানসিক অবসাদে ভোগেন। এগুলো মস্তিষ্কে বাড়তি চাপ তৈরি করে। এর ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। মনে রাখার শক্তি হ্রাস পায়। অ্যালজাইমারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ে। আবার অনেক সময়েই পরিবারের প্রবীণ মানুষদের দিনের অধিকাংশ সময় একা থাকতে হয়। এর ফলে তাঁদের মধ্যে একটা একাকিত্ব গ্রাস করে। এর ফলেও নানান স্নায়ুঘটিত সমস্যা তৈরি হয়।
সাইবার অপরাধ ও আর্থিক প্রতারণার শিকার বয়স্করা
অনেক সময়েই পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি হেনস্থার জন্য দায়ী বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁরা জানাচ্ছেন, পেশাগত জীবনে অবসর নেওয়ার পরে বহু মানুষ নানান মানসিক জটিলতায় ভোগেন। তাঁরা নিজেদের কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। অনেক সময়েই সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। এর ফলে পরিবারে অনেক সময় গুরুত্ব কমতে থাকে। এই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলা, তাঁদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। তাঁরা যেকোনো কাজ করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে প্রতি দিনের স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য অন্যের উপরে নির্ভর হয়ে পড়েন। এর জেরে তাঁদের হেনস্থার সুযোগ বাড়ে। এছাড়াও বিশ্ব জুড়ে প্রৌঢ় হেনস্থার অন্যতম দিক হল আর্থিক হেনস্থা। এমনটাই জানাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারের প্রৌঢ় সদস্যের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্পত্তি নিয়ে নেওয়া হয়। আবার বর্তমান সময়ে সাইবার অপরাধের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বয়স্কদের প্রযুক্তিগত বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত না থাকার সুযোগ নিয়ে অনেক সময় তাঁদের সঙ্গে আর্থিক প্রতারণা করা হচ্ছে। এগুলো বয়স্কদের আর্থিক ও শারীরিক ভাবে ভয়ঙ্কর ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
হেনস্থা বন্ধের জন্য কী পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট মহল?
বিশ্ব জুড়ে চলতে থাকা প্রবীণ নাগরিকদের হেনস্থার ঘটনায় নানান আইনি সাহায্য রয়েছে। ভারতেও একাধিক শক্তিশালী আইন রয়েছে। যে আইনের সাহায্যে বয়স্ক মানুষদের হেনস্থাকারীদের শাস্তি হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, হেনস্থা হলে কী কী করতে হবে, সেদিকে নজর দেওয়ার পাশপাশি সমান গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে হেনস্থার ঘটনা না ঘটে। তাঁরা জানাচ্ছেন, হেনস্থা কীভাবে আটকানো যায়, সে দিকে নজর দেওয়া জরুরি। আর্থিক প্রতারণা আটকাতে প্রবীণ নাগরিকদের নিয়ে আরো বেশি কর্মশালা জরুরি। প্রযুক্তিগত একাধিক বিষয়ে, তাঁরা অবগত থাকেন না। ফলে, নানানভাবে প্রতারিত হতে পারেন। তাই তাঁদের সতর্ক করতে নানান কর্মশালা জরুরি। সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রেও, তাঁরা কোনো রকম হেনস্থার শিকার হলে, কী কী আইনি সাহায্য নেবেন, সে সম্পর্কে অবগত থাকা জরুরি।
বয়স্কদের বন্ধু থাকা জরুরি
মানসিক হেনস্থা রুখতে নিজেদের কমিউনিটি গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, বয়স্কদের হেনস্থার অন্যতম কারণ একাকিত্ব। তাঁদের সঙ্গে কেউ নেই, এই ভাবনা থেকেই হেনস্থার ঘটনা ঘটছে। তাই বয়স্কদের বন্ধু থাকা জরুরি। যাতে তাঁদের মনের কথা প্রকাশের জায়গা থাকে। তাহলেই অবহেলা বোধ কমবে। দিনের কিছুটা সময় নিজেদের মতো, নিজের বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো জরুরি। এতে আত্মবিশ্বাস বজায় থাকে। একাকিত্বের বোঝাও কমবে। এর ফলে মানসিক অবসাদের ঝুঁকিও কমবে। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর উপরে বাড়তি বোঝা পড়বে না। একাধিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়ানো সহজ হবে। চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, আধুনিক চিকিৎসা দীর্ঘ জীবনের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু জীবন যাপনের মান বাড়াতে সামাজিক পরিবর্তন জরুরি। প্রৌঢ়কালেও নিজেদের মতো ভালো থাকা যায়, এই আত্মবিশ্বাস জরুরি। বয়স বাড়লেই, অন্যের বোঝা নয়, এই অনুভব করানো প্রয়োজন। তবেই তাঁরা মানসিকভাবে ভালো থাকবেন। মানসিক চাপ ও অবসাদ কমলেই উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্নায়ুর সমস্যা, স্মৃতিশক্তি হ্রাসের মতো একাধিক রোগের ঝুঁকি কমবে। ভোগান্তি কমবে। স্বাস্থ্য সঙ্কট কমবে।
