মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: প্রায় দু’দশক আগে সিঙ্গুর (Suvendu Adhikari on Singur) থেকে বিদায় নিয়েছিল গাড়ি কারখানা। টাটা মোটরসের ন্যানো প্রকল্প ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক, আন্দোলন এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর শিল্পের স্বপ্ন কার্যত অধরাই থেকে গিয়েছে এই এলাকার মানুষের কাছে। এবার কি সেই সিঙ্গুরেই ফিরতে চলেছে গাড়ি শিল্প? নতুন করে আশার কথা শোনালেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করতে গিয়ে শিল্পায়ন নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। শিল্পপতিদের আস্থা অর্জনের পাশাপাশি রাজ্যের জমি নীতি এবং সিঙ্গুরের শিল্প পরিকাঠামোকে নতুন করে কাজে লাগানোর বিষয়েও ইঙ্গিত দেন তিনি।
সিঙ্গুর প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি
সিঙ্গুর প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “সিঙ্গুর নিয়ে অবশ্যই আমরা কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করব। কিছু একটা করব। অশোক লে-ল্যান্ডের সঙ্গে আমার প্রাথমিক স্তরের কথা হয়েছে। তবে আগের সরকারের মতো দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে শুধু সমঝোতাপত্র (মউ) স্বাক্ষর করে দায় সারতে চাই না। তাই এখনই বিস্তারিত কিছু বলছি না।” শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাপস রায়ও সিঙ্গুরে টাটা মোটরসকে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। প্রয়োজনে নিজে টাটা কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি। তবে বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রীর অশোক লে-ল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনার কথা প্রকাশ্যে আসায় সিঙ্গুরে শিল্প ফেরানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এদিন শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় বলেন, “সিঙ্গুরের গাড়ি কারখানার জমিতে শিল্প গড়ে উঠুক, এটাই সেখানকার মানুষের প্রত্যাশা। মুখ্যমন্ত্রীর এই উদ্যোগে তাঁরা অবশ্যই খুশি হবেন। গাড়ি কারখানার জমিতে একই ধরনের শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যেই সরকার উদ্যোগী হয়েছে।”
শিল্পমহলের প্রতিক্রিয়া
মুখ্যমন্ত্রীর সিঙ্গুর-ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছে শিল্পমহল। বণিকসভার সদস্য আরএ বাঙ্গুরের মতে, পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ভাবমূর্তির সঙ্গে সিঙ্গুরের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেখানে নতুন করে শিল্প গড়ে উঠলে তা রাজ্যের অর্থনীতির পক্ষেও ইতিবাচক হবে। এমএসএমই-র প্রতিনিধি লক্ষ্মীকান্ত রাও বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুরের পরিস্থিতি এবং সেখানকার মানুষের চাহিদা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। সেই জায়গা থেকে সিঙ্গুরে নতুন করে কিছু করার উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। সেখানে শেষ পর্যন্ত গাড়ি কারখানা গড়ে উঠলে একাধিক অনুসারী শিল্পেরও সম্ভাবনা তৈরি হবে। উপকৃত হবেন এলাকার সাধারণ মানুষ।” বণিক সভার সদস্য আরএ বাঙ্গুর বলেন, “সিঙ্গুর রাজ্যের শিল্পের ভাবমূর্তির জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ নাম। সিঙ্গুরের মাটিতে শিল্প এলে আদতে রাজ্যেরই লাভ।”
সিঙ্গুরে শিল্প প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন
সিঙ্গুরে শিল্প প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নতুন নয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন, জমি অধিগ্রহণ, আদালতের লড়াই এবং জমি ফেরতের পরেও আজ পর্যন্ত সেখানে বড় কোনও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। একসময় শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ দেখেছে সিঙ্গুর। পরে সেই জমি ফেরত পাওয়ার আন্দোলনও প্রত্যক্ষ করেছে। কৃষিজমিতে আবার চাষের স্বপ্ন দেখা হলেও কৃষি ও শিল্প—কোনও ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি।
সিঙ্গুর ও টাটাদের অধরা ন্যানো প্রকল্প
সিঙ্গুরকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ২০০৬ সালের মে মাসে সপ্তমবারের জন্য ক্ষমতায় ফেরার পর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার ঘোষণা করে, টাটা মোটরস পশ্চিমবঙ্গে এক লক্ষ টাকার ছোট গাড়ি ন্যানো তৈরির কারখানা গড়বে। হুগলির সিঙ্গুরে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের পাশে প্রায় ৯৯৭ একর জমি চিহ্নিত করা হয়।
জমি অধিগ্রহণ ও অনিচ্ছুক কৃষকদের প্রতিবাদ: ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে ১৮৯৪ সালের জমি অধিগ্রহণ আইন অনুসারে জমি অধিগ্রহণ শুরু করে রাজ্য সরকার। অনেক কৃষক ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করলেও একাংশ জমি দিতে অস্বীকার করেন। তাঁদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে কৃষিজমি রক্ষা কমিটি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলন ও অনশন: ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে অনিচ্ছুক কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলনে নামেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতার ধর্মতলায় টানা ২৬ দিনের অনশন রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
কারখানা নির্মাণ ও রাজনৈতিক সংঘাত: কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে সিঙ্গুরে কারখানা নির্মাণের কাজ শুরু করে টাটা মোটরস। তৈরি হতে থাকে কারখানার শেড ও অন্যান্য পরিকাঠামো। কিন্তু জমির বাইরে আন্দোলন ও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ক্রমে সিঙ্গুরের আন্দোলন জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
রাজভবনে বৈঠক, কিন্তু মেলেনি সমাধান: অনিচ্ছুক কৃষকদের প্রায় ৪০০ একর জমি ফেরতের দাবিতে তৃণমূল কংগ্রেসের আন্দোলন তীব্র হয়। কারখানা ঘেরাও এবং দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধের ঘটনাও ঘটে। তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধির মধ্যস্থতায় রাজভবনে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হলেও জমি ফেরত নিয়ে কোনও ঐকমত্য তৈরি হয়নি।
সিঙ্গুর ছেড়ে গুজরাটে ন্যানো প্রকল্প: শেষ পর্যন্ত আন্দোলন, অচলাবস্থা এবং কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে ২০০৮ সালের ৩ অক্টোবর রতন টাটা সিঙ্গুর থেকে ন্যানো প্রকল্প সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে গুজরাতের সানন্দে স্থানান্তরিত হয় প্রকল্পটি।
রাজনৈতিক পালাবদল: ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস।
জমি ফেরানোর উদ্যোগ ও আইনি লড়াই: ক্ষমতায় এসেই সিঙ্গুরের জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় নতুন সরকার। বিধানসভায় পাশ হয় সিঙ্গুর ল্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাক্ট, ২০১১। তবে টাটা মোটরস এই আইনের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়। কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ আইনটি বহাল রাখলেও ২০১২ সালের জুন মাসে ডিভিশন বেঞ্চ তা অসাংবিধানিক ঘোষণা করে খারিজ করে দেয়। এরপর সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য সরকার।
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়: ২০১৬ সালের ৩১ অগস্ট সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ২০০৬ সালে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া বেআইনি ছিল। আদালত প্রায় ৯৯৭ একর জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ক্ষতিপূরণের টাকা যাঁরা নিয়েছিলেন, তাঁদেরও সেই অর্থ ফেরত দিতে হয়নি। ওই বছরের ২০ অক্টোবর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষকদের হাতে জমির পরচা ও দখল হস্তান্তর করেন।
জমি ফিরেছে, কিন্তু ফেরেনি শিল্প
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে জমি কৃষকদের হাতে ফিরলেও বাস্তবে পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি। দীর্ঘদিন কারখানার নির্মাণকাজ, কংক্রিটের ভিত্তি এবং ভারী যন্ত্রপাতির কারণে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রশাসনের তরফে জমিকে আবার চাষযোগ্য করে তোলার চেষ্টা হলেও সব জমিতে আগের মতো কৃষিকাজ সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে টাটা মোটরস চলে যাওয়ার পর সিঙ্গুরে বড় কোনও বিকল্প শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ফলে একদিকে কৃষির সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে শিল্পের অভাব—এই দুইয়ের মধ্যে আটকে পড়েছেন এলাকার বহু মানুষ। যে যুবসমাজ একসময় কারখানায় চাকরির স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁদের অনেকের কাছেই সেই প্রত্যাশা আজও অধরা। ফলে সিঙ্গুরে আবার শিল্প গড়ে তোলার দাবি ক্রমশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
স্বপ্ন দেখাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গে অশোক লে-ল্যান্ড-এর কথা
ভারতের বাণিজ্যিক গাড়ি নির্মাণ শিল্পে পরিচিত নাম অশোক লে-ল্যান্ড। হিন্দুজা গোষ্ঠীর এই সংস্থার যাত্রা শুরু ১৯৪৮ সালে, অশোক মোটরস নামে। ১৯৫৫ সালে সংস্থার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় অশোক লে-ল্যান্ড। বর্তমানে বাস ও বাণিজ্যিক যানবাহন নির্মাণের ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম বড় সংস্থা এটি। ফলে সিঙ্গুরে অশোক লে-ল্যান্ডের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর প্রাথমিক আলোচনা ঘিরে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে আলোচনা কতটা এগোবে, সেখানে আদৌ গাড়ি কারখানা হবে কি না, কিংবা কত কর্মসংস্থান তৈরি হবে—সব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। সিঙ্গুরের মানুষ অতীতে শিল্পের স্বপ্ন দেখেছেন, আন্দোলন করেছেন, জমি ফিরে পেয়েছেন। এবার তাঁদের প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতির গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তবেই ফিরুক শিল্প। অশোক লে-ল্যান্ড কি সেই স্বপ্নপূরণের নতুন অধ্যায় লিখবে? আপাতত সেই দিকেই তাকিয়ে সিঙ্গুর তথা গোটা বাংলা।
