Tag: Spain vs Argentina

  • FIFA World Cup 2026: তোরেসের শটে দ্বিতীয়বার স্প্যানিশ আর্মাডার বিশ্বজয়, চোখের জলে-শূন্য হাতে বিদায় মেসির

    FIFA World Cup 2026: তোরেসের শটে দ্বিতীয়বার স্প্যানিশ আর্মাডার বিশ্বজয়, চোখের জলে-শূন্য হাতে বিদায় মেসির

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: রামায়ণ-মহাভারত থেকে ইলিয়াড-ওডিসি যে কোনও মহাকাব্যের শেষটা যেন ট্র্যাজেডি দিয়েই বোনা থাকে। চোখের জলেই নায়ক থেকে মহানায়ক হয়ে ওঠেন ম্যাকবেথ বা জুলিয়াস সিজার। সেরকমই মেসি-মহাক্যাবের শেষটাও হল চোখের জলেই। হয়তো গত বারের সুখের স্মৃতি নিয়ে বিদায় নিতে পারতেন তিনি। কিন্তু নিজেকে আরও এক বার চ্যালেঞ্জ জানাবেন বলেই আমেরিকায় বিশ্বকাপ খেলতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু পারলেন না। বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায় সুখের হল না মেসির জন্য। যুব বিশ্বকাপে ভারতে খেলে যাওয়া ফেরান তোরেসের গোলে দ্বিতীয়বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন। ৮৩ হাজার দর্শক। ৭০ শতাংশই আর্জেন্টিনার। তাদের সামনে স্পেন বার বার আক্রমণ করেও আর্জেন্টিনাকে গোল দিতে পারেনি। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ ছিল গোল শূন্য। খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ১১৬ মিনিটের মাথায় নিকো উইলিয়ামসের হেড থেকে ফেরান তোরেসের শট। জয়সূচক গোল। ওই একটি গোলেই টানা দু’বার বিশ্বকাপ হাতে তোলা হল না লিয়োনেল মেসির। রবিবার বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে ০-১ হেরে গেল আর্জেন্টিনা।

    সবচেয়ে খারাপ ম্যাচ খেলল আর্জেন্টিনা!

    এ বারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে খারাপ ম্যাচ খেলল আর্জেন্টিনা। বস্তুত, তারা এতটাই খারাপ খেলেছে যে কী করে এই দল ফাইনালে উঠেছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। ১২০ মিনিটের ফুটবলে স্পেনের গোল লক্ষ্য করে একটিও শট নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। মেসিকে গোটা মাঠে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁকে বল পাস করতেই পারেননি সতীর্থেরা। শেষের দিকে তেড়েফুঁড়ে বেশ কয়েক বার আক্রমণ করেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু ১০ জনের দলের পক্ষে সম্ভব ছিল না ওই জায়গা থেকে ম্যাচে ফেরা। বরং একাধিক সুযোগ নষ্ট না করলে স্পেনের জয়ের ব্যবধান আরও বেশি হতে পারত। এদিন স্পেনের গতির কাছে বারবার পরাস্ত হয়েছে আর্জেন্টিনা।

    যোগ্য দল হিসেবে জয়ী স্পেন

    বিশ্বকাপ তিনটি নকআউট ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে জিতেছে আর্জেন্টিনা। তবে এদিন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা স্রেফ রক্ষণই করে গেল। স্পেনকে আরও বেশি খেলার সুযোগ করে দিল। আর্জেন্টিনা নিজেদের রক্ষণের ফাঁসে এতটাই ফেঁসে গেল যে স্পেনের কাজ আরও সহজ হয়ে গেল। ফাইনালের পরিসংখ্যান দেখলে আর্জেন্টিনার হতশ্রী দশা আরও স্পষ্ট হবে। স্পেনের ২০টি শটের বদলে আর্জেন্টিনা নিয়েছে মাত্র তিনটি শট। তিনটিই এসেছে শেষের তিন-চার মিনিটে। বল পজেশন স্পেনের ৬৮ শতাংশ, আর্জেন্টিনার ৩২ শতাংশয়। মোট পাস, নিখুঁত পাস, কর্নার— সব বিষয়েই আর্জেন্টিনার থেকে অনেক যোজন এগিয়ে ছিল স্পেন। তাই বিশ্বকাপ যে তারা যোগ্য দল হিসেবেই জিতেছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকার কথাই নয়।

    পুরস্কার শূন্য মেসির ঝুলি

    ২০১৪ সালে বিশ্বকাপের ফাইনালে হারলেও সোনার বল জিতেছিলেন লিয়োনেল মেসি। প্রতিযোগিতার সেরা ফুটবলার হয়েছিলেন। কিন্তু এ বার আমেরিকা থেকে খালি হাতেই ফিরতে হল তাঁকে। একটিও পুরস্কার পেলেন না মেসি।

    কিলিয়ান এমবাপে (সোনার বুট): চলতি বিশ্বকাপের ফাইনালের আগেই সোনার বুট প্রায় পাকা করে নিয়েছিলেন এমবাপে। এ বার ১০টি গোল করেছেন তিনি। পাশাপাশি করেছেন চারটি অ্যাসিস্ট। তাঁর সবচেয়ে কাছে থাকা মেসি আটটি গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট করেছেন।

    রদ্রি (সোনার বল): এ বার বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার হয়েছেন রদ্রি। ফাইনালে দলকে চ্যাম্পিয়ন করে সেই পুরস্কার নিয়েছেন স্পেনের অধিনায়ক। মিডফিল্ডারেরা সাধারণত এই পুরস্কার খুব বেশি পান না। কিন্তু এ বার রদ্রি গোটা প্রতিযোগিতায় স্পেনকে খেলিয়েছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সফল পাস দিয়েছেন। রদ্রি ছিলেন বলেই এক সুন্দর ফুটবল খেলেছে স্পেন। তাই রদ্রি যোগ্য হিসাবেই এই পুরস্কার জিতেছেন।

    উনাই সিমন (সোনার গ্লাভস): এই পুরস্কারও আগে থেকেই প্রায় পাকা ছিল। গোটা বিশ্বকাপে মাত্র একটি গোল খেয়েছেন স্পেনের গোলরক্ষক সিমন। তা ছাড়া তাঁকে এক বারও পরাস্ত করতে পারেননি কোনও ফুটবলার। গোটা প্রতিযোগিতায় একটি গোল খাওয়া গোলরক্ষকের হাতেই যে সোনার গ্লাভস উঠবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

    পাউ কুবারসি (সেরা উদীয়মান তারকা): মাত্র ১৯ বছরের এই ফুটবলার স্পেনের রক্ষণ সামলেছেন। তিনি ছিলেন বলে সিমনকেও কম কষ্ট করতে হয়েছে। পাশাপাশি আক্রমণেও বল বাড়িয়েছে কুবারসি। এত অল্প বয়সে যে পরিণত মানসিকতা তিনি দেখিয়েছেন, তার জন্য বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান তারকা হয়েছেন তিনি।

    পা-এ বলই পেলেন না মেসি

    কেরিয়ারে বিশ্বকাপে প্রচুর ভাল ম্যাচ খেলেছেন মেসি। এ বারের বিশ্বকাপে তার কিছু দেখা গিয়েছে। কিন্তু রবিবারের পারফরম্যান্স তার লক্ষ লক্ষ মাইলের মধ্যেও আসবে না। এই ম্যাচে তিনি কোনও প্রভাবই ফেলতে পারেননি। দলকে কোনও ভাবে সাহায্য করতে পারেননি। দলের বিপদের সময়ের একার হাতে উদ্ধার করতে পারেননি। বহু ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে উতরে দিয়েছেন। কিন্তু এই বয়সে তাঁকে অবিশ্বাস্য কিছু করতে হলে পায়ে বল তো পেতে হবে। সেটাই তো সতীর্থেরা দিতে পারলেন না। প্রথম ২০ মিনিটে মাত্র দু’বার বল পায়ে ঠেকিয়েছিলেন মেসি। গোটা প্রথমার্ধে তাঁর পায়ে বল এসেছে বার চারেক। ৩৯ বছর বয়সে স্বাভাবিক ভাবেই তিনি বেশি দৌড়তে পারবেন না। কিন্তু তাঁর পায়ে বল পৌঁছে দেওয়ার প্রাথমিক কাজটুকুও করতে পারেননি এনজো ফের্নান্দেজ, দি পলেরা।

    অস্তমিত নীল-সাদা

    আকাশের রং নীল-সাদা। লামিনে ইয়ামাল সেদিকেই চেয়ে। ১৮ বছরের তরুণকে ঘিরে কুকুরেয়া, পোরো, রড্রি, পেড্রি এবং বাকিরা। বিড়বিড় করছেন স্প্যানিশ ফুটবলের রাজপুত্ররা। হয়তো ফুটবল দেবতাকে লা রোহার কৃতজ্ঞতা। ততক্ষণে ভালোবাসার অত্যাচারে তিনি বন্দি। স্পেনের লাল-হলুদ পতাকা ঢেকে দিচ্ছে ইয়ামালকে। মহাজাগতিক ফ্রেমে লেপ্টে স্পর্ধা, আবেগ, আদর। পরাস্ত আর্জেন্টিনা। বিশ্বজয়ী স্পেন। ২০১০ সালে স্প্যানিশ ফুটবলের ধ্বজা উড়িয়েছিলেন জাভি, ইনিয়েস্তারা। ফের ২০২৬। স্প্যানিশ আর্মাডার বিশ্বজয়। লা রোহার দ্বিতীয়বার কাপ জয়ে নায়ক কে? ফুয়েন্তে ব্রিগেডে সবাই সেরা। তিকি-তাকার মায়াজালে অস্তমিত নীল-সাদা। কাঁদছেন আরেকজনও। লিও মেসি। বিদায়বেলায় চোখের কোন চিকচিকে। তাঁকে ঘিরেই ডে পল, মার্তিনেজ, রোমেরো, নিকো গঞ্জালেজরা।

    কাঁদল সারা বিশ্বের মেসি-প্রেমীরা

    চার বছর আগে কাতারে বিশ্বকাপ জিতে কেঁদেছিলেন। স্বপ্ন পূরণের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। প্রথম বার বিশ্বজয়ের আনন্দে চোখের জল বেরিয়েছিল। কিন্তু এ বার অনেক পরিণত তিনি। ট্রফির স্বাদ পেয়ে গিয়েছেন। সেই জন্যই হয়তো শুরুতে নির্লিপ্ত দেখাচ্ছিল মেসিকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর পর কিছু ক্ষণ মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কোমরে হাত দিয়ে চার দিকে তাকাচ্ছিলেন। তার পর হাত, পা ছড়িয়ে মাঠেই বসে পড়লেন লিয়ো। এগিয়ে এলেন লামিন ইয়ামাল। ফাইনালের আগে যে দু’জনের লড়াইয়ের কথা হচ্ছিল। এই ম্যাচে মেসিকে ছাপিয়ে গিয়েছেন ইয়ামাল। কিন্তু শেষ বেলায় মেসিকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিলেন তিনি। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন মেসি। সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে ঘুরলেন। সমর্থকদের ধন্যবাদ জানালেন। তার পর পুরস্কার মঞ্চের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। মেসিকে দেখে মনে হচ্ছিল, যত তাড়াতাড়ি সাজঘরে ফিরতে পারবেন তত ভাল। মাঠে থাকতেও আর ইচ্ছা করছিল না তাঁর। কিন্তু তখনই মেসির নামে জয়ধ্বনি উঠল মাঠে। সমর্থকেরা তাঁদের প্রিয় তারকাকে ধন্যবাদ জানালেন। সেই জয়ধ্বনি শুনে আর আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না মেসি। কেঁদে ফেললেন। কাঁদল সারা বিশ্বের মেসি-প্রেমীরা। চোখের জলেই নায়ক থেকে মহানায়ক হয়ে ওঠেন ম্যাকবেথ, জুলিয়াস সিজার। মেসি-তো মহানায়কই, তাই বিদায়টাও চোখের জলেই।

LinkedIn
Share