মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কৌশিকী অমাবস্যায় (Koushiki Amabasya) কালীঘাট মন্দিরে (Kalighat) পুজো দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। পুজো শেষ হওয়ার পর মন্দিরের মাটিতে বসেই ভোগের প্রসাদ গ্রহণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর পাতে ছিল বাসন্তী পোলাও, মাছের মাথা ও পায়েস। বাঙালির ধর্মীয় সংস্কৃতিতে দেবীকে আমিষ ভোগ নিবেদনের যে দীর্ঘদিনের রীতি রয়েছে, এদিনের পুজোয় তারই প্রতিফলন দেখা যায়। মায়ের পুজোয় আমিষ গ্রহণ নিয়ে অকপট শুভেন্দু (Suvendu in Kalighat) বলেন, “সনাতন ও বাঙালি ঐতিহ্যকে কালিমালিপ্ত বা দুর্বল করার চেষ্টা কোনও দিন সফল হবে না। দুর্গাপুজোর অষ্টমী কিংবা কার্তিক মাসে আমি যেমন সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক আহার মেনে চলি, তেমনই এক জন বাঙালি হিসেবে মায়ের ভোগের মাছ কিংবা পাঁঠাবলির প্রসাদ গ্রহণ করতেও আমার কোনও দ্বিধা নেই।”
মাতৃকৃপায় তিনি জনকল্যাণে ব্রতী
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুজোর ডালা নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ডালায় ছিল বেনারসি শাড়ি, ফুলের মালা ও মিষ্টি। দেবী কালীর চরণে সেগুলি নিবেদন করে আরতি ও অঞ্জলি দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর নামেই পুজোর সংকল্প করা হয়। ভবানীপুর কেন্দ্রে প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণার পর মায়ের আশীর্বাদ নেওয়ার স্মৃতি স্মরণ করে এদিন তিনি জানান, মাতৃকৃপা ও প্রাপ্ত ‘গুরুদায়িত্ব’ নিয়েই তিনি জনকল্যাণে ব্রতী হয়েছেন। পুজো নিবেদনের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অখণ্ড ভারত গঠন, বাঙালি তথা সনাতন সংস্কৃতির সুরক্ষা এবং দেশবিরোধী শক্তির বিনাশই তাঁর মূল লক্ষ্য। শুভেন্দু বলেন, “যেদিন ভবানীপুরে আমার নাম ঘোষণা হয়েছিল, প্রথম মায়ের কাছে এসেছিলাম। মা পদধূলি দিয়ে বলেছিলেন, তোকে দায়িত্ব দিলাম।”
বাঙালি ঐতিহ্য মেনেই মায়ের ভোগ
বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির প্রচলিত রীতি মেনেই এদিন কালীঘাটে দেবীর জন্য সাজানো হয় নানা পদে সমৃদ্ধ ভোগের আয়োজন। সেখানে ছিল বাসন্তী পোলাও, পাঁচ রকম ভাজা, শুক্তো, ডাল, সবজি, পনির এবং একাধিক ধরনের মাছ। ইলিশ, চিংড়ি, ভেটকি, পার্শে ও কাতলা-সহ মাছের বিভিন্ন পদ ছিল ভোগের তালিকায়। ছিল কাতলা মাছের মাথাও। পাশাপাশি বলির পাঁঠার মাংস, পায়েস ও চাটনি পরিবেশন করা হয়। মায়ের ভোগ গ্রহণের প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী জানান, মন্দিরের পুরোহিতদের দেওয়া মাছ ভাজা, মাছের মাথা, বাসন্তী পোলাও-সহ বিভিন্ন পদ তিনি প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নিজের খাদ্যাভ্যাসের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, অষ্টমীর দিন এবং কার্তিক মাসে তিনি সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করেন। আবার বাঙালি হিসেবে দেবীকে যে মাছ দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়, সেই প্রসাদও তিনি গ্রহণ করেন। একইভাবে পাঁঠা বলির প্রসাদ গ্রহণের কথাও জানান তিনি।
দুর্গাপুজোয় আমিষ বিতর্ক, মন্দির থেকেই বার্তা
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাকে ঘিরে আলাদা তাৎপর্য দেখছে রাজনৈতিক মহল। দুর্গাপুজোয় আমিষ খাবার গ্রহণ নিয়ে বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের পর দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। যদিও বিজেপির একাধিক নেতা স্পষ্ট করেছেন, দুর্গাপুজোয় আমিষ খাওয়ার বিষয়ে দলের কোনও আপত্তি নেই। এই আবহে কালীঘাটে মুখ্যমন্ত্রীর আমিষ ভোগ গ্রহণকে নিছক ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন অনেকে। বিশেষ করে বাঙালির নিজস্ব ধর্মীয় আচার, খাদ্যসংস্কৃতি এবং সনাতন ঐতিহ্যের প্রসঙ্গটি এদিনের অনুষ্ঠানে নতুন করে সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কোনও সন্ত বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তাঁর নিজস্ব মতামত প্রকাশ করতেই পারেন। কে সেই মত গ্রহণ করবেন, তা ব্যক্তিগত বিষয়। আমিও কার্তিক মাস দামোদর মাসে সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করি, আবার বাঙালি হিসেবে..পাঁঠা বলির প্রসাদও গ্রহণ করি।”
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বার্তা
বৃহস্পতিবার বিধানসভা অধিবেশনে বিবৃতি দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আগেই বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাগেশ্বর বাবার পরামর্শ কারও উপরে চাপিয়ে দেওয়া যেমন হবে না, তেমনই তাঁকে সামনে রেখে ঘোলা জলে বিরোধীরা মাছও ধরতে পারবে না। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘লিলুয়ায় একজন সাধু এসেছিলেন। তিনি দেশপ্রেমের কথা, রাষ্ট্রবাদের কথা, অখণ্ড ভারতের কথা বলেছেন। ভারতের ঐতিহ্য, সংস্কৃতির কথা তাঁর মতো করে তিনি বলেছেন। যাঁরা সে সব গ্রহণ করতে চান, করবেন। যাঁরা চান না, করবেন না। তিনি কারও উপরে কিছু চাপিয়ে দিতে চাননি।’ এরপরে নাম না–করে মুখ্যমন্ত্রী নিশানা করেন কংগ্রেসকে। ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেন, বাগেশ্বর বাবার পরামর্শ না–মানার অধিকার অবশ্যই আছে, কিন্তু তাঁর ছবি পোড়ানো সমর্থনযোগ্য নয়। মুখ্যমন্ত্রীর হুঙ্কার, ‘আমি কতগুলি লোককে দেখলাম, ভবানীপুর থানার সামনে ছবি পোড়াচ্ছে। আমি এখান থেকে সিপিকে (কলকাতার সিপি অজয় নন্দ) বলছি, ওই লোকগুলিকে গ্রেফতার করতে হবে। এ রাজ্যে এ সব চলবে না।’ তাঁর এই নির্দেশ থেকে স্পষ্ট, সাধু–সন্তদের অপমান বিজেপি–শাসিত বাংলায় কোনও ভাবেই বরদাস্ত করবে না সরকার।
গেরুয়া ধ্বজা সব সময় উপরে থাকবে
বাগেশ্বর বাবা আর বিজেপিকে এক বন্ধনীতে ফেলে পদ্ম–নেতাদের গায়ে বাঙালি বিরোধী তকমা সাঁটতে শুরু করে দিয়েছিলেন বিভিন্ন শিবিরের বিরোধীরা। যদিও বাগেশ্বর বাবার আমিষ–নিরামিষ সংক্রান্ত পরামর্শের সঙ্গে যে বিজেপি কোনও ভাবেই সম্পৃক্ত নয়, সেটা ঘটনার দু’দিনের মাথায় সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি নবমীর দিন পাঁঠার মাংস খাওয়ার পক্ষে সওয়াল করেন। একই ভাবে নিজেদের আমিষপ্রীতির জানান দেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, সুকান্ত মজুমদারের মতো শীর্ষ বিজেপি নেতা–নেত্রীরা, এমনকী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অন্যতম অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সঞ্জীব সান্যাল। এবার বিরোধীদের স্পষ্ট জবাব দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। ধর্মীয় আচার ও বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির প্রসঙ্গ তুলে শেষ পর্যন্ত সনাতন সংস্কৃতির জাগরণের কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, সনাতন ও বাঙালি ঐতিহ্যকে কালিমালিপ্ত বা দুর্বল করার চেষ্টা কোনও দিন সফল হবে না। তাঁর কড়া হুঁশিয়ারি, “গেরুয়া ধ্বজা সব সময় উপরে থাকবে, কখনও নীচে নামবে না।” ‘বহুজন সুখায় বহুজন হিতায়’ নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শুভেন্দু জানান, রাজ্য থেকে দেশবিরোধী শক্তিকে নির্মূল করার জন্য মায়ের কাছে শক্তি ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছেন।
