মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আগামী প্রজন্মের মনে দেশপ্রেম ও রাজ্যের প্রকৃত ইতিহাস গেঁথে দিতে এবার রাজ্য সরকার সিলেবাসে (School Syllabus) রদবদল আনছে। শিক্ষক দিবসের (Teachers’ Day) মঞ্চ থেকে পাঠ্যক্রমের আমূল পরিবর্তন ও শিক্ষায় একগুচ্ছ সংস্কারের রূপরেখা পেশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। বর্তমান পাঠ্যসূচির সমালোচনা করে তিনি জানান, অতীতে রাজ্যের সঠিক ইতিহাস ঢেকে রাখা হয়েছিল। শনিবার নিউ টাউনে (Teachers’ Day) অনুষ্ঠানমঞ্চ থেকে রাজ্যের ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে বড় ঘোষণাও করেন তিনি। কেন্দ্রের ‘সেন্ট্রাল স্কুল’ ও ‘জহর নবোদয় বিদ্যালয়’-এর ধাঁচে রাজ্যের প্রতিটি জেলায় অন্তত দুটি করে অত্যাধুনিক মডেল স্কুল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। এই বিশেষ বিদ্যালয়গুলির নাম দেওয়া হয়েছে ‘সিএম শ্রী ইনস্টিটিউট’ (CM Shri Institute)।
এ রাজ্য কীভাবে সৃষ্টি হল, জানবে নতুন প্রজন্ম
মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, প্রচলিত পাঠ্যবইয়ে ‘টাটাদের রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেওয়াকে মহৎ কর্ম’ বলে দাবি করে এক পৃষ্ঠা জুড়ে রাখা হলেও, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন কীভাবে পশ্চিমবঙ্গের জন্ম হয়েছিল—তার কোনও উল্লেখই নেই। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (Shyamaprasad Mukherjee) ও স্বামী প্রণবানন্দের অবদানকে আড়াল করার সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আপনি আজ পশ্চিমবঙ্গে বসে বাক্স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, পোশাক ও খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা ভোগ করছেন। অথচ এ রাজ্য কীভাবে সৃষ্টি হল, তা নতুন প্রজন্ম জানাবে না? একদল যখন ভারত ভাগ করেছিল, তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কীভাবে পাকিস্তান ভাগ করে পশ্চিমবঙ্গকে রক্ষা করেছিলেন—তা ছাত্র-ছাত্রীদের জানতে দেওয়া হবে না?”
মাতঙ্গিনী হাজরার কাহিনী পাঠ্যবইয়ে
একই সঙ্গে ১৯৪২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হাতে শাঁখা ও জাতীয় পতাকা নিয়ে গুলি খেতে খেতে মাতঙ্গিনী হাজরার ‘বন্দে মাতরম্’ (Vande Mataram) ধ্বনি দেওয়ার মতো আত্মত্যাগের ইতিহাসও পাঠ্যক্রমে সবিস্তারে ফিরিয়ে আনার কথা বলেন তিনি। জাতীয়তাবোধ ও মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করতে রাজ্য সরকার যে কোনও কার্পণ্য করবে না, সেই কথাও মনে করিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের অন্তরাত্মায় গাথা ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতটি প্রতিটি স্কুলের প্রার্থনাসভায় গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সরকার যে কোনও আপস বা রফা করবে না, তা-ও জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
‘সংস্কৃত দিবস’ উদযাপন
শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের ধারাবাহিকতার কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু বলেন, বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারের পাশাপাশি প্রাচীন সংস্কৃত ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন, যার জন্য ‘সংস্কৃত দিবস’ উদযাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের ধারা অক্ষুণ্ন রেখে রাজ্যজুড়ে এই সমস্ত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ সফল করতে শিক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছে পূর্ণ সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
‘সিএম শ্রী’ প্রতিষ্ঠান চালু
মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই ‘সিএম শ্রী’ প্রতিষ্ঠানগুলিতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে পড়ুয়াদের ভর্তি করা হবে। স্কুলগুলিতে থাকবে সেরা মানের শিক্ষক, আধুনিক ডিজিটাল ল্যাব ও স্মার্ট বোর্ড। পাশাপাশি, রাজ্যজুড়ে প্রথম দফায় ১ হাজার ১৯৭টি সাধারণ বিদ্যালয়ে আধুনিক পঠনপাঠনের সুবিধার্থে স্মার্ট বোর্ড বসানোর কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। ক্রীড়া পরিকাঠামোর প্রসারে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলে দুটি বড় ক্রীড়া কেন্দ্র (Sports Institutes) তৈরির কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। এখানেও এসএসসি-র মাধ্যমে নিয়োগ করা হবে। শুভেন্দুর কথায়, ‘প্রচুর ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর নিয়োগ করা হবে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ছাত্রছাত্রীরা যাতে আগামী দিনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সফল হতে পারে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।’ প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের প্রাচীনতম খেলাধুলো, খোখো, হাডুডু, ফুটবল ইত্যাদি খেলাধুলো প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ে ফিরে আসুক। এছাড়া মেধাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার জন্য ‘স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট স্কলারশিপ’ চালু রাখার বিষয়টিতেও সিলমোহর দেন তিনি।
বিগত তৃণমূল সরকারকে নিশানা
পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে শিক্ষা পরিকাঠামোর চরম বেহাল দশাকে নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমাদের সরকার ক্ষমতায় এসেই জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) গ্রহণ করেছে, যা অত্যন্ত দরকারি ছিল। শিক্ষা দফতরের বৈঠকে জানতে পারি, রাজ্যে এখনও প্রায় ১৯ হাজার এমন স্কুল রয়েছে যেখানে ন্যুনতম পরিকাঠামোটুকু নেই; এমনকি পরিশ্রুত পানীয় জল বা ছাত্রীদের জন্য পরিচ্ছন্ন বাথরুম পর্যন্ত নেই।” এই পরিস্থিতি বদলাতে প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে শুভেন্দু অধিকারী জানান, রাজ্যের প্রতিটি বিদ্যালয়ে দ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং ছাত্রীদের জন্য পৃথক শৌচাগার নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। কেবল পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনা নয়, শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের জন্য বিদ্যালয়গুলিতে তবলা সহ সাংস্কৃতিক ও এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসের সরঞ্জাম সরবরাহ করে স্কুলগুলিকে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
মোবাইল ফোনের ভয়ঙ্কর কু-প্রভাব
মুখ্যমন্ত্রী ছাত্রছাত্রীদের উপর মোবাইল ফোনের ভয়ঙ্কর কু-প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে, তিনি গুজরাটের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। শুভেন্দু বলেন, “মোবাইল ফোনের ভয়ঙ্কর কু-প্রভাব রয়েছে ছাত্রছাত্রীদের উপর। গুজরাটে ইতিমধ্যেই নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এ সব সিদ্ধান্ত নিলে আমার ভোট কমে যেতে পারে।” মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘গুজরাটে দেখুন, প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের মোবাইল ফোনে হাত দিতে দেওয়া হয় না। ভয়ঙ্কর ক্ষতি করছে মোবাইল ফোন। রাত দেড়টা-দু’টোর আগে বাচ্চারা ঘুমোতে যায় না, সারাক্ষণ মোবাইল ঘাঁটছে। বাবা-মা শুয়ে পড়েছে, আড়াল হতেই মোবাইল ঘাঁটা আরম্ভ করে দিচ্ছে।’ তাঁর কথায়, ‘এই সমস্ত সংস্কার যদি না করেন, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষক দিবসের কোনও মানেই থাকবে না।’ শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত মানোন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আরও যোগ করেন, বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে ৩১ নম্বর স্থানে অবস্থান করছে, তবে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী তিন বছরের মধ্যে রাজ্যকে সেরা দশের তালিকায় নিয়ে আসার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
