মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অনড় শুভেন্দু-সরকার। বিধানসভায় জবাবি ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) ঘোষণা করলেন, শুধু গ্রেফতার নয়, অভিযুক্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলামের জন্যও নতুন আইন আনার প্রস্তুতি চলছে। রাজ্যপালের ভাষণের পরিপ্রেক্ষিতে ধন্যবাদ জ্ঞাপক প্রস্তাবে বক্তৃতা করতে গিয়ে মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই অধিবেশনের শেষ দিনেই দুর্নীতি রোধে আরও কড়া আইন আনা হচ্ছে। সেই আইন কার্যকর হলে দোষীদের শুধু জেল হবে না, দুর্নীতিকারীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিলাম করা হবে।
তৃণমূল আর ফিরবে না
নাম না-করে এই প্রসঙ্গ টেনে তিনি কটাক্ষ করেছেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। পূর্বতন তৃণমূল সরকার তাঁর সঙ্গে কী কী করেছিল, তা-ও মনে করিয়ে দিয়েছেন শুভেন্দু। কটাক্ষ করতে ছাড়েননি রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কেও। সেই সঙ্গে নিজের ভাষণে বার বার তিনি বলতে ছাড়েননি যে, ‘‘তৃণমূল আর ফিরবে না।’’ আমতলায় তৃণমূলের প্রাসাদোপম পার্টি অফিস। কিংবা কালীঘাটে হরিশ মুখোপাধ্যায় রোডে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। বিভিন্ন সময় আলোচনার কেন্দ্রে উঠেছে। এবার নাম না করে বিধানসভায় ওই ‘প্রাসাদগুলি’ নিয়ে হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার বিধানসভায় তিনি বলে দিলেন, “ওই প্রাসাদগুলোতে কলকাতার রাস্তায় যাঁরা রাতের বেলা ফ্লাইওভারে নিচে থাকেন, তাঁদের রাখাব।”
১১০০ কোটি ক্যামাক স্ট্রিট হয়ে যেত দুবাই!
এদিন বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেন, “৪ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট। কেউ কেউ জ্ঞান দিচ্ছিলেন, টাকা আসবে কোথা থেকে। টাকা কোথা থেকে আসবে জানেন? বীরভূমে পাথরে কী করেছেন জানেন? এক বছরে বীরভূমের পাথর থেকে রাজস্ব দিয়েছেন ৬০ কোটি টাকা। আর আমরা একমাসে রাজস্ব দিয়েছি ৮৩ কোটি। এটা ১০০ কোটি হবে। এক বছরে ১২০০ কোটি টাকা। আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তহবিলে ১০০ কোটি, বাকি ১১০০ কোটি ক্যামাক স্ট্রিট হয়ে যেত দুবাই।”
অধিবেশনের শেষ দিন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বিল
মঙ্গলবার বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, রাজ্যে তোলাবাজি, মাফিয়ারাজ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তিনি জানান, সংগঠিত অপরাধ এবং আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হবে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি অধিবেশনেই এমন একটি বিল আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনি কাঠামো (Property Seizure Bill) তৈরি করা হবে। পাশাপাশি সেই সম্পত্তি নিলামের ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে। হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “সবার হিসেব হবে। আমার দফতর স্বরাষ্ট্র দফতর এই অধিবেশনেই বিল আনছে। বিধানসভায় বিএ (বিজনেস অ্যাডভাইসরি) কমিটি অনুমোদন দিলেই অধিবেশনের শেষ দিন বিল আসবে। অনেকেই ভাবছেন, ২ মাস থাকলাম (জেলে)। তারপর আইনি লড়াই করে বেরিয়ে এলাম। বিল আসছে। সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করব। সম্পত্তির নিলাম করব।”
কোনও চোরকে ছাড়া হবে না
এদিন বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, “মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে বলব, আপনি যা যা পদক্ষেপ করছেন, পূর্ণ সমর্থন করছি। কিন্তু, যাঁরা যাঁরা হঠাৎ তৃণমূলের সঙ্গে ঝগড়া করে বাঁচার চেষ্টা করছেন, তাঁদের একটাকে বাঁচতে দেবেন না।” তার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কোনও চোরকে ছাড়া হবে না। একটাও গুণ্ডা মাফিয়া জেলের বাইরে থাকবে না। স্বরাষ্ট্র দফতর আমার। আপনারা যদি ওদের বিরুদ্ধে কোনও চুরি, দুর্নীতি, ত্রিপল লুকিয়ে রাখা, অবৈধ সম্পত্তির কোনও তথ্য থাকে, লিখিতভাবে দেবেন, আমরা ব্যবস্থা নেব। কথা দিলাম।”
আগাগোড়া আক্রমণাত্মক মুখ্যমন্ত্রী
ভাষণ দিতে গিয়ে মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আগাগোড়া আক্রমণাত্মক। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গির খান, শওকত মোল্লাদের কোনও ভাবে ছাড় দেওয়া হবে না। তাঁর বক্তৃতায় উঠে আসে বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সব্যসাচী দত্তের প্রসঙ্গও। সব্যসাচীর সোনা-কেনা প্রসঙ্গ নিয়ে বলেন, ‘‘সমস্ত সোনা কেনা হয়েছে ২০২১ সালের পরে।’’ প্রসঙ্গত, মঙ্গলবারই আদালতে পুলিশ জানিয়েছে, সব্যসাচীর মামলায় এখনও পর্যন্ত মোট ছ’কেজি সোনা বাজেয়াপ্ত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দেড় কেজি রুপো বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ও আদালতে জানিয়েছে পুলিশ।
নাম না করে মমতাকে নিশানা
নথি দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, আগের সরকারের আমলে বাণিজ্য সম্মেলনে ফিকিকে ৩২৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল নিয়ম বহির্ভূত ভাবে। তাঁর কথায়, ‘‘বিজিবিএস দেখবেন? সরকার ৩২৪.৭৩ কোটি টাকা ফিকি (ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডিস্ট্রি)-কে দিয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সই দেখবেন নাকি? ৩২৪ কোটি টাকা। এ তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র!’’ শুভেন্দুর প্রশ্ন, ‘‘আপনি কি এটা করতে পারেন?’’ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘একটা কমিশন হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু এবং মেম্বার সেক্রেটারি, যাঁর নাম শুনলে অনেকেই আপনারা ভয় পান, এডিজি র্যাঙ্কের আইপিএস কে জয়রামনকে নিয়ে। যত চুরি করেছেন, মনরেগার চুরি, আবাসের চুরি, জল জীবন মিশনের চুরি, লক্ষ্মীর ভান্ডারের চুরি— যত চুরি করেছেন, এই কমিশনে অভিযোগ পড়বে এবং তাঁদের শ্রীঘরে যেতে হবে।’’
ইউপিএসসি-র মতো নিয়োগ
তার পরেই শুভেন্দু স্পষ্ট করেছেন, এ বার থেকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনও ভাবেই পক্ষপাতদুষ্টতা থাকবে না, স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ করা হবে। কোনও রাজনীতিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না। ইউপিএসসি-র মতো নিয়োগ হবে। বাজেটেও সে কথা জানিয়েছে সরকার। এদিন শুভেন্দু অধিকারী আরও বলেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে। তাঁর বক্তব্য, জনস্বার্থ রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।









