মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ‘ক্ষণে গোরাচাঁদ ক্ষণে কালা’ থেকে ‘গেহরা হুয়া’! কখনও ‘বোঝে না সে বোঝে না’ আবার কখনও ‘কেশারিয়া’-বলিউড থেকে টলিউড! হিন্দি, বাংলা, তামিল, তেলুগু সাম্প্রতিক বহু ছবির গানেই তিনি রয়েছেন। বয়স মাত্র ৩৮, এখনও ৪০ পেরোয়নি! সামনে বিস্তীর্ণ সোনালি অধ্যায়! এ হেন সময়ে হঠাতই ঘোষণা প্লেব্যাক করবেন না অরিজিৎ (Arijit Singh)। মঙ্গলবার রাতে সমাজমাধ্যমে নিজেই এই ঘোষণা করে দিলেন অরিজিৎ সিং। তাঁর এই সিদ্ধান্তকে সঙ্গীতমহল যেমন স্বাগত জানিয়েছে, তেমনই হতবাক তাঁর অগণিত ভক্তরা। নিজের বার্তায় অরিজিৎ লেখেন, “নতুন বছরের শুভেচ্ছা সকলকে। শ্রোতা হিসেবে এত বছর ধরে আমায় যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি, এ বার থেকে আমি আর প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে কোনও কাজ করব না।” এই মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়।
কেন এই অবসর?
অনুরাগীদের এই একটাই প্রশ্ন, কেন গায়ক হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নিলেন। তারই উত্তরে কমেন্টে অরিজিৎ লেখেন, “এর একটা কারণ আছে। নতুন কোনও গায়ক উঠে এসে আমাকে সত্যিকারের অনুপ্রেরণা দেবে, এই অপেক্ষায় আমি রইলাম।” অরিজিতের (Arijit Singh) গান ভালবাসেন না, এমন শ্রোতা খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। তাঁর কণ্ঠের আবেশ মুহূর্তের মধ্যেই শ্রোতাকে টেনে নিয়ে যায় এক অন্য অনুভবের জগতে। ঠিক সেই গায়কই মঙ্গলবার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে জানান, তিনি আর প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে কাজ করবেন না। ‘মার্ডার ২’ ছবিতে গাওয়া তাঁর ‘ফির মহব্বত’ গানটিই ছিল বলিউডে প্রথম গান। ‘আশিকি ২’ ছবির ‘তুম হি হো’ গানটি অরিজিৎ সিংয়ের জীবনের মোড় বদলে দিয়েছিল। তারপর থেকে গায়ককে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। হিন্দি, বাংলা, তামিল, তেলুগু, মারাঠি এবং কন্নড় ভাষায় গান গেয়েছেন। ৩০০ টিরও বেশি ছবিতে কণ্ঠ দিয়েছেন। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার সহ অসংখ্য সম্মান। স্পটিফাই, ইউটিউব এবং অন্যান্য সঙ্গীত প্ল্যাটফর্মে বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক শ্রোতা ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে একজন তিনি।
কাজ করবেন, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জন্য
১৯৮৭ সালের ২৫ এপ্রিল মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন অরিজিৎ সিং (Arijit Singh)। মাত্র ১৮ বছর বয়সে, ২০০৫ সালে, তিনি অংশ নেন জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘ফেম গুরুকুল’-এ। গুরু রাজেন্দ্র প্রসাদ হাজারির অনুপ্রেরণায় সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। প্রতিযোগিতায় জয়ী না হলেও, এই মঞ্চই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এখান থেকেই সংগীতজগতের দরজা ধীরে ধীরে খুলে যেতে শুরু করে। ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করতে হয়েছিল তাঁকে। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যান যে প্রায় সব সিনেমার গানে তাঁর কণ্ঠ শোনা যেত। কিন্তু আর না, এবার থেকে প্লে-ব্যাক নয়। তবে গান চালিয়ে যাবেন। কাজ করবেন। ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জন্য। অরিজিৎ বলেন,“ঈশ্বর আমার প্রতি সত্যিই সদয়। আমি সঙ্গীতের একজন ভক্ত। ভবিষ্যতে আরও শিখব এবং একজন ছোট শিল্পী হিসেবে নিজে আরও কাজ করব। আপনাদের সকলের সমর্থনের জন্য আবারও ধন্যবাদ। কিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়া আছে সেগুলো শেষ করতে হবে। সেগুলি শেষ করব। স্পষ্ট করে বলতে চাই, যে আমি সঙ্গীত তৈরি করা বন্ধ করব না।”
একই ধাঁচের কাজ করতে করতে তিনি ক্লান্ত
‘তুম হি হো… বস তুম হি হো…’, এই গান শুনে থমকে গিয়েছিল গোটা দেশ। কত প্রেমিকের রাত জাগার ওষুধ এই গান। কত অপূর্ণ প্রেম মানে খুঁজে পেয়েছে তাঁর গানে। কিন্তু সবকিছুতে তিনি দাঁড়ি টানলেন। স্বেচ্ছায় প্লে-ব্যাক সঙ্গীতের দুনিয়া থেকে সরে দাঁড়ালেন। যা করতে সাহস লাগে। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে অকপট স্বীকারোক্তি দিলেন গায়ক। তাঁর প্লে-ব্যাক ছাড়ার কারণ কোনো বিতর্ক নয়, বরং তাঁর নিজের ‘একঘেয়েমি’। অরিজিৎ নিজের ব্যক্তিগত এক্স হ্য়ান্ডেল-এ জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত তিনি হুট করে নেননি। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি প্লে-ব্যাক থেকে বিরতি নেওয়ার কথা ভাবছিলেন। তাঁর এই চরম সিদ্ধান্তের নেপথ্যে থাকা প্রধান কারণ তিনি হাঁফিয়ে উঠেছেন। অরিজিৎ বলেন, তিনি খুব দ্রুত একঘেয়েমিতে ভোগেন। একই ধরনের গান বা একই ধাঁচের কাজ করতে করতে তিনি ক্লান্ত। তিনি জানিয়েছেন, একঘেয়েমি কাটানোর জন্যই তিনি মঞ্চে পারফর্ম করার সময় নিজের পুরোনো গানের অ্যারেঞ্জমেন্ট বা সুর বদলে দেন। তাঁর কথায়, ‘আমি বোর হয়ে গিয়েছি। বেঁচে থাকার জন্য আমাকে অন্য ধরনের সঙ্গীত নিয়ে কাজ করতে হবে’।
মুর্শিদাবাদ থেকে মুম্বই কঠিন যাত্রা
জিয়াগঞ্জের সেই সাধারণ ছেলেটি যেমন করে নিজের স্বপ্ন ছুতে পেরেছে। তেমন করেই আজও তিনি শিখতে চান, নিজের মতো করে আরও কিছু করতে চান। সংগীতকে নিজের মতো করে ভালবাসতে চান। মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে আজও অরিজিৎ সিংকে (Arijit Singh) দেখা যায় স্কুটি চেপে সাধারণ মানুষের মতোই ঘুরে বেড়াতে। তারকা খ্যাতি, বিশ্বমঞ্চের সাফল্য কিছুই তাঁকে শিকড় থেকে আলাদা করতে পারেনি। তবে এই জিয়াগঞ্জ থেকে মুম্বই পর্যন্ত যাত্রাটা তাঁর মোটেই সহজ ছিল না। ছিল কঠোর পরিশ্রম আর নিরন্তর সংগ্রাম। মুম্বইয়ে দীর্ঘদিন ভাড়া বাড়িতে থেকে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন অরিজিৎ। গায়ক হিসেবে পরিচিত হওয়ার অনেক আগেই তিনি কাজ করতেন মিউজিক প্রোগ্রামার হিসেবে। দিনের পর দিন স্টুডিওতে কাটিয়েছেন, গান বানানোর খুঁটিনাটি শিখেছেন, তৈরি করেছেন নিজের স্টুডিও। কাজের ফাঁকে ফাঁকে শিখতে থেকেছেন সংগীতের নানা দিক। শঙ্কর-এহসান-লয়, মিঠুন, প্রীতম, বিশাল-শেখরের মতো তাবড় সংগীত পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করে নিজের দক্ষতাকে আরও শাণিত করেছেন। ছুঁয়েছেন সাফল্যের শিখর।
সাহসী ঘোষণা খুব কম শিল্পীই পারেন
কেরিয়ারের মধ্যগগনে থেকে এমন সাহসী ঘোষণা খুব কম শিল্পীই করতে পারেন। অরিজিৎ জানিয়েছেন, অবশেষে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করেছেন। বাণিজ্যিক গণ্ডি পেরিয়ে তিনি এখন স্বতন্ত্র মিউজিক (Independent Music) এবং নতুন সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করতে চান। অরিজিতের এই স্বীকারোক্তি বুঝিয়ে দিল, তিনি কেবল একজন গায়ক নন, তিনি একজন খাঁটি শিল্পী। জনপ্রিয়তার মোহে অন্ধ না হয়ে তিনি বেছে নিলেন সঙ্গীতের সেই পথ, যা তাঁকে নতুন করে বাঁচার আনন্দ দেবে। গান বাঁচতে শেখায়, ভালবাসাতে শেখায়, জীবনের রসদ জোগায়। তাই হয়তো ‘গানের ভেলায় বেলা অবেলায় প্রাণের আশা’-ই মনের স্রোতে ভাসাতে চান অরিজিৎ।









