মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কথায় বলে সময়ের ফের! শুল্ক-যুদ্ধের সময় ভারতকে কটাক্ষ করেছিলেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই সহযোগী হাওয়ার্ড লুটনিক চুপিসারে এসেছেন ভারত সফরে। অথচ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অচলাবস্থার মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য সচিব বড় মুখে দাবি করেছিলেন— “শেষ পর্যন্ত ভারত শুল্কের চাপে নতি স্বীকার করবে, দুঃখপ্রকাশ করবে এবং একটি চুক্তি করার চেষ্টা করবে।” সেই ছবিটাই বদলে গেল ২৬ ফেব্রুয়ারি। বৃহস্পতিবার লুটনিকই দিল্লিতে এসে কেন্দ্রীয়মন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সঙ্গে বৈঠক করেন, ঠিক সেই সময় যখন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপিত ব্যাপক বৈশ্বিক শুল্ক বাতিল করে দেয় (India US Trade Deal)।
লুটনিকের সফর (India US Trade Deal)
এই গোপন বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত—কোনও পক্ষই প্রকাশ্যে ঘোষণা করেনি। আদালতের রায়ের পর প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তি, যা আগামী মাসে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল, তা নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে গোয়েল টুইট না করা পর্যন্ত ভারতে লুটনিকের সফরের খবর জানা যায়নি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মার্কিন দূত সার্জিও গোর। গোয়েল টুইট করেন, “মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক ও সার্জিও গোরকে আতিথ্য জানালাম। আমাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।” তবে বৈঠকের বিস্তারিত তিনি জানাননি। কিন্তু “বাণিজ্য” ও “অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব” শব্দের উল্লেখ থেকেই স্পষ্ট যে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি। তিন নেতাই ছবির জন্য পোজ দেওয়ার সময় হাসিমুখে ছিলেন। গয়ালের হাসি যেন একটু বেশিই চওড়া ছিল। সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে আলোচনা শান্ত পরিবেশেই হয়েছে। গোরও বেশি কিছু জানাননি। তিনি টুইট করেন, “আমাদের দুই দেশের জন্য বহু সহযোগিতার ক্ষেত্র রয়েছে। হাওয়ার্ড লুটনিক ও পীযূষ গোয়েলের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ মধ্যাহ্নভোজ।”
পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলেছে
লুটনিকের সফরের সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। খুব বেশিদিন আগে নয়, এক পডকাস্টে তিনি দাবি করেছিলেন যে— ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি গত বছর বাস্তবায়িত হয়নি, কারণ প্রধানমন্ত্রী মোদি সরাসরি ট্রাম্পকে ফোন করতে অস্বীকার করেছিলেন। এখন পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলেছে, কারণ ট্রাম্পের প্রভাব কমেছে। শুল্ক সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করা বেশ কয়েকটি দেশ নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে। কারণ ট্রাম্প এই পারস্পরিক শুল্ককে চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারতও ওয়াশিংটনে নির্ধারিত তার বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সফর স্থগিত করেছে, যা চুক্তির শর্ত চূড়ান্ত করার উদ্দেশ্যে নির্ধারিত ছিল। ভারতের জন্য আদালতের এই আদেশ কার্যত নতুন করে দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি করেছে এবং সম্ভবত আরও অনুকূল শর্ত আদায়ের পথ খুলে দিয়েছে (India US Trade Deal)।
ট্রাম্পের বক্তব্য
এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছে। বুধবার তিনি ভারত-সহ অন্যান্য দেশকে “খেলা” না করার এবং বাণিজ্য প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে না আসার সতর্কবার্তা দেন। ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ট্রুথ সোশালে লিখেছেন, “যে কোনও দেশ যদি এই সুপ্রিম কোর্টের হাস্যকর সিদ্ধান্ত নিয়ে খেলা করতে চায়—বিশেষ করে যারা বছরের পর বছর, এমনকি দশকের পর দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ঠকিয়েছে—তাহলে তারা সম্প্রতি যে শুল্কে সম্মত হয়েছে তার চেয়েও অনেক বেশি শুল্ক এবং তার চেয়েও খারাপ পরিণতির সম্মুখীন হবে।” বর্তমানে ভারতীয় রফতানি পণ্যের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৩ শতাংশ শুল্ক আরোপিত রয়েছে। প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির অধীনে ট্রাম্প ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করেছিলেন। গুরুত্বপূর্ণভাবে, রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্কও তিনি তুলে নিয়েছিলেন (India US Trade Deal)। তবে ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে আসবে না, বরং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। এই প্রেক্ষাপটেই লুটনিকের নীরব সফর। চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের আগে কি ফের আলোচনা হবে? উত্তর দেবে সময়ই।
