তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
বদলে যাচ্ছে পরিবেশ। তার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে জীবন যাপনের ধরন। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোগের দাপট। আন্তর্জাতিক একাধিক সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, গোটা বিশ্বের মোট ফুসফুসের রোগে আক্রান্তের ১২ শতাংশ ভারতীয়। ভারতের সাড়ে ছয় কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত। ভারতে ফুসফুসের রোগ অন্যতম প্রধান অসংক্রামক রোগের তালিকায় রয়েছে। আর ফুসফুসের সমস্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধির অন্যতম কারণ জীবন যাপনের ধরন। এমনটাই জানাচ্ছে সাম্প্রতিক গবেষণা।
কী বলছে নয়া তথ্য?
বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, ফুসফুসের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে ধূমপানের মতো অভ্যাস। তবে, ধূমপান ছাড়াও এমন একাধিক অভ্যাস রয়েছে, যা নিঃশব্দে ফুসফুসের সমস্যা তৈরি করে। কিন্তু অধিকাংশের মধ্যেই সে সম্পর্কে কোনো সচেতনতা নেই। প্রত্যেক বছর ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত রোগীদের একটা বড় অংশ, এমন আছেন, যারা কখনোই ধূমপান করেননি। কিন্তু তাঁরা ফুসফুসের সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছেন। ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ, হাঁপানি এমনকি ফুসফুসে ক্যান্সারের মতো সমস্যা ও দেখা দিচ্ছে। প্রত্যেক দিনের জীবন যাপনের ধরন ফুসফুসের রোগের কারণ হয়ে উঠছে!
কোন অভ্যাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে?
ল্যাপটপের সামনে ৮-১০ ঘণ্টা
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, কাজের ধরন সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, এ দেশে কর্মজগতে বড় পরিবর্তন হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশ দিনের ৮-১০ ঘণ্টা চেয়ারে বসে কাটায়। দীর্ঘসময় ল্যাপটপের সামনে একটানা বসে থাকতে হয়। আর দীর্ঘ সময় এই বসে থাকাই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, দীর্ঘ সময় বসে থাকলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন ঠিক মতো হয় না। হৃদপিন্ড এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতাও তাই কমে। এগুলো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। ফলে, যে কোনও ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
শরীর চর্চায় ঘাটতি বাড়ায় ঝুঁকি
শরীর চর্চায় ঘাটতি ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলেও জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাঁরা জানাচ্ছেন, এ দেশে কাজের সময় এতটাই বেশি এবং অনেককেই রাত জেগে কাজ করতে হয়। এর ফলে দিনের বেলায় শরীর চর্চা করার প্রতি অনীহা তৈরি হয়। এতে শরীরে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত যোগাভ্যাস করলে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক থাকে। ফুসফুস এবং মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে। আবার রক্ত সঞ্চালন ঠিকমতো হয়। ফলে ফুসফুসে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। কিন্তু যোগাভ্যাসে অনীহা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে জটিলতা তৈরি করছে।
কৃত্রিম সুগন্ধী ব্যবহারও কারণ
ফুসফুসের সংক্রমণ বৃদ্ধির নেপথ্যে অন্যতম কারণ অতিরিক্ত কৃত্রিম সুগন্ধী ব্যবহার। এমনটাই জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, বাইরের দূষণ নিয়ে আলোচনা হলেও, ঘরের ভিতরের দূষণ নিয়ে একেবারেই সচেতনতা তৈরি হয়নি। এর ফলে, বিপদ বাড়ছে। লাগাতার মশানাশক ওষুধের ধোঁয়া কিংবা অতিরিক্ত কৃত্রিম সুগন্ধী ঘরে ব্যবহারের ফলে ফুসফুসের ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া অনেকেই কাঠে রান্না করেন। আবার শহরাঞ্চলে গ্যাসে রান্না করলেও কেউ কেউ জানলা বন্ধ করে রান্না করেন, এর ফলে ধোঁয়া হয়। এগুলো ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই এই ধরনের অভ্যাস এ দেশে ফুসফুসের রোগের বোঝা বাড়াচ্ছে।
কিছু নির্দিষ্ট পেশায় ঝুঁকি বেশি
এর পাশপাশি কিছু নির্দিষ্ট পেশায় কর্মরত মানুষদের কাজের জন্য ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, কয়লা খনি কিংবা শিল্পাঞ্চলে কর্মরত মানুষদের ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ, লাগাতার ধুলো ও দূষিত ধোঁয়া ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে। তাই ফুসফুসের রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে, পেশাগত ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষা কতখানি মানা হচ্ছে, সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি।
ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি কমাতে কী পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা?
এক ঘণ্টা অন্তর অন্তত ১০ মিনিট হাঁটাচলা
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, ভারতে এই বিপুল সংখ্যক ফুসফুসের রোগের বোঝা, জনস্বাস্থ্যের বড় বিপর্যয় হতে পারে। তাঁরা জানাচ্ছেন, ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি কমাতে সচেতনতা জরুরি। সব মহলে সতর্কতা না বাড়লে, বিপদ কমবে না। তাই দিনভর একজায়গায় বসে কাজ থাকলেও, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর অন্তত ১০ মিনিট হাঁটাচলা করা জরুরি। এতে রক্ত সঞ্চালন ঠিকমতো হবে আবার শরীরের একাধিক অঙ্গের কার্যকারিতাও ঠিকমতো চলবে।
নিয়মিত যোগাভ্যাস
ব্যস্ততা সত্ত্বেও যোগাভ্যাস রপ্ত করতে হবে। এমনটাই পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। তাঁর জানাচ্ছেন, তরুণ প্রজন্মের একাংশ বিনোদনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েক ঘণ্টা সময় কাটান। কিন্তু দিনে তিরিশ মিনিট যোগাভ্যাসের জন্য বরাদ্দ করতে পারেন না। ফলে, একাধিক শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়। কিন্তু সচেতনতার মাধ্যমে এই মানসিকতা বদল প্রয়োজন। এমনটাই মত চিকিৎসকদের। তাঁরা জানাচ্ছেন, দিনের অন্যান্য কাজের মতোই যোগাভ্যাসকে নিয়মিত অভ্যাসে রপ্ত করতে হবে। তাহলেই নানান জটিলতা কমবে।
তবে ধূমপান ফুসফুসের বিপদ সবচেয়ে বাড়িয়ে তোলে। ধূমপান বর্জন করতেই হবে। এমনটাই জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
